মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৪

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (২২) অর্থনৈতিক ব্যবস্থা



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৪ 

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ২২)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)


অর্থনৈতিক ব্যবস্থা 
অর্থনীতি এমন এক বিদ্যা যাতে মানুষের বৈষয়িক সহযোগিতার লেনদেন ও আয়-ব্যয়ের অবস্থা পর্যালোচিত হয়। অর্থনীতির মূলনীতি হল এইমানুষের চাহিদা যতই খুব বেড়ে গেল আর প্রত্যেকেই নিজ নিজ প্রয়োজন মনের মত করে পূরণ করার জন্য উদগ্রীব হলততই দেখতে পেল কারো পক্ষেই বিচ্ছিন্ন থেকে একাকী তা পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণকারো কাছে হয়তো প্রয়োজনাতিরিক্ত পানি রয়েছে কিন্তু খাবার নেই। ফলে একে অপরের মুখাপেক্ষী হতে বাধ্য হয়। এক্ষেত্রে বিনিময় ছাড়া তাদের গত্যন্তর নেই। তাই এ বিনিময়ের কাজটি অভাব পূরণের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হয়। তখন এটা অপরিহার্য মনে হল যেপ্রত্যেক ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোন এক প্রয়োজনীয় বস্তু উৎপাদন বা তৈরীর কাজে আত্মনিয়োগ করবে এবং সেটাকেই সুদৃঢ় ভিত্তিতে গড়ে তুলবে ও তার সর্ববিধ উপকরণ সংগ্রহ ও সরবরাহ করবে। এমনকি সেটাকে অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের বিনিময়ের মাধ্যম করার উপযোগী করবে। এ ভাবে বার্টার সিস্টেম অর্থনীতির এক সর্বজন স্বীকৃত মূলনীতি হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন দেখা গেলএকজনের পছন্দনীয় জিনিসটি অপর ব্যক্তির পছন্দ হচ্ছে নাতাই দ্রব্য বিনিময় কোন কোন ক্ষেত্রে অচল হয়ে পড়ছেতখন তারা এ ব্যবস্থার বিকল্প আবিস্কারে আত্মনিয়োগ করল। ফলে তারা স্থায়ীত্ব লাভকারী খনিজ দ্রব্য বিনিময় কোন কোন ক্ষেত্রে অচল হয়ে পড়ছেতখন তারা এ ব্যবস্থার বিকল্প আবিস্কারে আত্মনিয়োগ করল। ফলে তারা স্থায়িত্ব লাভকারী খনিজ দ্রব্য উত্তোলনপূর্বক মুদ্রা তৈরী করে বিনিময়ের মাধ্যম বানাল। তখন এটাই সর্বজন স্বীকৃত মাধ্যম হয়ে দাঁড়াল। খনিজ দ্রব্যের ভেতর সোনা ও রূপা এ কাজে ব্যবহৃত হয়। এগুলো মুদ্রাকারে তৈরী বিধায় মানুষের বহনের জন্যও সহজসাধ্য হল। তাছাড়া সোনা বা রূপার কোন গুণগত তারতম্য না থাকায় পছন্দ অপছন্দের বিরোধ দেখা দিল না। ফলে এ দুটোই সাধারণতঃ স্থায়ী সমাধান হয়ে দাঁড়াল। অন্য মাধ্যমটি শুধু উভয় পক্ষের স্বীকৃতির ভিত্তিতে অব্যাহত থাকল। 
উপার্জনের পন্থা হিসেবে মানুষ কৃষিপশুপালন ও পশু শিকারকাষ্ঠ ও ফলমূল সংগ্রহ এবং খনিজ দ্রব্য আহরণকে গ্রহণ করল। তাছাড়া কামারসূতারতাঁতী ইত্যাদি শিল্পজাত পেশাজীবী গড়ে উঠল। এর মাধ্যমে মানুষ তার আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভাবে কাজে লাগাল। ব্যবসা-বাণিজ্য এক গুরুত্বপূর্ণ পেশ হিসেবে দেখা দিল। 
তারপর শহর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য মেথর ও ঝাড়ুদার নামক পেশাদার সৃষ্টি হল। অতঃপর মানুষের নানাবিধ চাহিদা ও প্রয়োজন মেটাবার জন্য বিভিন্ন পেশাদার জন্ম নিল। এ ভাবে মানুষ যতই ভোগ-বিলাস ও আড়ম্বরের দিকে অগ্রসর হলতত বেশী পেশাদার সৃষ্টি হয়ে চলল। এমনকি এক এক পেশায় এক এক শ্রেণী নির্দিষ্ট হয়ে গেল। 
এর কারণ দুটো। প্রথমতঃ প্রত্যেকে তার নিজ নিজ দক্ষতা ও ক্ষমতা অনুসারে নির্দিষ্ট পেশ গ্রহণ করল। সাহসী বাহাদুরেরা সামরিক পেশায়মেধাবী ও ধীশক্তি সম্পন্নরা অফিস-আদালতের পেশায় এবং দৈহিক শক্তিধর ও পরিশ্রমীরা বোঝা বহন ও শ্রমের পেশায় নিয়োজিত হল। দ্বিতীয়তঃ সুযোগ-সুবিধার কারণেও পেশা নির্ধারিত হয়। যেমনএকজন কামারের ছেলের কিংবা তার সহচরদের জন্য কামার হওয়া যেরূপ সহজঅন্যের জন্য সেরূপ সহজ নয়তেমনি কামারের ছেলের জন্য অন্য কোন পেশাও সহজ সাধ্য নয়। যেভাবে নদীর কূলের বাসিন্দাদের জন্য জেলে হওয়া যত সহজঅন্য কিছু হওয়া তার জন্য তত সহজ নয়। 
এসব পেশাদার ছাড়াও কিছু লোক থাকে যাদের কোন ভাল পেশার সুযোগ বা শক্তি থাকে না। তখন তারা নাগরিকদের জন্য ক্ষতিকর পেশায় নিয়োজিত হয়। যেমন চুরিজুয়াডাকাতিভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদি। 
বিনিময় কার্যের আবার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। কখনও দ্রব্য দিয়ে দ্রব্যের বিনিময় হয়। সেটাকে বেচা-কেনা বলা হয়। কখনও দ্রব্যের বিনিময়ে কাজ নেয়া হয়। সেটাকে মজুরী বা ভাড়া বলা হয়। শহরবাসী কিংবা জনবহুল এলাকার নাগরিকদের ভেতর যেহেতু আত্মীয়তা বা প্রতিবেশী সুলভ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেতাই তাদের ভেতর হেবাউপহার ও ধার-কর্জের আদান-প্রদান ও লেনদেন চালু হয়। দরিদ্র শ্রেণীর জন্য দান-খয়রাতের রীতি প্রবর্তিত হয়। 
মূলতঃ যে কোন সমাজে কিছু লোক জ্ঞানী হয়কিছু লোক বোকা হয়কিছু লোক সবল হয়কিছু লোক কর্মঠ হয়কিছু লোক বিলাসী হয়কিছু হিসেবী হয়এবং এর ফলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়। তাই একে অপরের সহযোগিতা ছাড়া চলতে পারে না। এ সহযোগিতার ক্ষেত্রে চুক্তিশর্ত ও সমঝোতার প্রশ্ন দেখা দেয়। 
এ সবের জন্যই বর্গা প্রথাসমবায় প্রথাশেয়ারের ব্যভসাপাওয়ার অব এটর্নীইজারা প্রথা ইত্যাদি রীতি চালু হয়। এ ক্ষেত্রে ধার-কর্জও জরুরী হয়। কখনও আমানতের লেনদেন হয়ে থাকে এসব ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততার অভাব দেখা দেয়ায় সাক্ষী-সাবুদলেখা-পড়াদলীল-দস্তাবীজজামীন-জামানত ইত্যাদি ব্যবস্থা অনুসৃত হয়। মানুষ যত বেশী সম্পদ আহরণ করতে থাকলতত বেশী পারস্পরিক সহযোগিতার রীতি-নীতি চালু হতে লাগল। 
এভাবে সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের ভেতর লেনদেনের এসব রীতি-নীতির বিস্তার লাভ ঘটেছে। আপনার এও দেখতে পাবেনঅর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ভাল-মন্দের ভিত্তিতেই ন্যায়বান ও নিপীড়ক নির্ণীত হয়।

পরবর্তী পর্ব 
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৫
রাজনীতি 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...