মঙ্গলবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৫

আত্মদর্শন (৩৩) জাহেরী ইলম রূহানী ইল্‌মের অন্তরায়



আত্মদর্শন পর্ব - ৩৩
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

জাহেরী ইলম রূহানী ইল্‌মের অন্তরায় 
এ পর্যন্ত যাহা বর্ণিত হইল তাহাতে মানবাত্মার শ্রেষ্ঠত্ব বুঝা গেল এবং সূফীগণের পথ কি, তাহাও প্রকাশ পাইল। তুমি হয়ত শুনিয়া থাকিবে যে, সুফীগণ বলেন, জাহেরী ইল্ল্ম তাঁহাদের পথের অন্তরায় এবং হয়ত তুমি ইহা অস্বীকারও করিয়া থাকিবে। তুমি একথা অবিশ্বাস করিও না। সূফীগণের একথা সত্য। কারণ, তুমি যদি জড়জগত ও জড়জগতের জ্ঞান লইয়াই মশগুল থাক তবে তুমি সূফীগণের উন্নত অবস্থা হইতে দূরে বহুদূরে এক পর্দার অন্তরালে পড়িয়া থাকিবে। মানবাত্মা কূপসদৃশ। পাঁচ ইন্দ্রিয় যেন এই কূপের পাঁচটি নালা ইন্দ্রিয়রূপ নালাপথে বাহিরজগতের জ্ঞানীরূপ পানি সর্বদা আত্মারূপ কূপে আসিয়া সঞ্চিত হইতেছে। কূপের তলদেশ হইতে পরিষ্কার পানি বাহির করিবার তোমার ইচ্ছা থাকিলে প্রথমে নালা কয়টিকে বন্ধ করিয়া দাও, যাহাতে বাহিরের পানি ভিতরে আসিতে না পারে। তত্পর কূপে সঞ্চিত সমস্ত পানি ও কর্দমাদি বাহির করিয়া ফেল। অবশেষে কূপের তলদেশে খনন কর। তাহা হইলে দেখিবে , পাতাল হইতে পরিষ্কার পানি আসিয়া কূপ পরিপূর্ণ করিয়া ফেলিবে। যতক্ষণ পূর্বসঞ্চিত পানিতে কৃপ পরিপূর্ণ থাকে এবং বাহির হইতে পানি আসিবার পথ খোলা থাকে ততক্ষণ পাতাল হইতে নির্মল পানি উঠিতে পারে না। এইরূপ , যতক্ষণ বাহ্য জ্ঞান মন হইতে বিদূরীত না হইবে ততক্ষণ আত্মার অভ্যন্তর হইতে বিশুদ্ধ জ্ঞান উৎপন্ন হইবে না। কিন্তু আলিম যদি অর্জিত ইল্‌ম হইতে স্বীয় হৃদয় খালি করিয়া ফেলে এবং উহাতে লিপ্ত না থাকে তবে তদ্রূপ ইল্‌ম তাহার জন্য অন্তরাল হয় না বরং তাহার অন্তর্চক্ষু খুলিয়া যায় এবং নির্মল ইলম তাহার হৃদয়ে উৎপন্ন হইতে থাকে। এমনিভাবে জড়জগতের সহিত ইন্দ্রিয়সমূহের সম্মিলনে হৃদয়ে যে সকল খেয়ালের উদয় হয় তৎসমুদয় হইতে হৃদয় মুক্ত রাখিলে উহা আর তত্ত্বজ্ঞানের পথে অন্তরাল হইবে না। অর্জিত ইল্‌ম এ পথে অন্তরাল কেন হয় এ সম্বন্ধে একটি উদাহরণ দেওয়া যাইতেছে। মনে কর, এক ব্যক্তি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের আকিদাসমূহ শিক্ষা করিয়াছেন, এ বিষয়ে তর্ক-বিতর্কের যাবতীয় আবশ্যক দলিল প্রমাণাদিও সংগ্রহ করিয়াছেন, নিজকে সম্পূর্ণরূপে উহাতেই লিপ্ত রাখিয়াছেন এবং বিশ্বাস করিয়া লইয়াছেন যে, এই ইল্‌ম ব্যতীত আর ইল্মই নাই। এমতাবস্থায় তাহার হৃদয়ে কোন নূতন জ্ঞানের উদ্ভব হইলে তিনি বলিবেন- “যাহা আমি শিখিয়াছি ইহা তাহার বিপরীত এবং যাহা আমার জ্ঞানের বিপরীত তাহা মিথ্যা।” এই প্রকার লোকের জন্য কোন কিছুর হাকীকত উপলব্ধি করা একেবারে অসম্ভব। কারণ সাধারণ লোককে তাঁহারা যে আকীদা শিখাইয়া থাকেন তাহা হাকীকতের ছাঁচমাত্র, আসল হাকীকত নহে। অস্থি হইতে যেমন মজ্জা বাহির হয় তদ্রূপ সেই ছাঁচ হইতে যে প্রকৃত সত্য প্রকাশিত হয় তাহাকেই আসল হাকীকত ও পূর্ণ মা'রিফাত বলে। যে আলিম ধর্মবিশ্বাস দৃঢ় করিবার জন্য কেবল তর্ক-বিতর্কের কৌশল শিক্ষা করেন তাঁহার প্রতি হাকীকত প্রকাশ পায় না। কারণ এমন আলিম মনে করেন,- “সমস্ত ইল্মই আমি শিখিয়া লইয়াছি।” এইরূপ ধারণাই প্রকৃত জ্ঞানের পথে তাহার অন্তরাল হইয়া দাড়ায়। যাহারা সামান্য ইল্‌ম শিখিয়াছেন তাঁহাদের মনে এই ধারণা বলবান থাকে। এই জন্যই তাঁহারা প্রকৃত জ্ঞান হইতে বঞ্চিত ও পর্দার অন্তরালে থাকেন। কিন্তু যে আলিম তদ্রূপ ধারণা করেন না তাঁহার নিকট অর্জিত ইল্‌ম কিছুমাত্র বাধা জন্মায় না ; বরং অজ্ঞানতার সমস্ত পর্দা তাঁহার সম্মুখ হইতে বিদূরিত হয়, তাঁহার কাশ্ফ হইতে থাকে এবং তিনি পূর্ণতা লাভ করেন। প্রথম হইতে জ্ঞানের পথে যাহার পদ দৃঢ় হয় নাই তাহার পথ হইতে তদ্রূপ আলিমের পথ খুব ভয়শূন্য ও সরল। যে ব্যক্তি আলিম নহে সে হয়ত দীর্ঘকাল কোন মিথ্যা খেয়ালে জড়িত থাকে এবং ফলে সামান্য সন্দেহই তাহার পক্ষে প্রবল অন্তরাল হইয়া দাঁড়ায়। কিন্তু আলিম এরূপ বিপত্তি হইতে নিরাপদে থাকেন। 

জাহেল ভণ্ড সূফী 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...