মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৪

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (২৩) রাজনীতি



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৫ 

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ২৩)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

রাজনীতি 
রাষ্ট্রবিজ্ঞান সেই বিদ্যাকে বলেযাতে নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক বর্ণনা করা হয়। কোন রাষ্ট্রের নাগরিক বলতে তাদের বুঝায়যারা ভিন্ন ভিন্ন থাকা সত্ত্বেও সম ভাবধারায় উদ্ধুদ্ধ ও জীবন-জীবিকার যাবতীয় কায়কারবারে পরস্পর সম্পৃক্ত। 
মূলতঃ যে কোন রাষ্ট্রের নাগরিকগণ একই ব্যক্তি সদৃশযার বিভিন্ন অংগ-প্রত্যংগ মিলে একক দেহ গঠিত হয়েছে। প্রত্যেকটি যৌগিক বস্তুর যে কোন অংশে ক্ষতি দেখা দেয়ার সম্ভাবনা থাকে কিংবা তাতে কোন ব্যাধি সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎতাতে যথাযথ অবস্থার বদলে কোন অব্যবস্থা দেখা দিতে পারে। অথবা তাতে যথাযথ অবস্থা বহাল থাকতে পারে এবং তা সুন্দর ও সুস্থ মনে হতে পারে। মোটকথাবিভিন্ন অংশের সমন্বয়ে সৃষ্ট যে কোন বস্তুতে এদুটো অবস্থা দেখা দিতে পারে। 
যে কোন রাষ্ট্রে বহু লোক বাস করে। ভাল-মন্দ ভাবনার ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত হওয়া স্বাভাবিক। কোন উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পরিষদ ছাড়া কেউ কারো নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে না। কারণতা করতে গেলে ঝগড়া-বিবাদ ও দাংগা-হাংগামা সৃষ্টি হবে। তাই গোটা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এমন এক ব্যক্তির হাতে থাকতে হবে যার আনুগত্য রাষ্ট্রের ভাংগা-গড়ার ক্ষমতাসম্পন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মেনে নেয়। অর্থাৎতিনি হবেন তাদেরই নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান। রাষ্ট্র প্রধানকে পূর্ণ ক্ষমতাবান হতে হবে। তার অধীনে সামরিক বাহিনী থাকতে হবে! সংকীর্ণমনা উগ্র স্বভাবের দাংগা-হাংগামা প্রিয় লোকদের জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন সর্বাধিক। 
এই ব্যবস্থার অবর্তমানে দেখা যায় যেদুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসে এবং তখন তারা ইনসাফের বিধি-বিধান বর্জন করে খেয়ালখুশী মত সমাজ পরিচালিত করে। এ ধরনের সংগঠনকে ডাকাত সংঘের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে শুধু জনসাধারণের সম্পদ লুণ্ঠন করা। অথবা তাদের কাজ হয় হিংসা-বিভেদ ছড়ানোশত্রুতা উদ্ধার করা ও যে কোন মূলে ক্ষমতায় জেঁকে বসা। এদের হাতে মানুষের চরম দুর্গতি নেমে আসে। এরূপ অবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে জনগণকে উদ্ধুদ্ধ ও সংঘবদ্ধ করে তাদেরকে উৎখাতের জন্য জেহাদ করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। 
সঠিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অবর্তমানে অন্যান্য যে সব জটিলতা ও অকল্যাণ দেখা দেবে তা হল এইঃ 
কোন দুর্ধর্ষ লোক যদি কাউকে হত্যা কিংবা আহত করেঅথবা নির্যাতন করেকিংবা কারো স্ত্রীকন্যাভগ্নির ইজ্জত নষ্ট করতে চায়অথবা তার ধন-সম্পদ গায়ের জোরে ছিনিয়ে নেয় বা রাতের আঁধারে চুরি করে কিংবা কারো সম্মান হানি ঘটায়অপবাদ রটায় ও নানা ভাবে ক্ষতি করে চলেতখন তার প্রতিকারের কোন উপায় থাকে না। 
এ সব প্রকাশ্য অপরাধ ছাড়াও বেশ কিছু অপ্রকাশ্য ও পরোক্ষ অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। যেমনযাদু করাবিষ খাওয়ানোমানুষকে ক্ষতিকর ব্যবহার শিক্ষা দানমানুষে মানুষে ঝগড়া বাঁধানোর ষড়যন্ত্র করারাষ্ট্রপতি ও নাগরিককর্মচারী ও মালিকস্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট করার চক্রান্ত চালাতো ইত্যাদি। 
তেমনি চরিত্র ধ্বংসকারী কার্যকলাপ যথা পুরুষ কিংবা নারীর সমকামিতা অথবা পশুর সংগে পাশবিকতার মত বদ-অভ্যেস মানব সমাজের সামাজিক রীতি-নীতির বিপর্যয় ঘটায়। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনে ভাংগত সৃষ্টি হয়কিংবা তারা অসুখী হয়। 
তেমনি সে সব বদঅভ্যেস যা মানব সমাজের বিবেক ও রুচির পরিপন্থী। যেসব পুরুষরা নারী সেজে নারী সুলভ আচরণ চালায় কিংবা নারীরা পুরুষ সেজে পুরুষকে আচরণ দেখায়। 
তেমনি সেসব স্বভাব যা বড় রকমের ঝগড়ার সৃষ্টি করে। যেমনএরূপ কোন নারী লাভের জন্য কয়েকজনে জুটে কাড়াকাড়ি করা যে নারী মূলতঃ কারো জন্যই নির্ধারিত নয়কিংবা মদ পান করে মাতলামী করা। 
তেমনি নাগরিক জীবন দুর্বিষহ করার বিভিন্ন গর্হিত কাজে লিপ্ত হওয়া। যেমনজুয়া খেলাঘুষের আদান-প্রদানমাপে কম দেয়াভেজাল মেশানোদুর্মূল্য সৃষ্টির জন্য গুদামজাত করাকিংবা ফটকাবাজারী করাঅন্যকে ফাঁসানোর জন্য দাম বাড়ানোর দালালী করা ইত্যাদি।
তেমনি নাগরিক জীবন অতীষ্টকারী ঘৃণ্য কার্যকলাপে লিপ্ত থাকা। মিথ্যা মামলাবানোয়াট ও জাল দলীল প্রণয়নমিথ্যা সাক্ষীমিথ্যা শপথ ইত্যাদি। কারণএসব কারণে সত্য উদঘাটন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা দুরূহ হয়ে পড়ে। পরন্তু নাগরিক নৈতিকতাও কলুষিত হয়। 
তেমনি শহরবাসী শহুরে পেশা ছেড়ে গ্রামে গিয়ে চাষাবাদ শুরু করে কিংবা গ্রামবাসী চাষাবাদ ছেড়ে সবাই ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করাও একটা ক্ষতিকর দিক। কারণযে পেশায় যারা দক্ষ তারা হঠাৎ পেশা বদল করলে সব ক্ষেত্রেই অদক্ষতা ও ব্যর্থতা দেখা দেয়। এ কারণে খাদ্য উৎপাদকদের যেমন খাদ্য উৎপাদনে থাকা উচিততেমনি অন্যান্য পেশাদারদের নিজ নিজ পেশায় দক্ষতা প্রয়োগে লেগে থাকা কর্তব্য। মূলতঃ কৃষিকাজ যেন খাদ্য আর অন্যান্য পেশ লবণ। একটি ছাড়া অপরটি বিস্বাদ ও অর্থহীন হয়ে যাবে। 
তেমনি হিংস্র জন্তু ও ক্ষতিকর এবং কীট-পতংগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়া। অথচ সেগুলো ধ্বংস করে ফেলা অপরিহার্য। 
এসব তো গেল রাষ্ট্রের নাগরিক জীবনের নিরাপত্তার জন্য নাগরিকদের নীতি-নৈতিকতার বিভিন্ন দিক। এখন আলোচ্য হচ্ছে তাদের বৈষয়িক সংরক্ষণ ও উন্নয়নের দিকসমূহ। যেমনরাজধানী ও কেন্দ্রীয় শহরগুলোয় জাতীয় প্রয়োজনের বিভিন্ন সৌধ নির্মাণপ্রাচীর ও দূর্গ তৈরীসারাইখানাবাজাররাস্তা-ঘাটও পুল তৈরীপুস্করিণীখাল ও কূপ খনননদী বন্দর ও জাহাজ তৈরী করে পণ্য আমদানী-রফতানী ও যোগাযোগের ব্যবস্থা করাচাকরীব্যবসা ও শিল্পের সৃষ্টি করাস্বদেশ ও বিদেশী মূলধন বিনিয়োগের আকর্ষণ ও সুযোগ সৃষ্টি করা ইত্যাদি। 
তাছাড়া প্রত্যেক পেশার লোকজনকে নিজ নিজ পেশার কাজের উৎসাহপরিবেশ ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বেকারদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শিল্পখাতে দ্রব্য যাতে উন্নতমানের হতে পারে তার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার উপর বিশেষ জোর দিতে হবে। কৃষি বিদ্যালয় গড়ে তুলতে হবে। ভূমি অনাবাদী রাখা যাবে না। ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্লানিংয়ে পারদর্শী লোক তৈরী করতে হবেদেশের নাগরিকদের সামগ্রিক অবস্থা জানার ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাহলে কার কোথায় কি প্রয়োজন তা যথাসময়ে নিরসনের ব্যবস্থা নেয়া যাবে। বিত্তবানদের সহায়তায় বিত্তহীনদের অবস্থার প্রতিকার করতে হবে। 
বিশেষতঃ রাষ্ট্রীয় তহবিল যেন বেকারভাতা আর ওলামাসেনানায়ককবি-সাহিত্যিক ইত্যাকার অনুৎপাদনশীল লোকের ভার বহন করে নিঃশেষ না হয়। তাহলে পেশাদার কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত ট্যাক্স বসিয়ে তাদের নিরুৎসাহ করা হবে। ফলে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডার অধিকতর দুর্বল হয়ে পড়বে। এ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তাই কর্মহীন সব লোককেই বেকারভাতা না দিয়ে কর্মক্ষমদের উৎপাদনশীল কাজে নিয়োগ করতে হবে এবং সামরিক ও পুলিশ বাহিনীতে প্রয়োজন মোতাবেক নিয়োগ করতে হবে। রাষ্ট্রনায়কদের উপরোক্ত ব্যবস্থাগুলো সতর্কতার সাথে অনুধাবন করতে হবে।

পরবর্তী পর্ব
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৬ 
রাষ্ট্রপতিগণের চরিত্র ও গুণাবলী 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...