হযরত ওহাব ইবনে মাম্বাহ (রাঃ) বলেন, “সেদিন হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক ঘাঁটিতে মুনাজাত করিবেন, “ইয়া রাব্বি হাবলী উম্মাতি, ইয়া রাব্বি হাব্লী উম্মাতি!” তখন , উহাতে মানুষের এত ভীড় হইবে যে, একে অন্যের উপর পতিত হইবে। সেতুটি সমুদ্রের মধ্যে প্রকম্পিত জাহাজের ন্যায় প্রবল বাতাসে আন্দোলিত হইতে থাকিবে। তথাপিও যাহারা রক্ষা পাওয়ার তাহারা আল্লাহর রহমতে পার হইয়া যাইবে। প্রথম দল চক্ষুর দৃষ্টি হরণকারী বিজলীর মত দ্রুতবেগে, দ্বিতীয় দল প্রবল ঝড়ের ন্যায়, তৃতীয় দল দ্রুতগামী পাখীর ন্যায়, চতুর্থ দল দ্রুতগামী অশ্বের ন্যায়, পঞ্চম দল ধাবমান পথিকের ন্যায়, ষষ্ঠ দল দুর্বল পথিকের মত ধীরে ধীরে, সপ্তম দল ধাবমান উটের মত, অষ্টম দল গর্ভবতী মহিলাদের মত, নবম দল বাঘের মত দৌড়াইয়া পুল পার হইবে। একদল পুলের উপর দাঁড়াইয়া থাকিবে ও চলিতে এবং পার হইতে পারিবে না। তন্মধ্যে কেহ একদিনে কেহ একমাসে, কেহ এক বৎসরে, কেহ দুই বৎসরে, কেহ তিন বৎসরে ক্রমানুয়ে দীর্ঘ সময়ে পুলছিরাত পার হইবে। সর্বশেষ ব্যক্তি উহা পঁচিশ হাজার বৎসরে পার হইবে।
হাদীস শরীফে আরও আছে, “মানুষ যখন পুল পার হইতে থাকিবে, তখন তাহাদের সামনে-পেছনে, উর্ধ্বে-নিন্মে ডাহিনে-বামে, চতুর্দিকে কেবল জ্বলন্ত আগুন থাকিবে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কেহ নাই যে, তাহাকে পুলছিরাত পার হইতে হইবে না। তোমার প্রতিপালক নিশ্চয়ই ইহা অতিক্রম করাইবেন। তারপর আমি প্রত্যেক ধর্মভীরুদিগকে নিস্তার দিব এবং অত্যাচারীদিগকে অধঃমুখে দোযখে নিক্ষেপ করিব।” নরকাগ্নি তাহাদের হাড়, মাংস, চামড়া, নাড়িভূড়ি জ্বালাইয়া কয়লার মত করিয়া দিবে।
অপরদিকে কেহ নির্বিঘ্নে তাহা পার হইবে। আগুন তাহাদিগকে স্পর্শও করিবে না। পরন্তু সে পার হইয়া বলিবে, “কই পুলছিরাত কোথায়?” ফেরেশতাগণ উত্তর করিবে, “হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহর রহমতে তুমি উহা অতিক্রম করিয়াছ।" আরও বর্ণিত আছে যে, একদল লোক আগুনের ভয়ে মধ্যখানে দাঁড়াইয়া কাঁদিতে থাকিবে। এমতাবস্থায় হযরত জিব্রাইল (আঃ) তাহাদিগকে প্রশ্ন করিবেন, “তোমরা কেন দাঁড়াইয়া ক্রন্দন করিতেছ?” তাহারা বলিবে, “আগুনের ভয়ে।” পুনরায় জিজ্ঞাসা করিবেন, “পৃথিবীতে কিভাবে তোমরা সমুদ্র অতিক্রম করিতে?” তাহারা উত্তর করিবে, “নৌকা বা জাহাজে চড়িয়া।” তখন ফেরেশ্তাগণ ঐ সকল মসজিদগুলিকে যাহাতে তাহারা জামাতে নামায আদায় করিয়াছিল, নৌকা বা জাহাজের ছুরতে উপস্থিত করিবে এবং তাহারা সেইগুলিতে আরোহণ করিয়া পুলছিরাত পাৱ হইয়া যাইবে। আর তাহাদিগকে স্মরণ করাইয়া ঘোষণা করা হইবে, “এইগুলি সেই মসজিদ, যাহাতে তোমরা জামাতের সহিত নামায সম্পন্ন করিতে।”
হাদীস শরীফে আরও আছে, “রোজ কিয়ামতে আল্লাহর সম্মুখে এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হইবে, যাহার গুনাহরাশি নেক হইতে অধিক হইবে। এইজন্য তাহাকে দোযখে নিক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হইবে। তারপর আল্লাহ পাক হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে বলিবেন, “হে জিব্রাইল! তাহাকে জিজ্ঞাসা কর, সে কি কোন আলেমের মাহফিলে বসিয়াছিল? তবে তাহাকে আমলের সুপারিশে মাফ করিয়া দিব।” তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে সে উত্তর করিবে যে সে বসে নাই। হযরত জিব্রাইল (আঃ) আরজ করিবেন, “হে আল্লাহ! তুমিই তোমার বান্দা সম্পর্কে ভাল জান।” আল্লাহ আবার বলিবেন, “তাহাকে জিজ্ঞাসা কর, সে কোন আলেমের সাথে ভালবাসা রাখিয়াছিল কিনা?” বান্দা বলিবে, না রাখে নাই। আবার জিজ্ঞাসা করা হইবে, “সে কি কোন আলেমের দস্তরখানে বসিয়া আহার করিয়াছে?" বান্দা উত্তরে না বলিবে। পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হইবে, “সেকি কোন আলেমের গৃহে বসবাস করিয়াছে?" বান্দা উত্তর করিবে, না। আবার জিজ্ঞাসা করা হইবে, “সে কি কোন আলেমের নামে নিজের ছেলের নাম রাখিয়াছে? তাহাতেও তাহাকে মাফ করিয়া দিব।” ইহাও পাওয়া যাইবে না। আবার জিজ্ঞাসা করা হইবে, “সে এমন কোন ব্যক্তিকে ভালবাসিয়াছে কি, যে কোন আলেমকে ভালবাসিত।” এইবার বান্দা উত্তর করিবে 'হ্যাঁ।' তখন আল্লাহ নির্দেশ দিবেন, “তাহাকে বেহেশতে পৌছাইয়া দাও। কারণ সে পৃথিবীতে আলেমের প্রিয়পাত্রকে ভালবাসিয়াছে।"
হাদীস শরীফে আরও আছে, “রোজ কিয়ামতে মসজিদগুলিকে শুভ্র উটের ন্যায় হাশরের মাঠে হাজির করা হইবে। উহার পাগুলি আম্বর নির্মিত হইবে। গলা জাফরানের, মস্তক মেশকের ও পৃষ্ঠদেশ জবরজদের তৈরী হইবে। উহাদের পিঠে জামাতের নামায আদায়কারীগণ সওয়ার হইবে। মোয়াজ্জিনগণ উহার লাগাম ধরিয়া এবং ঈমামগণ হাঁকাইয়া মাঠে লইয়া যাইবে। তখন জিজ্ঞাসা করা হইবে, “তাহারা কি মর্যাদাশীল · ফেরেশতা না কোন নবী ও রাসূল?” উত্তরে বলা হইবে, “হে হাশরবাসীগণ! তাহারা কোন নবী ও রাসূল বা কোন মর্যাদাশালী ফেরেশতা নহে, বরং তাহারা ঐ সকল উম্মতে মুহাম্মদী যাহারা জামাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়িয়াছিল।”
আরও বর্ণিত আছে যে, “আল্লাহ পাক দারদাইল নামক একজন ফেরেশতা পয়দা করিয়াছেন। তাহার দুইখানা পাখা মাশরেক-মাগরেব পর্যন্ত বিস্তৃত। মাগরিবের পাখা ইয়াকুত এবং মাশরিকের পাখা সবুজ জবরজদে নির্মিত হইবে। আর মণিমুক্তা, ইয়াকুত ও মারজান খচিত হইবে। ইহার মস্তক আরশের নীচে এবং পদদ্বয় সপ্ততল মাটির নীচে থাকিবে। তিনি প্রত্যেক রমযান মাসের রাত্রে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “কোন প্রার্থনাকারী আছে কি, আল্লাহ যাহার প্রার্থনা কবুল করিবেন। কোন আকাঙ্ক্ষাকারী আছে কি? তাহা পূরণ করিয়া দেওয়া হইবে। কোন তাওবাহকারী আছে কি? তাহার তাহওবাহ, কবুল করা হইবে। কোন ক্ষমাকারী আছে কি? আজ ক্ষমা করা হইবে।” উক্ত ফেরেশতা ফজর পর্যন্ত এইরূপ ঘোষণা করেন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন