অহংকারের কারণসমূহ
অহংকারের প্রথম কারণ 'এলম' তথা জ্ঞান।
প্রকাশ থাকে যে, এমন লোকই অহংকার করে, যে নিজেকে বড় মনে করে। আর নিজেকে সে-ই বড় মনে করে, যে জানে তার মধ্যে কোন পার্থিব অথবা পারলৌকিক পূর্ণতার গুণ বিদ্যমান রয়েছে।
পারলৌকিক পূর্ণতা দু'টি— এলম (জ্ঞান) ও আমল (কর্ম)। অপরপক্ষে পার্থিব পূর্ণতা পাঁচটি—বংশ, সৌন্দর্য, শক্তি, ধনসম্পদ এবং বন্ধু-বান্ধব ও সঙ্গী-সাথীদের প্রাচুর্য। অতএব, এ সাতটি বিষয়ই হচ্ছে অহংকারের কারণ। নিম্নে প্রত্যেকটি আলাদা আলাদাভাবে বর্ণিত হচ্ছে।
অহংকারের প্রথম কারণ এলম তথা জ্ঞান–
জ্ঞানী ব্যক্তিরা দ্রুত অহংকারী হয়ে পড়ে। তাই হাদীসে বলা হয়েছে
>জ্ঞানের বিপদ হচ্ছে অহংকার।”
অর্থাৎ, জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের মধ্যে জ্ঞানের পূর্ণতা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয়ে নিজেকে বড় এবং অন্যদেরকে মূর্খ ও তুচ্ছ মনে করতে থাকে। ফলে, পার্থিব কাজ-কারবারে সে নিজেকে অগ্রগণ্য মনে করে। অপরের কাছ থেকে প্রথমে সালাম পাওয়ার আশা করে। অন্যরা তার সাথে সদাচরণ করে, কিন্তু সে কারও সাথে সদাচরণ করে না। করলেও এটাকে তার প্রতি অনুগ্রহ মনে করে এবং কৃতজ্ঞতা আশা করে। আর ধর্মীয় ব্যাপারে জ্ঞানী ব্যক্তি অন্যের সাথে এভাবে অহংকার করে যে, সে নিজেকে আল্লাহর কাছে অন্যের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ও উত্তম মনে করে। ফলে অন্যের জন্যে সে যতটুকু ভয় করে, নিজের জন্যে ততটুকু করে না; বরং নিজের মুক্তির ব্যাপারে অন্যের চেয়ে বেশী আশাবাদী হয়।
বলা বাহুল্য, এরূপ জ্ঞানী ব্যক্তিকে মূর্খ বলাই অধিক সঙ্গত। তাকে জ্ঞানী কে ‘করেছে? সত্যিকার জ্ঞান তো তাকে বলে, যা দ্বারা মানুষ আল্লাহকে, নিজেকে এবং পরিণামের বিপদকে চিনে ও বুঝে। জ্ঞান দ্বারা খোদাভীতি, বিনয় ও নম্রতা বৃদ্ধি পায়।
এখন প্রশ্ন হয়, জ্ঞানের কারণে কিছুসংখ্যক লোকের অহংকার ও নির্ভীকতা বেড়ে যায় কেন?
এর কারণ দ্বিবিধ। প্রথমত এ সকল লোক এমন জ্ঞান চর্চায় মশগুল হয়, যা কেবল নামে মাত্রই জ্ঞান- সত্যিকার জ্ঞান নয়। সত্যিকার জ্ঞান দ্বারা খোদাভীতি বৃদ্ধি পাবেই। যেমন, আল্লাহ বলেন :
>”জ্ঞানী ব্যক্তিরাই আল্লাহকে ভয় করে।”
দ্বিতীয়ত এ সকল লোক যখন জ্ঞান চর্চা করে, তখন তাদের বাতেন অর্থাৎ অন্তরদেশ সংশোধিত থাকে না; বরং কুচরিত্র দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে। ফলে যে শিক্ষাই লাভ করুক না কেন, তা তাদের অন্তরে ভাল আসন পায় না। পরিণামে জ্ঞানের ফলও ভাল হয় না।
হযরত ওয়াহাব (রহঃ) এর একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : জ্ঞান হচ্ছে আকাশের পানির মত, যা পরিষ্কার ও মিষ্ট থাকে। কিন্তু বৃক্ষসমূহ আপন শিরা-উপশিরা দ্বারা যখন সেই পানিকে নিজেদের মধ্যে টেনে নেয়, তখন মূলত যে বৃক্ষের যে স্বাদ, সে পানিকে সেইভাবে বদলে নেয়। পানি পেয়ে তিক্ত বৃক্ষের তিক্ততা আরও বেড়ে যায় এবং মিষ্ট বৃক্ষের মিষ্টতাও তেমনি বৃদ্ধি পায়। জ্ঞানের অবস্থাও তদ্রূপ। যে জ্ঞানী ব্যক্তির মধ্যে যেরূপ সাহসিকতা ও খাহেশ থাকে, সে জ্ঞান তার জন্যে তেমনি হয়ে যায়। ফলে এর কারণে অহংকারীর অহংকার এবং বিনয়ীর বিনয় বেড়ে যায়।
অহংকারের দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে 'আমল' অর্থাৎ, এবাদত —
অনেক সংসারত্যাগী এবাদতকারী অহংকার, ইযযত ও মানুষকে আকৃষ্ট করার প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকে না। তাদের আচরণ থেকেও পার্থিব ও পারলৌকিক উভয় প্রকার কাজকর্মে অহংকার বুঝা যায়। পার্থিব কাজকর্মে যেমন তাদের কাছে মানুষের আসা, মানুষের কাছে তাদের যাওয়ার তুলনায় উত্তম বিবেচিত হয়। তারা মানুষের কাছে আশা করে যে, মানুষ তাদের অভাব-অনটন পূর্ণ করুক, সম্মান করুক, মজলিসে সবার আগে বসাক এবং পরহেযগার ও মুত্তাকীরূপে স্মরণ করুক। পারলৌকিক ব্যাপারে তাদের অহংকার এই যে, তারা নিজেদেরকে মুক্তিপ্রাপ্ত এবং অন্য সকলকে ধ্বংসপ্রাপ্ত মনে করে। অথচ বাস্তবে ধ্বংসপ্রাপ্ত তারাই?
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এক হাদীসে বলেন :
>”সব মানুষ বরবাদ হয়ে গেছে- যখন তোমরা কাউকে একথা বলতে শুন, তখন মনে কর, সর্বাধিক বরবাদ সেই হবে। যে ব্যক্তি এবাদতকারীকে আল্লাহর ওয়াস্তে প্রিয় মনে করে এবং আল্লাহর এবাদতের কারণে তার সম্মান করে, তার মধ্যে ও এবাদতকারীর মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। সে মুক্তি পাবে এবং আল্লাহর নৈকট্যশীল হবে। কিন্তু এবাদতকারী যেহেতু মানুষকে হেয় জ্ঞান করে, তাদের কাছে উঠাবসা করতে ঘৃণা পোষণ করত, তাই সে আল্লাহর গযবের যোগ্য হবে।”
আশ্চর্যের বিষয় বটে, মানুষ তো তাকে ভালবাসার কারণে তার এবাদতের মর্তবা পাবে, আর সে নিজে কি না মানুষকে হেয় জ্ঞান করার কারণে আল্লাহর অসন্তোষের পাত্র হবে।
বর্ণিত আছে, বনী ইসরাঈলের মধ্যে এক ব্যক্তি অধিক গুণ্ডামির কারণে “গুণ্ডা” নামে খ্যাত ছিল। অপরদিকে অন্য এক ব্যক্তি অধিক এবাদতের কারণে, “আবেদ” নামে প্রসিদ্ধ ছিল। তার অধিক এবাদতের ফলস্বরূপ একখণ্ড মেঘ তাকে সর্বক্ষণ ছায়া দান করত। একদিন গুণ্ডা লোকটি আবেদের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে মনে চিন্তা করল- এই আবেদ এবাদতে অনেক নাম করেছেন। আমি একজন গুণ্ডা। তার কাছে বসলে আল্লাহ আমার প্রতি রহম করতে পারেন। অতঃপর সে ভক্তি সহকারে আবেদের কাছে গিয়ে বসল। এদিকে আবেদ ভাবল- আমি তো একজন আবেদ। এই গুণ্ডা লোকটি এখানে বসল কেন? এই ভেবে সে গুণ্ডাকে সরোষে বলল : চলে যা এখান থেকে! আল্লাহ তা'আলা সেই সময়ের নবীর কাছে ওহী পাঠালেন : তাদের উভয়কে নতুন করে আমল করতে বল। আমি গুণ্ডাকে ক্ষমা করেছি এবং আবেদের সকল এবাদত বাতিল করে দিয়েছি। অতঃপর মেঘখন্ডের ছায়াও গুণ্ডার উপর চলে গেল।
অহংকারের তৃতীয় কারণ বংশ-মর্যাদা—
যার বংশ সম্ভ্রান্ত, সে নীচ বংশের লোকদেরকে হেয় মনে করে, যদিও তারা শিক্ষা-দীক্ষা ও কর্মে বেশী হয়। কেউ কেউ বংশগত অহমিকায় এত বেশী ক্ষিপ্ত যে, তারা অন্যদেরকে গোলাম মনে করে এবং তাদের সাথে উঠা-বসা করতে ঘৃণা করে। সম্ভ্রান্ত বংশের ধার্মিক ও জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিগণও এ ব্যাধি থেকে মুক্ত নয়। কিন্তু সাধারণ অবস্থায় এটা তাদের মধ্যে গোপন থাকে-মুখে ফুটে উঠে না। তবে ক্রোধ প্রবল হলে জ্ঞানবুদ্ধির নূর বিলীন হয়ে যায়। তখন অহংকার কথাবার্তায়ও ফুটে উঠে।
এক রেওয়ায়েতে হযরত আবূ যর (রাঃ) বর্ণনা করেন, একবার রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর সামনে এক ব্যক্তির সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়। ক্রোধের আতিশয্যে আমি তাকে বলে বসলাম - হে কৃষ্ণকায় নারীর সন্তান ! রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আমাকে বললেন :
>”হে আবূ যর ! উভয় পাল্লা সমান। কৃষ্ণকায় নারীর সন্তানের উপর শ্বেতকায় নারীর সন্তানের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই।'
আবূ যর বলেন : একথা শুনে আমি মাটিতে শুয়ে পড়লাম এবং লোকটিকে বললাম : তুমি আমার গণ্ডদেশকে পদতলে পিষ্ট কর। এখানে লক্ষণীয় যে, হযরত আবূ যর যখন নিজেকে শ্বেতকায় মহিলার সন্তান বলে গর্ব করলেন, তখন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তাঁকে কিভাবে সতর্ক করে দিলেন। আরও লক্ষণীয়, তিনি কিভাবে তওবা করলেন এবং মন থেকে অহংকার মূলোৎপাটন করে দিলেন। তিনি বুঝে নিলেন, ইযযতের শিকড় যিললত ছাড়া উৎপাটিত হয় না। তাই যার সাথে অহংকার করেছিলেন, তারই পদতলে আপন গণ্ডদেশ স্থাপন করলেন।
অহংকারের চতুর্থ কারণ রূপ-লাবণ্য—
এ কারণটি মহিলাদের মধ্যে অধিক পাওয়া যায়। এই অহংকারের ফলে অপরের দোষ-ত্রুটি ও গীবত মুখে উচ্চারিত হয়ে যায়। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, একবার এক মহিলা রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে আগমন করলে আমি হাতের ইশারায় বললাম ‘বেঁটে’। এতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আয়েশা, তুমি তার গীবত করেছ। বলা বাহুল্য, গোপন অহংকারই ছিল এর কারণ। হযরত আয়েশা নিজে যদি বেঁটে হতেন, তবে মহিলাকে বেঁটে বলতেন না । অতএব, তিনি যেন নিজের দেহাবয়বকে উত্তম জ্ঞান করেছেন। এর বিপরীতে মহিলাকে খর্বাকৃতির মনে করে বেঁটে বলে দিয়েছেন।
অহংকারের পঞ্চম কারণ ধন-সম্পদ—
এ ধরনের অহংকার রাজা-বাদশাহরা তাদের ধন-ভাণ্ডার নিয়ে, ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যসামগ্রী নিয়ে, গ্রামীণ লোকেরা তাদের ভূ-সম্পত্তি নিয়ে এবং সাজ-সজ্জাকারীরা তাদের পোশাক ও যানবাহন নিয়ে করে থাকে। সুতরাং ধনাঢ্য ব্যক্তি নিঃস্ব ব্যক্তিদের সাথে অহংকার করে বলে : মিয়া, তুমি তো ভিখারী-মিসকীন। আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে কিনে নিতে পারি।
ধনাঢ্যতার বিপদ ও দারিদ্র্যের ফযীলত সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই ধনীরা এসব কথা বলে। কোরআন পাকে এই ফযীলতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে–
>”অতঃপর কথাবার্তায় সে তার সঙ্গীকে বলল : আমার কাছে তোমার চেয়ে অধিক ধন-সম্পদ এবং অধিক জনশক্তি আছে।”
সঙ্গী জওয়াব দিল :
>‘যদি তুমি আমার ধন ও জন কম দেখ, তবে তাতে কোন ক্ষতি নেই। আমি আশা করি আমার পালনকর্তা আমাকে কল্যাণ দান করবেন, যা তোমার বাগ-বাগিচার চেয়ে উত্তম হবে এবং তোমার বাগানের উপর আকাশ থেকে অগ্নিশিখা নিক্ষেপ করবেন, ফলে তা হয়ে যাবে বৃক্ষহীন ময়দান অথবা তার পানি শুকিয়ে যাবে। অতঃপর তা খোঁজাখুঁজি করেও পাবে না।”
কারুনের অহংকারও তেমনি ছিল। সে যখন খুব সাজগোছ করে সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে হাযির হত, তখন তারাও তার মত ধন-সম্পদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করতে লাগল।
অহংকারের ষষ্ঠ কারণ দৈহিক শক্তি-বল—
যা নিয়ে দুর্বল ও অসমর্থদেরসাথে অহংকার করা হয়।
অহংকারের সপ্তম কারণ অনুগামী—
সাহায্যকারী, মুরীদ, চাকর-নওকর, পরিবার ও আত্মীয়বর্গের সংখ্যাধিক্য। রাজা-বাদশাহরা অধিক সৈন্য-সামন্ত নিয়ে এবং শিক্ষিতরা অধিক শিষ্য নিয়ে অহংকার করে- যদিও তাদের সৈন্য সামন্ত ও শিষ্যবর্গ ধ্বংস ও আযাবের কারণ হয়।
পরবর্তী পর্ব






