শুক্রবার, ১ নভেম্বর, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (৪০) দোযখের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৪০)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

দোযখের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, “একদিন জিব্রাইল (আঃ) হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট গমন করিলে আঁ হযরত তাহাকে দোযখের বিবরণ দিতে বলিলেন। উত্তরে জিব্রাইল (আঃ) বলিলেন, আল্লাহ পাক দোযখকে পয়দা করিয়া এক হাজার বৎসর পর্যন্ত জ্বালাইলে ইহা লালবর্ণ হয়। আরও এক হাজার বৎসর জ্বালাইলে উহা গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ হয়। উহার তীব্রতা ও শিখা কখনও নিভিবে না। হযরত মোজাহেদ (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন যে, 'দোযখে উটের ঘাড়ের ন্যায় এক শ্রেণীর বিষাক্ত সাপ ও বিশ্রী খচ্চরের মত এক শ্রেণীর বিচ্ছু আছে। দোযখীগণ উহার ভয়ে পলায়ন করিতে চাহিলে উহারা তাহাদিগকে তালাস করিয়া ঠোঁট দ্বারা কামড়াইবে এবং মস্তক ও নখ ছাড়া সমস্ত দেহের চামড়া টানিয়া ছিঁড়িবে। শতবার পলাইয়াও তাহারা উহাদের আযাব হইতে রেহাই পাইবে না।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারেস (রাঃ) হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, “দোযখে উটের ঘাড়ের মত এক শ্রেণীর সাপ আছে। উহা এত ভয়ঙ্কর যে কাহাকেও একবার দংশন করিলে চল্লিশ বৎসর যাবত উহার বিষক্রিয়া থাকিবে।আবার খচ্চরের মত এক শ্রেণীর বিচ্ছু আছে, উহার দংশনেও বিষক্রিয়া চল্লিশ বৎসর বিদ্যমান থাকিবে।” 
হযরত আমামা (রাঃ) এজিদ ইবনে ওয়াহাব ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “তোমাদের ব্যবহারের আগুন দোযখের আগুনের তুলনায় সত্তর ভাগের একভাগ তেজসম্পন্ন। দুনিয়ার আগুন পানিতে ধুইলে ব্যবহারের উপযোগী থাকে না আর দুনিয়ার আগুন দোযখের আগুন হইতে আল্লাহর নিকট পানাহ চাহিয়া থাকে।

হাদীস শরীফে আরও আছে যে, একদা জিব্রাইল (আঃ) কে আল্লাহ পাক নির্দেশ করিলেন, “তুমি মালেক (আঃ) এর নিকট হইতে কিঞ্চিৎ‍ আগুন লইয়া হযরত আদম (আঃ)কে ব্যবহারের জন্য দাও।" আগুন চাহিলে জিব্রাইল (আঃ)কে মালেক (আঃ) বলিলেন, “কি পরিমাণ আগুন আপনি নিতে চান?” জিব্রাইল (আঃ) উত্তর করিলেন, “এক আঙ্গুলের মাথার সমান আগুন চাই।” হযরত মালেক (আঃ) বলিলেন, “এই পরিমাণ আগুন সাত আকাশ ও সাত যমিন বিগলিত করিয়া দিবে।” তিনি আরও বলিলেন, “হে বন্ধু! অর্ধ অঙ্গুলি পরিমাণ আগুনের তাপে বৃষ্টিপাত ও গাছপালা উৎপাদন বন্ধ হইয়া যাইবে।” তারপর জিব্রাইল (আঃ) আগুনের পরিমাণ সম্পর্কে আল্লাহর নিকট আরজ করিলে, আল্লাহ পাক বলিলেন, “হে জিব্রাইল! কেবল কণামাত্র আগুনকে সাত সাগরে সত্তরবার ধুইয়া সর্ব্বোচ্চ পর্বতের উপর রাখিয়া দাও।” কিন্তু সেই আগুনও পর্বতকে জ্বালাইয়া দোযখে উহার পূর্বস্থানে চলিয়া গেল। পাথরখন্ড ও লোহার মধ্যে উহার ধূম্ররাশি ছাড়িয়া গেল। উহার পরিত্যক্ত ধূম্ররাশি আজও মানুষের ব্যবহারের উপযোগী আগুন সরবরাহ করিতেছে; সুতরাং হে বিশ্বাসীগণ! উহা হইতে হেদায়েত লাভ করুন।

হাদীস শরীফে আছে, “নিকৃষ্টতম দোযখীকে কেবল এক জোড়া আগুনের জুতা পরিধান করান হইবে। উহার তেজে মগজ টবগ্ করিয়া ফুটিয়া মস্তক বিদীর্ণ করিয়া বাহির হইতে থাকিবে এবং পেটের সমস্ত বস্তু গলিয়া বাহ্যনালী দিয়া গড়াইয়া পড়িবে এবং সে ধারণা করিবে হয়ত তাহাকেই সবচেয়ে কঠিন আযাব করা হইতেছে। মূলতঃ সেই ব্যক্তি নিকৃষ্টতম জ্বাহান্নামী।" দোযখীরা আযাবের যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর যাবত হযরত মালেক (আঃ) কে ডাকাডাকি করিবে, কিন্তু তিনি নিশ্চুপ থাকিবেন ৷ বহুকাল পর তিনি বলিবেন, “হে দোযখীগণ! চীৎকার ও ডাকাডাকিতে কোন ফল হইবে না। এই আযাব তোমাদিগকে অনন্তকাল ভোগ করিতে হইবে।” আবার তাহারা আল্লাহর নিকট আরজ করিয়া বলিবে, “হে আল্লাহ! আমাদিগকে মাফ করুন এবং আযাব হইতে মুক্তি দিন! পুনরায় এমন গুনাহ আর করিব না।" বহুকাল নীরবতার পর বলা হইবে, “হে দোযখীগণ! কান্না-কাটিতে কোন ফল হইবে না। লাঞ্ছিত ও নির্বাকভাবে আযাব ভোগ কর। তোমাদের প্রতি কোন করুণা বর্ষিত হইবে না। তারপর তাহারা চীৎকার ও বাক্যালাপ করিতে পারিবে না। গাধার প্রথম আওয়াজ ‘জাফির' এবং শেষ আওয়াজ ‘শাহিক' ছাড়া অন্য কোন আওয়াজ তাহারা করিতে পারিবে না।”

হযরত মালেক (আঃ) আল্লাহর শপথ করিয়া বলিয়াছেন, “হে নবী! যিনি আপনাকে সত্য নবীরূপে পাঠাইয়াছেন, তাঁহার শপথ, যদি দোযখের একটি কাপড় আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে লট্‌কাইয়া দেওয়া হইত, তবে উহার তাপ ও দুর্গন্ধে জগৎবাসী মরিয়া যাইত। ঐ আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবী করিয়া প্রেরণ করিয়াছেন। যদি সূচাগ্র পরিমাণ দোযখের আগুন দুনিয়াতে রাখা হইত, তবে সমস্ত পৃথিবী ছারখার হইয়া যাইত। ঐ আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবী করিয়া পাঠাইয়াছেন, পবিত্র কুরআনে বর্ণিত জিঞ্জিরের একছাত পরিমাণও যদি কোন পর্বতে রাখা হইত তবে পর্বত ও পৃথিবী জ্বালাইয়া উহা সপ্ততল ষমিনের নীচে নামিয়া যাইত। আর হে নবী! ঐ আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্য নবী করিয়া পাঠাইয়াছেন, দোযখীদের আযাবের মত কাহাকেও যদি দুনিয়ার মাগরিব প্রান্তে আযাব করা হইত, তবে মাশরিক প্রান্তবাসীগণ উহার তাপ, প্রচন্ডতা ও ভয়ঙ্করতায় জ্বলিয়া যাইত। দোযখ অতিশয় ভয়ঙ্কর, ভীষণ গভীর অনলকুন্ড বিশিষ্ট। লোহা উহার জ্বালানী হইবে। গরম পানি ও পূঁজ , দোযখীদের পানীয় এবং কাত্রান নির্মিত বস্তু উহাদের পরিধেয় কাপড় হইবে।

পরবর্তী পর্ব-
দোযখের দরওয়াজার বিবরণ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...