মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫

বিবাহ (৪) বিবাহের ফযীলত সম্পর্কিত সাহাবায়ে কেরামের উক্তিসমূহ



বিবাহ (পর্ব – ৪) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জাল (রহ.)

বিবাহের ফযীলত সম্পর্কিত সাহাবায়ে কেরামের উক্তিসমূহ 

*হযরত ওমর ফারুক (র.) বলেন : ধর্মপরায়ণতা বিবাহে বাধা সৃষ্টি করে না। কেবল দুটি বিষয়ই বিবাহে বাধা দান করে- অক্ষমতা ও দুশ্চরিত্রতা। এতে তিনি বিবাহের বাধা দুটি বিষয়ে সীমিত করে দিয়েছেন। 

*হযরত আব্বাস (র.) বলেনঃ বিবাহ না করা পর্যন্ত আবেদের এবাদত পূর্ণ হয় না। এর উদ্দেশ্য বিবাহ এবাদতের পরিশিষ্ট, কিন্তু বাহ্যতঃ তার উদ্দেশ্য এই মনে হয় যে, কামভাব প্রবল হওয়ার কারণে অন্তরের নিরাপত্তা বিবাহ ব্যতীত কল্পনীয় নয়। অন্তরের নিরাপত্তা ছাড়া এবাদত হতে পারে না। এ কারণেই তাঁর কয়েকজন গোলাম যখন বালেগ হয়ে যায়, তখন তাদেরকে একত্রিত করে তিনি বললেন : তোমরা বিবাহ করতে চাইলে আমি বিবাহ করিয়ে দেব। কারণ, মানুষ যখন যিনা করে, তখন তার অন্তর থেকে ঈমান বের করে নেয়া হয়। 

*হযরত ইবনে মসউদ (রা.) বলতেনঃ ধরে নেয়া যাক, আমার বয়সের মাত্র দশ দিন বাকী আছে, তবু বিবাহ করে নেয়াই আমার কাছে ভাল মনে হয়, যাতে আল্লাহ্ তাআলার সামনে অবিবাহিত গণ্য হয়ে না যাই। 

*হযরত মুয়ায ইবনে জাবালের দুই স্ত্রী মহামারীতে মৃত্যুমুখে পতিত হন এবং নিজেও মহামারীতে আক্রান্ত ছিলেন, কিন্তু এই অবস্থায়ও বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেছিলেন : আল্লাহর সাথে অবিবাহিত হয়ে সাক্ষাৎ করতে আমার লজ্জা বোধ হয়। এ দুটি উক্তি থেকে বুঝা যায়, এ দুজন সাহাবীর মতে কামভাবের প্রাবল্য থেকে আত্মরক্ষা ছাড়া বিবাহের অন্যান্য ফযীলতও ছিল। 
* হযরত ওমর ফারুক (র.) একাধিক বিবাহ করেছেন এবং বলতেন : আমি কেবল সন্তানের জন্যে বিবাহ করি। 
*জনৈক সাহাবী কেবল রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতই করতেন এবং রাতে তাঁর কাছেই থাকতেন। তিনি একদিন উক্ত সাহাবীকে বললেন : তুমি বিয়ে কর না কেন? সাহাবী আরজ করলেন : ইয়া রসূলাল্লাহ, একে তো আমি নিঃস্ব, কোন বিষয় আশয় নেই, দ্বিতীয়ত - আপনার খেদমত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চুপ হয়ে গেলেন। কিছুদিন পর আবার একথা বললে সাহাবী একই জওয়াৰ দিলেন, কিন্তু এবার সাহাবী মনে মনে চিন্তা করলেন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার মঙ্গল আমার চেয়ে বেশী বুঝেন। আমার জন্যে যা অধিক সমীচীন এবং আল্লাহর নৈকট্যের কারণ, তা তিনি জানেন। যদি তৃতীয় বার বলেন, তবে বিয়ে করে নেব। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তৃতীয় বার বললে সাহাবী আরজ করলেন : আপনি আমার বিয়ে করিয়ে দেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : অমুক গোত্রে গিয়ে বল, রসূলূল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তোমাদেরকে আদেশ করেছেন তোমাদের মেয়ে আমার সাথে বিয়ে দিতে। সাহাবী আরজ করলেন : হুযুর, আমার কাছে কিছু নেই। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কেরামকে ডেকে বললেন : তোমরা খেজুরের বীচি পরিমাণ স্বর্ণ সংগ্রহ করে তোমাদের এ ভাইকে দাও। সাহাবায়ে কেরাম তাই করলেন এবং এই সাহাবীকে সেই গোত্রে নিয়ে বিবাহ করিয়ে দিলেন। এর পর লোকেরা ওলীমা খাওয়ার বাসনা প্রকাশ করলে সাহাবীদের সকলে মিলে একটি ছাগলের ব্যবস্থা করে দেন। এ হাদীসে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বার বার বিয়ে করতে বলা এ কথাই জ্ঞাপন করে যে, খোদ বিবাহের মধ্যে ফযীলত রয়েছে। এটাও সম্ভব যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর বিবাহের প্রয়োজন জানতে পেরেছিলেন।

*কথিত আছে, পূর্ববর্তী উম্মতের মধ্যে জনৈক আবেদ এবাদতে সমসাময়িক সকলকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সে সময়ের পয়গম্বরের সামনে তার আলোচনা হলে পয়গম্বর বললেন : যদি একটি সুন্নত বর্জন না করত, তবে সে চমৎকার ছিল বটে। আবেদ পয়গম্বরের কথা শুনে দুঃখিত হয়ে তাঁর খেদমতে হাযির হয়ে বলল : আমি কোন্ সুন্নতটি বর্জন করেছি? পয়গম্বর বললেন :– তুমি বিবাহ বর্জন করেছ। আবেদ আরজ করল : আমি বিবাহ নিজের উপর হারাম করিনি, কিন্তু আমি নিঃস্ব, আমার ব্যয়ভার অন্য বহন করে। এ কারণে কেউ আমাকে কন্যা দান করে না। পয়গম্বর বললেন : আমি তোমাকে আমার কন্যা দিচ্ছি। সেমতে আবেদের সাথে পয়গম্বর কন্যার বিয়ে হয়ে গেল।

*বিশর ইবনে হারেস (রহ.) বলেনঃ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল তিনটি বিষয়ে আমার উপর ফযীলত রাখেন। প্রথম, তিনি নিজের জন্যে ও অন্যের জন্যে হালাল রুজি অন্বেষণ করেন, আর আমি কেবল নিজের জন্যেই অন্বেষণ করি। দ্বিতীয়, তিনি বিবাহ করার অবকাশ রাখেন; কিন্তু আমি এ ব্যাপারে সংকীর্ণ। তৃতীয়, তিনি জনগণের ইমাম।

*কথিত আছে, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের পত্নী অর্থাৎ, আবদুল্লাহ জননী যেদিন ইন্তেকাল করেন, তার পরের দিন তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করে নেন এবং বলেন : আমার মনে হয় যেন রাতে আমি অবিবাহিত। 

*বিশরকে লোকে বলল, মানুষ আপনাকে বিবাহের সুন্নত বর্জনকারী বলে থাকে। বিশর বললেন : আপত্তিকারীদেরকে বলে দাও, আমি ফরযের কারণে সূন্নত থেকে বিরত রয়েছি। পুনরায় কেউ তাঁর বিবাহের ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করলে তিনি বললেনঃ এ আয়াত আমাকে বিবাহ থেকে বিরত রেখেছে- 
“মহিলাদেরও নিয়মানুযায়ী হক আছে, যেমন তাদের উপর স্বামীদের হক আছে"। 
বর্ণিত আছে, বিশরকে মৃত্যুর পর স্বপ্নে দেখে কেউ জিজ্ঞেস করল : আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন? তিনি বললেন : জান্নাতে আমার মর্যাদা উঁচু হয়েছে এবং পয়গম্বরগণের মর্তবার কাছে পৌঁছেছে; কিন্তু বিবাহিতদের মর্তবা পর্যন্ত পৌঁছেনি। 

*সুফিয়ান ইবনে ওয়ায়ন! বলেন : অধিক পত্নী দুনিয়াদারী নয়। কেননা, হযরত আলী (র.) অন্য সাহাবীগণের তুলনায় অধিক সংসারত্যাগী ছিলেন। অথচ তাঁর চার জন পত্নী ছিলেন।

পরবর্তী পর্ব —
বিবাহের প্রতি বিমুখ হওয়ার কারণ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...