শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০২৪

দাকায়েকুল (৫১) বেহেশতবাসীগণের সুখের বিবরণ



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ৫১)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বেহেশতবাসীগণের সুখের বিবরণ-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, জনাব নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, পুলছিরাতের পিছনে একটি বিস্তীর্ণ মাঠ রহিয়াছে। উহাতে অনেক সুন্দর ও মনোরম গাছ আছে এবং প্রত্যেক গাছের নীচে উত্তরে দক্ষিণে প্রলম্বিত দুইটি নহর রহিয়াছে। আর সেই নহরগুলি বেহেশত হইতে উৎপন্ন হইতেছে। নেককার বান্দ| কবর হইতে উঠিয়া হিসাব-নিকাশের জন্য দীর্ঘকাল দণ্ডায়মান থাকিয়া এবং প্রখর সূর্যের উত্তাপে দগ্ধীভূত হইয়া অতিশয় ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত অবস্থায় পুলছিরাত অতিক্রম করিয়া যখন একটি নহর হইতে পানি পান করিবে, তখনই তাহাদের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট, ক্লান্তি ও অবসাদ বিদূরিত হইয়া যাইবে। এমন কি সেই পানি বক্ষস্থলে পৌঁছিবামাত্র সমস্ত হিংসা, বিদ্বেষ, কিনা ও খেয়ানতের আপবিত্রতা দূরীভূত হইয়া যাইবে। আর সেই পানি উদরে প্রবেশ করিবার সঙ্গে সঙ্গে উদরস্থ সমুদয় প্রস্রাব পায়খানা এবং রক্ত জাতীয় নাপাকী হইতে দেহ পবিত্র হইয়া যাইবে। তারপর অন্য নহরের পানি দ্বারা তাহার। নিজেদের মস্তক ও শরীর ধৌত করিবে। আর সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের মুখমণ্ডল পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল ও রেশমী বস্ত্রের ন্যায় কোমল ও নরম হইয়া যাইবে। আর সেই দেহ হইতে সুগন্ধি নির্গত হইতে থাকিবে। তারপর তাহারা নিজ নিজ বেহেশতের দ্বারদেশে গিয়া উপনীত হইবে। সেইখানে পৌছিয়া তাহারা দরজার লাল বর্ণের ইয়াকুত-মুক্তার শিকলে করাঘাত করিবার সঙ্গে সঙ্গে উহা উন্মুক্ত হইয়া যাইবে। তাহাদের করাঘাতের মৃদু শব্দ শ্রবণ করিয়া হুরগণ অনুভব করিতে পারিবে যে, তাহাদের প্রতিক্ষিত স্বামীগণের আগমন ঘটিয়াছে। অতএব তখনই তাহারা স্বীয় স্বামীর শুভাগমনে আনন্দিত হইয়া বিদ্যুৎবেগে ছুটিয়া গিয়া নিজ নিজ স্বামীকে আলিঙ্গন করিবে এবং তাহাকে ভিতরে লইয়া আসিবে। আর বলিতে থাকিবে, “ওগো প্রিয়তম! তুমিই আমার পরম সুহৃদ বন্ধু, আমি তোমাতেই সন্তুষ্ট ও পরিতুষ্ট থাকিব। আর আমি কখনও তোমার প্রতি বিরাগ ও অসন্তুষ্ট হইব না।” তাহারা এইরূপভাবে তাঁহাকে সাদর সম্ভাষণ জ্ঞাপন করিবে। তাহাদের জন্য বেহেশতের মধ্যে সত্তরটি পালঙ্ক থাকিবে এবং প্রত্যেক পালঙ্কে সত্তরটি বিছানা ও প্রত্যেক বিছানায় সত্তরজন করিয়া বিবি থাকিবে এবং তাহাদের প্রত্যেকের শরীরে সত্তরটি অলঙ্কার থাকিবে আর সেইগুলির ভিতর দিয়া তাহাদের নলার হাড়ের ভিতরের মগজ পর্যন্ত পরিদৃষ্ট হইবে।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, “যদি বেহেশতি হুরগণের একটি কেশও পৃথিবীতে পতিত হইত, তাহা হইলে উহার আলোকে সমুদয় পৃথিবীবাসী আলোকিত হইয়া যাইত।”

হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও ফরমাইয়াছেন যে, “বেহেশত রাজ্য অত্যন্ত চমকদার শুভ্র আলোতে ঝলমল করিবে। সেখানে বেহেশতীগণ কখনও নিদ্রাচ্ছন্ন হইবে না, কারণ নিদ্রা মৃত্যুর ভাই। স্মরণ রাখা দরকার যে, বেহেশত রাজ্যে দিবা-রাত, চন্দ্র-সূর্য কিংবা নিদ্ৰা-তন্দ্ৰা কিছুই থাকিবে না, তবে সর্বদাই উহা স্বর্গীয় আভায় ঝলমল করিতে থাকিবে। বেহেশত রাজ্য মোট সাতটি প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত হইবে । তন্মধ্যে প্রথম প্রাচীরটি রৌপ্য নির্মিত, দ্বিতীয়টি স্বর্ণ নির্মিত, তৃতীয়টি ইয়াকুত নির্মিত, চতুর্থ ও পঞ্চমটি মাওয়ারিদ পাথর নির্মিত, ষষ্ঠটি জবরজদ নির্মিত আর সপ্তমটি চমকদার নূরের দ্বারা তৈরী। প্রতি দুইটি প্রাচীরের মধ্যবর্তী দূরত্ব হইবে পাঁচশত বৎসরের রাস্তা। বেহেশতী বান্দাদের মুখে দাড়ী ও শরীরে পশম গজাইবে না, কিন্তু পুরুষদের মুখে সবুজ রংয়ের গোঁফ থাকিবে। ফলে তাহাদের সৌন্দর্য অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পাইবে। তাহাদের নয়নে সুরমা লাগানো থাকিবে। বেহেশতবাসীগণ সকলে তেত্রিশ বৎসরের হৃষ্টপুষ্ট যুবক হইবে। নর এবং নারীর মধ্যে পার্থক্যের নিমিত্ত পুরুষদের মুখে সবুজ গোঁফ থাকিবে।

হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও ফরমাইয়াছেন যে, বেহেশতবাসী প্রত্যেকের শরীর সত্তরটি অলঙ্কারে পরিশোভিত হইবে। প্রত্যেকে প্রতি ঘন্টায় সত্তর প্রকার রং ধারণ করিবে। বেহেশতবাসী পুরুষ তাহার মুখচ্ছবি হুরদের মুখমণ্ডলে, বক্ষে ও উরুদ্বয়ে (আয়নার মত) দেখিতে পাইবে। পক্ষান্তরে হুরগণও তাহাদের মুখমন্ডল তাহাদের স্বামীর মুখমণ্ডলে, বক্ষদেশে ও উরুদ্বয়ে অবলোকন করিবে। তাহারা কফ, থুথু নিক্ষেপ করিবে না বা নাক ঝাড়িবে না। তাহাদের বগলের নীচে ও নাভীর নীচে অবৈধ লোম গজাইবে না; কিন্তু তাহাদের চক্ষুতে ঘন ভ্রূ ও মাথায় সুদীর্ঘ কেশগুচ্ছ শোভা পাইবে। তাহাদের সৌন্দর্য ও লাবণ্য দিন দিনই পরিবর্ধিত হইবে । যেমন পৃথিবীতে ক্রমাগত বার্ধক্য বৃদ্ধি পাইতে থাকে। প্রত্যেক পুরুষ পানাহার ও সঙ্গম ক্রিয়ায় একশত পুরুষের সমতুল্য সামর্থবান হইবে। পৃথিবীতে স্বামী-স্ত্রী যেমন সঙ্গম করিয়া থাকে, তেমনি বেহেশতবাসীরাও হোকবার পর হোবা (আশি বৎসরে এক হোবা) সঙ্গম উপভোগ করিবে। বেহেশতের বিছানাপত্রে কোন পিপীলিকা বা কোন ছারপোকার উপদ্রব ঘটিবে না। বেহেশতী হুরদের সহিত যতই সঙ্গম করা হইবে তাহাদিগকে ততই নবতর কুমারী বলিয়া অনুমিত হইবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলিয়াছেন, “হুরদের সমতুল্য সুন্দরী লাবণ্যময়ীর সংবাদ কখনও কেহ শ্রবণ করে নাই । এইজন্য উহাদের পূর্ণ বিবরণ প্রদান করা সম্ভব নহে।”

হযরত আলী (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “বেহেশতের মধ্যে এমন একটি বিশিষ্ট বৃক্ষ রহিয়াছে, যাহার উপর হইতে হোল্লা নামক স্বর্গীয় পোশাক নির্গত হইবে এবং নীচের দিক হইতে পঙ্খীরাজ ঘোটকীর আবির্ভাব ঘটিবে। উহার জিনপোশে মণিমুক্তা ও ইয়াকুত খচিত থাকিবে; কিন্তু উহারা কোন প্রকার পায়খানা-প্রস্রাব করিবে না। আল্লাহ পাকের অলী বান্দাগণ উহাদের উপর সওয়ার হইয়া বেহেশত রাজ্যে বিচরণ করিবেন। তাহাদের এই মর্তবা দর্শন করিয়া নিম্নবর্তী বান্দাগণ আল্লাহ পাকের নিকট ফরিয়াদ করিয়া বলিবেন, “হে আল্লাহ! তাহারা কি কার্যের বিনিময়ে এইরূপ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী হইয়াছে?” প্রত্যুত্তরে আল্লাহ তায়ালা বলিবেন, “যখন তোমরা সুখ নিদ্রার কোলে বিভোর ছিলে, তখন তাহারা নামাযে আত্মনিয়োগ করিয়াছিল। তোমরা যখন মনের আনন্দে খানাপিনা করিতে, তখন তাহারা পবিত্র রোযা পালনে নিরত ছিল। আর যখন তোমরা ধনরত্ন সঞ্চয় করিতে এবং উহা ব্যয় করিতে কৃপণতা প্রকাশ করিতে, তাহারা তখন মুক্ত হস্তে দান করিত। আর তোমরা যখন ভীরু ও কাপুরুষের মত কালযাপন করিতে তাহারা তখন ধর্মযুদ্ধে ঝাপাইয়া পড়িত।”

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, বেহেশতের মধ্যে এমন একটি প্রকাণ্ড বৃক্ষ রহিয়াছে যাহার সুশীতল ছায়া একশত ঘোড়া দৌড়াইয়াও শেষ করা যাইবে না। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়াল৷ এরশাদ করিয়াছেন, “এবং বেহেশতে সুবিস্তৃত ছায়াবান বৃক্ষ রহিয়াছে।” পৃথিবীর বুকে সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পরক্ষণে সেইরূপ ছায়া পরিদৃষ্ট হইয়া থাকে। যেমন আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “হে হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ! আপনি কি ভাবিয়া দেখেন নাই যে, আপনার প্রতিপালক (সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পর) কিরূপ ছায়া বিস্তার করিয়াছেন?” হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “আমি কি তোমাদিগকে এমন একটি সময়ের কথা বলিব না, যাহা সুখময় বেহেশতের অনুরূপ হইবে? সূর্যোদয়ের পূর্বক্ষণ ও সূর্যাস্তের পরক্ষণই বেহেশতী সময়ের সদৃশ; কিন্তু এই ছায়ার মত বেহেশতী ছায়া ক্ষণস্থায়ী ও ভঙ্গুর নহে। উহা যেমনই চিরস্থায়ী তেমনই আরামদায়ক।”

হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছে যে, বেহেশতের মধ্যে এমন একটি বৃক্ষ আছে। যাহার ফলগুলি মাখন হইতে কোমল, মধু হইতে সুমিষ্ট এবং মেশ্ক হইতে সুগন্ধযুক্ত হইবে; কিন্তু নামাযী ব্যক্তি ভিন্ন অন্য কাহারও ভাগ্যে উহা আস্বাদন সম্ভব হইবে না।

পরবর্তী পর্ব-

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...