হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “আমি উহাদের উৎপত্তি স্থান ও পতিত স্থান সম্বন্ধে হযরত জিব্রাইল (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম। প্রত্যুত্তরে তিনি বলিলেন, “এই নহরগুলি হাউজে কাউসারে পতিত হইয়াছে, কিন্তু উহাদের উৎপত্তি স্থান সম্বন্ধে আমি অবগত নহি; বরং আপনি আল্লাহ তায়ালার নিকট উহা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করুন। তবেই আল্লাহ পাক আপনাকে উহা বলিয়া দিবেন বা দেখাইয়া দিবেন।" সুতরাং আমি আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করিলাম। তখনই আল্লাহ তায়ালা আমার নিকট একজন ফেরেশতা প্রেরণ করিলেন। উক্ত ফেরেশতা আমাকে চক্ষু বন্ধ করিতে বলিলেন, আমি তাহাই করিলাম। আর কিছুক্ষণ পর চক্ষু খুলিয়া দেখিলাম আমি একটা প্রকাণ্ড বৃক্ষের নীচে একটি সুবৃহৎ শুভ্র মোতির গম্বুজের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া রহিয়াছি। সেই গম্বুজের সবুজ ইয়াকুত নির্মিত দরওয়াজাগুলির মধ্যে লোহিত বর্ণের স্বর্ণের তালা ঝুলিতেছে। সেই গম্বুজটি আমার এত প্রকাণ্ড মনে হইল যে, যদি পৃথিবীর সমস্ত মানব-দানব উহাতে রাখা হইত, তবে মনে হইত যেন একটি ক্ষুদ্র পাখী পাহাড়ের শীর্ষদেশে বসিয়া রহিয়াছে। আর গম্বুজের উপর একটি বৃহৎ পেয়ালা দেখিতে পাইলাম। আর দেখিলাম যে, সেই চারিটি নহর উক্ত পেয়ালার নিম্নদেশ হইতে প্রবাহিত হইতেছে। অতঃপর আমি ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছা প্রকাশ করিলাম। তখন সেই ফেরেশতা আমাকে গম্বুজের ভিতর প্রবেশ করিতে বলিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আমি উহাতে কিরূপে প্রবেশ করিব? উহা যে বন্ধ দেখা যাইতেছে? তিনি বলিলেন, “তালাটি খুলিয়া ফেলুন?” আমি বলিলাম, “কিরূপে উহা খুলিব? আমার কাছে ত উহার চাবি নাই?” ফেরেশতা বলিলেন, “কেন উহার চাবি ত আপনার হাতেই রহিয়াছে। আমি বলিলাম, “কই উহার চাবি?” তিনি উত্তর করিলেন, উহার চাবি
“বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহীম”, অর্থাৎ অনন্ত দয়াময় ও পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার নামে আরম্ভ করিতেছি, সুতরাং আমি ঐ তালার নিকট গিয়া “বিসমিল্লাহ" শরীফ পাঠ করিতেই উহা খুলিয়া গেল। আর আমি উহাতে প্রবেশ করিয়া প্রত্যক্ষ করিলাম যে উহার চারিটি কোণ হইতে চারিটি নহর প্রবাহিত হইতেছে। তারপর আমি উহা হইতে বাহির হইতে চাহিলাম, তখন উক্ত ফেরেশতা বলিলেন, “আপনি উহার উৎপত্তিস্থল কি দেখিয়াছেন?” আমি উত্তর করিলাম, হ্যাঁ, দেখিয়াছি।” তিনি পুনরায় আমাকে লক্ষ্য করিতে বলিলেন। এইবার আমি লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম গম্বুজের চারি কোণেই “বিসমিল্লাহ শরীফ” লেখা রহিয়াছে। আমি আরও লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম যে বিস্মির মিম অক্ষর হইতে পানির নহর প্রবাহিত হইতেছে। আর আল্লাহ শব্দের 'হা' অক্ষর হইতে দুধের নহর প্রবাহিত হইতেছে। ‘রাহমানির' শব্দের মিম অক্ষর হইতে শরাবের নহর প্রবাহিত হইতেছে। 'রাহীম' শব্দের মিম অক্ষর হইতে মধুর নহর প্রবাহিত হইতেছে। তখন আমি উপলব্ধি করিলাম যে, ‘বিসমিল্লাহ্ শরীফ' হইতেই চারিটি নহর প্রবাহিত হইতেছে। এমন সময় অলক্ষ্যে থাকিয়া যেন আল্লাহ পাকের এই ঘোষণা দান করিল, “হে হাবীব ! আপনার যে সকল উম্মত সর্বান্তকরণে এই নামে আমাকে ডাকিবে, তবে আমি নিশ্চয়ই তাহাদিগকে এই সকল নহর হইতে পান করাইব।”
তাহাদিগকে সোমবারে দুধ ও মঙ্গলবারে শরাব পান করাইব। শরাব পান করিয়া তাহারা বেহুঁশ হইয়া উড়িতে থাকিবে। পরিশেষে এক হাজার বৎসর পর্যন্ত উড়িয়া তীব্র গন্ধবিশিষ্ট একটি প্রকাণ্ড পাহাড়ের চূড়ায় গিয়া উপবেশন করিবে। আর সেই পাহাড়ের নিম্নদেশ হইতে নহরে ছাল্ছাবিল প্রবাহিত হইতে থাকিবে, সেই নহর হইতে বুধবার দিন পানি পান করিয়া পুনরায় তাহারা উড়িতে আরম্ভ করিবে এবং এক হাজার বৎসর পর্যন্ত উড়িয়া অবশেষে এক বালাখানায় গিয়া উপস্থিত হইবে। সেই বালাখানা অগণিত সুউচ্চ খাট, পালঙ্ক, পানপাত্র, সারিবদ্ধ তাকিয়া, বিছানা, গালিচা ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ থাকিবে। আর তাহারা প্রত্যেকে এক একটি খাটের উপর বসিয়া পড়িবে। তখন উপর হইতে তাহাদের উপর জান-জাবিল পানীয় বর্ষিত হইবে। সেই পানি তাহারা বৃহস্পতিবার পান করিবে। তারপর আল্লাহ্তায়ালা আম্বরের শুভ্র মেঘ হইতে এক হাজার বৎসর পর্যন্ত হোল্লা এবং এক হাজার বৎসর পর্যন্ত জাওহার বর্ষিত করিবেন! এক একজন হুর এক একটি জাওহার ধারণ করিয়া পরমানন্দে হাজার বৎসর পর্যন্ত উড়িতে থাকিবে। তারপর তাহারা শুক্রবার দিন মহা প্রতিপান্বিত আল্লাহ পাকের সন্নিকটে ‘মাকয়াদে সিদ্ধ’ বা সত্য মজলিসে আসন গ্রহণ করিবে। সেখানে তাহারা 'খোলদ' নামক দস্তর খানে আহারে বসিবে। তথায় তাহাদিগকে এমন মধু খাইতে দেওয়া হইবে, যাহার পাত্রের মুখ মেশক দ্বারা মোহর করা থাকিবে। আর বলা হইবে, “ইহারাই পুণ্যকার্য সম্পাদন করিয়াছিল এবং পাপকার্য হইতে রিবত থাকিয়াছিল।”
হযরত কা'ব (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে বেহেশতের বৃক্ষ সম্বন্ধে প্রশ্ন করিয়াছিলেন। প্রত্যুত্তরে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “বেহেশ্ত্রী বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা কখনও পরিশুদ্ধ হইবে না। এমন কি পত্র-পল্লবও ঝরিয়া পড়িবে না এবং ফল কখনও নিঃশেষ হইবে না। আর বেহেশতের মধ্যে তুবা নামক এক বৃহৎ বৃক্ষ রহিয়াছে। উহার মূল শুভ্র মণির তৈরি, উপরাংশ স্বর্ণের তৈরী এবং মধ্যমাংস রূপার তৈরী। সেই বৃক্ষের শাখাগুলি জবরজদ ও পত্রগুলি 'সুনদূস্' পদার্থ দ্বারা নির্মিত। তুবা বৃক্ষের সত্তর হাজার শাখা আছে। সেইগুলি এতই বিস্তৃত যে উহার বৃহৎ শাখাগুলি আরশের পায়ার সহিত এবং ক্ষুদ্র ডালাগুলি আকাশের সহিত মিশিয়া রহিয়াছে। বেহেশতের প্রত্যেক কামরায় উহার এক একটি শাখা আছে ৷ সেই বৃক্ষ প্রত্যেক বেহেশতবাসীকে ছায়াদান করিবে এবং তাহাদের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে ফল প্রদান করিবে। সেই বৃক্ষটি আকাশে অবস্থিত সূর্যের তুল্য হইবে –যেমন সূর্য আকাশে থাকিয়াও পৃথিবীর সকল প্রান্তকে আলোকোজ্জ্বল করিয়া থাকে।”
হযরত আলী (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, বেহেশতের বৃক্ষগুলি রৌপ্য নির্মিত হইবে, তবে কিছু শাখা স্বর্ণের ও কিছু শাখা রৌপ্যের হইবে। মোটকথা বৃক্ষটি স্বর্ণের হইলে শাখাগুলি হইবে রৌপ্যের। পক্ষান্তরে মূল বৃক্ষটি রৌপ্যের হইলে শাখাগুলি হইবে স্বর্ণের। দারুত্ তাক্লীফ অর্থাৎ পৃথিবীর গাছগুলির মূল যেমন যমিনে এবং শাখাগুলি উপরে, কিন্তু বেহেশতী বৃক্ষগুলির মূল উপরে এবং শাখাগুলি নীচে হইবে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিয়াছেন, “উহার ফলগুলি নিকটবর্তী হইবে।” বেহেশতের মাটি মেশ্ক, আম্বর ও কাফুরের হইবে এবং উহার নহরগুলি দুধ, মধু, পানি ও শরাবে পরিপূর্ণ হইবে। বাতাসের আলোড়নের সহিত পাতাগুলি হইতে খুব সুন্দর আওয়াজ বাহির হইবে।
মানুষ যতক্ষণ আল্লাহ পাকের জিকিরে, তাস্বীহ পাঠে ও এস্তেগফার ও কুরআন তেলাওয়াতে নিমগ্ন থাকে, ততক্ষণ ফেরেশতারা তাহাদের জন্য বালাখানা ও বৃক্ষ রোপণে নিমগ্ন থাকেন। আর যখনই মানুষ পুণ্যকর্ম হইতে বিরত হয়, তখন ফেরেশতাগণ বালাখানা তৈরী ও বৃক্ষ রোপণ হইতে বিরত থাকেন।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি পবিত্র রমজান মাসে রোযা রাখিবে, আল্লাহ তায়ালা তাহার সহিত শুভ্র মোতি নির্মিত তাঁবুতে আবদ্ধ 'হুর' এর বিবাহ দিবেন। যেমন আল্লাহপাক এরশাদ করিয়াছেন, “এমন হুরদের সহিত বিবাহ দিবেন । যাহাদিগকে তাঁবুতে আবদ্ধ রাখা হইয়াছে।” সেই সকল রমণীদের জন্য সত্তরটি লাল ইয়াকুত নির্মিত পালঙ্ক থাকিবে। প্রত্যেক পালঙ্কের উপর সত্তরটি মায়েদা বা খাদ্যের থালা থাকিবে এবং প্রত্যেক থালায় হাজার স্বর্ণের পেয়ালা থাকিবে। সমপরিমাণে তাহাদের স্বামীও প্রদান করা হইবে। এই সকল নেয়ামত উহাদিগকে দান করা হইবে, যাহারা রমজান মাসে রোযা ছাড়াও অন্যান্য সৎকর্মও সম্পাদন করিয়াছেন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন