মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫

বিবাহ (১৭) কনের লক্ষ‍্যনীয় তৃতীয় গুন রূপলাবণ্য



বিবাহ (পর্ব – ১৭) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

কনের লক্ষ‍্যনীয় তৃতীয় গুন রূপলাবণ্য —
তৃতীয় গুণ রূপলাবণ্য। এ গুণটিও এজন্যে কাম্য যে, এর ফলে স্বামী যিনা থেকে মুক্ত থাকে। স্ত্রী কুশ্রী হলে মানুষ স্বভাবতই অতৃপ্ত থাকে। এছাড়া যার মুখমণ্ডল সূশ্রী হবে, তার চরিত্রও ভাল হয়। এটাই সাধারণ নিয়ম। আমরা পূর্বে লেখেছি যে, কনের দ্বীনদারীর প্রতিলক্ষ্য রাখা জরুরী এবং রূপ-লাবণ্যের কারণে তাকে বিবাহ করা উচিত নয়। এর অর্থ এই নয় যে, রূপলাবণ্যের প্রতি লক্ষ্য করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরং উদ্দেশ্য এই যে, যখন দ্বীনদারীর অভাব হয়, তখন কেবল রূপলাবণ্যে আসক্ত হয়ে বিবাহ করা উচিত নয়। কেননা, শুধু সুন্দরী হওয়া বিবাহে উৎসাহিত করে ঠিক, কিন্তু দ্বীনদারীর ব্যাপারে শিথিল করে দেয়। তবে রূপলাবণ্যের কারণে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই মহব্বত ও সম্প্রীতি থাকে বিধায় এটাও লক্ষ্যণীয় বিষয়। মহব্বতের কারণাদি বিবেচনা করাতে শরীয়তও নির্দেশ দিয়েছে। এ কারণেই বিবাহের পূর্বে কনেকে দেখে নেয়া মোস্তাহাব। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তাআলা তোমাদের অন্তরে যখন কোন মহিলাকে বিবাহ করার আগ্রহ সৃষ্টি করে দেন, তখন তোমাদের উচিত তাকে দেখে নেয়া। কেননা, এটা পারস্পরিক প্রেম-প্রীতির জন্যে উপযোগী। তিনি আরও বলেন:  আনসারদের চোখে কিছু আছে। যখন তোমাদের কেউ তাদের কাউকে বিবাহ করতে চায়, তখন তাকে দেখে নেয়া উচিত। কথিত আছে, আনসাররা ক্ষীণদৃষ্টি ছিলেন। কেউ বলেন: তাদের চোখ ছোট ছিল। পূর্ববর্তী কোন কোন বুযুর্গ এমন ছিলেন, যাঁরা অভিজাত পরিবারে বিবাহ করলেও পাত্রী দেখে নিতেন। 
আ'মাশ বলেন: পূর্বে না দেখে যে বিবাহ করা হয় তার পরিণতি হয় দুঃখ কষ্ট। বলাবাহুল্য, প্রথম দৃষ্টিতে তো চরিত্র ও দ্বীনদারী জানাই যায় না- কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য জানা যায়। এথেকে বুঝা গেল যে, রূপলাবণ্যের প্রতি খেয়াল রাখাও শরীয়তে কাম্য। 
বর্ণিত আছে, হযরত ওমর (র.)-এর খেলাফতকালে এক ব্যক্তি চুলে খেযাব লাগিয়ে বিবাহ করে নেয়। কয়েক দিন পর তার খেযাব সরে গেলে শ্বশুরালয়ের লোকেরা খলীফার কাছে নালিশ করে বসে যে, তারা যুবক মনে করে তার কাছে বিবাহ দিতে সম্মত হয়েছিল। খলীফা লোকটিকে শাস্তি দিলেন এবং বললেন: তুমি মানুষকে বিভ্রান্ত করেছ। 
বর্ণিত আছে, হযরত বেলাল ও হযরত সোহায়ব রূমী (র.) এক আরব পরিবারে গিয়ে বিবাহের প্রস্তাব দেন। গৃহকর্তা তাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলে হযরত বেলাল বললেন: আমি বেলাল এবং সে আমার ভাই সোহায়ব! আমরা পথভ্রষ্ট ছিলাম, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন। আমরা গোলাম ছিলাম, আল্লাহ আমাদেরকে মুক্ত করেছেন। আমরা নিঃস্ব ছিলাম, আল্লাহ আমাদেরকে ধনবান করেছেন আপনারা আমাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করলে আলহামদুলিল্লাহ আর অস্বীকার করলে সোবহানাল্লাহ, অতঃপর তাদেরকে বলাহলঃ আপনাদের বিবাহ হয়ে যাবে। হযরত সোহায়ব হযরত বেলালকে বললেন : হায়, তুমি আমাদের ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রমের কথাও উল্লেখ করতে পারতে, যা আমরা রসূলে করীম(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সঙ্গে থেকে আনজাম দিয়েছি! হযরত বেলাল বললেন: চুপ থাক। আমরা সত্য কথা বলে দিয়েছি। এ সততাই বিবাহ সম্পন্ন করেছে। বাহ্যিক রূপলাবণ্য ও আভ্যন্তরীণ চরিত্র উভয়ের মধ্যে ধোঁকা হতে পারে। রূপলাবণ্যের ধোঁকা দেখার মাধ্যমে দূর করা মোস্তাহাব। চারিত্রিক ধোঁকা দোষগুণ শুনার মাধ্যমে দূর হতে পারে। তাই বিবাহের পূর্বে উভয় কাজ সেরে নেয়া উচিত, কিন্তু দোষগুণ ও চরিত্র মাধুর্য কেবল বুদ্ধিমান, সত্যবাদী এবং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ব্যক্তিকেই জিজ্ঞাসা করা উচিত। সে যেন কনের পক্ষ না হয় এবং শত্রুও না হয়। কেননা, ইদানীং বিবাহ পূর্ব বিষয়াদিতে এবং কনের গুণ বর্ণনার ব্যাপারে মানুষের মন স্বল্পতা ও বাহুল্য প্রবণ হয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে সত্য কথা বলে এরূপ লোকের সংখ্যা খুবই কম। বর্তমানে প্রবঞ্চনা ও বিভ্রান্ত করার প্রচলন অত্যন্ত বেড়ে গেছে। মোট কথা, যেব্যক্তি কেবল সুন্নত আদায়, সন্তানলাভ ও ঘরকন্নার জন্যে বিবাহ করতে চায়, সে যদি রূপলাবণ্যের প্রতি উৎসাহী না হয়, তবে এটা সংসারবিমুখতার অধিক নিকটবর্তী। কেননা, রূপলাবণ্যও একটি পার্থিব বিষয়, যদিও মাঝেমাঝে এবং কোন কোন ব্যক্তির পক্ষে এটা দ্বীনদারীতে সহায়ক হয়। 
হযরত আবু সোলায়মান দারানী বলেন: সংসারবিমুখতা সবকিছুতেই হয়, এমনকি স্ত্রীর মধ্যেও হয় সংসারবিমুখতা অবলম্বন করার জন্যে মানুষ কোন বৃদ্ধাকে বিবাহ করতে পারে। 
মালেক ইবনে দীনার বললেন: মানুষ এতীম ও নিঃস্ব মহিলাকে বিবাহ করে না, যাকে খাওয়ালে পরালে সওয়াব পাওয়া যায়, ভরণপোষণ সহজ হয় এবং সামান্যতে সন্তুষ্ট থাকে; বরং তারা দুনিয়াদারদের কন্যাকে বিবাহ করে, যে সর্বদা নতুন নতুন কামনা বাসনা উপস্থিত করে বলে,আমাকে অমুক শাড়ী পরাও, অমুক বস্তু খাওয়াও।

ইমাম আহমদ দু'ভগিনীর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন, তাদের মধ্যে বুদ্ধিমতী কোন্টি, তাঁকে উত্তরে বলা হয়: যে বুদ্ধিমতী, তার চোখ নেই। তিনি বললেন: আমি এই অন্ধকেই বিবাহ করব। মোটকথা, যেব্যক্তি আনন্দের জন্যে নয়, বরং প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশে বিবাহ করতে চায়, তার নিয়মনীতি এরূপই হওয়া উচিত, কিন্তু যেব্যক্তি আনন্দ ব্যতীত দ্বীনদারী ঠিক রাখতে পারে না, তার রূপ-লাবণ্য দেখা উচিত। কারণ, বৈধ বিষয় দ্বারা আনন্দ লাভ করা দ্বীনদারীর একটি দুর্গ।
কথিত আছে, সুন্দরী, চরিত্রবতী, কালকেশী আনতনয়না, গৌরবর্ণা ও স্বামী নিবেদিত! স্ত্রী কেউ পেয়ে গেলে সে যেন বেহেশতের হুর পেয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদের পত্নীদেরকে এসব বিশেষণেই বিশেষিত করেছেন। 
বলা হয়েছে: চরিত্রবতী, সুন্দরী, আনতনয়না, সোহাগিনী ও সমবয়স্কা, অপ্সরা আয়তলোচনা।বলাবাহুল্য, এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে আনন্দ পূর্ণতা লাভ করে। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সেই উত্তম, যাকে দেখে তার স্বামী আনন্দিত হয়, যে স্বামীর আদেশ পালন করে, স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের হেফাযত করে এবং স্বামীর ধনসম্পদ দেখাশুনা করে।" বলাবাহুল্য, সোহাগিনী স্ত্রীকে দেখেই স্বামী আনন্দিত হয়।

পরবর্তী পর্ব —
কনের লক্ষ‍্যনীয় চতুর্থ গুন মোহরানা কম হওয়া

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...