📚এহইয়া উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)
এখলাসের স্থর সমূহ —
যে সব বিষয় এখলাসকে কলুষিত ও দূষিত করে, সেগুলোর মধ্যে কতক সুস্পষ্ট ও কতক অস্পষ্ট। সুস্পষ্ট বিষয়সমূহের মধ্যে প্রধান হচ্ছে ‘রিয়া’।
—উদাহরণতঃ যখন কেউ নামাযে এখলাস করে, তখন যদি কিছু লোক তাকে দেখে অথবা কাছে আসে, তখন শয়তান তাকে বলে নামায উত্তমরূপে পড় যাতে দর্শকরা তোমাকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে এবং সাধু মনে করে। নামাযী একথা মেনে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিনয় প্রকাশ করে এবং রুকু-সেজদা উত্তমরূপে আদায় করে। প্রথম স্তরের এই রিয়া প্রাথমিক পর্যায়ের নামাযীদের কাছেও গোপন থাকে না।
—রিয়ার দ্বিতীয় স্তর এই যে, নামাযী এই আপদটি আঁচ করে নেয় এবং এ থেকে আত্মরক্ষা করে। অর্থাৎ, শয়তানের আনুগত্য করে না এবং সেদিকে ভূক্ষেপও করে না; বরং পূর্বে যেভাবে পড়ত, সেভাবেই পড়তে থাকে। তখন শয়তান তার কাছে কল্যাণের বাহানায় আসে এবং বলে : তুমি তো অনুসৃত, পুরোহিত ও নামযাদা ব্যক্তি। তুমি যা করবে, তাতে অন্যরা তোমার অনুসরণ করবে। ফলে, তাদের আমলের সওয়াব তুমিও পাবে যদি তুমি ভালরূপে আমল কর। পক্ষান্তরে তুমি খারাপ আমল করলে অন্যদের খারাপ আমলের কুফল তোমার উপরও বর্তাবে। যারা প্রথম স্তরের ধোকার জালে আবদ্ধ হয় না, তারা কখনও এই দ্বিতীয় স্তরের অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু এটাও রিয়া এবং এর কারণেও এখলাস বরবাদ হয়ে যায়। কেননা, যদি বাস্তবিকই নামাযে খুশু তার কাছে উত্তম হয় যে, অন্যের কারণে তা ত্যাগ করে না, তবে একাকী নামায পড়ার সময় নিজেকে খুশুতে অভ্যস্ত করে না কেন? সত্যিকার সাধু সে ব্যক্তি, যার অন্তর উজ্জ্বল এবং তার ঔজ্জ্বল্য অন্যের উপর প্রতিফলিত হয়। একথা ঠিক যে, কেউ তার অনুসরণ করলে অনুসরণকারী সওয়াবের অধিকারী হবে। কিন্তু এই অনুসৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হবে, যে বিষয় তোমার মধ্যে ছিল না, তা প্রকাশ করলে কেন?
—তৃতীয় স্তর দ্বিতীয় স্তরের চেয়েও অধিক সূক্ষ্ম। তা এই যে, বান্দা নিজের নফসের পরীক্ষা নেবে এবং শয়তানের চক্রান্ত সম্পর্কে অবগত হয়ে জেনে নেবে যে, নির্জনে এক অবস্থ হওয়া এবং জনসমক্ষে অন্য অবস্থা হওয়া নিছক রিয়া। এখানে এখলাস হল, নামায একাকীত্বেও তেমনি হওয়া, যেমন জনসমাবেশে হয়। কেউ যদি মানুষের দেখা অবস্থায় অভ্যাস অনুযায়ী নামাযে অধিক খুশু করে এবং একদিকে দৃষ্টি রেখে একাকীত্বেও নিজ নফসের প্রতি মনোনিবেশ করে অধিক খুশু করে, তবে তাও সূক্ষ্ম ও গোপন রিয়া। কেননা, সে নির্জনে এই নিয়তে উত্তমরূপে নামায পড়ে যে, জনসমাবেশেও যেন উত্তমরূপে নামায আদায় হয়। অতএব, নির্জনে ও জনসমাবেশে উভয় জায়গায় তার লক্ষ্য রইল মানুষের প্রতি। এখানে এখলাস এভাবে হত যে, চতুষ্পদ জন্তুর দেখা ও মানুষের দেখা উভয়টি নামাযীর দৃষ্টিতে সমান হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে নামাযী ধারণা করে নির্জনে ও জনসমাবেশে একই রূপে নামায পড়লে সে রিয়া থেকে মুক্ত হয়ে যাবে তা ঠিক নয়। রিয়া থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় হল মানুষের প্রতি দৃষ্টি তেমনি থাকা, যেমন জড় পদার্থের প্রতি দৃষ্টি হয় - নির্জনে হোক অথবা জনসমাবেশ।
—চতুর্থ স্তর যা চূড়ান্ত পর্যায়ের গোপন তা হল এই যে, এক ব্যক্তি শয়তানের ধোকা জেনে ফেলেছে। ফলে, তার নামায পড়া মানুষে দেখলেও শয়তান একথা বলতে পারে না যে, তুমি দর্শকদের খাতিরে খুশু কর। ফলে, শয়তান তার কাছে এসে বলে : আল্লাহ তা'আলার মাহাত্ম্য ও প্রতাপ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা কর, যার সামনে তুমি দাঁড়িয়ে আছ। আল্লাহ তোমার অন্তরকে তাঁর দিক থেকে গাফেল দেখুক— এ বিষয়ে লজ্জাবোধ কর। নামাযীর মনে এ ধারণা আসার সাথে সাথে তার অন্তর হাযির হয় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খুশু করতে শুরু করে। নামাযী মনে করে, এটাই এখলাস। অথচ এটা হুবহু ধোকা ও প্রতারণা। কেননা, যদি আল্লাহর প্রতাপের প্রতি লক্ষ্য করার কারণে এই খুশু হত, তবে একাকীত্বেও তাই হত। কেবল অন্য কারও আগমনের কারণেই এই অবস্থা সৃষ্টি হত না। এই আপদ থেকে বাঁচার আলামত এই যে, উপরোক্ত চিন্তা-ভাবনা একাকীত্বেও অন্তরে প্রতিষ্ঠিত থাকে, যেমন জনসমাবেশে থাকে। মোটকথা, যে পর্যন্ত মানুষের দেখা ও গবাদি পশুর দেখার মধ্যে নিজের আমলে পার্থক্য হতে থাকবে, সে পর্যন্ত নামাযী এখলাস বহির্ভূত এবং গোপন শিরকে লিপ্ত বলে গণ্য হবে। এটাই সেই শিরক, যা মানুষের অন্তরে কালো পিঁপড়ার গতির চেয়েও অধিক গোপন, যে পিঁপড়া অন্ধকার রাত্রে কঠিন পাথরের উপর দিয়ে চলে। হাদীসে তাই বর্ণিত হয়েছে।
পরবর্তী পর্ব—
মিশ্র আমলের সওয়াব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন