রবিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১১) সূফীগণের মতে ফরযে আইন হওয়ার উদ্দেশ্য



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১১)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সূফীগণের মতে ফরযে আইন হওয়ার উদ্দেশ্য
সূফীগণ বলেছেন, ফরযে আইন শিক্ষার উদ্দেশ্য শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং ফেরেশতাদের ইলহাম জানা। তাদের এ উক্তিও সত্য, কিন্তু সে ব্যক্তির জন্যে, যে এতে লিপ্ত হয়। মানুষ যেহেতু প্রায়ই অনিষ্টের কারণাদি তথা রিয়া ও হিংসা থেকে মুক্ত থাকে না, তাই তিনটি ধ্বংসাত্মক বিষয়ের মধ্য থেকে যার প্রতি সে নিজেকে মুখাপেক্ষী দেখে, তা জানা তার জন্যে অপরিহার্য। এটা জানা অবশ্যই ওয়াজেব। কারণ, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : তিনটি বিষয় মারাত্মক (১) কৃপণতা, যার আনুগত্য করা হয়, (২) কুপ্রবৃত্তি, যা মেনে চলা হয় এবং (৩) আত্মম্ভরিতা। কোন মানুষ এগুলো থেকে মুক্ত নয়। পরে আমরা আড়ম্বর, আত্মপ্রীতি ইত্যাদি মনের যেসব অবস্থা উল্লেখ করব, সে এ তিনটি মারাত্মক বিষয়েরই অনুসারী, যা দূর করা ফরযে আইন। এই মারাত্মক বিষয়সমূহের সংজ্ঞা, কারণাদি, লক্ষণ ও প্রতিকার না জানা পর্যন্ত এগুলো দূর করা সম্ভব নয়। কেননা, অনিষ্ট সম্পর্কে না জানার কারণেই মানুষ অনিষ্টে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এর প্রতিকার হচ্ছে বিপরীত বিষয় দ্বারা তার মোকাবিলা করা। পরবর্তীতে বিনাশন পর্বে আমরা যা লিপিবদ্ধ করেছি, তার অধিকাংশই ফরযে আইন। সব মানুষ অনর্থক বিষয়াদিতে মশগুল হওয়ার দিক দিয়ে সেগুলো বর্জন করে রেখেছে।
নও-মুসলিম ব্যক্তিকে বেহেশত, দোযখ, পুনরুজ্জীবন ও কেয়ামতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের বিষয় দ্রুত শিক্ষা দিতে হবে যাতে সে এগুলো সত্য বলে বিশ্বাস করে। এ বিষয়টিও দুটি কলেমায়ে শাহাদতের পরিশিষ্ট। কারণ, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর রেসালতে বিশ্বাস স্থাপন করার পর তার আনীত বিষয়সমূহও বুঝা দরকার। তা এই যে, যেব্যক্তি আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করে, তার জন্যে জান্নাত এবং যে তাঁদের নাফরমানী করে তার জন্য জাহান্নাম। সত্য মাযহাব এটাই এবং এ থেকে আরও জানা গেল, প্রত্যেক ব্যক্তির দিবারাত্রির চিন্তাধারার মধ্যে এবাদত ও আদান-প্রদানের কিছু নতুন নতুন ঘটনা ঘটতে থাকে। এ কারণেই তার সামনে যে অভিনব ঘটনা ঘটে, তা জিজ্ঞাসা করা জরুরী এবং যে ঘটনা সত্বর ঘটবে বলে আশা করা যায়, অবিলম্বে তার জ্ঞান লাভ করাও জরুরী।

সুতরাং জানা গেল, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সে আমলের এলেমই বুঝিয়েছেন, যার ওয়াজেব হওয়া সুস্পষ্ট, অন্য কোন এলেম বুঝাননি। এ থেকে পরিষ্কার বুঝা গেল, আমল ওয়াজেব হওয়ার সময় ক্রমান্বয়ে এলেম ওয়াজেব হতে থাকবে।(আল্লাহ্ তা’আলাই ভাল জানেন)

পরবর্তী পর্ব
যে জ্ঞান ফরযে কেফায়া

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১০) যার জন্য জ্ঞান ফরযে আইন



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১০)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যার জন্য জ্ঞান ফরযে আইন --
বুদ্ধিমান প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে তিন প্রকার বিষয়ের নির্দেশ দেয়া হয়- (১) বিশ্বাস, (২) বিশ্বাস অনুযায়ী আমল করা ও (৩) না করা। এখন ধর, কোন ব্যক্তি সূর্যোদয় ও দ্বিপ্রহরের মধ্যবর্তী সময়ে বালেগ হল। এখন তার উপর প্রথমতঃ ওয়াজেব হবে শাহাদতের উভয় কলেমা অর্থসহ শিক্ষা করা। অর্থাৎ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ" কলেমাটি শেখা ও তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা ওয়াজেব হবে। এ সম্পর্কে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে যুক্তি-প্রমাণ লিপিবদ্ধ করে বিশ্বাস করা ওয়াজেব হবে না; বরং নিঃসন্দেহে ও দ্বিধাহীন চিত্তে কলেমাদ্বয় সত্য বলে বিশ্বাস করাই তার পক্ষে যথেষ্ট হবে। এতটুকু জ্ঞান মাঝে মাঝে অনুসরণ ও শরণের মাধ্যমেও অর্জিত হয়ে যায়। আলোচনা ও বিতর্কের প্রয়োজন হয় না। আলোচনা ও যুক্তি-প্রমাণ ওয়াজেব না হওয়ার কারণ, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরবের লোকদের কাছ থেকে যুক্তি প্রমাণ ছাড়াই কেবল সত্য বলে বিশ্বাস ও স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেছেন।
মোট কথা, উপরোক্ত বিষয়টুকু জেনে নিলেই তখনকার ওয়াজেব আদায় হয়ে যাবে। তখন কলেমাদ্বয় শিক্ষা করা ও অর্থ হৃদয়ঙ্গম করাই তার জন্যে ফরযে আইন ছিল। এছাড়া অন্য কোন কিছু তার জন্যে জরুরী ছিল না। কারণ, সে যদি এই কলেমাদ্বয় সত্য বলে বিশ্বাস করার পর মারা যায়, তবে নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা'আলার অনুগত বান্দারূপেই মরবে, নাফরমানরূপে নয়।
কলেমার পর অন্য বিষয়সমূহ সাময়িক কারণাদির ভিত্তিতে তার উপর ওয়াজেব হয়। এগুলো প্রত্যেকের জন্য অপরিহার্য নয়। কেউ কেউ এগুলো থেকে আলাদাও থাকতে পারে। এসব সাময়িক কারণ কর্ম ও বিশ্বাসের মধ্যে দেখা দেয়। প্রথমটির উদাহরণ এই- মনে কর, উপরোক্ত ব্যক্তি সূর্যোদয় ও দ্বিপ্রহরের মধ্যবর্তী সময় থেকে যোহর পর্যন্ত জীবিত রইল। যোহরের সময় এলে তার উপর নতুন ওয়াজেব হবে ওযু ও নামাযের মাসআলা শিক্ষা করা। অতএব এ ব্যক্তি বালেগ হওয়ার সময় সুস্থ থাকলে যদি সে সূর্য ঢলে পড়ার সময় পর্যন্ত কিছু না শেখে এবং এ সময়ের পর শিখতে শুরু করলে ঠিক সময়ে সব শেখে আমল করতে না পারে, তবে বলা যায় যে, ব্যহ্যতঃ সে জীবিত থাকবে বিধায় সময়ের পূর্বেই শিক্ষা করা তার উপর ওয়াজেব। এ কথাও বলা যায়, জানা আমল করার জন্যে শর্ত। আমল ওয়াজেব হওয়ার পর সে আমল সম্পর্কে জানা ওয়াজেব হয়। সুতরাং প্রথম সময় থেকে শিক্ষা করা তার উপর ওয়াজেব নয়। অন্যান্য নামাযের বেলায়ও একথা প্রযোজ্য।
এর পর যদি এ ব্যক্তি রমযান পর্যন্ত জীবিত থাকে, তবে রমযানের কারণে রোযা শিক্ষা করা তার উপর নতুন ওয়াজেব হবে। অর্থাৎ, জানতে হবে যে, সোবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার সময়। এ সময়ে রোযার নিয়ত করা এবং পানাহার ও স্ত্রীসহবাস থেকে বিরত থাকা জরুরী।
এখন যদি তার কাছে অর্থ-সম্পদ আসে অথবা বালেগ হওয়ার সময়ই অর্থ সম্পদ থাকে, তবে যাকাতের পরিমাণ জানা তার জন্যে অপরিহার্য হবে। কিন্তু তখনই অপরিহার্য হবে না; বরং বালেগ হওয়ার সময় থেকে এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর অপরিহার্য হবে। যদি তার কাছে উট ব্যতীত অন্য কিছু না থাকে তবে কেবল উটের যাকাত জানাই জরুরী হবে। অন্যান্য মালের ক্ষেত্রে এরূপ বুঝা উচিত। যদি তার উপর হজ্জের মাস আসে, তবে হজ্জের মাসআলা তখনই জানা জরুরী নয়। কেননা, হজ্জ সমগ্র জীবৎকালের মধ্যে মাত্র একবার আদায় করতে হয়। তবে আলেমগণের উচিত তার সামর্থ্য থাকলে বলে দেয়া যে, জীবনে একবার হজ্জ করা সে ব্যক্তির উপর ফরয, যে পাথেয় ও সওয়ারীর মালিক। এতে সম্ভবতঃ সে সাবধানতা অবলম্বন জরুরী মনে করে দ্রুত হজ্জ আদায় করতে সচেষ্ট হবে। অতঃপর যখন সে হজ্জ করার ইচ্ছা করবে, তখন মাসআলা শিক্ষা করা তার উপর ওয়াজেব হবে। তবে কেবল হজ্জের আরকান ও ওয়াজেব বিষয়সমূহ শিক্ষা করা জরুরী হবে নফলসমূহ নয়। কারণ, যে কাজ করা নফল, তা শিক্ষা করাও নফল। মোট কথা, যেসব করণীয় কাজ ফরযে আইন, সেগুলো শিক্ষা করা ক্রমান্বয়ে এমনিভাবে ওয়াজেব হবে। বর্জনীয় কর্মের ক্ষেত্রেও যখন যেরূপ অবস্থা দেখা দেবে, সেভাবেই তা শিক্ষা করা ওয়াজেব। এ বিষয়টি মানুষের অবস্থা অনুযায়ী বিভিন্ন রূপ। উদাহরণতঃ যেসব কথাবার্তা বলা হারাম, সেগুলো জানা বোবার জন্যে ওয়াজেব নয়; অথবা অবৈধ দৃষ্টির মাসআলা জানা অন্ধের জন্যে জরুরী নয় কিংবা যারা জঙ্গলে বাস করে, তাদের জন্যে কোন্ কোন্ গৃহে বসা হারাম, তা জানা আবশ্যক নয়। মোট কথা, যদি জানা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এসব বিষয়ের প্রয়োজন হবে না, তবে সেগুলো শিক্ষা করা তার উপর ওয়াজেব নয় ; বরং যেসব বিষয়ে সে লিপ্ত, সেগুলো সম্পর্কে বলে দেয়া জরুরী।
উদাহরণতঃ যদি মুসলমান হওয়ার সময় রেশমী বস্ত্র পরিহিত থাকে অথবা অবৈধভাবে দখল করা যমীনে বসে থাকে কিংবা বেগানা নারীর প্রতি তাকিয়ে থাকে, তবে তাকে এসব বিষয় বর্জন করার কথা বলে দেয়া জরুরী । যেসব বিষয়ে সে লিপ্ত নয়; বরং অদূর ভবিষ্যতে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, যেমন পানাহারের বস্তু, সেগুলো শিক্ষা দেয়া ওয়াজেব। উদাহরণতঃ যদি কোন শহরে মদ্যপান ও শূকরের মাংস খাওয়ার প্রচলন থাকে, তবে তাকে এগুলো বর্জন করার কথা বলা জরুরী। যেসব বিষয় শিক্ষা করা ওয়াজেব, সেগুলো শেখানোও ওয়াজেব। বিশ্বাস এবং অন্তরের কর্মসমূহ জানাও আশংকা অনুযায়ী ওয়াজেব। যেমন, তার অন্তরে কলেমাদ্বয়ের অর্থ সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি হলে তার এমন বিষয় শেখা উচিত, যদ্বারা সন্দেহ দূর হয়ে যায়। যদি সে সন্দেহ করে এবং মরে যায়; মৃত্যুর সময় সে বিশ্বাস করেনি যে, আল্লাহ তা'আলার কালামে পাক অনন্ত, আল্লাহর দীদার সম্ভবপর, তার মধ্যে পরিবর্তনের অবকাশ নেই এবং এছাড়া অন্যান্য বিশ্বাসও পোষণ করেনি, তবে এরূপ ব্যক্তি সকলের মতানুযায়ী ইসলামের উপরই মরেছে। কিন্তু যেসব কুমন্ত্রণা বিশ্বাসের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে, সেগুলোর কতক স্বয়ং মানুষের মন থেকে। উদগত হয় এবং কতক পরিস্থিতি-পরিবেশের প্রভাব মনে উৎপন্ন হয়। যদি সে এমন শহরে বসবাস করে, যেখানে বেদআতী কথাবার্তার প্রচলন রয়েছে, তবে তাকে বালেগ হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে সত্য বিষয় শিখিয়ে বেদআত থেকে রক্ষা করতে হবে, যাতে প্রথমেই মিথ্যা শিকড় গেড়ে না বসে। কেননা, মিথ্যা শ্রুতিগোচর হয়ে গেলে তা মন থেকে দূর করা ওয়াজেব হবে। অবশ্য কোন কোন সময় এটা দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে। উদাহরণতঃ নও-মুসলিম ব্যক্তি ব্যবসায়ী হলে এবং তার শহরে সুদের কারবার প্রচলিত থাকলে সুদ থেকে আত্মরক্ষার মাসআলা শিক্ষা করা তার জন্যে ওয়াজেব হবে। অতএব ফরযে আইন শিক্ষা সম্পর্কে আমরা যা লিপিবদ্ধ করেছি, তাই সত্য। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় আমলের অবস্থা জানা ফরযে আইন । সুতরাং যেব্যক্তি প্রয়োজনীয় আমল ও তার ওয়াজেব হওয়ার সময় জেনে নেবে, সে তার ফরযে আইন জ্ঞান অর্জন করে নেবে।

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (৯) যে জ্ঞান ফরযে আইন



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ৯)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যে জ্ঞান ফরযে আইন --
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন :
>"জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয।"
>"জ্ঞান অর্জন কর; যদিও তা চীন দেশে থাকে।"
যে জ্ঞান প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরযে আইন, তা কি? এ ব্যাপারে মতভেদ আছে এবং এতে বিশটিরও বেশী মতের সন্ধান পাওয়া যায়। আমরা সবগুলোর বিবরণ দিচ্ছি না। তবে মতভেদের সারকথা প্রত্যেক পক্ষই সে জ্ঞানকে অত্যাবশ্যক বলেছেন, যাতে সে নিজে নিয়োজিত ছিল। উদাহরণতঃ
কালাম শাস্ত্রের পণ্ডিতগণ বলেন, কালাম শাস্ত্রই ফরযে আইন। কারণ, তওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদ এর মাধ্যমেই জানা যায় এবং আল্লাহ্ তাআলার সত্তা ও গুণাবলীর জ্ঞান এ শাস্ত্রের দ্বারাই অর্জিত হয়।
ফেকাহবিদগণ বলেন, : ফেকাহশাস্ত্র শিক্ষা করা ফরযে আইন। কারণ, এর মাধ্যমে এবাদত, হালাল-হারাম এবং জায়েয না-জায়েয ও আদান-প্রদান সম্পর্কে জানা যায়।
তফসীরবিদ ও হাদীসবিদগণ বলেন : আল্লাহর কিতাব ও রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার সুন্নত শিক্ষা করা ফরযে আইন। কেননা, এ দু'টি থেকেই সকল শাস্ত্রের উৎপত্তি।
সূফীগণ বলেন : ফরযে আইন হচ্ছে আমাদের জ্ঞান। তাঁদের কেউ কেউ বলেন, বান্দার নিজের অবস্থা এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে তার মর্যাদার অবস্থা জানা ফরযে আইন। কেউ বলেন : এখলাস, নফসের অপবাদ এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা ও ফেরেশতাদের এলহামের পার্থক্য জানা ফরযে আইন। আবার কেউ বলেন, ফরযে আইন হচ্ছে ‘এলমে বাতেন', যা এ জ্ঞানের যোগ্য বিশেষ লোকদের উপর ওয়াজেব। তারা শব্দের ব্যাপকতা পরিবর্তন করে একে বিশেষ অর্থে নিয়েছেন।
আবু তালেব মক্কী (রহঃ) বলেন : ফরযে আইন হচ্ছে সে জ্ঞান, যা নিম্নোক্ত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে ‘পাঁচটি বিষয়ের উপর ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত : এ বিষয়ের সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই কেননা, এ পাঁচটি বিষয়ই ওয়াজেব। তাই এগুলো জানাও ওয়াজেব। এখন শিক্ষার্থীর পক্ষে যে বিষয়টি বিশ্বাস করা দরকার, তা আমরা উল্লেখ করছি। আমরা এ অধ্যায়ের ভূমিকায় বলে এসেছি যে, এলেম দুই প্রকার (১) এলমে মোয়ামালা ও (২) এলমে মোকাশাফা। হাদীসে যে এলেম প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয বলে ব্যক্ত হয়েছে, তা হচ্ছে এলমে মোয়ামালা তথা আদান-প্রদান সম্পর্কিত জ্ঞান।

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (৮) শিক্ষা দানের ফজিলত সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের উক্তি


জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ৮)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শিক্ষা দানের ফজিলত সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের উক্তি --
>হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : যেব্যক্তি কোন হাদীস বর্ণনা করে এবং তদনুযায়ী কাজ করে, সে সেসব লােকের সমান সওয়াব পাবে, যারা সে কাজটি সম্পাদন করবে।
>হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : যেব্যক্তি মানুষকে ভাল কথা শেখায়,

তার জন্যে সকল বস্তু, এমনকি সমুদ্রের মাছেরা পর্যন্ত এস্তেগফার করে।
>জনৈক আলেম বলেন : জ্ঞানী ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর সৃষ্ট জীবের মধ্যে যোগসূত্র স্বরূপ।
>বর্ণিত আছে, হযরত সুফিয়ান সওরী (রহঃ) আসকালানে এসে কিছু দিন অবস্থান করেন। কেউ তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করল না। তিনি বললেন : আমার জন্যে সওয়ারী ঠিক করে দাও, আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই। এ শহরে জ্ঞানের অপমৃত্যু ঘটবে। এ কথা বলার কারণ, তিনি শিক্ষাদানের মাহাত্ম্য এবং এর মাধ্যমে জ্ঞান অব্যাহত রাখতে প্রয়াসী ছিলেন।
>আতা (রহঃ) বলেন, আমি হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিবের কাছে গিয়ে দেখি, তিনি কাঁদছেন। আমি কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আমাকে কেউ জ্ঞানের কথা জিজ্ঞেস করে না।
>জনৈক মনীষী বলেন : জ্ঞানীরা কালের প্রদীপ। স্ব স্ব সময়ে প্রত্যেকেই উজ্জ্বল বাতি বিশেষ। সমসাময়িক লোকেরা তাঁদের কাছ থেকে আলো আহরণ করে।
>হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন : আলেম সম্প্রদায় না থাকলে মানুষ চতুষ্পদ জন্তুর মত হয়ে যেত। অর্থাৎ, জ্ঞানীরা জ্ঞানদানের মাধ্যমে মানুষকে পশুত্বের স্তর থেকে বের করে মানবতার স্তরে পৌঁছে দেয়।
>ইকরিমা বলেন : এ জ্ঞানের কিছু মূল্য আছে। লোকেরা জিজ্ঞেস করল : তা কি? তিনি বললেন : তা এই যে, তা এমন ব্যক্তিকে শিক্ষা দেবে, যে স্মরণ রাখে এবং বিনষ্ট না করে।
>ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ায বলেন : আলেমগণ উম্মতের প্রতি পিতামাতার চেয়ে অধিক দয়াশীল। লোকেরা জিজ্ঞেস করল? এটা কেমন করে? তিনি বললেন : পিতামাতা মানুষকে দুনিয়ার আগুন থেকে রক্ষা করে, আর আলেমগণ রক্ষা করেন আখেরাতের আগুন থেকে।
>জনৈক মনীষী বলেন : জ্ঞানের সূচনা চুপ থাকা, অতঃপর শ্রবণ করা, অতঃপর মুখস্থ করা, অতঃপর আমল করা, অতঃপর মানুষের মধ্যে প্রচার করা।
>অন্য একজন বলেন : নিজের জ্ঞান এমন ব্যক্তিকে দাও যে সে সম্পর্কে অজ্ঞ এবং এমন ব্যক্তির কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ কর, যে তুমি যা জান না তা জানে। এরূপ করলে তুমি যা জান না, তা জানতে পারবে। এবং যা জানবে তা মনে থাকবে।

>হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন : আমি এ বিষয়টি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণিত পেয়েছি যে, জ্ঞান অর্জন কর। কারণ, জ্ঞানার্জন করা খোদাভীতি, তার অন্বেষণ এবাদত, তার পাঠদান তসবীহ্ এবং তার আলোচনা জেহাদ। যেব্যক্তি জানে না, তাকে জ্ঞানদান করা খয়রাত। যোগ্য ব্যক্তির জন্যে তা ব্যয় করা নৈকট্য। জ্ঞান একাকীত্বে সহচর, সফরে সঙ্গী, একান্তে বাক্যালাপকারী, ধর্মের পথপ্রদর্শক, সচ্ছলতা ও নিঃস্বতা উভয় অবস্থায় পথপ্রদর্শক, বন্ধুদের সামনে প্রতিনিধিত্বকারী, অপরিচিতদের মধ্যে নৈকট্যকারী, শত্রুর বিরুদ্ধে হাতিয়ার এবং জান্নাতের পথে আলোকবর্তিকা। এ জ্ঞানের বদৌলত আল্লাহ্ তা'আলা কিছু লোককে উচ্চ মর্তবা দান করেন। তাদেরকে কল্যাণমূলক কাজে সর্দার, নেতা ও পথপ্রদর্শক করেন। তাদের দেখাদেখি অন্যরা কল্যাণপ্রাপ্ত হয়। মানুষ তাদের পদাংক অনুসরণ করে চলে এবং তাদের ক্রিয়াকর্মের প্রতি তাকিয়ে থাকে। ফেরেশতারা তাদের বন্ধুত্ব কামনা করে এবং পাখা দ্বারা তাদেরকে মুছে পরিষ্কার করে। প্রাণী ও নিষ্প্রাণ সবাই তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। এমনকি, সমুদ্রের মৎস্য, পোকমাকড়, স্থলের হিংস্র সরীসৃপ চতুষ্পদ জীব-জন্তু এবং আকাশ ও তারকারাজি পর্যন্ত মাগফেরাতের দোয়া করে। কারণ, জ্ঞান আত্মার জন্য জীবনী শক্তি। এর কারণে মূখর্তা থাকে না। জ্ঞান একটি নূর। এটি যার মধ্যে থাকে তার সামনে থেকে অন্ধকার সরে যায়। জ্ঞানের দ্বারা দেহ শক্তি পায় এবং দুর্বলতা দূরীভূত হয়। এর সাহায্যে বান্দা সৎলোকদের মর্তবা ও উচ্চ মর্যাদা লাভ করে। জ্ঞান সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা রোযা রাখার সমান এবং জ্ঞানদানে মশগুল থাকা রাত জেগে নফল এবাদত করার সমান। জ্ঞানের কারণেই আল্লাহ্ তা'আলার আনুগত্য, একত্বে বিশ্বাস ও এবাদত হয়। এর মাধ্যমেই পরহেযগারী, তাকওয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং হালাল হারামের জ্ঞান অর্জিত হয়। জ্ঞান ইমাম এবং আমল তার অনুসারী। সৎলোকদের অন্তরেই এর জন্যে স্থান করা হয় এবং হতভাগ্যরা এ থেকে বঞ্চিত থাকে। আমরা আল্লাহ্ তা'আলার কাছে তওফীকপ্রার্থী।


পরবর্তী পর্ব
যে জ্ঞান ফরযে আইন

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (৭) মৃত্যুর পরেও ইলম উপকারে আসে



 জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ৭)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মৃত্যুরৈ পরেও ইলম উপকারে আসে
মানুষ মারা গেলে তার কর্ম বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি বিষয় অব্যাহত থাকে - (১) জ্ঞান,- যা দ্বারা অপরের উপকার হয় (২) সদকায়ে জারিয়া এবং (৩) সৎকর্মপরায়ন সন্তান, যে তার জন্য নেক দোয়া করে।
>সৎ কাজের প্রতি যে উৎসাহ দেয়, সে সৎকর্মীর অনুরূপ।।
>দু'ব্যাক্তির প্রতি ঈর্সা করা উচিৎ - (১) যাকে আল্লাহ্ তা'আলা প্রজ্ঞা দান করেছেন; অতঃপর সে তদনুযায়ী কাজ করে এবং মানুষকে তা শিক্ষা দেয়। (২) যাকে আল্লাহ্ তা'আলা ঐশ্চর্য দিয়েছেন। এবং তা দান-খয়রাতে ব্যায় করতে বাধ্য করেছেন।
>আমার নায়েবদের প্রতি আল্লাহ রহম করুন। লোকেরা জিজ্ঞেস করল : আপনার নায়েব কারা? তিনি বললেন : যারা আমার পথ বেছে নেয় এবং তা মানুষকে শিক্ষা দেয়।

পরবর্তী পর্ব

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (৬) ইলম গোপন করার শাস্তি



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ৬)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ইলম গোপন করার শাস্তি—
>"যে ব্যক্তি কোন জ্ঞান অর্জন করে, অতঃপর তা গোপন করে, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পড়িয়ে দিবেন।"
>"উৎকৃষ্ট দান ও উত্তম উপঢৌকন হচ্ছে জ্ঞানের কথা, যা তুমি শুনে স্মরণ রাখবে, এর পর মুসলমান ভাইয়ের কাছে নিয়ে যাবে এবং তাকে শিক্ষা দিবে। এটা এক বছর এবাদতের সমান।"
বলা হয়েছে :
>"দুনিয়া অভিশপ্ত এবং যা কিছু তাতে আছে,তাও অভিশপ্ত; কিন্তু আল্লাহর জিকির এবং যা এর নিকটবর্তী হয় অথবা শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থী, এগুলু অভিশপ্ত নয়।"
নিশ্চয় আল্লাহর ফেরেশতা, আকাশ ও পৃথিবীর অধিবাসিবৃন্দ,এমনকি পিঁপীলিকা তাদের গর্তে এবং মৎস সমুদ্রে সেই শিক্ষকের জন্য রহমত কামনা করে, যে মানুকে কল্যান শিক্ষা দেয়।
>"এক মুসলমান অন্য মুসলমানের জন্য দোয়ার চাইতে বড় কোন উপকার করিতে পারেনা"।
>"যদি ইমানদার একটি উত্তম কথা শুনে তদনুযায়ী আমল করে, তবে তার জন্য তা এক বছরের এবাদত অপেক্ষা উত্তম।"
একদিন রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বাড়ী থেকে বের হয়ে দুটি মজলিস দেখলেন এক মজলিসে আল্লাহ্ তা'আলার কাছে দোয়া প্রার্থনা করা হচ্ছিল এবং মজলিসের লোকেরা দোয়ার প্রতি উৎসুক ছিল। অপর মজলিসে শিক্ষা দান করা হচ্ছিল। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ মুবারক করেন :
>"প্রথম মজলিসের লোকেরাতো আল্লাহ্ তাআলার কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছে। আল্লাহ্ তা'লা ইচ্ছা করলে দেবেন ইচ্ছা না করলে দেবেন না। কিন্তু দ্বীতিয় মজলিসের লোকেরা শিক্ষা দানে রত আছে। আল্লাহ্ তা'লা আমাকেও শিক্ষাদাতা রুপেই প্রেরণ করেছেন।" এই বলে দ্বিতীয় মজলিসের দিকে গেলেন। এবং তাদের মধ্যে বসে পড়লেন।
রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন :
>"আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে হেদায়েত ও জ্ঞান দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তার দৃষ্টান্ত ভূখন্ডে প্রচুর বৃষ্টির মত। সে ভূখন্ডের কিছু অংশ এমন যে, সে পানি ধারণ করে এবং প্রচুর ঘাস উৎপন্ন করে। অপর অংশ এমন যে, সে পানি আটকে রাখে। আল্লাহ্ তা'আলা আটকে পড়া সেই পানি দ্বারা মানুষকে উপকার পৌছান। তারা তা পান করে এবং ক্ষেতে সেচ করে। পক্ষান্তরে কিছু ভূখন্ড এমন যে, সে পানি আটকায়না এবং ঘাস, লতা-পাতাও উৎপন্ন করেনা।"
এ হাদীসে ভূখন্ডের প্রথম অংশটি তাদের দৃষ্টান্ত, যারা জ্ঞানের দ্বারা নিজেরা উপকৃত হয়। দ্বিতীয় অংশটি তাদের দৃষ্টান্ত, যারা অপরকে উপকার পৌছায় এবং তৃতীয় অংশটি তাদের দৃষ্টান্ত, যারা উভয় বিষয় থেকে বঞ্চিত।

পরবর্তী পর্ব

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (৫) জ্ঞানদানের শ্রেষ্টত্ব




জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ৫)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জ্ঞানদানের শ্রেষ্টত্ব—
এসম্পর্কিত আয়াত :
>"এবং যাতে সতর্ক করে তাদের সম্প্রদায়কে, যখন তাদের কাছে ফিরে আসে, যাতে সম্প্রদায়ের লোকেরা সংযমী হয়"
এ আয়াতে সতর্ক করার অর্থ জ্ঞান দান ও পথ প্রদর্শন।
>"যখন আল্লাহর কিতাব অধিকারীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলেন একে মানুষের জন্য অবশ্যই বর্ণনা করবে এবং গোপন করবেনা"
এতে বলা হয়েছে, জ্ঞানের শিক্ষা দান ওয়াজেব।
>"এবং তাদের একটি দল জেনে শুনে সত্য গোপন করে।" এতে বর্ণিত হয়েছে যে, জ্ঞান গোপন করা হারাম। যেমন সাক্ষ্য গোপন করার জন্য বলা হয়েছে :
"যে সাক্ষ্য গোপন করে সে পাপিষ্ট"।
>"তার চেয়ে সুন্দর কথা কার, যে আল্লাহর প্রতি আহবান করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে।"
>"তোমার পালনকর্তার পথের দিকে আহবান কর প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।"

জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের উক্তি—
হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু বলেন,যে ব্যক্তি কোন হাদিস বর্ণনা করে এবং তদনুযায়ী কাজ করে, সে সেইসব লোকের সমান সওয়াব পাবে, যারা সে কাজটি সম্পাদন করবে।
>হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) বলেন : আমি যখন জ্ঞান অর্জন করছিলাম, তখন হীন ছিলাম। এখন আমার কাছে লোকজন জ্ঞান লাভ করতে শুরু করলে আমি সন্মানের অধিকারী হয়ে গেছি।
>ইবনে আবী মুলাইকা বলেন : আমি হযরত ইবনে আব্বাসের সমতুল্য কাউকে দেখিনি। তার মুখাকৃতি সর্বোত্তম, কথাবার্তা প্রান্জল এবং ফতোয়া সর্বাধিক জ্ঞানবহ।
>ইবনে মোবারক বলেন : আমার কাছে সেই ব্যাক্তি আশ্চর্যজনক, যে জ্ঞান অন্বেষন করেনা। কারণ তার মন তাকে কোন মাহাত্ম্যের প্রতি আহবান করেনা।
>জনৈক দার্শনিক বলেন : দু ব্যক্তির প্রতি আমার মনে যে দয়ার উদ্রেক হয়, তা অন্য কারো প্রতি হয়না। - (১) সে ব্যক্তি, যে জ্ঞান অন্বেষন করে কিন্তু বুঝেনা (২) সে ব্যক্তি যে বুঝে ; কিন্তু জ্ঞান অন্বেষন করেনা।
>হযরত আবু দারদা (রঃ) বলেন : একটি মাসআলা শিক্ষা করা আমার মতে সারা রাত জেগে নফল পড়া অপেক্ষা উত্তম। তিনি আরো বলেন : জ্ঞানী ব্যক্তি ও জ্ঞান অন্বেষনকারী কল্যাণের অংশিদার। অন্য সকলেই কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। তিনি আরো বলেন : জ্ঞানী হও অথবা জ্ঞান অন্বেষনকারী হও অথবা শ্রোতা হও, চতুর্থ কোন কিছু হয়োনা, তা হলে ধংশ হয়ে যাবে।
>হযরত আতা (রহঃ) বলেন : জ্ঞানের একটি মজলিশ ক্রীড়া-কৌতুকের সত্তরটি মজলিশের কাফপারা হয়ে যায়।
>হযরত ওমর (রঃ) বলেন : হাজার রাত জাগরণকারী রোজাদার আবেদের মরে যাওয়া এমন জ্ঞানী ব্যাক্তির তুলনায় কম, যে আল্লাহ্ তা'আলার হালাল ও হারাম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ।
>ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন জ্ঞান অন্বেষন করা নফলের ছেয়ে উত্তম।
>ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন : আমি ইমাম মালেকের কাছে পাঠাব্যেশরত ছিলাম এমন সময় যোহরের সময় হল। আমি নামাজের জন্য কিতাব বন্ধ করলে তিনি বললেন : ওহে, যার জন্য তুমি উঠেছ, সেটা এর ছেয়ে উত্তম নয়, যাতে তুমি ছিলে। তবে নিয়ত দুরস্ত হওয়া শর্ত।
>হযরত আবু দারদা (রঃ) বলেন যে ব্যাক্তি মনে করে জ্ঞান অন্বেষন করা জেহাদ নয়, সে বুদ্ধি বিবেচনায় অপক্ষ।

জ্ঞান দানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে হাদীস
জ্ঞান দানের শ্রেষ্টত্ব সম্পর্কে বহু হাদীস বর্ণিত রয়েছে-
রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>"আল্লাহ্ তা'আলা কোন জ্ঞানী ব্যক্তিকে জ্ঞান দান করে তার কাছ থেকে সে অঙ্গীকারও নিয়েছেন, যেমন পয়গম্বরগণের কাছ থেকে নিয়েছেন। অর্থাত তারা অবশ্যই তা বর্ণনা করবে এবং গোপন করবেনা।"
রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) মুয়ায ইবনে জাবালকে ইয়েমেন প্রেরন করার সময় বললেন :
>"যদি আল্লাহ্ তা'আলা তোমার দ্বারা একটি লোককেও পথ প্রদর্শন করে, তবে এটা হবে তোমার জন্যে দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছু অপেক্ষা উত্তম।"
> "যে ব্যক্তি অন্যদের শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে জ্ঞানের একটি অধ্যায় শিক্ষা করবে তাকে অবশ্যই পয়গম্বর ও সিদ্দিকের সওয়াব দান করা হবে।"
হযরত ঈসা আলাইহিস্সালাম এর উক্তি বর্ণিত আছে,
>"যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে তদনুযায়ী আমল করে এবং মানুষকে তা শিক্ষা দান করে, সে আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্বে মহান বলে বিবেচিত হয়।"
>" কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাআলা এবাদতকারী ও জেহাদকারীদেরকে বলবেন : জান্নাতে যাও। আলেম তথা জ্ঞানী ব্যক্তি বলবেন : ইলাহী ! তারা আমাদের জ্ঞানের বদৌলতে এবাদত ও জেহাদ করেছে; অর্থাত সন্মান পাওযার যোগ্য আমরা। আল্লাহ্ তা'আলা বলবেন : তোমরা আমার কাছে কোন কোন ফেরেশতার সমতুল্য। তোমরা সুপারিশ কর তোমাদের সুপারিশ মন্জুর করা হবে। অতঃপর তারা সুপারিশ করবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। এই মর্তবা সেই জ্ঞানের, যাহা শিক্ষাদানের মাধ্যমে অপরের কাছে পৌঁছায়। সে জ্ঞানের নয়, যা কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে সীমিত থাকে এবং অন্যের কাছে পৌঁছায় না।
রসুলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন :
>"আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে জ্ঞান দান করার পর তা ছিনিয়ে নিয়ে যান না। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়ার মাধ্যমে জ্ঞানও তুলে নেন।"
সেমতে কোন জ্ঞানী ব্যক্তি দুনিয়া থেকে চলে গেলে তার সাথে জ্ঞানও চলে যায়। অবশেষে মূর্খ নেতৃবর্গ ছাড়া কেউ অবশিষ্ট থাকেনা। এই মূর্খদের কাছে কিছু জিজ্ঞেস করলে তারা না জেনে না শুনে ফতোয়া দেয়। ফলে নিজেরাও বিপথগামী হয় এবং অপরকেও বিপথগামী করে।

পরবর্তী পর্ব

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (৪) জ্ঞান অন্বেষনের মাহাত্ম্য



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ৪)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জ্ঞান অন্বেষনের মাহাত্ম্য
এ সম্পর্কিত আয়াত সমুহ নিম্নরূপ :
এ সম্পর্কিত আয়াত সমুহ নিম্নরূপ :
"তাদের প্রতিটি দল থেকে কিছু লোক কেন বের হয়না, যাতে তারা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে?"
"অতএব যারা স্মরণ রাখে, তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর যদি তোমরা না জান।"
হাদীস নিম্নরূপ :
>"যে ব্যক্তি জ্ঞান অম্বেষন করে চলে, আল্লাহ্ তাকে জান্নাতের পথে চালাবেন।"
> "ফেরেশতারা জ্ঞান অন্বেষনকারীর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তার জন্যে পাখা বিছিয়ে দেন"।
> "এক'শ রাকাত নামাজ পড়া অপেক্ষা জ্ঞানের কোন অধ্যায় শিক্ষা করা উত্তম"।
> "জ্ঞানের কোন অধ্যায় শিক্ষা করা মানুষের জন্য পৃথিবী ও পৃথিবীস্থিত সব কিছু থেকে উত্তম"।
> "জ্ঞান অন্বেষন কর; যদিও তা চীনে থাকে; অর্থাৎ অনেক দুরে থাকে"।
> "জ্ঞান অন্বেষন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয"।
> "জ্ঞান একটি ভান্ডার যার চাবি হচ্ছে প্রশ্ন করা। সুতরাং জ্ঞান সম্পর্কিত বিষয়ে প্রশ্ন কর। কেননা এতে চার ব্যাক্তি সওয়াব পায়। (১) প্রশ্নকারী (২) জ্ঞানী ব্যাক্তি (৩) শ্রোতা এবং (৪) যে তাদের প্রতি মহব্বত রাখে।"
> "মূর্খ ব্যাক্তি যেন তার মূর্খতা নিয়ে বসে না থাকে। জ্ঞানী ব্যাক্তিরও তার জ্ঞান নিয়ে চুপ থাকা উচিৎ নয়।" অর্থাত মূর্খতা দূর করার জন্যে প্রশ্ন করবে আর জ্ঞানী ব্যাক্তি তার জওয়াব দিবে।
হযরত আবু যর (রঃ)-এর হাদীসে বলা হয়েছে :
>"জ্ঞান সংক্রান্ত মজলিশে হাজির হওয়া- হাজার রাকাত নামাজ পড়া, হাজার রোগীর খবর নিতে যাওয়া এবং হাজার জানাযায় যোগদান অপেক্ষা উত্তম। কেউ আরজ করল : কুরআন তেলাওয়াত অপেক্ষাও কি উত্তম? রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: জ্ঞান ব্যাতিত কুরআন কি উপকার করে?"
> "ইসলামকে জীবিত করার উদ্দেশ্যে জ্ঞান অন্বেষনকালে যে ব্যক্তি মৃত্যুবরন করে, জান্নাতে তার এবং পয়গম্বরগণের স্থর হবে এক।"

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...