এখন গোনাহগারদের বিভ্রান্তি বর্ণনা করা হচ্ছে। তারা বলে - আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল। আমরা তার ক্ষমা আশা করি। অতঃপর এই আশার উপর ভিত্তি করে তারা সৎকর্মও বর্জন করে। তারা এর নাম রাখে “রাজা” অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি আশাবাদ। কারণ তারা জানে “রাজা” ধর্মের একটি প্রশংসনীয় বিষয়। মাঝে মাঝে তাদের এই আশাবাদের একটি দলীল হয়ে থাকে তাদের পিতৃপুরুষদের সৎকর্মপরায়ণ ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন হওয়া; যেমন সৈয়দ হওয়া। খোদাভীতি ও পরহেযগারীতে পূর্বপুরুষদের বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও তারা ধারণা করে যে, আল্লাহর কাছে তারা বাপ-দাদার চেয়েও বুযুর্গ। কেননা, বাপ-দাদারা খোদাভীতি ও পরহেযগারী সত্ত্বেও ভয়ে কম্পমান থাকতেন; কিন্তু তারা সকল প্রকার পাপাচার সত্ত্বেও নির্ভীক হয়ে থাকে। এটা চরম বিভ্রান্তি। তাদের মনে শয়তান এই ধারণা সৃষ্টি করেছে যে, যে কাউকে মহব্বত করে, সে তার বংশধরকেও মহব্বত করে। আল্লাহ তা'আলা যেহেতু তোমাদের বাপ-দাদাকে প্রিয় জানতেন, তাই তোমাদেরকেও প্রিয় জানবেন। অতএব, তোমাদের কর্ম করার প্রয়োজন কি? অথচ তারা একথা স্মরণ করে না যে, হযরত নূহ (আঃ) নিজের পুত্রকে নৌকায় নিজের সঙ্গে তুলতে চেয়েছিলেন এবং দোয়া করেছিলেন পরওয়ারদেগার, আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর হল - "হে নূহ ! নিশ্চয় সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে তো অসৎ"।
হযরত ইবরাহীম (আঃ) নিজের পিতার জন্যে দোয়া করেন; কিন্তু তা-নামনযুর হয়। মোটকথা, উপরোক্ত ধারণা ধোকা ও বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তা'আলা কেবল অনুগতদেরকেই ভালবাসেন এবং গোনাহগারকে অপছন্দ করেন যেমন, পিতা অনুগত হলে তার সন্তানরা গোনাহগার হলেও আল্লাহ। পিতাকে অপছন্দ করেন না। তেমনি পিতাকে মহব্বত করার কারণে তার গোনাহগার পুত্রকেও মহব্বত করেন না। এ ক্ষেত্রে মূল কথা হচ্ছে-
>"একজনের পাপের বোঝা অন্যজন বহন করবে না"।
যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, পিতার তাকওয়া ও খোদাভীতির কারণে সেও মুক্তি পেয়ে যাবে, সে এমন, যেমন কেউ মনে করে যে, পিতা পেট ভরে খেলে তারও পেট ভরে যাবে এবং সে পানি পান করলে তারও তৃষ্ণা মিটে যাবে। অথচ এরূপ মনে করা সম্পূর্ণ অবান্তর। এ থেকে জানা গেল যে, তাকওয়া ফরযে আইন। এতে পিতার তাকওয়া পুত্রের জন্যে যথেষ্ট হবে না। কিয়ামতের দিন তাকওয়ার ভিত্তিতেই বিচার হবে। তবে যে ব্যক্তির উপর আল্লাহর ক্রোধ অধিক হবে না, তার জন্যে সুপারিশের অনুমতি হবে এবং সুপারিশ তার জন্যে লাভজনক হবে।
এখন প্রশ্ন হয়, গোনাহগার ব্যক্তি বলে থাকে, আল্লাহ ক্ষমাশীল। আমি তার ক্ষমা আশা করি। তার এ দুটি বাক্যই তো নির্ভুল এবং মনে লাগে। এতে বিভ্রান্তি কিসের?
জওয়াব এই যে, শয়তান মানুষকে এমনি ধরনের বাক্য দ্বারা বিভ্রান্ত করে, যা বাহ্যত গ্রহণযোগ্য এবং ভেতরে প্রত্যাখ্যাত। বলা বাহুল্য, বাহ্যিক কথা সুন্দর না হলে মন বিভ্রান্ত হবে কেন? রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এই উক্তির রহস্য ফাঁস করে দিয়েছেন। এক হাদীসে তিনি বলেন -
>"বিজ্ঞ সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে অনুগত করে, মৃত্যু পরবর্তী সময়ের জন্যে আমল করে এবং নির্বোধ সেই ব্যক্তি, যে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয় এবং আল্লাহর কাছে আশা-আকাক্ষা করতে থাকে।
সুতরাং বাস্তবে এই হচ্ছে আমলহীন আশা-আকাঙ্ক্ষা, শয়তান যার নাম পাল্টে 'রাজা' দিয়েছে। মূর্খরা এতেই বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। অথচ 'রাজা' শব্দের ব্যাখ্যা আল্লাহ তাআলা এভাবে করেন,-
>"নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা হিজরত করেছে ও আল্লাহর পথে জেহাদ করেছে, তারাই আল্লাহর রহমত আশা করে। অর্থাৎ তারাই আশা করার যোগ্য।
হযরত হাসান (রহঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল: কোন কোন লোক বলে-আমরা আল্লাহর কাছে আশা রাখি এবং আমল করি না। তিনি বললেন : এটা তাদের খামখেয়ালী। যে ব্যক্তি কোন বস্তু আশা করে, সে তার অন্বেষণ করে। আর যে ব্যক্তি কোন বস্তুকে ভয় করে, সে তার কাছ থেকে দূরে পালায়।
মুসলিম ইবনে ইয়াসার বলেন : আমি একদিন এত জোরেশোরে সেজদায় গেলাম যে, আমার সামনের দুটি দাত ভেঙ্গে গেল। এটা দেখে কেউ বলল : আমরা তো আল্লাহর কাছে মাগফেরাত আশা করি। এজন্যে আমল করি না। মুসলিম জওয়াব দিলেন : এটা কস্মিনকালেও 'রাজা' তথা আশা নয়। মানুষ যে বিষয় আশা করে, তা তালাশ করে।
এর একটি দৃষ্টান্ত এই যে, এক ব্যক্তি আশা করে যে, সে সন্তানের পিতা হবে; অথচ সে এখনও বিবাহই করেনি কিংবা বিবাহ করে থাকলেও স্ত্রীর সাথে সহবাস করেনি। এরূপ ব্যক্তির সন্তানের পিতা হওয়ার আশা খামখেয়ালী নয় তো কি? এমনিভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার ক্ষমা ও রহমত আশা করে এবং তার ঈমানই নেই কিংবা ঈমান থাকলেও সৎকর্ম করেনি কিংবা সৎকর্মের সাথে সাথে অসৎকর্মও ছাড়েনি, সেও খামখেয়ালীতে লিপ্ত।
জানা উচিত যে, আশা দু’জায়গায় করা ভাল।
(এক)– আপাদমস্তক গোনাহগার ব্যক্তি। তার মনে যখন তওবা করার কল্পনা জাগে, তখন শয়তান তাকে এই বলে বিভ্রান্ত করে যে, তোর তওবা কবুল হবে না। এতে শয়তানের উদ্দেশ্য থাকে, তাকে নিরাশ করে দেয়া। এমতাবস্থায় নৈরাশ্য দূর করে আশা করা ওয়াজিব। সে স্মরণ করবে যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, তওবা কবুলকারী এবং তওবা একটি এবাদত, যা দ্বারা গোনাহ দূর হয়ে যায়। কোরআন শরীফে এর সমর্থন রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন :
>"বলে দিন, হে আমার বান্দা ! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করবেন। কারণ, তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে এস।
অতএব, মানুষ যখন তওবা সহকারে ক্ষমার আশা করবে, তখন তাকে আশাবাদী বলা উচিত হবে। নতুবা গোনাহ অব্যাহত রেখে মাগফেরাতের আশা করা খামখেয়ালী।
(দুই) – যে ব্যক্তি নফল এবাদতে ক্রটি করে এবং কেবল ফরয এবাদত করেই ক্ষান্ত থাকে, সে যদি নিজের জন্যে আল্লাহর সেই সমস্ত নেয়ামত ও ওয়াদা আশা করে, যা তিনি সৎকর্মপরায়ণদেরকে দিয়েছেন এবং এই আশার আনন্দে নফল এবাদতের প্রতি মনোনিবেশ করে, তবে তার এই আশা উত্তম। আল্লাহ বলেন
>"অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা, যারা আপন নামাযে বিনয় নম্র, যারা অসার কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে, যারা যাকাতদানে সক্রিয়, যারা আপন যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে তাদের স্ত্রী ও অধিকারভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলে তারা তিরস্কৃত হবে না। কেউ এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করলে সে হবে সীমালঙ্ঘনকারী এবং যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং যারা তাদের নামাযে যত্নবান, তারাই হবে অধিকারী ফেরদাউসের, যাতে তারা চিরকাল থাকবে"।
সুতরাং প্রথমোক্ত আশা দ্বারা তওবার প্রতিবন্ধক নৈরাশ্য খতম হয়ে যায় এবং দ্বিতীয় আশা দ্বারা এবাদতে স্ফূর্তির অন্তরায় অলসতা দূর হয়ে যায়। সারকথা, যে আশা তওবা করতে উদ্বুদ্ধ করে, তাকে বলা হয় 'রাজা'। আর যে আশা এবাদতে অলসতার কারণ হয়, তাকে বলা হয় বিভ্রান্তি ও খামখেয়ালী।
আজকাল অধিকাংশ লোক আমলে অলসতা করে। তারা আল্লাহর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আখেরাতের জন্যে চেষ্টা-চরিত্র করে না। এর কারণ এটাই যে, ভারা বিভ্রান্তিতে পড়ে আছে, যাকে 'রাজা' মনে করে নিয়েছে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন—
>এই উম্মতের শেষ যুগে বিভ্রান্তি প্রবল হবে। বাস্তবে তাই দেখা যায়। প্রথম যুগের লোকেরা অব্যাহতভাবে এবাদত করতেন। তারা যা-ই আমল করতেন, তাদের অন্তর ভয়ে পরিপূর্ণ থাকত; অথচ তারা সারারাত আল্লাহর এবাদতে কাটিয়ে দিতেন। এতদসত্ত্বেও নির্জনে নিজের জন্য কান্নাকাটি করতেন।
কিন্তু বর্তমান (হাজার+ বছর পূর্বের) যুগের অবস্থা এর বিপরীত। এখন মানুষ গোনাহে ডুবে থাকে, দুনিয়া নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকে এবং আল্লাহর প্রতি বিমুখ থাকে। এরপরও তারা শংকাহীন ও প্রশান্ত দৃষ্টিগোচর হয়। তারা বলে আমরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও কৃপার উপর আস্থা রাখি এবং তাঁর রহমত ও মাগফেরাত আশা করি। তারা যেন দাবী করে আমরা আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ এতটুকু জানি, যতটুকু পয়গম্বর ও সাহাবায়ে কেরাম জানতেন না।
হযরত মাকাল ইবনে ইয়াসার (রাঃ) -এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : এক সময় আসবে, যখন পরনের বস্ত্রের ন্যায় কোরআন মানুষের অন্তরে পুরাতন হয়ে যাবে। মানুষের কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষাই থেকে যাবে এবং এর সাথে ভয় মোটেই থাকবে না। কোন কাজ করলে তারা বলবে, এটা কবুল হবে এবং কোন অকাজ করলে বলবে এটা ক্ষমা পেয়ে যাব। এই হাদীস থেকে জানা গেল যে, মানুষ ভয়ের জায়গায় লালসাকে ব্যবহার করবে এবং কোরআনে উল্লিখিত ভয়ের আয়াত সম্পর্কে মূখ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা খৃস্টানদের এ অবস্থাই বর্ণনা করে বলেন "তাদের পেছনে আগমন করল কিতাবের উত্তরাধিকারীগণ, যারা তুচ্ছ জীবনের সামগ্রী গ্রহণ করে এবং বলে আমাদেরকে ক্ষমা করা হবে।
এখানে বিভ্রান্তদেরকে প্রধানত চার শ্রেনীতে বিভক্ত কর হয়েছে।
(১) শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি
(২) সংসারত্যাগী ও এবাদতকারীদের বিভ্রান্তি
(৩) সুফিগণের বিভ্রান্তি ও
(৪) বিত্তশালীদের বিভ্রান্তি।
পরবর্তী পর্ব









