মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫

বিবাহ (৩১) পারস্পরিক জীবন যাপনের একাদশ আদব সন্তান সংক্রান্ত



বিবাহ (পর্ব – ৩১) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের একাদশ আদব সন্তান সংক্রান্ত —
প্রথম, ছেলে সন্তান হলে অধিক খুশী এবং কন্যা সন্তান হলে মনঃক্ষুণ্ণ হবে না। কেননা, কেউ জানে না তার জন্যে এতদুভয়ের মধ্যে কোনটি মঙ্গলজনক; বরং গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, কন্যা সন্তানের মধ্যে নিরাপত্তা ও সওয়াব অধিক। উত্তমরূপে শিক্ষা দান করে, লালন-পালন করে ও তার উপর আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত সম্পূর্ণ করে, সেই কন্যা তার জন্যে ডানে বামে দোযখের আড়াল হয়ে তাকে জান্নাতে পৌছাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (র.)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যেব্যক্তি দুটি কন্যা সন্তান লাভ করে এবং তারা যতদিন পিতার কাছে থাকে, ততদিন পিতা তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে, সেই কন্যাদ্বয় তাকে জান্নাতে দাখিল করবে। অন্য এক রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এরশাদ করেন: যেব্যক্তি বাজার থেকে নতুন বন্ধু আপন সন্তানদের জন্যে কিনে আনে, সে যেন তাদের জন্যে খয়রাত নিয়ে আসে। তার উচিত এই বন্ধু পুত্রদের পূর্বে কন্যাদের মধ্যে বন্টন শুরু করা। কেননা, যেব্যক্তি কন্যাকে খুশী করে, সে যেন আল্লাহ তা'আলার ভয়ে ক্রন্দন করে। যে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে, আল্লাহ তার উপর দোযখ হারাম করে দেন। হযরত আবু হোরায়রা (র.)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান অথবা বোন থাকে এবং তাদের বিপদাপদ ও নির্মমতায় সবর করে, আল্লাহ তাকে কন্যাদের প্রতি করুণা করার কারণে জান্নাতে দাখিল করবেন। এক ব্যক্তি আরজ করল : যদি দু'কন্যা থাকে? তিনি বললেন: দু'কন্যার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হবে। এক ব্যক্তি বলল: একজন হলে? তিনি বললেন: একজন হলেও।"

দ্বিতীয়, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশুর কানে আযান দেবে। হযরত রাফে (র.)-এর পিতা বর্ণনা করেন: হযরত ফাতেমা (র.)-এর গর্ভ থেকে হযরত হাসান (র.) ভূমিষ্ঠ হলে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর কানে আযান দিয়েছেন। আমি এ দৃশ্য স্বচক্ষে দেখছি। আরও বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন- "আমি যার কোন সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়, অতঃপর সে তার বাম কানে আযান দেয়, সেই সন্তান 'উন্মুহু ছিবইয়ান' রোগের আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকে। যখন শিশুর মুখ খোলে, তখন সর্বপ্রথম তাকে কলেমা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্' শিক্ষা দেয়া এবং সপ্তম দিনে খতনা করা মোস্তাহাব। এ সম্পর্কে একটি হাদীস বর্ণিত আছে।

তৃতীয়, শিশুর উত্তম নাম রাখবে। এটাও শিশুর হক। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- "যখন নাম রাখ, তখন যেন নামের প্রথম অংশ 'আবদ' (বান্দা) হয়, আল্লাহ তাআলার সর্বাধিক প্রিয় নাম হচ্ছে 'আব্দুল্লাহ' ও 'আব্দুররহমান' । রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "তোমরা আমার নামে নাম রাখ। তবে আমার ডাকনামে ডাকনাম রেখো না।"  আলেমগণ বলেন: এ নিষেধাজ্ঞা কেবল রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আমলে ছিল। তখন তাঁকে 'আবুল কাসেম' নামে ডাকা হত। এখন অন্যের জন্যে এই নাম রাখা দূষণীয় নয়। তবে তাঁর নাম ও ডাকনাম এক ব্যক্তির জন্যে একত্রিত করা উচিত নয়, হাদীসে এ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। কেউ কেউ বলেন: এই নিষেধাজ্ঞাও কেবল তাঁর আমলে ছিল। এক ব্যক্তির ডাকনাম ছিল আবু ঈসা (ঈসার বাপ)। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) শুনে বললেন: ঈসা (আ.)-এর তো বাপ ছিল না। এ থেকে জানা গেল, আবু ঈসা নাম রাখা মাকরূহ। নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে যায়, তারও নাম রাখা উচিত। আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ বলেন: আমি শুনেছি গর্ভপাতের সন্তান কেয়ামতের দিন পিতার পেছনে পেছনে ফরিয়াদ করবে এবং বলবে, তুমি আমাকে নামহীন ছেড়ে দিয়ে নষ্ট করেছ। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ একথা শুনে বললেন: তা কেমন করে হবে? পিতা তো জানতেও পারে না যে, গর্ভপাতজনিত সন্তান ছেলে না মেয়ে। এমতাবস্থায় সে কিরূপে নাম রাখবে? জওয়াবে আবদুর রহমান বললেনঃ অনেক নাম আছে, যা পুরুষ ও নারী উভয়েরই হতে পারে; যেমন আম্মারা, তালহা, ওতবা ইত্যাদি। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ "কেয়ামতের দিন তোমরা তোমাদের নামে ও তোমাদের পিতার নামে আহূত হবে। অতএব তোমরা সুন্দর সুন্দর নাম রাখ। কারও নাম খারাপ থাকলে তা বদলে দেয়া মোস্তাহাব। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) 'আছ' (পাপী) -এর নাম পাল্টে আবদুল্লাহ রেখেছিলেন। হযরত যয়নব (র.)-এর নাম ছিল বাররাহ। নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তুমি নিজেই নিজেকে ভাল বল। উল্লেখ্য, 'বাররাহ' অর্থ নিরপরাধ। এর পর তিনি এই নাম পাল্টে যয়নব রাখলেন।

চতুর্থ, সন্তান জন্ম গ্রহণের পর আকীকা করবে। পুত্রের জন্যে দু'টি ছাগল এবং কন্যার জন্য একটি ছাগল জবাই করবে। আকীকার জন্তু নর হোক কিংবা মাদী, তাতে কিছু আসে যায় না। হযরত আয়েশা (র.) রেওয়ায়েত করেন, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পুত্রের আকীকায় দুটি ছাগল এবং কন্যার আকীকায় একটি ছাগল জবাই করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বর্ণিত আছে, তিনি হযরত ইমাম হাসান (র.)-এর আকীকায় একটি ছাগল জবাই করেন। এ থেকে জানা গেল, এক ছাগল জবাই করলেও ক্ষতি নেই। ভূমিষ্ঠ শিশুর চুলের ওজনের সমপরিমাণ সোনা অথবা রূপা খয়রাত করা সুন্নত। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত ইমাম হুসাইন (র.)-এর জন্মের সপ্তম দিন হযরত ফাতেমা (র.)-কে এরশাদ করেন: তার চুল মুণ্ডন করে চুলের সমপরিমাণ রূপা সদকা করে দাও। হযরত আয়েশা (র.) বলেন: আকীকার জন্তুর হাড়া ভাঙ্গা উচিত নয়।

পঞ্চম, সন্তানের কণ্ঠ তালুতে খোরমা অথবা মিষ্টি মেখে দেবে। আবু বকর তনয়া হযরত আসমা (র.) বলেন: কোবায় আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়র আমার গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হলে আমি তাকে এনে রসূলে আকরাম (স.)-এর কোলে তুলে দিলাম। তিনি একটি খোরমা চিবিয়ে তার রস আবদুল্লাহর মুখে দিলেন। তাই সর্বপ্রথম তার পেটে যা পড়ে, তা ছিল রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর লালা মোবারক। এর পর তিনি তার তালুতে খোরমা মেখে দিলেন এবং বরকতের দোয়া করলেন। মুহাজিরদের মধ্যে সর্বপ্রথম শিশু সে-ই জন্মগ্রহণ করেছিল। তাই তার জন্মগ্রহণে মুসলমানদের আনন্দের সীমা ছিল না; কেননা, লোকেরা বলাবলি করতো যে, ইহুদীরা তোমাদের উপর জাদু করেছে। তোমাদের সন্তান সন্ততি হবে না।


পরবর্তী পর্ব —

পারস্পরিক জীবন যাপনের দ্বাদশ আদব তালাক সংক্রান্ত 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...