রবিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান জ্ঞানার্জন (৩) জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের উক্তি


জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের উক্তি

জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ৩ )
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণেরও অনেক উক্তি বর্নিত আছে। হযরত আলী (র.) কোমায়লকে বলেন, "হে কোমায়ল ! জ্ঞান ধন-সম্পদ অপেক্ষা উত্তম । জ্ঞান তোমার হেফাজত করে, আর তুমি ধন-সম্পদের হেফাজত কর। জ্ঞান শাসক আর ধন-সম্পদ শাসিত । ধন ব্যয় করলে হ্রাস পায় আর জ্ঞান ব্যয় করলে বেড়ে যায় ।"

তিনি (আলী র.) আরো বলেন : "জ্ঞানী ব্যক্তি রোজাদার, এবাদতকারী ও জেহাদকারী অপেক্ষা উত্তম। আলেম ব্যক্তির মৃত্যু হলে ইসলামে এমন শুন্য দেখা দেয় যা তার উত্তরশুরি ছাড়া কেউ পূরণ করতে পারে না ।" 

তার কথিত একটি আরবী অনুবাদ এরূপ : "সকল মানুষ আকার আকৃতিতে এক রূপ সকলের পিতা আদম এবং সকলের মা হাওয়া । তারা যদি মূল উপাদান দিযে গর্ব করতে চায়, তবে পানি ও মৃত্তিকা ব্যতিত তাদের মূল উপাদান আর কি? হা যার দেহে আলেমদের গর্বের আলখেল্লা আলা রয়েছে। কেননা সে নিজে যেমন পথপ্রাপ্ত, তেমনি অপরেরও পথ-প্রদর্শক। সৌন্দর্যের বস্তু তার অর্জিত রয়েছে। এটাই মানুষের মর্যাদা। 

মূর্খরা সদাই জ্ঞানীদের সাথে শত্রুতা পোষন করে। তথাপি তুমি এমন জ্ঞান অর্জন কর, যদ্বারা চিরঞ্জীব হতে পার। সকল মানুষ মৃত; কিন্তু জ্ঞানী চিরজীবী।

আবুল আসওয়াদ (রহ.) বলেন : জ্ঞানের ছেয়ে বেশী ইজ্জতের কোন কোন বিষয় নেই। বাদশাহ জনগণের শাসক হয়ে থাকে এবং জ্ঞানীরা বাদশাহদের শাসক হয়।

হযরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন,- হযরত সোলায়মান ইবনে দাউদ (আ.)-কে এলেম, ধন-সম্পদ ও রাজত্বের মধ্য থেকে যে কোন একটি বেছে নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। তিনি এলেম পছন্দ করেছিলেন। ফলে তাকে এলেমের সাথে ধন ও রাজত্বও দেয়া হয়েছিল।

হযরত ইবনে মোবারক (রহ.)-কে কেউ জিজ্ঞাসা করল : মানুষ কে? তিনি বললেন : "সংসারবিমুখ দরবেশ।" প্রশ্ন হল : নীচ কে? উত্তর হল : "যারা নিজেদের দ্বীন বিক্রি করে খায়।" 

মোট কথা জ্ঞানী ব্যক্তি ছারা অন্য কাউকে তিনি মানুষ বলেননি। কেননা যে বৈশিষ্ট মানুষ ও চতুষ্পদ বস্তুর মধ্যে পার্থক্য সূচিত করে তা হচ্ছে জ্ঞান। মানুষ তখনই মানুষ বলে কথিত হবে যখন তার মধ্যে গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণ বিদ্যমান থাকবে। 

মানুষের মর্যাদা দৈহিক শক্তির কারণে নয়। কেননা, উট তার ছেয়ে বেশী শক্তির অধিকারী। মানুষের মর্যাদা বিশাল বপু হওয়ার কারণেও নয়। কেননা, হিংস্র জন্তুর বীরত্ব মানুষের ছেয়ে বড়। বরং একমাত্র জ্ঞানের দিক দিয়ে মানুষ সম্ভ্রান্ত। জ্ঞানের জন্যই মানুষ সৃ্ষ্টি। 

জনৈক দার্শনিক বলেন : কেউ আমাকে বলুক, যে ব্যক্তি এলেম পায়নি, সে কি পেয়েছে এবং যে ব্যক্তি এলেম পেয়েছে, তার পাওয়ার আর কি বাকী আছে?

ফাতাহ্ মুসেলী বলেন : রোগীকে রোজ রোজ খাদ্য, পানীয় ও ওষুধপত্র না দিলে সে কি মরে যাবেনা? লোকেরা বলল : নিসন্দেহে মরে যাবে। তিনি বললেন : আত্মার অবস্থাও তদ্রূপ। আত্মাকে তিন দিন এলেম ও জ্ঞান থেকে উপোস রাখলে সে মরে যায়। তার এ উক্তি যথার্থ। কেননা জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হচ্ছে আত্মার খোরাক; এগুলোর মধ্যেই তার জীবন; যেমন দেহের খোরাক খাদ্য। যার জ্ঞান নেই তার অন্তর রুগ্ন। মৃত্যু তার জন্য অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার আত্মার রোগ ও মৃত্যুর খবর রাখেনা।দুনিয়ার মহব্বত ও কাজ-কারবারে লেগে থাকার কারণে তার চেতনা লোপ পায়। যেমন ভয় ও নেশার আতিসয্যে জখমের ব্যাথা অনুভূত হয় না; যদিও বাস্তবে ব্যাথা থাকে। কিন্তু মৃত্যু যখন দুনিয়ার বোঝা ও সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়, তখন সে আত্মার মৃত্যুর কথা জানতে পারে এবং পরিতাপ করে। অবশ্য দহন পরিতাপে কোন উপকার হয়না। ভীত ব্যক্তির ভয় অথবা মাতালের নেশা দূর হয়ে গেলে ভয় ও নেশার অবস্থায় তার যে সব যখম লাগে, সেগুলো সে হাড়ে হাড়ে টের পেতে থাকে। সত্য উদঘাটিত হওয়ার সেই দিনের (হাসরের দিন) ভয়াবহতা থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। কেননা এখন মানুষ ঘুমিয়ে আছে। মৃত্যু হলে জাগ্রত হবে।

হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন : জ্ঞানী লোকদের লেখার কালি এবং শহীদের রক্ত ওজন করা হলে কালির ওজন বেশী হবে । 

হযরত ইবনে মাসুদ (র.) )বলেন : "হে লোকসকল ! জ্ঞান অর্জন কর জ্ঞানকে তুলে নেয়ার পূর্বে । জ্ঞান তুলে নেয়ার অর্থ জ্ঞানী লোকদের মৃত্যুবরণ করা । আল্লাহর কসম, যার হাতে আমার প্রাণ - যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছে, তারা জ্ঞানীলোকদের মাহাত্ম্য দেখে আকাঙ্ক্ষা করবে যে, আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জ্ঞানী অবস্থায় পুনরুখ্বিত করলে ভাল হত । কেউ জ্ঞানী হয়ে জন্মগ্রহন করে না, বরং অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জিত হয়।"

হযরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন : রাতের কিছু অংশে জ্ঞান চর্চা করা আমার মতে সারারাত জাগ্রত থেকে নফল এবাদত করা অপেক্ষা উত্তম । এ বিষয়টি হযরত আবু হুরায়রা (র.) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) থেকেও বর্ণিত আছে।

"আয় পরোয়ারদেগর আমাদেরকে ইহকালের পুণ্য এবং পরকালের পুণ্য দান করুন" এ আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে হযরত হাসান (রহ.) বলেন : দুনিযার পুণ্য জ্ঞান ও আরাধনা। পরকালের পুন্য অর্থ জান্নাত ।

জনৈক দার্শনিককে কেউ প্রশ্ন করল : কোন্ বস্তু সঞ্চয় করা দরকার? উত্তর হল : এমন বস্তু সঞ্চয় করা উচিৎ, যা তোমার নৌকা ডুবে গেলে তোমার সাথে সাতার কাটতে থাকে। অর্থাৎ, জ্ঞানই হচ্ছে সঞ্চয়যোগ্য বস্তু। কারণ দেহরূপী নৌকা মৃত্যুরূপী সলিলে সমাধিলাভ করলে পর এটাই সাথী থাকে।

অন্য এক দার্শনিক বলেন : "যে ব্যক্তি প্রজ্ঞাকে নিজের লাগাম বানায়ে নেয়, মানুষ তাকে ইমাম করে নেয়। যে ব্যক্তি জ্ঞানে খ্যাতি অর্জন করে মানুষ তাকে ইজ্জত সন্মানের দৃষ্টিতে দেখে।"

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন : জ্ঞানের এক গৌরভ এইযে, "একে কোন ব্যক্তির সাথে সামান্যতম সম্পর্কযুক্ত করা হলে সে আনন্দিত হয়। উদাহরণত: যদি বলা হয়, অমুক ব্যক্তি এব্যাপারে জ্ঞান রাখে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আনন্দ অনুভব করে। পক্ষান্তরে সে এবিষয়ে জ্ঞান রাখেনা -একতা কাউকে বললে সে দুঃখিত হয়।"

হযরত ওমর বিন খাত্তাব (র.) বলেন : "হে লোকসকল! জ্ঞানব্রতী হও। আল্লাহ্ তা'আলার কাছে একটি মহব্বতের চাদর আছে। যে ব্যক্তি কোন বিষয়ে জ্ঞান অন্বেষন করে, আল্লাহ্ তা'আলা সে চাদর তাকে পরিয়ে দেন। এরপর সে ব্যক্তি কোন গুনাহ করলেও তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি (তওবার) লাভের তওফিক দান করা হয়। পুনরায় গুনাহ্ করলেও তাকে আল্লাহ্'র সন্তুষ্টি লাভের তওফিক দান করা হয়। পুনরায় গুনাহ করলেও আল্লাহ্ তাকে ওই তওফিক দান করেন । তৃতীয়বার গুনাহ করার পরও এরূপ করা হয় । এভাবে বারবার তওফিক দানের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তার কাছ থেকে সেই চাদরটি ছিনিয়ে না নেয়া, যদিও তার গুনাহ বৃদ্ধি পেতে পেতে মৃত্যু পর্যন্ত পৌছে ।"

আহনাফ (রহ.) বলেন, "মনে হয় জ্ঞানীগন সমগ্র ইজ্জতের মালিক হয়ে যাবে । যে ইজ্জত জ্ঞানের দ্বারা সুদৃঢ না হয় তার পরিনতি হয় লাঞ্ছনা।"

সালেম ইবনে আবী জা'দ বলেন : "আমি ক্রীতদাস ছিলাম । প্রভু আমাকে তিনশ দিরহামের বিনিময়ে মুক্ত করে দিলে আমি কি কাজ শিখে জীবিকা নির্বাহ করব সে সম্পর্কে ভাবতে লাগলাম । অবশেষে জ্ঞানকে পেশা করে নিলাম । এর পর এক বছর অতীত না হতেই শহরের শাসক আমার সাথে সাক্ষাত করতে এলেন । আমি তাকে ফিরিযে দিলাম; কাছে আসতে দিলাম না ।"

যু্হরা ইবনে আবুবকর বলেন : আমার পিতা আমাকে জ্ঞানব্রতী হতে চিটি লিখলেন । তিনি লিখলেন- যদি তুমি নিঃস্ব হয়ে যাও তবে জ্ঞান হবে তোমার ধন । আর যদি ধনাঢ্য হয়ে যাও তবে জ্ঞান হবে অঙ্গসজ্জা ।
হযরত লোকমান তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিলেন : হে বৎস জ্ঞানীদের কাছে বস । কেননা আল্লা্হ্ তা'আলা জ্ঞানের নুর দ্বারা অন্তরকে জীবিত করেন । যমিন বৃষ্টির পানি দ্বারা মাটিকে শস্যশ্যামল করেন ।

জনৈক দার্শনিক বলেন : জ্ঞানী ব্যক্তি মারা গেলে তার জন্য পানিতে মাছ এবং শুন্যে পাখীরা পর্যন্ত ক্রন্দন করে। বাহ্যত: তাকে দেখা না গেলেও তার স্মৃতি অন্তরে জাগ্রত থাকে।

জ্ঞান জ্ঞানার্জন (২) জ্ঞানের শ্রেষ্টত্ব সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসসমূহ



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

জ্ঞানের শ্রেষ্টত্ব সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসসমূহ নিম্নরূপ –
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "আল্লাহ যার কল্যাণ চান তিনি তাকে দীন বিষয়ে গভীর ইলম দান করেন।" 

তিনি আরো ইরশাদ করেন - "জ্ঞানী ব্যাক্তিবর্গ পয়গন্বরগণের উত্তরাধিকারী।"
বলাবাহুল্য নবুয়তের ছেয়ে বড় কোন মর্তবা নেই। কাজেই এই মর্তবার উত্তরাধিকারী হওয়ার ছেয়ে বড় আর কোন গৌরব নেই। 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেন, – "জ্ঞানী ব্যাক্তির জন্য আকাশ ও পৃথিবীস্থিত সবকিছু মাগফেরাত কামনা করে।" 
সুতরাং এর চেয়ে বড় আর কি পদমর্যাদা হবে,যার কারণে আকাশ ও পৃথিবীর ফেরেশতাকুল মাগফেরতের দোয়ায় মশগুল থাকবে? জ্ঞানি ব্যাক্তি নিজের মধ্যে ব্যাপৃত থাকে, আর ফেরেস্তারা তার জন্য মাগফেরাত প্রার্থনায় নিরত থাকেন। 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "প্রজ্ঞা সম্ভ্রান্ত ব্যাক্তির মাহাত্ম্য বৃদ্বি করে। এবং গোলামের মর্যাদাও এত উচু করে যে, তাকে রাজা বাদশাদের আসনে বসিয়ে দেয়।" এ হাদীসে তিনি দুনিয়াতে জ্ঞানের ফলাফল বর্ণনা করেছেন। বলাবাহুল্য আখেরাত দুনিয়ার তুলনায় শ্রে্ষ্ঠ ও স্থায়ী।

এক হাদীসে বলা হয়েছে : "দুটি স্বভাব মুনাফেকের মধ্যে পাওয়া যায়না। - (১) সুন্দর পথ প্রদর্শন (২) ধর্ম সম্পর্কিত জ্ঞান।" 

কোন কোন সমসাময়িক ধর্ম জ্ঞানীর নেফাক (কপটতা) দেখে এ হাদীস সম্পর্জে সন্দেহ করা উচিত নয়। কেননা 'ফেকাহ্' শব্দ বলে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সে জ্ঞান ও প্রজ্ঞাই বুঝাননি, যা তোমরা মনে কর; বরং এ শব্দের অর্থ পরে বর্ণিত হবে। ফেকাহবিদের সর্বনিম্ন স্থর হল আখেরাতকে দুনিয়া অপেক্ষা উলে বিশ্বাস করা। এ বিশ্বাস ফেকাহবিদদের কাছে সু্ষ্টু ও প্রবল হয়ে গেলে সে নেফাক ও নাম যসের মোহ থেকে মুক্ত হয়ে যায়। 

রসূল-আল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো ইরশাদ করেন : "মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ঈমানদার সেই জ্ঞানীব্যাক্তি যার কাছে মানুষ প্রয়োজন নিয়ে আগমন করে এবং মানুষ তার প্রতি বুমুখতা প্রদর্শন করলে সে নিজেকে বিমুখ করে দেয়।"
তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেন "ঈমান নিরাভরণ। তার পোষাক হচ্ছে তাকওয়া (খোদাভীতি), তার মজ্জা হচ্ছে লজ্জা এবং তার ফল হচ্ছে জ্ঞান।" 

এক হাদীসে আছে : "মানুষের মধ্যে নবুয়তোর মর্তবার নিকটবর্তী হচ্ছে জ্ঞানী ও জেহাদকারী সম্প্রদায়। জ্ঞানী সম্প্রদায এ জন্য যে তারা মানুষকে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কতৃক আনীত কথাবার্তা বলে। এবং জেহাদকারীগণ এ কারণে যে তারা পয়গম্বরগণের আনীত শরীয়তের জন্য অশ্বের সাহায্যে জেহাদ করে।" 

অন্য এক হাদীসে আছে : "একটি গোষ্টির মরে যাওয়া একজন জ্ঞাণী ব্যক্তির মরেযাওয়া অপেক্ষা সহজতর।"

রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "মানুষ সর্ণ ও রৌপ্যের খনির মত খনি বিশেষ। অতএব যারা যাহেলিয়াতের যুগে শ্রেষ্ঠ ছিল, তারা ইসলাম যুগেও শ্রেষ্ট, যদি তারা দ্বীনের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়।"

এক হাদীসে আছে : কিয়ামতের দিন জ্ঞানীদের লেখার কালি শহীদের রক্তের সাথে ওজন করা হবে।"

আরো আছে,- "আমার উম্মতের যে ব্যক্তি চল্লিশটি হাদীস মুখস্ত করবে, সে কেয়ামতেরদিন ফেকাবিদ ও জ্ঞানীরূপে আল্লাহ্ তা'আলার সাক্ষাত লাভে ধণ্য হবে।

অন্যত্র আছে : "যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার দ্বীন সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে দুঃখ থেকে বাচাবেন। এবং তাকে ধারণাতীত জায়গা থেকে জীবনোপকরন সরবরাহ করবেন।"

আরো বলা হয়েছে : "আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর প্রতি এই মর্মে ওহী পাঠাইলেন, "হে ইব্রাহীম ! আমি মহা জ্ঞানী এবং প্রত্যেক জ্ঞানীকে পছন্দ করি।"

আরো আছে, "আমার উম্মতের মধ্যে দুই শ্রেণীর লোক রয়েছে, যারা ঠিক হয়ে গেলে তার অনুসারী সকল মানুষ ঠিক হয়ে যায় এবং তারা বিগড়ে গেলে সকল মানুষ বিগড়ে যায়। তাদের এক শ্রেণী হচ্ছে শাসক এবং অপর শ্রেণী হচ্ছে ফেকাহবিদ। অর্থাৎ দ্বীনি এলমে সমৃদ্ধ ব্যক্তিবর্গ।"

অন্য হাদীসে আছে : "আল্লাহ'র নৈকট্যশালী করে এমন জ্ঞান বেশী পরিমানে না থাকার দিন যদি আমার উপর আসে, তবে সেদিনের সূর্যোদয় যেন আমার ভাগ্যে না জোটে।"

এবাদত ও শাহাদতের উপর জ্ঞাণীকে শ্রেষ্ঠত্বদান প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "জ্ঞাণী ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব এবাদতকারীর উপর এমনি, যেমন আমার শ্রেষ্ঠত্ব সাহাবীদের উপর।"

লক্ষ্যণীয়, এ হাদীসে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এলেমকে কেমন করে নবুয়তের স্থরে রেখেছেন এবং জ্ঞানহীন কর্মের মর্তবা কেমন করে হ্রাস করেছেন। অথচ এবাদতকারী সদাসর্বদা যে এবাদত করে, তার জ্ঞান সে অবশ্যই রাখে। এ জ্ঞান না হলে এবাদত হবেনা।

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "আলেম ব্যক্তির শ্রে্ঠত্ব এবাদত কারীর উপর তেমনি, যেমন চতুর্দশীর চাদের শ্রেষ্ঠত্ব তারকারাজির উপর হয়ে থাকে।"

তিনি আরো বলেছেন : "কেয়ামতেরদিন তিন শ্রেণীর লোক সুপারিশ করবে - পয়গম্বরগণ, অতঃপর জ্ঞানীলোকগণ, অতঃপর শহীদগণ।" এ হাদীস দ্বারা জ্ঞানের এমন মাহাত্ম্য প্রমানিত হয় যে, এটা নবুয়তের পরে এবং শাহাদতের অগ্রে। অথচ শাহাদতের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বহু রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে।

রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো ইরশাদ করেন ; "আল্লাহ্ তা'আলার এবাদত কোন কিছুর মাধ্যমে ততটুকু সমৃদ্ধ হয়না, যতটুকু দ্বীনের জ্ঞানের মাধ্যমে হয়। একজন দ্বীনের জ্ঞানী ব্যক্তি শয়তানের জন্য হাজার এবাদতকারী অপেক্ষা কঠোর হয়ে থাকে। 

প্রত্যেক বস্তুর একটি স্তম্ভ আছে। এ দ্বীনের স্তম্ভ হচ্ছে ফেকাহ্ (দ্বীনি জ্ঞান)।" আরো বলা হয়েছে : ঈমানদার আলেম ঈমানদার আবেদ অপেক্ষা সত্তরগুণ শ্রেষ্ঠ।"

অন্য এক হাদীসে আছে : "তোমরা এমন যুগে রয়েছ, যখন জ্ঞানী ব্যক্তির স়ংখ্যা অনেক এবং বক্তার সংখ্যা কম। ভিক্ষুকের সংখ্য অল্প এবং দাতার সংখ্যা অধিক। এমন যুগে জ্ঞান লাভ করা অপেক্ষা আমল করা উত্তম। 

অতি সত্বর এমন যুগ আসবে, যখন জ্ঞানীর সংখ্যা হ্রাস পাবে এবং বক্তা হবে অধিক। দাতা কম হবে এবং ভিক্ষুক বেশী হবে। তখন জ্ঞান অর্জন হবে আমল অপেক্ষা উত্তম।"

রসূল।(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো ইরশাদ করেন : জ্ঞানী ব্যক্তি ও এবাদতকারীর মধ্যে একশ স্তরের ব্যাবধান রয়েছে। প্রত্যেক দু'স্থরের মাঝখানে এতটুকু দূরত্ব রয়েছে যতটুকু একটি দ্রুতগামী ঘোড়া সত্তর বছরে অতিক্রম করতে পারবে।"

এক হাদীসে বর্ণিত আছে, সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন : 'ইয়া রসুলআল্লাহ্,(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম): কোন আমলটি উত্তম?" তিনি বললেন : "আল্লাহ্ তা'আলার ব্যপারে জ্ঞান।" 
সাহাবীগণ আরজ করলেন : আমরা উত্তম আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছি। তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আবার বললেন "আল্লাহ্ তা'আলার ব্যপারে জ্ঞান" 
আবার বলা হল, আমরা আমল সম্পর্কে প্রশ্ন করছি, আপনি এলেম সম্পর্কে বলছেন! তিনি বললেন "এলেমের সমন্বয়ে অল্প আমল উপকারী হয় এবং মূর্খতার সমন্বয়ে অধিক আমলও নিষ্ফল হয়ে যায়।"

এক হাদিসে আছে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে উঠাবেন। অতপর আলেমদেরকে উঠাবেন এবং তাদেরকে বলবেন, "হে জ্ঞানীগণ ! আমি তোমাদের মধ্যে যে জ্ঞান রেখেছিলাম, তা তোমাদেরকে কিছু জেনেই রেখেছিলাম।আমি তোমাদের মধ্যে আমার জ্ঞান এইজন্য রাখিনি যে, তোমাদেরকে শাস্তি দেব। যাও আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করলাম" আল্লাহ তা'আলার কাছে আমরাও এমনি আনজাম কামনা করি।

পরবর্তী পর্ব

জ্ঞান জ্ঞানার্জন (১) কোরআন মজীদে জ্ঞানের মাহাত্ম সম্পর্কিত আয়াতসমুহ



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কোরআন মজীদে জ্ঞানের মাহাত্ম সম্পর্কিত আয়াতসমুহ —

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, –
"ফেরেশতা ও মধ্যপন্থী আলেমগণ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, আল্লাহ ছারা কোন উপাস্য নেই।" এই আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা প্রথম পর্যায়ে নিজের সত্তা, দ্বিতীয় পর্যায়ে ফেরেস্তাকুল এবং তৃতীয় পর্যায়ে জ্ঞানীদের কথা উল্লেখ করেছেন। জ্ঞানের শ্রেষ্টত্ব, মাহাত্ম্য ও মৌলিকতা বুঝার জন্য এতটুকুই যতেষ্ট।

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
আল্লাহ আরো বলেন,- "যারা বিশ্বাসী এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ্ তা'আলা তাদের মর্তবা অনেক উচু করে দেন"।

হজরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন - সাধারণ মুমিনদের মর্তবা অপেক্ষা জ্ঞানী মুমিনদের মর্তবা সাতশ স্থর বেশী হবে এবং প্রত্যেক দু'স্থরের দূরত্ব হবে পাচ'শ বছরের সমান।

আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন, – "জিজ্ঞেস করুন, যারা জ্ঞানী এবং জ্ঞানহীন, তারা কি সমান হতে পারে?"

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"বলুন,আল্লাহ এবং কিতাবের জ্ঞানে জ্ঞানীরা আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্যদাতা রূপে যতেষ্ট।"

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"যার কাছে কিতাবের জ্ঞান ছিল, সে বলল: আমি তাকে এনে দিচ্ছি।" এতে ব্যক্ত করা হয়েছে সে লোকটি জ্ঞানের বলেই রাণী বিলকিসের সিংহাসন এনে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"যারা জ্ঞানী ছিল, তারা বলল : তোমাদের ধ্বংশ হোক, আল্লাহ প্রদত্ত কল্যাণই বিশ্বাসী ও সৎকর্মীর জন্য উত্তম।"
এতে বলা হয়েছে, পরকালের মাহাত্ম্য শিক্ষার মাধ্যমে জানা যায়।

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"আমি এসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্য বর্ননা করি। এগুলি কেবল তারাই বুঝে, যারা জ্ঞাণী।"

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"যদি তারা বিষয়টি রাসুলের কাছে এবং গণ্যমান্যদের কাছে উপস্থাপন করত, তবে তাদের মধ্যে যারা জ্ঞানান্বেষী, তারা জেনে নিতে পারত।"
এখানে আল্লাহ্ তা'আলা পারষ্পরিক ব্যপারাদিতে তাঁর নিজের বিধান শিক্ষিতদের ইস্তেহাদের উপর ন্যস্ত করেছেন। আল্লাহর বিধান জানার ব্যাপারে তাদের মর্তবাকে পয়গম্বরগণের মর্তবার সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন।

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"হে বনী আদম ! আমি তোমাদের প্রতি নাযিল করেছি পোষাক, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে। আর নাযিল করেছি পশম এবং পরহেযগারীসুলভ পোষাক, এটা সর্বোত্তম।"
এ আয়াতে তফসীরে কেউ কেউ বলেন: এখানে পোষাকের অর্থ শিক্ষা, পশমের অর্থ বিশ্বাস এবং পরহেযগারীসুলভ পোষাক বলে লজ্জা বুঝানো হয়েছে।

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"আমি তোমাদের কাছে কিতাব পৌছে দিয়েছি,যা জ্ঞান সহকারে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেছি।"

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"আমি সজ্ঞানে তাদের সকল অবস্থা বর্ননা করব।"

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"বরং এগুলু কোরআনের সুস্পষ্ট আয়াত, যা জ্ঞানপ্রাপ্তদের বক্ষে গচ্ছিত।

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে বর্ননা শিক্ষা দিয়েছেন।" এ বিষয়টি অনুগ্রহ প্রকাশের স্থলে বর্ণিত হয়েছে।

পরবর্তী পর্ব —

শনিবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৩

মহব্বত (পর্ব- ১৫) আশেকগণের কাহিনী

 

মহব্বত (পর্ব- ১৫)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আশেকগণের কাহিনী 
জনৈক আরেফ (আল্লাহভক্ত লোক) বলতেন : যখন তুমি আমাকে দেখে ফেলেছ, তখন তা চল্লিগ্ন জনকে দেখার সমান হয়ে গেছে। কেননা, আমি চল্লিশ জন আবদালকে দেখেছি এবং তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে একটা না একটা চরিত্র আহরণ করেছি। এই বুযুর্গকে কেউ প্রশ্ন করল : আমরা শুনেছি, আপনি খিযির (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করেন। তিনি হেসে বললেন : যে খিযিরকে দেখে, তার কোন কৃতিত্ব নেই ; বরং কৃতিত্ব সেই ব্যক্তির, যাকে খিযির দেখতে চায় কিন্তু সে আত্মগোপন করে। 
হযরত আবু ইয়াযীদ বুস্তামী (রহঃ) -এর খেদমতে একবার আরয করা হল : আপনি আল্লাহ তা'আলাকে যে প্রত্যক্ষ করেন তার কিছু অবস্থা বর্ণনা করুন। তিনি সজোরে চিৎকার দিয়ে বললেন : এটা জানা তোমাদের অবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। লোকেরা আরয করল : আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে আপনি নিজের নফসের বিরুদ্ধে যে কঠোরতর মোযাজাদা করেছেন, তা আমাদেরকে বলে দিন। তিনি বললেন : তোমাদেরকে এ সম্পর্কে ওয়াকিফ্‌হাল করাও বৈধ নয়। তারা আরয করল : তা হলে সাধনার শুরুতে আপনি যা যা করতেন, তাই বলুন। তিনি বললেন : প্রথমে আমি আমার নফসকে আল্লাহ তা'আলার দিকে আহবান করলাম। সে অবাধ্যতা করল। আমি তাকে কসম দিলাম যে, এক বছর পানি পান করব না এবং নিদ্রার স্বাদ আস্বাদন করব না। অতঃপর নফস তা পূর্ণ করেছে।
ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ায বর্ণনা করেন— আমি আবু ইয়াযীদকে এশার নামাযের পর সোবহে সাদেক পর্যন্ত এভাবে বসে থাকতে দেখেছি, হাটু মাটিতে রাখা, আবার উপরে পায়ের পাতা ও গোড়ালি মাটি থেকে উত্তোলিত। চিবুক বুকের সাথে সংযুক্ত এবং উভয় চক্ষু অনিমেষ উন্মীলিত। যখন সকাল নিকটবর্তী হল, তখন তিনি একটি সেজদা করে আবার বসলেন এবং আল্লাহর দরবারে আরয করলেন : ইলাহী ! কিছু লোক তোমার কাছে প্রার্থনা করেছে এবং তুমি তাদেরকে পানিতে ও বায়ুতে চলার ক্ষমতা দান করেছ। তারা এতেই সন্তুষ্ট হয়েছে। আমি তোমার কাছে এসব বিষয় থেকে আশ্রয় চাই। আরও কিছু লোক তোমার কাছে আবেদন করেছে৷ তুমি তাদেরকে ভূ-পৃষ্ঠের দূরত্ব অতিক্রম করার ক্ষমতা দান করেছ। তারা এতেই রাযী হয়েছে। আমি এ থেকেও তোমার কাছে আশ্রয় চাই। এক সম্প্রদায়ের লোকেরা তোমার কাছে সওয়াল করলে তুমি তাদেরকে ভূ-পৃষ্ঠের ধন-ভাণ্ডার দিয়ে দিয়েছ। তারা এ নিয়েই খুশী হয়েছে। কিন্তু আমি তোমার কাছে এ থেকেও আশ্রয় চাই। এভাবে তিনি ওলীগণের বিশটিরও বেশী কারামতের কথা দোয়ার ভেতরে উল্লেখ করলেন। এরপর চোখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাতেই দেখলেন, ইয়াহইয়া দণ্ডায়মান। আমি আরয করলাম : খাদেম হাযির। তিনি বললেন : তুমি কখন থেকে এখানে দাঁড়িয়ে? আমি আরয করলাম : অনেকক্ষণ ধরে। অতঃপর তিনি চুপ করে রইলেন। আমি আরয করলাম : আমাকে আপনার কিছু হাল বলুন। তিনি বললেন : তোমার জন্যে যা উপযুক্ত তাই বলছি শুন। আল্লাহ তা'আলা আমাকে নিম্নের আকাশে দাখিল করলেন এবং নিম্নজগত ভ্রমণ করালেন। জান্নাত থেকে আরশ পর্যন্ত যা কিছু আকাশসমূহে ছিল, সবই আমাকে দেখিয়েছেন। এরপর আমাকে সামনে দাঁড় করিয়ে বললেন : তুমি যা যা দেখছ, এগুলোর মধ্যে যা চাইবে, আমি তাই তোমাকে দিয়ে দেব। আমি আরয করলাম : হে আল্লাহ, আমি এমন কোন বস্তু দেখিনি, যা ভাল মনে করে তোমার কাছে চাইতে পারি। আল্লাহ বললেন : তুমি আমার সাচ্চা বান্দা। তুমি ঠিক আমারই জন্যে আমার এবাদত কর। এছাড়া আরও অনেক কথা বললেন।
ইয়াহইয়া ইবনে মোয়ায বলেন : একথা শুনে আমি ভীত হয়ে পড়লাম এবং আরয করলাম : হুযুর, আপনি আল্লাহ তা'আলার কাছে তাঁর মারেফত প্রার্থনা করলেন না কেন? আপনাকে তো এই শাহানশাহের পক্ষ থেকে বলাই হয়েছিল, যা চাইবে, তা-ই পাবে। হযরত আবু ইয়াযীদ একটি চিৎকার দিলেন, অতঃপর বললেনঃ চুপ কর। আল্লাহ তা'আলার প্রতি আমার আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়ে গেল, আমাকে ছাড়া কেউ যেন তাঁকে না চিনে ! তাঁর মারেফত অন্যরা পাবে, এটা আমার কাছে ভাল মনে হয়নি।
বর্ণিত আছে, আবু তোরাব বখশী (রহঃ) জনৈক মুরীদকে নিয়ে গর্ব করতেন। তাকে কাছে জায়গা দিতেন এবং তার খেদমত করতেন। মুরীদ এবাদতে মশগুল থাকত। একদিন আবু তোরাব তাকে বললেন : আবু ইয়াযীদ বোস্তামীর সংসর্গ অবলম্বন কর। মুরীদ বলল : আমার তার প্রয়োজন নেই। আবু তোরাব অধিক পীড়াপীড়ি করলে মুরীদ জোশের মুখে বলে ফেলল : আমি আবু ইয়াযীদকে দিয়ে কি করব? আমি আল্লাহ তা'আলাকে দেখেছি। তিনি আমাকে আবু ইয়াযীদকে দেখার মুখাপেক্ষী রাখেননি। আবু তোরাব বলেন : এ কথা শুনে আমারও মন বিগড়ে গেল। আমি বেসামাল হয়ে বলে উঠলাম : আল্লাহকে দেখে অহংকারী হয়ে যাও? যদি আবু ইয়াযীদকে একবার দেখ, তবে আল্লাহ তা'আলাকে সত্তর বার দেখার চেয়ে অধিক উপকারী হবে। মুরীদ অত্যন্ত হয়রান হয়ে বলল : তা কেমন করে হতে পারে? আবু তোরাব বললেন— তুমি আল্লাহ তা'আলাকে নিজের কাছে দেখলে তিনি তোমার সহনশক্তির পরিমাণ অনুযায়ী আত্মপ্রকাশ করেন, আর আবু ইয়াযীদকে আল্লাহ তা'আলার কাছে দেখলে আল্লাহ তা'আলা আবু ইয়াযীদের সহনশক্তির পরিমাণ অনুযায়ী আত্মপ্রকাশ করবেন।
মুরীদ একথার তত্ত্ব উপলব্ধি করার পর বলল : আমাকে তার কাছে নিয়ে চলুন। আবু তোরাব বলেন : আমরা গিয়ে একটি টিলার উপর দাঁড়ালাম এই অপেক্ষায় যে, আবু ইয়াযীদ জঙ্গল থেকে বের হবেন। কেননা, তিনি তখন হিংস্র প্রাণীদের জঙ্গলে বসবাস করতেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবু ইয়াযীদ একটি পালকযুক্ত পরিধেয় কোমরে বেঁধে বের হলেন। আমি মুরীদকে বললাম : ইনি আবু ইয়াযীদ। তাঁকে দেখা মাত্রই সে চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এরপর আমরা তাকে নাড়া দিয়ে মৃত পেলাম। আমরা সকলে মিলে তাকে দাফন করলাম। আমি আবু ইয়াযীদের খেদমতে আরয করলাম : হুযুর, আপনার দিকে দেখার কারণে লোকটি মরে গেল। তিনি বললেন : তা নয় ; বরং তোমার মুরীদ ছিল সাচ্চা। তার অন্তরে একটি রহস্য লুকিয়ে ছিল। আমাকে দেখা মাত্রই তার মনের সব রহস্য খুলে গেল। দুর্বল মুরীদের মকামে ছিল বলে সে তা সহ্য করতে পারল না। মারা গেল।
যখন হাবশী সৈন্যরা বসরায় প্রবেশ করে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং ধন-সম্পত্তি লুটপাট করে, তখন হযরত সহলের মুরীদরা তাঁর কাছে সমবেত হয়ে আরয করে, আপনি এদেরকে হটিয়ে দেয়ার জন্যে আল্লাহ তা'আলার কাছে দোয়া করুন। হযরত সহল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন : এ শহরে আল্লাহ তা'আলার কিছু বান্দা আছেন, যারা যালেমের বিরুদ্ধে বদদোয়া করলে সকাল পর্যন্ত ভূপৃষ্ঠে কোন যালেমের অস্তিত্ব থাকবে না। একই রাত্রিতে সব খতম হয়ে যাবে। কিন্তু তারা বদদোয়া করেন না। সকলেই সমস্বরে প্রশ্ন করল : কেন ? তিনি বললেন : কারণ, যে বিষয়কে আল্লাহ তা'আলা ভাল মনে করেন না, সেটা তাদের কাছেও ভাল লাগে না।
হযরত বিশর (রহঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল : আপনি এই মর্তবায় কেমন করে পৌছলেন? তিনি বললেন : আমি আল্লাহ তা'আলার কাছে দোয়া করতাম যাতে তিনি আমার অবস্থা গোপন রাখেন এবং কারও কাছে প্রকাশ না করেন। বর্ণিত আছে, তিনি হযরত খিযির (আঃ)-কে দেখেছেন এবং তাঁকে বলেছেন— আপনি আমার জন্যে দোয়া করুন। খিযির (আঃ) বললেন : আল্লাহ তা'আলা নিজের আনুগত্য তোমার জন্যে সহজ করুন। তিনি বললেন : আরও কিছু দোয়া করুন। খিযির (আঃ) বললেন : আল্লাহ তা'আলা এই আনুগত্যকে মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখুন।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : হযরত খিযিরকে দেখার জন্যে আমার মনে প্রবল আগ্রহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এজন্যে আমি একবার আল্লাহ তা'আলার কাছে দোয়া করলাম । আল্লাহ পাক আমার দোয়া কবুল করলেন এবং তাঁর সাক্ষাত আমার নসীব হল। আমি তখন অন্য সব কথা ভুলে গিয়ে কেবল একথাই বললাম : হে আবুল আব্বাস ! আপনি আমাকে এমন দোয়া শিখিয়ে দিন, যা পাঠ করলে আমি মানুষের মন থেকে উধাও হয়ে যাই। তাদের অন্তরে আমার কোন মান না থাকে এবং আমার ধর্মপরায়ণতা কেউ জানতে না পারে। তিনি বললেন : এই দোয়া পাঠ করবে– “হে আল্লাহ, আমার উপর তোমার পুরু পর্দা ফেলে দাও। আমার উপর তোমার যবনিকা নামিয়ে দাও। আমাকে রাখ গোপন দোষের মধ্যে এবং আমাকে মানুষের অন্তর থেকে লুকিয়ে রাখ। এরপর হযরত খিযির (আঃ) অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি তাঁকে পুনরায় কখনও দেখিনি এবং মনে দেখার আগ্রহও সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু তাঁর শিখানো দোয়া সর্বদা পাঠ করতে থাকলাম। তাঁরই বর্ণনা অনুযায়ী এই দোয়ার প্রভাব এমনভাবে প্রতিফলিত হল যে, মানুষের মধ্যে তাঁর অপমান, লাঞ্ছনা ও মূল্যহীনতা সীমা ছাড়িয়ে যায়। যিম্মী তথা অমুসলিম আশ্রিতরাও তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত এবং ধরে নিয়ে বিনা মজুরীতে নিজেদের বোঝা তার মাথায় চাপিয়ে দিত। তিনি এসব আচরণ নীরবে সহ্য করতেন। মোটকথা, তাঁর অন্তরে সুখ ও সংশোধন লাঞ্ছিত ও অজ্ঞাত থাকার মধ্যে নিহিত ছিল। আল্লাহ তা'আলার ওলীদের এই ছিল অবস্থা। তাদেরকে অজ্ঞাতদের মধ্যেই খোঁজ করা উচিত। কিন্তু বিভ্রান্ত মানুষ তাদেরকে এমন লোকদের মধ্যে তালাশ করে, যারা পরিধান করে নানা রকম কাপড়ে তালি দেওয়া পোশাক, কিন্তু জ্ঞান-গরিমা, পরহেযগারী এবং প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক দিয়ে মানুষের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ।
অথচ আল্লাহ তা'আলা তাঁর ওলীগণকে গোপন রাখাই পছন্দ করেন। হাদীসে কুদসীতে এরশাদ হয়েছে-
>“আমার আওলিয়া আমার কা’বার নীচে থাকে। আমাকে ছাড়া কেউ তাদেরকে চিনে না।”
সারকথা, যারা অহংকার ও আত্মম্ভরিতা করে, তাদের অন্তর ওলীত্বের সুগন্ধি থেকে অধিকতর দূরে থাকে। আর অধিকতর নিকটবর্তী তাদের অন্তর, যারা অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েও বুঝে না যে, অপমান ও লাঞ্ছনা কি? যেমন, গোলাম অপমান বুঝে না যখন তার প্রভু তার উপরের আসনে বসে। সুতরাং আমাদের মধ্যে যদি তাদের অন্তর এমন না থাকে এবং আমরা এমন আত্মা থেকে যদি বঞ্চিত হই, তবে যারা এর যোগ্য, এসব কারামতের সম্ভাব্যতায় বিশ্বাস না রাখা আমাদের উচিত নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলার ওলী হওয়া যদি কারো পক্ষে সম্ভব না হয়, তবে অন্তত ওলীদের প্রতি মহব্বত ও ঈমান রাখা তো তার জন্যে সম্ভব। হয়তো বা এর দৌলতেই কিয়ামতের দিন ওলীদের সাথে তার হাশর হয়ে যাবে।
প্রসিদ্ধ হাদীসে আছে–
>”মানুষ তার সাথেই থাকবে, যাকে সে মহব্বত করে।”
অনুনয় ও বিনয় অধিকতর উপকারী। তার প্রমাণ হযরত ঈসা (আঃ)-এর উক্তি। তিনি বনী ইসরাঈলকে প্রশ্ন করেন :
শস্যকণা কোথায় গজায়?
তারা আরয করল : মাটিতে।
তিনি বললেন : আমি সত্য বলছি, হেকমত ও প্রজ্ঞাও সে অন্তরেই গজিয়ে উঠে, যা মাটির মত হয়।
আল্লাহ তা'আলার ওলীত্ব অন্বেষণকারী বুযুর্গগণ নিজের নফসকে লাঞ্ছনার চরম পর্যায়ে পৌছিয়েই এই মর্তবা লাভ করেছেন।
বর্ণিত আছে, হযরত জুনায়দ বাগদাদী (রহঃ)-এর ওস্তাদ ইবনে করবনীকে এক ব্যক্তি ভোজের দাওয়াত দিল। তিনি তার ঘরের দরজায় পৌঁছলে তাঁকে তাড়িয়ে দিল। কিছুদূর চলে গেলে লোকটি তাঁকে আবার ডাকল। তিনি এলে আবার তাঁকে তাড়িয়ে দেয়া হল। এভাবে তিনবার ডাকল এবং তাড়িয়ে দিল। চতুর্থবার ডাকার পর যখন তিনি এলেন, তখন তাঁকে ঘরে নিয়ে গেল এবং বলল : মাফ করবেন, আমি আপনার বিনয় পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যেই আপনাকে বারবার তাড়িয়ে দিয়েছি। তিনি বললেন : আমি আমার নসকে বিশ বছর ধরে লাঞ্ছনায় অভ্যস্ত করেছি। ফলে, সে এখন কুকুরের মত হয়ে গেছে। তাড়িয়ে দিলে চলে যায়। আবার একটি হাড্ডি ফেলে দিলে চলে আসে। যদি তুমি আমাকে পঞ্চাশ বারও তাড়িয়ে দিতে এবং ডাকতে, তবে আমি চলে আসতাম।
এক রেওয়ায়েত অনুযায়ী এই ইবনে করবনীই বলেন : আমি এক মহল্লায় বাস করতাম। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই সাধুতায় খ্যাত হয়ে গেলাম। এতে আমার মন অশান্ত হয়ে উঠল। এক দিন আমি এক হাম্মামে (গোসলখানায়) গেলে সেখান থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে এক ব্যক্তির মূল্যবান কাপড় নিয়ে এলাম। অতঃপর সে দামী কাপড় পরে তার উপর আমার তালিযুক্ত নানা রঙের ছেঁড়া কাপড় পরে নিলাম। রাস্তায় বের হতেই লোকেরা আমাকে পাকড়াও করল এবং আমার ছেঁড়াবস্ত্র খুলে সেই দামী পোশাক নিয়ে নিল। শুধু তাই নয়, তারা আমাকে প্রচুর কিলঘুষিও মারল। এরপর থেকে আমি হাম্মাম চোর বলে খ্যাত হয়ে গেলাম এবং আমার অশান্ত মনে শান্তি ফিরে এল। এখন চিন্তা করা উচিত, বুযুর্গগণ কেমন সাধনার স্তর অতিক্রম করতেন, যাতে আল্লাহ তা'আলা তাদের মনোযোগ মানুষের দিক থেকে এমনকি, নিজের সত্তার দিক থেকেও ফিরিয়ে নেন। কেননা, যে ব্যক্তি নিজের নফসের দিকে লক্ষ্য রাখে, সে আল্লাহ তা'আলা থেকে আড়ালে থাকে এবং নফসের দিকে এই দৃষ্টিই তার জন্যে পর্দা হয়ে যায়।
বলা বাহুল্য, সর্বাধিক পর্দা হচ্ছে নিজের নসকে নিয়ে মশগুল থাকা। সেমতে বর্ণিত আছে, বুস্তামের জনৈক প্রভাবশালী ব্যক্তি হযরত আবু ইয়াযীদ বুস্তামীর মজলিসে সর্বক্ষণ উপস্থিত থাকত। একদিন সে আরয করল : আমি ত্রিশ বছর ধরে অবিরাম রোযা রাখছি এবং রাত জেগে নফল এবাদত করছি। কিন্তু এত সাধনা সত্ত্বেও আপনি যে জ্ঞান বর্ণনা করেন, তা নিজের অন্তরে বিদ্যমান পাই না। অথচ আমি এই জ্ঞানকে সত্য বলে বিশ্বাস করি এবং ভালবাসি। হযরত আবু ইয়াযীদ বললেন : ত্রিশ বছর কেন, যদি তুমি তিনশ' বছরও রোযা রাখ এবং রাত্রি জাগরণ কর, তবু এই জ্ঞানের কণা পরিমাণও পাবে না। লোকটি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন : কারণ এই যে, তুমি নিজের নফসের কারণে আল্লাহ তা'আলা থেকে আড়ালে আছ। লোকটি আরয করল : তাহলে এর প্রতিকার কি? তিনি বললেন : প্রতিকার আছে; কিন্তু তুমি তা কবুল করবে না। সে বলল : আপনি বলুন, যাতে আমি তা পালন করতে পারি। তিনি বললেন : এখনি নাপিতের কাছে গিয়ে মাথা ও দাড়ি মুণ্ডন কর। এই পোশাক খুলে কম্বলের লুঙ্গি পরিধান কর। ঘাড়ে আখরুটের একটি ঝুলি তুলে নাও। রাস্তায় গিয়ে নিজের চারপাশে লোকজনকে জড়ো কর। এরপর তাদেরকে বল : যে কেউ আমাকে একটি থাপ্পড় মারবে, আমি তাকে একটি আখরুট দেব। এমনিভাবে প্রত্যেক বাজারে যাও এবং যারা তোমার পরিচিত, তাদের কাছেও যাও এবং থাপ্পড় খেয়ে খেয়ে আখরুট বিলি কর। লোকটি বলল : সোবহানাল্লাহ, আপনি আমাকে এমন কথা বললেন ! তিনি বললেন : তোমার ‘সোবহানাল্লাহ’ বলা একটি শিরক। কারণ, তুমি নিজের নফসকে বড় জেনে “সোবহানাল্লাহ” বলেছ। আল্লাহ তা'আলার তাযীমের জন্যে বলনি। লোকটি বলল : আমি এটা করব না। অন্য কিছু বলুন। তিনি বললেন : সর্বাগ্রে এটাই করা দরকার। সে বলল : এটা করার সাধ্য আমার নেই। হযরত আবু ইয়াযীদ বললেন : আমি তো আগেই বলেছিলাম যে, তুমি প্রতিকার কবুল করবে না। হযরত আবু ইয়াযীদ বর্ণিত এই প্রতিকারটি সে ব্যক্তির জন্যে, যে নিজের নফসের দিকে লক্ষ্য রাখে এবং মানুষের দৃষ্টি নিজের দিকে কামনা করে ! এই চিকিৎসা ছাড়া এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার অন্য কোন উপায় নেই। অতএব, যে ব্যক্তি এই চিকিৎসার শক্তি রাখে না, তার কমপক্ষে এর কার্যকারিতায় বিশ্বাস রাখা উচিত। যার মধ্যে এই বিশ্বাসটুকুও নেই, তার দুর্ভোগ নিশ্চিত। হাদীস শরীফে আছে -
>”বান্দার ঈমান কামেল হয় না, যে পর্যন্ত তার কাছে কোন বস্তুর স্বল্পতা আধিক্যের তুলনায় অধিক প্রিয় না হয় এবং যে পর্যন্ত খ্যাত না হওয়া তার কাছে খ্যাত হওয়ার তুলনায় অধিক পছন্দনীয় না হয়।”
আরও আছে–
>”তিনটি বিষয় যার মধ্যে পাওয়া যায়, তার ঈমান কামেল হয়ে যায়৷ এক, আল্লাহ তা'আলার কাজে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় না করা। দুই, লোক দেখানোর জন্যে কোন আমল না করা। তিন, সামনে দু'টি বিষয় উপস্থিত হলে— একটি দুনিয়ার ও একটি আখেরাতের- আখেরাতের বিষয়টি বেছে নেয়া।”
অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে

"বান্দার ঈমান কামেল হয় না যে পর্যন্ত তার মধ্যে তিনটি স্বভাব না পাওয়া যায় । এক, যখন সে ক্রুদ্ধ হয়, তখন তার ক্রোধ তাকে হক থেকে সরিয়ে দেয় না। দুই, যখন সে খুশী হয়, তখন খুশী তাকে অসত্যের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় না। তিন, যখন সে শক্তিশালী হয়, তখন যা তার নয়, সে তা গ্রহণ করে না। এগুলো হচ্ছে মুমিন হওয়ার শর্ত, যা রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বর্ণনা করেছেন । অতএব, সে ব্যক্তির জন্যে আশ্চর্য লাগে, যে ধার্মিকতার দাবী করে অথচ এসব শর্ত থেকে কণা পরিমাণও নিজের মধ্যে পায় না। এছাড়া ঈমানের পর যে সমস্ত স্তর অর্জিত হয়, সেগুলো সে অস্বীকারও করে ।
(সমাপ্ত)

প্রথম পর্বের লিংক


বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...