স্ত্রীর উপর স্বামীর হক —
এক্ষেত্রে চূড়ান্ত কথা, বিবাহ প্রকারান্তরে বাঁদী হওয়ার নামান্তর বিধায় স্ত্রী যেন স্বামীর বাঁদী হয়ে যায়। সুতরাং স্বামীর আনুগত্য করা সর্বাবস্থায় তার উপর ওয়াজিব। স্ত্রীর উপর স্বামীর হক যে বেশী, এ সম্পর্কে অনেক হাদীস বর্ণিত আছে!
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "যে স্ত্রী এমতাবস্থায় মারা যায় যে, তার স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
কোন এক ব্যক্তি সফরে যাওয়ার সময় স্ত্রীকে বলে গেল: উপর তলার কক্ষ থেকে নীচে নামবে না। নীচে তার পিতা বসবাস করত। ঘটনাক্রমে সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। স্ত্রী নীচে পিতার কাছে নামার অনুমতি চেয়ে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে লোক পাঠালে তিনি বললেন: স্বামীর আদেশ পালন কর। শেষ পর্যন্ত পিতা মারা গেলে সে আবার অনুমতি প্রার্থনা করল। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আবার বললেন: স্বামীর আদেশ পালন কর। ফলে পিতা সমাধিস্থও হয়ে গেল; কিন্তু সে নীচে নামল না। অতঃপর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এই মহিলাকে বলে পাঠালেন: তুমি যে স্বামীর আদেশ পালন করেছ, এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তোমার পিতার মাগফেরাত করেছেন।
অন্য এক হাদীসে আছে, "যখন স্ত্রী পাঞ্জেগানা নামায পড়ে, রমযান মাসের রোযা রাখে, আপন গুপ্ত অঙ্গের হেফাযত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তখন সে তার পালনকর্তার জান্নাতে প্রবেশ করবে।
এ হাদীসে স্বামীর আনুগত্যকে ইসলামের রোকনসমূহের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। একবার রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মহিলাদের আলোচনা প্রসঙ্গে বললেন: গর্ভবতী নারী, সন্তান প্রসবকারিণী নারী, দুগ্ধদানকারিণী নারী, সন্তানদের প্রতি দয়াশীলা নারী, স্বামীর সাথে যে অসদাচারণ করে, যদি তা না করত, তবে তাদের মধ্যে যারা নামাযী, তারা জান্নাতে প্রবেশ করত।
এক হাদীসে তিনি বলেন:
"আমি দোযখে উকি দিয়ে দেখলাম, তার অধিকাংশ বাসিন্দাই মহিলা। মহিলারা আরজ করলঃ ইয়া রসূলাল্লাহ্, এর কারণ কি? তিনি বললেন: মহিলারা অভিসম্পাত বেশী করে এবং স্বামীদের না-শোকরী করে।"
অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে, আমি জান্নাতে উঁকি দিয়ে দেখলাম, তাতে পুরুষ জান্নাতীদের তুলনায় মহিলাদের সংখ্যা খুব নগণ্য। আমি জিজ্ঞেস করলাম: মহিলারা কোথায়? উত্তর হল: দু'টি লাল বস্তু তাদের জান্নাতে আসার পথে বাধা হয়েছে। একটি স্বর্ণ ও অপরটি জাফরান। অর্থাৎ, অলংকার ও রঙ্গিন পোশাক। হযরত আয়েশা (র.) বলেন: কোন এক যুবতী রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে হাযির হয়ে আরজ করল: ইয়া রসূলাল্লাহ্, আমি যুবতী। মানুষ আমার কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু বিবাহ আমার কাছে ভাল লাগে না। এখন জানতে চাই, স্ত্রীর উপর স্বামীর হক কি? তিনি বললেন: ধরে নেয়া যাক, স্বামীর আপাদমস্তক পুঁজে ভর্তি। যদি স্ত্রী এই পুঁজ চেটে নেয়, তবুও তার শোকর আদায় করতে পারবে না। মহিলা বলল: আমি বিবাহ করব কি? তিনি বললেন: করে নাও। বিবাহ করা উত্তম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন: খাসআম গোত্রের জনৈকা মহিলা রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর খেদমতে এসে আরজ করল : আমি স্বামীহীনা, বিবাহ করতে চাই। এখন স্বামীর হক কি, জানতে চাই। তিনি বললেন: স্বামীর এক হক, সে যদি উটের পিঠে থেকেও সহবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করে, তবে স্ত্রী অস্বীকার করতে পারবে না। আরেক হক, কোন বস্তু তার গৃহ থেকে তার অনুমতি ব্যতীত কাউকে দেবে না। দিলে তুমি রোযা রেখে কেবল ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্তই থাকবে। তোমার রোযা কবুল হবে না। যদি তুমি স্বামীর আদেশ ছাড়া ঘর থেকে বের হও, তবে ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত এবং তওবা না করা পর্যন্ত ফেরেশতারা তোমার প্রতি অভিসম্পাত করতে থাকবে। এক হাদীসে আছে, "যদি আমি কাউকে সেজদা করার নির্দেশ করতাম, তবে অবশ্যই স্ত্রীকে নির্দেশ করতাম যেন সে তার স্বামীকে সেজদা করে।"
এরূপ বলার কারণ, স্ত্রীর উপর স্বামীর হক বেশী। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন : স্ত্রী আল্লাহর পবিত্র সত্তার অধিকতর নিকটবর্তী তখন হয়, যখন সে তার কক্ষের অভ্যন্তরে থাকে। স্ত্রীর পক্ষে গৃহের আঙ্গিনায় নামায পড়া মসজিদে নামায পড়া অপেক্ষা উত্তম। আর কক্ষের ভেতরকার কক্ষে নামায পড়া কক্ষের ভেতরে নামায পড়ার তুলনায় শ্রেয়ঃ। এটা বলার কারণ, স্ত্রীর অবস্থার উৎকৃষ্টতা ও অপকৃষ্টতা পর্দার উপর নির্ভরশীল। সুতরাং যে অবস্থায় পর্দা বেশী হবে, সে অবস্থাই তার জন্যে উত্তম। এ কারণেই রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "নারী হল নগ্নতা। সে যখন বের হয় তখন শয়তান উঁকি দিয়ে দেখে। তিনি আরও বলেন: স্ত্রীর দশটি নগ্নতা রয়েছে। সে যখন বিবাহ করে তখন স্বামী একটি নগ্নতা ঢেকে দেয়। আর যখন সে মারা যায়, তখন কবর দশটি নগ্নতা আবৃত করে দেয়। মোট কথা, স্বামীর হক স্ত্রীর উপর অনেক। তন্মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ দুটি- একটি আত্মরক্ষা ও পর্দা এবং অপরটি প্রয়োজনাতিরিক্ত জিনিসপত্র দাবী না করা এবং স্বামীর উপার্জন হারাম হলে তা থেকে বেঁচে থাকা। সেমতে পূর্ববর্তীকালে নারীর অভ্যাস তাই ছিল। তখন কোন পুরুষ সফরে গেলে তার স্ত্রী ও কন্যারা তাকে বলত: খবরদার! হারাম উপার্জন করবে না। আমরা ক্ষুধা ও কষ্টে সবর করব; কিন্তু দোযখের আগুনে সবর করতে পারব না। সে যুগের এক ব্যক্তি সফরের ইচ্ছা করলে তার প্রতিবেশীদের মনে সন্দেহ হল। সবাই তার স্ত্রীকে বলল: তুমি তার সফরে সম্মত হচ্ছ কেন? সে তো তোমার খরচের জন্যে কিছুই রেখে যাচ্ছে না। স্ত্রী বললঃ আমি আমার স্বামীকে যেদিন থেকে দেখেছি, ভক্ষকই পেয়েছি- রিযিকদাতা পাইনি। আমার পালনকর্তা আমার রিযিকদাতা। এখন ভক্ষক চলে যাবে এবং রিযিকদাতা আমার কাছে থাকবে। রাবেয়া বিনতে ইসমাঈল আহমদ ইবনে আবুল হাওয়ারীর কাছে নিজের বিবাহের পয়গাম দিলে এবাদতের কারণে তিনি তা অপছন্দ করেন এবং বলেন: স্ত্রীর খাহেশ আমার নেই। আমি এবাদতেই মগ্ন থাকতে চাই। রাবেয়া বললেনঃ আমি আমার অবস্থায় তোমার চেয়ে অধিক মগ্ন রয়েছি। পুরুষের খাহেশ আমার নেই, কিন্তু আমি আমার পূর্ব স্বামীর কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে অনেক ধন সম্পদ পেয়েছি। আমি চাই তুমি এসব ধন-সম্পদ তোমার সঙ্গীদের মধ্যে ব্যয় কর এবং তোমার মাধ্যমে আমি সজ্জনদের পরিচয় লাভ করি। আহমদ বললেন: আমি আগে আমার ওস্তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নেই। অতঃপর তিনি হযরত সোলায়মান দারানীর কাছে ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি রাবেয়ার কথা শুনে বললেন: তাকে বিয়ে করে নাও। সে আল্লাহর ওলী। কেননা, এরূপ কথাবার্তা ওলীরা বলেন। আহমদ বলেন: ইতিপূর্বে ওস্তাদ আমাকে বিবাহ করতে বারণ করতেন এবং বলতেন, আমাদের সঙ্গীদের মধ্যে যে কেউ বিয়ে করেছে, সে-ই বদলে গেছে। এর পর আমি রাবেয়াকে বিয়ে করলাম। এই রাবেয়াও সিরিয়ায় তেমনি ছিল, যেমন ছিল বসরায় রাবেয়া বসরী।
স্বামীর ধনসম্পদ অযথা ব্যয় না করা স্ত্রীর অন্যতম কর্তব্য; বরং সে স্বামীর ধনসম্পদের হেফাযত করবে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: স্ত্রীর জন্যে হালাল নয় যে, সে স্বামীর গৃহ থেকে তার অনুমতি ছাড়া কোন খাদ্যবস্তু অন্যকে দেবে। তবে খারাপ হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকলে কাঁচা খাদ্য সামগ্রী দিতে পারে। যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী কাউকে খাওয়ায়, তবে সওয়াব স্বামী নেবে এবং গোনাহ স্ত্রীর উপর থাকবে।
পরবর্তী পর্ব —
কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন