শনিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৪

বিভ্রান্তি (পর্ব- ৪) গোনাহগারদের বিভ্রান্তি বর্ণনা



বিভ্রান্তি (পর্ব- ৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

গোনাহগারদের বিভ্রান্তি বর্ণনা—

এখন গোনাহগারদের বিভ্রান্তি বর্ণনা করা হচ্ছে। তারা বলে - আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল। আমরা তার ক্ষমা আশা করি। অতঃপর এই আশার উপর ভিত্তি করে তারা সৎকর্মও বর্জন করে। তারা এর নাম রাখে “রাজা” অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি আশাবাদ। কারণ তারা জানে “রাজা” ধর্মের একটি প্রশংসনীয় বিষয়। মাঝে মাঝে তাদের এই আশাবাদের একটি দলীল হয়ে থাকে তাদের পিতৃপুরুষদের সৎকর্মপরায়ণ ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন হওয়া; যেমন সৈয়দ হওয়া। খোদাভীতি ও পরহেযগারীতে পূর্বপুরুষদের বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও তারা ধারণা করে যে, আল্লাহর কাছে তারা বাপ-দাদার চেয়েও বুযুর্গ। কেননা, বাপ-দাদারা খোদাভীতি ও পরহেযগারী সত্ত্বেও ভয়ে কম্পমান থাকতেন; কিন্তু তারা সকল প্রকার পাপাচার সত্ত্বেও নির্ভীক হয়ে থাকে। এটা চরম বিভ্রান্তি। তাদের মনে শয়তান এই ধারণা সৃষ্টি করেছে যে, যে কাউকে মহব্বত করে, সে তার বংশধরকেও মহব্বত করে। আল্লাহ তা'আলা যেহেতু তোমাদের বাপ-দাদাকে প্রিয় জানতেন, তাই তোমাদেরকেও প্রিয় জানবেন। অতএব, তোমাদের কর্ম করার প্রয়োজন কি? অথচ তারা একথা স্মরণ করে না যে, হযরত নূহ (আঃ) নিজের পুত্রকে নৌকায় নিজের সঙ্গে তুলতে চেয়েছিলেন এবং দোয়া করেছিলেন পরওয়ারদেগার, আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর হল - "হে নূহ ! নিশ্চয় সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে তো অসৎ"। 

হযরত ইবরাহীম (আঃ) নিজের পিতার জন্যে দোয়া করেন; কিন্তু তা-নামনযুর হয়। মোটকথা, উপরোক্ত ধারণা ধোকা ও বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তা'আলা কেবল অনুগতদেরকেই ভালবাসেন এবং গোনাহগারকে অপছন্দ করেন যেমন, পিতা অনুগত হলে তার সন্তানরা গোনাহগার হলেও আল্লাহ। পিতাকে অপছন্দ করেন না। তেমনি পিতাকে মহব্বত করার কারণে তার গোনাহগার পুত্রকেও মহব্বত করেন না। এ ক্ষেত্রে মূল কথা হচ্ছে-   

>"একজনের পাপের বোঝা অন্যজন বহন করবে না"।


যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, পিতার তাকওয়া ও খোদাভীতির কারণে সেও মুক্তি পেয়ে যাবে, সে এমন, যেমন কেউ মনে করে যে, পিতা পেট ভরে খেলে তারও পেট ভরে যাবে এবং সে পানি পান করলে তারও তৃষ্ণা মিটে যাবে। অথচ এরূপ মনে করা সম্পূর্ণ অবান্তর। এ থেকে জানা গেল যে, তাকওয়া ফরযে আইন। এতে পিতার তাকওয়া পুত্রের জন্যে যথেষ্ট হবে না। কিয়ামতের দিন তাকওয়ার ভিত্তিতেই বিচার হবে। তবে যে ব্যক্তির উপর আল্লাহর ক্রোধ অধিক হবে না, তার জন্যে সুপারিশের অনুমতি হবে এবং সুপারিশ তার জন্যে লাভজনক হবে।

এখন প্রশ্ন হয়, গোনাহগার ব্যক্তি বলে থাকে, আল্লাহ ক্ষমাশীল। আমি তার ক্ষমা আশা করি। তার এ দুটি বাক্যই তো নির্ভুল এবং মনে লাগে। এতে বিভ্রান্তি কিসের?  

জওয়াব এই যে, শয়তান মানুষকে এমনি ধরনের বাক্য দ্বারা বিভ্রান্ত করে, যা বাহ্যত গ্রহণযোগ্য এবং ভেতরে প্রত্যাখ্যাত। বলা বাহুল্য, বাহ্যিক কথা সুন্দর না হলে মন বিভ্রান্ত হবে কেন? রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এই উক্তির রহস্য ফাঁস করে দিয়েছেন। এক হাদীসে তিনি বলেন -

>"বিজ্ঞ সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে অনুগত করে, মৃত্যু পরবর্তী সময়ের জন্যে আমল করে এবং নির্বোধ সেই ব্যক্তি, যে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয় এবং আল্লাহর কাছে আশা-আকাক্ষা করতে থাকে। 

সুতরাং বাস্তবে এই হচ্ছে আমলহীন আশা-আকাঙ্ক্ষা, শয়তান যার নাম পাল্টে 'রাজা' দিয়েছে। মূর্খরা এতেই বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। অথচ 'রাজা' শব্দের ব্যাখ্যা আল্লাহ তাআলা এভাবে করেন,- 

>"নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা হিজরত করেছে ও আল্লাহর পথে জেহাদ করেছে, তারাই আল্লাহর রহমত আশা করে। অর্থাৎ তারাই আশা করার যোগ্য।

হযরত হাসান (রহঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল: কোন কোন লোক বলে-আমরা আল্লাহর কাছে আশা রাখি এবং আমল করি না। তিনি বললেন : এটা তাদের খামখেয়ালী। যে ব্যক্তি কোন বস্তু আশা করে, সে তার অন্বেষণ করে। আর যে ব্যক্তি কোন বস্তুকে ভয় করে, সে তার কাছ থেকে দূরে পালায়। 

মুসলিম ইবনে ইয়াসার বলেন : আমি একদিন এত জোরেশোরে সেজদায় গেলাম যে, আমার সামনের দুটি দাত ভেঙ্গে গেল। এটা দেখে কেউ বলল : আমরা তো আল্লাহর কাছে মাগফেরাত আশা করি। এজন্যে আমল করি না। মুসলিম জওয়াব দিলেন : এটা কস্মিনকালেও 'রাজা'  তথা আশা নয়। মানুষ যে বিষয় আশা করে, তা তালাশ করে।

এর একটি দৃষ্টান্ত এই যে, এক ব্যক্তি আশা করে যে, সে সন্তানের  পিতা হবে; অথচ সে এখনও বিবাহই করেনি কিংবা বিবাহ করে থাকলেও স্ত্রীর সাথে সহবাস করেনি। এরূপ ব্যক্তির সন্তানের পিতা হওয়ার আশা খামখেয়ালী নয় তো কি? এমনিভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার ক্ষমা ও রহমত আশা করে এবং তার ঈমানই নেই কিংবা ঈমান থাকলেও সৎকর্ম করেনি কিংবা সৎকর্মের সাথে সাথে অসৎকর্মও ছাড়েনি,  সেও খামখেয়ালীতে লিপ্ত।

জানা উচিত যে, আশা দু’জায়গায় করা ভাল। 

(এক)– আপাদমস্তক গোনাহগার ব্যক্তি। তার মনে যখন তওবা করার কল্পনা জাগে, তখন শয়তান তাকে এই বলে বিভ্রান্ত করে যে,  তোর তওবা কবুল হবে না। এতে শয়তানের উদ্দেশ্য থাকে, তাকে নিরাশ করে দেয়া। এমতাবস্থায় নৈরাশ্য দূর করে আশা করা ওয়াজিব। সে স্মরণ করবে যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, তওবা কবুলকারী এবং তওবা একটি এবাদত, যা দ্বারা গোনাহ দূর হয়ে যায়। কোরআন শরীফে এর সমর্থন রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন : 

>"বলে দিন, হে আমার বান্দা ! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করবেন। কারণ, তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে এস।

অতএব, মানুষ যখন তওবা সহকারে ক্ষমার আশা করবে, তখন তাকে আশাবাদী বলা উচিত হবে। নতুবা গোনাহ অব্যাহত রেখে মাগফেরাতের আশা করা খামখেয়ালী। 

(দুই) – যে ব্যক্তি নফল এবাদতে ক্রটি করে এবং কেবল ফরয এবাদত করেই ক্ষান্ত থাকে, সে যদি নিজের জন্যে আল্লাহর সেই সমস্ত নেয়ামত ও ওয়াদা আশা করে, যা তিনি সৎকর্মপরায়ণদেরকে দিয়েছেন এবং এই আশার আনন্দে নফল এবাদতের প্রতি মনোনিবেশ করে, তবে তার এই আশা উত্তম। আল্লাহ বলেন 

>"অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা, যারা আপন নামাযে বিনয় নম্র, যারা অসার কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে, যারা যাকাতদানে সক্রিয়, যারা আপন যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে তাদের স্ত্রী ও অধিকারভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলে তারা তিরস্কৃত হবে না। কেউ এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করলে সে হবে সীমালঙ্ঘনকারী এবং যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং যারা তাদের নামাযে যত্নবান, তারাই হবে অধিকারী ফেরদাউসের, যাতে তারা চিরকাল থাকবে"।

সুতরাং প্রথমোক্ত আশা দ্বারা তওবার প্রতিবন্ধক নৈরাশ্য খতম হয়ে যায় এবং দ্বিতীয় আশা দ্বারা এবাদতে স্ফূর্তির অন্তরায় অলসতা দূর হয়ে যায়। সারকথা, যে আশা তওবা করতে উদ্বুদ্ধ করে, তাকে বলা হয় 'রাজা'। আর যে আশা এবাদতে অলসতার কারণ হয়, তাকে বলা হয় বিভ্রান্তি ও খামখেয়ালী। 

আজকাল অধিকাংশ লোক আমলে অলসতা করে। তারা আল্লাহর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আখেরাতের জন্যে চেষ্টা-চরিত্র করে না। এর কারণ এটাই যে, ভারা বিভ্রান্তিতে পড়ে আছে, যাকে 'রাজা' মনে করে নিয়েছে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন— 

>এই উম্মতের শেষ যুগে বিভ্রান্তি প্রবল হবে। বাস্তবে তাই দেখা যায়। প্রথম যুগের লোকেরা অব্যাহতভাবে এবাদত করতেন। তারা যা-ই আমল করতেন, তাদের অন্তর ভয়ে পরিপূর্ণ থাকত; অথচ তারা সারারাত আল্লাহর এবাদতে কাটিয়ে দিতেন। এতদসত্ত্বেও নির্জনে নিজের জন্য কান্নাকাটি করতেন।

কিন্তু বর্তমান (হাজার+ বছর পূর্বের) যুগের অবস্থা এর বিপরীত। এখন মানুষ গোনাহে ডুবে থাকে, দুনিয়া নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকে এবং আল্লাহর প্রতি বিমুখ থাকে। এরপরও তারা শংকাহীন ও প্রশান্ত দৃষ্টিগোচর হয়। তারা বলে আমরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও কৃপার উপর আস্থা রাখি এবং তাঁর রহমত ও মাগফেরাত আশা করি। তারা যেন দাবী করে আমরা আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ এতটুকু জানি, যতটুকু পয়গম্বর ও সাহাবায়ে কেরাম জানতেন না।


হযরত মাকাল ইবনে ইয়াসার (রাঃ) -এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : এক সময় আসবে, যখন পরনের বস্ত্রের ন্যায় কোরআন মানুষের অন্তরে পুরাতন হয়ে যাবে। মানুষের কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষাই থেকে যাবে এবং এর সাথে ভয় মোটেই থাকবে না। কোন কাজ করলে তারা বলবে, এটা কবুল হবে এবং কোন অকাজ করলে বলবে এটা ক্ষমা পেয়ে যাব। এই হাদীস থেকে জানা গেল যে, মানুষ ভয়ের জায়গায় লালসাকে ব্যবহার করবে এবং কোরআনে উল্লিখিত ভয়ের আয়াত সম্পর্কে মূখ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা খৃস্টানদের এ অবস্থাই বর্ণনা করে বলেন "তাদের পেছনে আগমন করল কিতাবের উত্তরাধিকারীগণ, যারা তুচ্ছ জীবনের সামগ্রী গ্রহণ করে এবং বলে আমাদেরকে ক্ষমা করা হবে।

এখানে বিভ্রান্তদেরকে প্রধানত চার শ্রেনীতে বিভক্ত কর হয়েছে।

(১) শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি

(২) সংসারত্যাগী ও এবাদতকারীদের বিভ্রান্তি

(৩) সুফিগণের বিভ্রান্তি ও 

(৪) বিত্তশালীদের বিভ্রান্তি।


পরবর্তী পর্ব

শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি

বিভ্রান্তি (পর্ব- ৩) কাফেরদের বিভ্রান্তি ও তার প্রতিকার



বিভ্রান্তি (পর্ব- ৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কাফেরদের বিভ্রান্তি ও তার প্রতিকার—

কোন কোন কাফেরকে পার্থিব জীবন বিভ্রান্ত করে রেখেছে এবং কতককে শয়তান। যারা পার্থিব জীবন দ্বারা বিভ্রান্ত, তারা বলে - নগদ বাকীর চেয়ে উত্তম। পার্থিব জীবন নগদ এবং পরকাল বাকী। সুতরাং পার্থিব জীবনই উত্তম এবং একেই অবলম্বন করা উচিত। তারা আরও বলে- ইহকাল নিশ্চিত এবং পরকাল সংশয়িত। নিশ্চিত বিষয় সংশয়িত বিষয়ের তুলনায় উত্তম হয়ে থাকে। সংশয়ের কারণে নিশ্চিতকে বর্জন করা ঠিক নয়। এ ধরনের প্রমাণাদি সম্পূর্ণ অসার এবং শয়তানের প্রমাণাদির অনুরূপ। সে বলেছিল >"আমি আদমের চেয়ে উত্তম। কারণ, তুমি আমাকে আগুনের দ্বারা সৃষ্টি করেছ এবং তাকে সৃষ্টি করেছ মাটির দ্বারা"।

এ ধরনের বিভ্রান্তির প্রতিকার দু’প্রকারে সম্ভব। (১)– সত্যিকার ঈমান দ্বারা (২) যুক্তি, প্রমাণের মাধ্যমে।


সত্যিকার ঈমান দ্বারা চিকিৎসা হল আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত উক্তিসমূহকে সত্য বলে বিশ্বাস করা 

>"তোমাদের কাছে যা আছে, তা নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং আল্লাহর কাছে যা আছে, তা অক্ষয় থাকবে।এবং পরকাল উৎকৃষ্টতর ও চিরস্থায়ী"।

 >"পার্থিব জীবন তো বিভ্রান্তির সামগ্রী বৈ নয়"।

>"পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে"।

সেমতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) যখন এসব আয়াতের বিষয়বস্তু অনেক কাফের দলের গোচরীভূত করেন, তখন তারা কালবিলম্ব না করে ইসলামে দীক্ষিত হয়ে যায় এবং কোন দলীলের অপেক্ষা করেনি। কেউ কেউ এসে আরয করত -  

ইয়া রসূলআল্লাহ্ ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমরা আপনাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, সত্যিই কি আল্লাহ আপনাকে রসূল করে পাঠিয়েছেন? তিনি জওয়াবে বলতেন : ‘হাঁ’। এরপরই তারা মুসলমান হয়ে যেত। সাধারণের এই ঈমান ছিল বিভ্রান্তির গণ্ডির বাইরে। এটা এমন, যেমন কোন বালক তার পিতার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে নেয়, যদিও কারণ জানা থাকে না।

যুক্তি, প্রমাণের মাধ্যমে চিকিৎসা হল যেসব যুক্তির ভিত্তিতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়, সেগুলোকে যুক্তির মাধ্যমেই খণ্ডন করা। উদাহরণতঃ উপরে কাফেরদের একটি বিভ্রান্তিকর যুক্তি উল্লিখিত হয়েছে যে, পার্থিব জীবন নগদ এবং পরকাল বাকী। আর নগদ বাকীর চেয়ে উত্তম। সুতরাং পার্থিব জীবনই অবলম্বন করা উচিত। এই যুক্তিতে দুটি বাক্য রয়েছে। প্রথম বাক্য হচ্ছে পার্থিব জীবন নগদ এবং পরকাল বাকী। এ বাক্যটি নিঃসন্দেহে সত্য। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যটি ( অর্থাৎ নগদ বাকীর চেয়ে উত্তম ) সর্বাবস্থায় সত্য নয়। এর মধ্যেই ধোকা নিহিত। কেননা, নগদ ও বাকীর পরিমাণ ও উদ্দেশ্যের মধ্যে সমান সমান হলে তো বাক্যটি সত্য; কিন্তু যদি নগদ বাকীর তুলনায় পরিমাণে কম হয়, তবে বাকীই উত্তম। দেখ, যে কাফেররা উপরোক্ত যুক্তি প্রদর্শন করে, তারাই ব্যবসায়ে এক টাকা নগদ এজন্যে বিনিয়োগ করে, যাতে দশ টাকা বাকী অর্জন করতে পারে। তখন তারা বলে না যে, নগদ। বাকীর চেয়ে উত্তম। সুতরাং বাকীর আশায় নগদ এক টাকা বিনষ্ট করা উচিত নয়। এমনিভাবে চিকিৎসক যদি রোগীকে উৎকৃষ্ট খাদ্য ও ফলমূল খেতে নিষেধ করে, তবে রোগের ভয়ে তৎক্ষণাৎ সে তা পরিত্যাগ করে অথচ এসব খাদ্যের স্বাদ নগদ এবং রোগ-যন্ত্রণা ভবিষ্যতে ভোগ করতে হবে। ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যত সুখের আশায় জলে ও স্থলে কত বিপদাপদের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায়ে নিয়োজিত থাকে এবং কারও কল্পনায় একথা আসে না যে, নগদ বাকীর চেয়ে উত্তম।


সারকথা এই যে, পরবর্তী সময়ে যদি দশ টাকা পাওয়া যায়, তবে তা এক টাকা নগদের চেয়ে উত্তম। এখন দুনিয়ার জীবন ও আখেরাতের জীবনকে তুলনা করলে দুনিয়ার জীবন ‘কিছুই না’ বলা যায়। উদাহরণতঃ মানুষ বেশীর চেয়ে বেশী একশ' বছর বাঁচে। এ বয়সকে আখেরাতের বয়সের সাথে তুলনা করলে তা তার এক কোটি ভাগের একের সমানও হয় না। সুতরাং দুনিয়াতে কেউ এক ছেড়ে দিলে আখেরাতে লাখ লাখ; বরং অগণিত পাবে। আর যদি প্রকারের দিকে লক্ষ্য করা যায়, তবে দুনিয়ার আনন্দে সর্বপ্রকার মালিন্য, কষ্ট ও বিপদ নিহিত থাকে। কিন্তু আখেরাতের আনন্দ- নিঝঞাট, স্বচ্ছ ও পাক-পবিত্র। 

মোটকথা, ‘নগদ বাকীর চেয়ে উত্তম’ - একথাটিই ভ্রান্ত ও ধোকা। এ ভ্রান্তির কারণ হচ্ছে শুনা কথায় বিশ্বাস করে নেয়া এবং এটা চিন্তা না করা যে, নগদ বাকীর চেয়ে উত্তম তখন, যখন উভয়ের পরিমাণ ও উদ্দেশ্য সমান হয়।

কাফেরদের আরও একটি যুক্তি হল নিশ্চিত বিষয় অর্থাৎ ইহকাল সন্দিগ্ধ বিষয় অর্থাৎ আখেরাতের চেয়ে উত্তম। এ যুক্তিটি প্রথমটির তুলনায় অধিকতর ঠুনকো। কেননা, এর উভয় বাক্যই ভিত্তিহীন। উদাহরণতঃ নিশ্চিত বিষয় সন্দেহযুক্ত বিষয়ের চেয়ে উত্তম - এটা তখন সত্য, যখন উভয়টি সমান হয়- অন্যথায় নয়। বলা বাহুল্য, ব্যবসায়ী ব্যক্তি কষ্ট নিশ্চিতরূপেই করে এবং তার লাভ সন্দেহযুক্ত থাকে। বিদ্যার্থ বিদ্যান্বেষণে নিশ্চিতই পরিশ্রম ও অধ্যবসায় করে এবং তার ইস্পিত ডিগ্রী পর্যন্ত পৌছার বিষয়টি সন্দিগ্ধ থাকে। অনুরূপভাবে রোগী ঔষধের তিক্ততা অবশ্যই অনুভব করে। এতদসত্ত্বেও তার আরোগ্য লাভের বিষয়টি থাকে অনিশ্চিত। এসমস্ত ক্ষেত্রে সকলেই সন্দেহযুক্ত বিষয়ের জন্যে নিশ্চিত বিষয়কে বর্জন করে। ব্যাবসায়ী বলে, যদি আমি ব্যাবসা না করি, তবে কষ্ট করব এবং ভুখা থাকব। ব্যাবসায়ে পরিশ্রম কম এবং মুনাফা বেশী। রোগী বলে, ঔষধের তিক্ততা রোগের পরিণাম অর্থাৎ মৃত্যু ভয়ের তুলনায় অনেক কম। সুতরাং যে ব্যক্তি আখেরাতের ব্যাপারে সন্দেহই করে, তার বলা উচিত- জীবনের গোণাগুণতি কয়েকটি দিন সবর করা আমার জন্যে সেসব বিষয়ের তুলনায় উত্তম, যা আখেরাত সম্পর্কে মানুষ বলে থাকে। কেননা, ধরে নেয়া যাক, যদি আখেরাত মিথ্যাই হয়, তবে তাতে আমার ক্ষতি কি? জীবনের কয়েক দিনের বিলাসই তো নষ্ট হবে। জীবন লাভের পূর্বেও তো কতকাল অতিবাহিত হয়েছে, তখন আমি বিলাস করিনি। সুতরাং ধরে নেব, আমি অস্তিত্বই লাভ করিনি। পক্ষান্তরে যদি আখেরাত সত্য হয়ে যায়, তবে অনন্তকাল পর্যন্ত নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে, যা আমি সহ্য করতে পারব না।


হযরত আলী (রাঃ) জনৈক খোদাদ্রোহীকে বলেছিলেন : তুমি যা বলছ, তা সত্য হলে আমাদের উভয়ের কোন ক্ষতি নেই। আর যদি আমার কথা সত্য হয়ে যায়, তবে আমি মুক্তি পাব, আর তুমি বরবাদ হয়ে যাবে। হযরত আলী (রাঃ) এরূপ বলার কারণ এটা ছিল না যে, আখেরাত সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন; বরং খোদাদ্রোহীর বিশ্বাস অনুযায়ী তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন এবং বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তার আখেরাত অস্বীকার করা নিতান্তই অযৌক্তিক ও ভ্রান্ত।


কাফেরদের যুক্তির দ্বিতীয় বাক্য হচ্ছে ‘আখেরাত সন্দিগ্ধতা’। 

মূলত এটাও ভুল; বরং আখেরাত ঈমানদারদের মতে সুনিশ্চিত। এর দলীল দ্বিবিধ। এক, ঈমান, বিশ্বাস এবং পয়গম্বর ও সুধীজনের অনুকরণ। পয়গম্বর ও সুধীজনদের অনুসরণ করলে আখেরাত সম্পর্কিত সকল বিভ্রান্তির অবসান হয়ে যায়। জনসাধারণের বিশ্বাস এমনি ধরনের। এটা এমন, যেমন কোন রােগী তার রােগের ঔষধ কি, জানে না। এরপর সকল চিকিৎসক ও কবিরাজ এ বিষয়ে একমত হয়ে গেল যে, এ রােগের ঔষধ অমুক গাছের মূল। এখন রােগী চিকিৎসকদের মুখে একথা শুনামাত্রই নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করে নেবে এবং তাদের কাছে এর কোন প্রমাণ চাইবে না। 

আখেরাত নিশ্চিত হওয়ার দ্বিতীয় দলীল পয়গম্বরগণের জন্যে ওহী এবং ওলীগণের জন্য ইলহাম। এরূপ ধারণা করা উচিত নয় যে, নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কেবল জিবরাঈল (আঃ)-এর কাছ থেকে শুনে আখেরাতের বিশ্বাসী হয়েছিলেন। বরং পয়গম্বরগণের জন্যে প্রত্যেক বস্তুর স্বরূপ হুবহু খুলে দেয়া হয় এবং তারা সেই স্বরূপকে অন্তশ্চক্ষু দ্বারা এমনভাবে দেখে নেন, যেমন আমরা চর্মচক্ষু দ্বারা কোন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুকে দেখি। অতএব, তাঁরা যেসব সংবাদ দেন, স্বচক্ষে দেখে সংবাদ দেন- কেবল শুনে দেন না। সুতরাং আখেরাত সম্পর্কে নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনার বিশ্বাস ও আমাদের বিশ্বাসের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ।


কোন কোন ঈমানদার ব্যক্তি যখন নিজের কথাবার্তা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে আল্লাহর বিধানাবলী অমান্য করে এবং কামনা-বাসনা ও গোনাহে লিপ্ত হয়ে সৎকর্ম বর্জন করে, তখন তারাও আখেরাত সম্পর্কিত উপরোক্ত বিভ্রান্তিতে কাফেরদের সাথে শরীক হয়ে যায়। কেননা, তারাও পার্থিব জীবনকে আখেরাতের উপর অগ্রাধিকার দেয়। অবশ্য মূল ঈমানের কারণে তারা চিরন্তন আযাব থেকে বেঁচে যাবে এবং কিছুকাল দোযখ ভোগ করার পর মুক্তি পাবে। তবে তারা যে বিভ্রান্ত, এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, তারা স্বীকার করে যে, আখেরাত দুনিয়ার চেয়ে উত্তম। কিন্তু দুনিয়ার প্রতি ঝোঁক থাকা এবং দুনিয়াকে অবলম্বন করার কারণে কেবল ঈমান চিরন্তন সাফল্য লাভের জন্যে যথেষ্ট নয়। কোরআন শরীফ এর সাক্ষী। আল্লাহ বলেন 

>"নিশ্চয় আমি ক্ষমাশীল সেই ব্যক্তির জন্যে, যে তওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, অতঃপর সৎপথে থাকে”।

মোটকথা, যারা দুনিয়া নিয়েই সন্তুষ্ট, এর আনন্দ-উল্লাসে নিমজ্জিত এবং মৃত্যুকে খারাপ মনে করে, তারাই বিভ্রান্ত, কাফের হোক কিংবা মুসলমান। এ পর্যন্ত কাফেরদের বিভ্রান্তি ও তার প্রতিকার বর্ণিত হল। 


পরবর্তী পর্ব

গোনাহগারদের বিভ্রান্তি বর্ণনা

বিভ্রান্তি (পর্ব- ২) বিভ্রান্তির নিন্দা ও স্বরূপ



বিভ্রান্তি (পর্ব- ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিভ্রান্তির নিন্দা ও স্বরূপ- 
বিভ্রান্তির নিন্দার জন্যে নিম্নোক্ত দুটি আয়াতই যথেষ্ট-
>"পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে এবং বিভ্রান্ত না করে তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে বিভ্রান্তকারী শয়তান"।(সুরা ফাতির - ৫)
>"কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে বিপদগ্রস্ত করেছ, তোমরা, আমার অমঙ্গলের প্রতীক্ষা করেছ এবং সন্দেহ পোষণ করেছ। মোহ তোমাদেরকে আল্লাহর আদেশ (অর্থাৎ মৃত্যু) আসা পর্যন্ত বিভ্রান্ত করে রেখেছে এবং বিভ্রান্তকারী শয়তান তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে বিভ্রান্ত করেছে"।(সুরা আল-হাদীদ - ১৪)
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন : “সাবধানী ব্যক্তিদের নিদ্রা কতই না চমৎকার”।
মোটকথা, শিক্ষার শ্রেষ্ঠত্ব ও মূর্খতার নিন্দায় কোরআন ও হাদীসে যা কিছু বর্ণিত আছে, সবই বিভ্রান্তির নিন্দার জন্যে দলীল। কেননা, বিভ্রান্তিও এক প্রকার মূর্খতা।
বিভ্রান্তির স্বরূপ হল শয়তানের ধোকার কারণে এমন কোন বিষয় সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা, যা মনের খেয়ালখুশী ও খাহেশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। 
সুতরাং যে ব্যক্তি কোন অসার ধারণার বশবর্তী হয়ে বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের কোন কল্যাণে বিশ্বাসী হয়, সে বিভ্রান্ত। অধিকাংশ মানুষই আপন কল্যাণের ধারণা রাখে। অথচ তাদের এ ধারণা ভুল। এ থেকে জানা গেল যে, অধিকাংশ মানুষই বিভ্রান্ত। তবে কোন কোন মানুষের বিভ্রান্তি অপরের তুলনায় স্পষ্টতর ও কঠোরতর হয়ে থাকে। 
কঠোরতর বিভ্রান্তি দু’প্রকার - (১) কাফেরদের বিভ্রান্তি ও (২) গোনাহগারদের বিভ্রান্তি। 
পরবর্তী পর্ব
কাফেরদের বিভ্রান্তি ও তার প্রতিকার

বিভ্রান্তি (পর্ব- ১) বিভ্রান্তি সকল দুর্ভাগ্যের মূল



বিভ্রান্তি (পর্ব- ১)
 📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিভ্রান্তি সকল দুর্ভাগ্যের মূল-
প্রকাশ থাকে যে, সাবধানতা ও সতর্কতা মানুষের সৌভাগ্যের চাবিকাঠি আর বিভ্রান্তি ও অসাবধানতা দুর্ভাগ্যের সেতুবন্ধ। মানুষের প্রতি ঈমান ও মাগফেরাতের চেয়ে আল্লাহ তা’আলার বড় কোন নেয়ামত নেই এবং বক্ষের উন্মুক্ততা ছাড়া ঈমান ও মাগফেরাত লাভের কোন উপায় নেই। এমনিভাবে কুফর ও গোনাহের চেয়ে বড় কোন অনিষ্ট নেই এবং আন্তরিক অন্ধত্ব ও মূর্খতা ছাড়া অন্য কিছু এই অনিষ্টের কারণ হয় না। চক্ষুষ্মন ব্যক্তিবর্গকে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে অন্তর দান করা হয়েছে, তার শানে কোরআনুল করিমে বলা হয়েছে : 
>"কুলঙ্গির মত, যার মধ্যে আছে একটি প্রদীপ, প্রদীপটি একটি কাচের আবরণের মধ্যে রক্ষিত। কাচের আবরণটি একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র সদৃশ, যা প্রজ্বলিত হয় পবিত্র যায়তুন বৃক্ষের তৈল থেকে, যা পূর্বমুখীও নয় পশ্চিমমুখীও নয়, অগ্নিসংযোগ না করলেও মনে হয় তার তৈল আলো দিচ্ছে। নূরের উপর নূর"। (সুরা নূর - ২৪)
পক্ষান্তরে গাফেলদের অন্তরের অবস্থা এরূপ বর্ণিত হয়েছে- 
>"অতল সমুদ্রের মত, যাকে উদ্বেলিত করে তরঙ্গের পর তরঙ্গ, যার উপরে ঘনমেঘ, এক অন্ধকারের উপর আর এক অন্ধকার, যখন সে হাত বের করে, তখন তা দেখে না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দান করেন না, তার কোন জ্যোতি নেই"॥ (সুরা নূর - ৪০)
আল্লাহ তা'আলা সাবধানী লোকদের অন্তর ইসলামের জন্যে উন্মুক্ত করে দেন এবং গাফেল ও বিভ্রান্তদেরকে অন্তশ্চক্ষু দান করেন না। তারা খেয়াল-খুশীকেই নিজেদের পথপ্রদর্শক মনে করে।
মোটকথা, বিভ্রান্তি সকল দুর্ভাগ্যের মূল এবং সমস্ত বিনাশের উৎস বিধায় এর সেসব পথ বর্ণনা করা অত্যন্ত জরুরী, যেগুলো দিয়ে এই বিভ্রান্তি অধিক পরিমাণে আগমন করে।
গাফেল ও বিভ্রান্তদের শ্রেণী যদিও অনেক। কিন্তু চারটি শ্রেণীতে সবাই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। 
(১) আলেম, (২) আবেদ, (৩) সূফী, (৪) ধনাঢ্য ব্যক্তি। 
এসব দলেরও অনেক উপদল রয়েছে এবং তাদের বিভ্রান্তির কারণসমূহও বিভিন্নরূপ। উদাহরণতঃ কোন কোন লোক শরীয়তের অস্বীকৃত কর্মকে সকর্ম বলে মনে করে। যেমন, অবৈধ ধন-সম্পদ দ্বারা মসজিদ নির্মাণ করে তাতে কারুকার্য করে এবং একে সওয়াবের কাজ মনে করে। কেউ এ ব্যাপারে পার্থক্য করে না যে, নিজের জন্যে চেষ্টা-চরিত্র করে, না আল্লাহর জন্যে করে। কেউ জরুরী কাজ বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত থাকে। আবার কেউ ফরয কাজ বর্জন করে নফল কাজে মশগুল থাকে।
নিম্নে আমরা বিভ্রান্তির নিন্দা ও স্বরূপ উদাহরণসহ বর্ণনা করার পর সর্বপ্রথম 'আলেম' তথা শিক্ষিত ব্যক্তিদের বিভ্রান্তি বর্ণনা করার প্রয়াস পাব।

পরবর্তী পর্ব

শনিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৪

নফল নামায (পর্ব - ২৩) সালাতুত্তাসবীহ



নফল নামায - (পর্ব - ২৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সালাতুত্তাসবীহ্ 
এ নামাযটি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে হুবহু বর্ণিত আছে। এটা কোন সময় ও কারণের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এ নামায একবার পড়া থেকে কোন সপ্তাহ অথবা মাস খালি না থাকা মোস্তাহাব। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর পিতৃব্য আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে বললেন : আমি আপনাকে একটি বস্তু দিচ্ছি, একটি বিষয় শেখাচ্ছি। আপনি যখন এটা করবেন, তখন আল্লাহ তাআলা আপনার ভূত-ভবিষ্যৎ, পুরাতন ও নতুন, জানা ও অজানা এবং প্রকাশ্য ও গোপন সকল গোনাহ্ মাফ করে দেবেন। বিষয়টি এই,
আপনি চার রাকআত নামায পড়বেন। প্রত্যেক রাকআতে আলহামদু ও একটি সূরা পাঠ করবেন। যখন প্রথম রাকআতের কেরাআত শেষ হয়, তখন দন্ডায়মান অবস্থায় সোবহানাল্লাহি ওয়ালহামদু লিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার পনর বার, এরপর রুকু করে রুকুতে দশ বার এই কলেমা পড়বেন, এর পর দাঁড়িয়ে এই কলেমা দশ বার, এর পর সেজদা করে সেজদায় দশ বার, মাথা তুলে বসা অবস্থায় দশ বার, এভাবে প্রতি রাকআতে মোট পঁচাত্তর বার এই কলেমা পাঠ করে চার রাকআত নামায সম্পন্ন করবেন। সম্ভব হলে এ নামায প্রত্যেক দিন পড়ুন, নতুবা প্রত্যেক জুমআর দিনে একবার, এটাও সম্ভব না হলে মাসে একবার পড়ুন।
এক রেওয়ায়েতে আছে, শুরুতে সানা পড়বেন, এর পর পনের বার উপরোক্ত তসবীহ্ কেরাআতের পূর্বে এবং দশ বার কেরাআতের পরে পাঠ করবেন; রাকআতের অবশিষ্টাংশে প্রথম রেওয়ায়েতের অনুরূপ পাঠ করবেন; কিন্তু দ্বিতীয় সেজদার পর কিছুই পাঠ করবেন না। এই রেওয়ায়েত উত্তম। উভয় রেওয়ায়েত অনুযায়ী চার রাকআত এক সালামে এবং রাতের বেলায় চার রাকআত দু'সালামে পড়বে। কেননা, হাদীসে আছে- (রাতের নফল নামায দু'রাকআত করে)। উপরোক্ত, কলেমার পরে  وَلَا حَولَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيُّ الْعَظِيمِ কলেমা যোগ করা উত্তম। কতক রেওয়ায়েতে এ কলেমাও বর্ণিত হয়েছে।

উপরে বর্ণিত নফল নামাযসমূহের মধ্যে তাহিয়্যাতুল মসজিদ, গ্রহণের নামায ও বৃষ্টির নামায ছাড়া অন্য কোন নামায মাকরূহ ওয়াক্তে পড়া মোস্তাহাব নয়। ওযুর দু'রাকআত, সফরের দু'রাকআত, গৃহ থেকে বের হওয়ার নামায এবং এস্তেখারার নামায মাকরূহ ওয়াক্তে পড়া যাবে না। কেননা, এসবের কারণ দুর্বল এবং মাকরূহ ওয়াক্তে নামায পড়ার নিষেধাজ্ঞা জোরদার। অতএব এসব নামায প্রথমোক্ত তিন প্রকার নামাযের মর্তবায় পৌঁছে না। আমি কতক সূফীকে মাকরূহ ওয়াক্তে ওযুর দু'রাকআত নামায পড়তে দেখেছি। অথচ এটা নীতিবিরুদ্ধ। কেননা, ওযু নামাযের কারণ নয়; বরং নামায ওযুর কারণ হয়। কাজেই নামায পড়ার জন্যে ওযু করা উচিত। এটা নয় যে, নামায পড়বে ওযু করার জন্যে। যেব্যক্তি মাকরূহ ওয়াক্তে তার ওযু নামায থেকে খালি রাখতে চায় না, তার উচিত ওযুর পরে দু'রাকআত কাযার নিয়ত করা। কেননা, তার যিম্মায় কোন কাযা নামায থাকা সম্ভবপর। কাযা নামায মাকরূহ ওয়াক্তেও মাকরূহ নয়। কিন্তু মাকরূহ ওয়াক্তে নফলের নিয়ত করার কোন কারণ নেই। এসব ওয়াক্তে নফল নামায পড়তে নিষেধ করার পেছনে তিনটি বিষয় উদ্দেশ্য। 
প্রথম, সূর্যপূজারীদের সাথে সামঞ্জস্য থেকে আত্মরক্ষা করা।
দ্বিতীয়, শয়তান থেকে আত্মরক্ষা করা। হাদীস শরীফে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যখন সূর্যোদয় হয় তখন তার সাথে শয়তানের মস্তকের একটি প্রান্ত সংযুক্ত থাকে। সূর্য উপরে উঠে গেলে তা পৃথক হয়ে যায়। যখন ঠিক দ্বিপ্রহর হয় তখন আবার মিলিত হয়ে যায়। যখন ঢলে পড়ে তখন চলে যায়। এর পর যখন সূর্য অস্ত যেতে থাকে, তখন শয়তানের মাথা আবার সংযুক্ত হয় এবং অস্ত যাওয়ার পর আলাদা হয়ে যায়। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ তিন সময়ে পড়তে নিষেধ করে তার কারণ বলে দিয়েছেন। 
তৃতীয়, আধ্যাত্ম পথের পথিক সর্বদা নিয়মিত নামায পড়ে। এবাদত একই প্রকারে নিয়মিত করা পরিণামে বিষণ্ণতা সৃষ্টি করে। যদি এক ঘন্টা এবাদত বন্ধ রাখা হয় তবে প্রসন্নতা বৃদ্ধি পায় এবং ইচ্ছা নতুনতর হয়।
(সমাপ্ত)
************
প্রথম পর্বের লিংক


নফল নামায (পর্ব - ২২) হাজতের নামায



নফল নামায - (পর্ব - ২২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

হাজতের নামায
যেব্যক্তি গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হয়, ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের জন্যে তার উচিত হাজতের নামায পড়া। ওহায়ব ইবনুল ওরদ (রহঃ) বলেন: যেসব দোয়া অগ্রাহ্য হয় না, সেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, বান্দা বার রাকআত নামায পড়বে, প্রত্যেক রাকআতে আলহামদু, আয়াতুল কুরসী ও কুল হুওয়াল্লাহু পড়বে। এর পর সেজদা করতঃ এই দোয়া পড়বে-

سُبْحَنَ الَّذِي تَقَطَّفَ بِالْمَجْدِ وَتَكَرَمَ بِهِ سُبْحَنَ الَّذِي اخطى كُلَّ شَيْ بِعِلْمِهِ سُبْحَنَ الَّذِي لَا يَنْبَغِي التَّسْبِيحُ الَّا لَهُ سُبْحَنَ ذِي الْمَنِ وَالْفَضْلِ سُبْحَنَ ذِي الْعِزِ وَالْكَرِمِ سُبحن ذِي الطَّولِ اَسْئَلُكَ بِمَعَاقِدِ الْعِرْ مِن عَرشِكَ وَمُنْتَهَى الرَّحْمَةِ مِن كِتَابِكَ وباسمك الاعظم وَجَدَكَ الأعلى وكَلِمَاتِكَ التَّامَّاتِ الَّتِي لَا يُجَاوِزُهُنَّ بِر وَلَا فَاجِرُ أَنْ تُصَلَّى عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمد .

অর্থাৎ, পবিত্র সেই সত্তা, যিনি মাহাত্ম্যকে আপন চাদর করেছেন এবং তদ্দ্বারা মহৎ হয়েছেন। পবিত্র সেই সত্তা, যিনি আপন জ্ঞান দ্বারা প্রত্যেক বস্তুকে বেষ্টন করেছেন। পবিত্র সেই সত্তা, একমাত্র যাঁর জন্যে তসবীহ উপযুক্ত। পবিত্র, অনুগ্রহ ও কৃপাবিশিষ্ট সত্তা। পবিত্র ইযযত ও দানশীলতাবিশিষ্ট সত্তা। পবিত্র নেয়ামতবিশিষ্ট সত্তা। ইলাহী, আমি আপনার কাছে আপনার আরশের জন্যে উপযুক্ত ইযযতের মাধ্যমে এবং আপনার কিতাবের চূড়ান্ত রহমতের মাধ্যমে, আপনার উচ্চ শানের মাধ্যমে এবং আপনার পরিপূর্ণ কলেমাসমূহের মাধ্যমে, যা কোন সৎ ও অসৎ ব্যক্তি অতিক্রম করতে পারে না- এই প্রার্থনা করছি, মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর বংশধরের প্রতি রহমত নাযিল করুন।
এর পর আল্লাহ তাআলার কাছে নিজের প্রয়োজন প্রার্থনা করবে, যদি তা কোন গোনাহের বিষয় না হয়। ইনশাআল্লাহ এ প্রার্থনা কবুল হবে। ওহায়ব বলেন: প্রাচীন লোকগণ বলতেন, এ দোয়া বোকাদেরকে শিখিয়ো না। নতুবা তারা এর মাধ্যমে গোনাহের কাজে সাহায্য নেবে। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) এ রেওয়ায়েতটি রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন।


পরবর্তী পর্ব

নফল নামায (পর্ব - ২১) এস্তেখারার নামায



নফল নামায - (পর্ব - ২১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

এস্তেখারার নামায-
যেব্যক্তি কোন কাজ করার ইচ্ছা করে; কিন্তু কাজটি করা ভাল হবে কি না করা ভাল হবে, তা কিছুই জানে না, তাকে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দু'রাকআত নামায পড়তে বলেছেন। সে প্রথম রাকআতে আলহামদু ও সূরা কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকআতে আলহামদু ও সূরা এখলাস পাঠ করবে। নামাযান্তে এই দোয়া পাঠ করবে:

‎اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ وَاسْتَقْدِرُكَ بِقُدَرَتِكَ وَاسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلَا أَقْدِرُ وَتَعْلَمُ ولَا أَعْلَمُ وَأَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ إِنَّ هَذَا الأمر خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَدُنْيَايَ وَعَاقِبَةِ أَمْرِي وَعَاجِلِهِ فِيهِ وَإِن كُنت يَسِرُهُ لِى ثُمَّ بَارِكْ لِي واجِلِهِ فَقَدِرْه لِى ثُمَّ يَسرُهُ تَعْلَمُ إِنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرَتِي فِي دِينِي وَدُنْيَايَ وَعَاقِبَةِ أَمْرِى وَعَاجِلِهِ وَاجِلِهِ فَاصْرِفْهُ عَنِّى وَاصْرِفْنِي عَنْهُ وَقَدِرْ لِي

‎الْخَيْرَ حَيْثُ مَا كَانَ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .

হে আল্লাহ, আমি আপনার জ্ঞানের মাধ্যমে আপনার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করি, আপনার শক্তির মাধ্যমে আপনার কাছে শক্তি এবং আপনার মহান কৃপা প্রার্থনা করি। কেননা, আপনি শক্তিমান, আমার কোন শক্তি নেই। আপনি জানেন, আমি জানি না। আপনি অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে সবিশেষ জ্ঞাত। হে আল্লাহ, যদি আপনার জ্ঞানে এ কাজটি আমার ইহকাল, পরকাল, পরিণাম, দুনিয়া ও আখেরাতের জন্যে কল্যাণকর হয়, তবে এটি আমার জন্য অবধারিত করুন, অতঃপর একে আমার জন্যে সহজ করুন এবং এতে বরকত দিন। আর যদি আপনি জানেন, এ কাজটি আমার ইহকাল, পরকাল, পরিণাম, দুনিয়া ও আখেরাতের জন্যে ক্ষতিকর, তবে এ কাজ আমা থেকে এবং আমাকে এ কাজ থেকে দূরে রাখুন, আমার জন্যে কল্যাণ অবধারিত করুন, তা যেখানেই থাকুক না কেন। নিশ্চয়ই আপনি সর্ববিষয়োপরি ক্ষমতাবান।
হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে এস্তেখারার দোয়া কোরআনের আয়াতের ন্যায় গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা দিতেন। এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে, যখন তোমাদের কেউ কোন কাজ করার ইচ্ছা করে, তখন দু'রাকআত নামায পড়বে এবং সে কাজের নাম উল্লেখপূর্বক উপরোক্ত দোয়া করবে। 
জনৈক দার্শনিক বলেন : যেব্যক্তি চারটি বিষয় প্রাপ্ত হয়, সে চারটি বিষয় থেকে বঞ্চিত হয় না। যে শোকর প্রাপ্ত হয় সে অতিরিক্ত নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয় না; যে তওবা প্রাপ্ত হয় সে কবুল থেকে বঞ্চিত হয় না; যে এস্তেখারা লাভ করে সে মঙ্গল ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয় না এবং যে পরামর্শ প্রাপ্ত হয়, সে সঠিক পথ থেকে বঞ্চিত হয় না।


পরবর্তী পর্ব

নফল নামায (পর্ব - ২০) গৃহে গমন ও নির্গমনের নামায



নফল নামায - (পর্ব - ২০)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

গৃহে গমন ও নির্গমনের নামায
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: তুমি যখন গৃহ থেকে বের হও, তখন দু'রাকআত নামায পড়ে নাও। এটা তোমার অশুভ নির্গমনের জন্যে বাধা হবে। আর যখন তুমি গৃহে গমন কর, তখন দু'রাকআত নামায পড়ে নাও। এটা তোমাকে অকল্যাণ থেকে রক্ষা করবে। প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজও এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থ, গুরুত্বপূর্ণ কাজের শুরুতে দু'রাকআত নামায পড়ে নেয়া উচিত। এ কারণে এহরাম বাঁধার সময় দু'রাকআত, সফরের শুরুতে দু'রাকআত এবং সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের পর গৃহে যাওয়ার পূর্বে মসজিদে দু'রাকআত নামায পড়ার কথা হাদীসে বর্ণিত আছে। এগুলো রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কর্ম থেকে বর্ণিত। জনৈক সালেহ ব্যক্তি যখন কোন খাদ্য খেতেন অথবা পানি পান করতেন, তখন, দু'রাকআত নামায পড়ে নিতেন।

মানুষের কাজকর্ম তিন প্রকার- (১) কতক কাজ বার বার হয়ে থাকে, যেমন পানাহার। এ ধরনের কাজ বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা উচিত। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ "যেকোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' বলে শুরু না করলে অসম্পূর্ণ থাকে।

(২) কতক কাজ বার বার হয় না; কিন্তু তাতে গুরুত্ব থাকে। যেমন- বিবাহ, উপদেশ, পরামর্শ ইত্যাদি। এ ধরনের কাজ আল্লাহর হামদ ও প্রশংসা সহকারে শুরু করা মোস্তাহাব। উদাহরণতঃ যে বিবাহ দেয় সে বলবে, আলহামদু লিল্লাহ ওয়াসসালাতু আলা রাসূলিল্লাহ- আমি আমার কন্যা তোমার বিবাহে দিলাম এবং যে বিবাহ করে সে বলবে, আলহামদু লিল্লাহ ওয়াসসালাতু আলা রাসূলিল্লাহ- আমি বিবাহ কবুল করলাম। সাহাবায়ে কেরাম উপদেশ দান ও পরামর্শ করার কাজে প্রথমে আল্লাহর হামদ করতেন। 

(৩) কতক কাজ বার বার হয় না; কিন্তু হওয়ার পর বেশী দিন স্থায়ী থাকে এবং তাতে গুরুত্ব পাওয়া যায়। যেমন সফর করা, নতুন গৃহ ক্রয় করা, এহরাম বাঁধা ইত্যাদি। এ ধরনের কাজ করার পূর্বে দু'রাকআত নামায পড়া মোস্তাহাব। গৃহে আগমন ও গৃহ থেকে নির্গমন এগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন কাজ। এটাও যেন এক ছোট্ট সফর।

পরবর্তী পর্ব

বৃহস্পতিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৪

নফল নামায - (পর্ব - ১৯) ওযুর নামায


নফল নামায - (পর্ব - ১৯)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ওযুর নামায- 
ওযু করার পর দু'রাকআত নামায পড়া মোস্তাহাব। কারণ, ওযু একটি সওয়াবের কাজ। এর উদ্দেশ্য নামায পড়া। বে-ওযু হওয়ার আশংকা সব সময় লেগে থাকে। তাই নামাযের পূর্বেই ওযু ভঙ্গ হয়ে যাওয়ার এবং প্রথম ওযুর শ্রম নিষ্ফল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেমতে ওযু করার সাথে সাথে দু'রাকআত পড়ে নেয়া মোস্তাহাব, যাতে উদ্দেশ্য ফওত না হয়ে যায়। হযরত বেলাল (রাঃ) এর হাদীস থেকে এটা জানা গেছে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ আমি জান্নাতে প্রবেশ করে বেলালকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম তুমি আমার আগে এখানে পৌঁছে গেলে কিরূপে। বেলাল বললেন: আমি কিছু জানি না। কেবল এতটুকু জানি, যখন আমি নতুন ওযু করি তখনই দু'রাকআত নামায পড়ে নেই।

পরবর্তী পর্ব

নফল নামায (পর্ব - ১৮) তাহিয়্যাতুল মসজিদের নামায



নফল নামায - (পর্ব - ১৮)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তাহিয়্যাতুল মসজিদের নামায
তাহিয়্যাতুল মসজিদের নামায- 
এ দু'রাকআত নামায সুন্নত। জুমআর দিনে ইমাম খোতবা পাঠ করলেও এ নামায পড়া উচিত। যদি কেউ মসজিদে গিয়ে ফরয অথবা কাযা নামাযে ব্যাপৃত হয়, তবে তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় এবং সওয়াব অর্জিত হয়ে যায়। কেননা, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে মসজিদে যাওয়ার প্রারম্ভ এমন এবাদত থেকে শূন্য না হওয়া, যা মসজিদের জন্যে নির্দিষ্ট, যাতে মসজিদের হক আদায় হয়। এজন্যই ওযুবিহীন অবস্থায় মসজিদে যাওয়া মাকরূহ। যদি মসজিদ হয়ে অন্য দিকে যাওয়ার জন্যে অথবা মসজিদে বসার জন্যে প্রবেশ করে, তবে চার বার 'সোবহানাল্লাহ ওয়ালহামদু লিল্লাহ ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার' বলে নেবে। কথিত আছে, এর সওয়াব দু'রাকআত নামাযের সমান। ইমাম শাফেয়ীর মাযহাবে মাকরূহ সমস্তগুলোতে অর্থাৎ, আসর ও ফজর নামাযের পর সূর্য ঢলে পড়ার সময় এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় তাহিয়্যাতুল মসজিদের দুই রাকআত পড়া মাকরূহ নয়। কেননা, বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আসরের পর দু'রাকআত পড়লে কেউ আরজ করল : আপনি তো আমাদেরকে এ নামায পড়তে নিষেধ করেছেন? তিনি বললেন : এ দু'রাকআত নামায আমি যোহরের পরে পড়তাম, বাইরের লোক নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে আজ পড়তে পারিনি। এ হাদীস থেকে দুটি বিষয় জানা গেল- (১) এমন নামায পড়া এ সময়ে মাকরূহ, যার কোন কারণ নেই। নফল নামাযের কাযা একটি দুর্বল কারণ। কেননা, আলেমগণ এ সম্পর্কে একমত নন, নফলের কাযা পড়া উচিত কিনা এবং যে নফল কাযা হয়ে যায়, তার মত নামায পড়ে দিলে নফলের কাযা হয়ে যাবে কিনা। সুতরাং এই দুর্বল কারণের জন্যে যখন আসরের পর নফল মাকরূহ রইল না, তখন মসজিদে আসা, যা একটি পূর্ণাঙ্গ কারণ, তার জন্য আরও উত্তমরূপে মাকরূহ থাকবে না। এ কারণেই জানাযা এসে গেলে জানাযার নামায, গ্রহণের নামায ও বৃষ্টির নামায কোন সময়ই মাকরূহ নয়। কেননা, এসব নামাযের কারণ আছে। মাকরূহ সেই নামায হয়, যার কারণ নেই। (২) আরও জানা গেল, নফলের কাযা পড়া দুরস্ত। কেননা, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নফলের কাযা পড়েছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিদ্রার আধিক্য অথবা রোগের কারণে রাত্রি বেলায় উঠতে না পারলে দিনের বেলায় বার রাকআত পড়ে নিতেন। জনৈক আলেম বলেন যেব্যক্তি নামাযে থাকার কারণে মুয়াযযিনের আযানের জওয়াব দিতে পারে না, তার উচিত সালামের পর তা কাযা করে নেয়া, যদিও তখন মুয়াযযিন চুপ হয়ে যায়। যদি কারও কোন নির্দিষ্ট ওযিফা থাকে এবং ওযরবশতঃ তা আদায় করতে না পারে, তবে অন্য সময়ে তা আদায় করে নেবে, যাতে তার নফস আরামপ্রবণ না হয়ে উঠে। সুতরাং এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া একে তো নফসের মোজাহাদার জন্যে ভাল, দ্বিতীয়তঃ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "আল্লাহ তাআলার কাছে অধিক পছন্দনীয় আমল তাই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা কম"। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে আল্লাহর এবাদত করে, এরপর ক্লান্ত হয়ে ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তার প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন।

পরবর্তী পর্ব

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...