প্রথম প্রকার সূফীদের বিভ্রান্তি
সুফীগণের মধ্যে অনেক শ্রেনীর রয়েছে তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি প্রবল থাকে। এক শ্রেনীর সুফীর নীতি এই যে, তারা সাচ্চা সুফীগণের ন্যায় পোষাক, আঁকার-আকৃতি, ভাষা, আদব-কায়দা, রীতিনীতি পরিভাষা তৈরী করে এবং বাহ্যিক দিক দিয়ে তাদের অনুরূপ হয়ে থাকে। উদাহরনতঃ তারা রাগ-রাগীনি শ্রবন করে, ভাবতিশয্যে নর্তন কুর্দন করে, জায়নামাজে মাথা নত করে চিন্তাশীলদের ন্যায় বসে,দীর্ঘ শ্বাস নেয়, ক্ষীনস্বরে কথা বলে। এতেই তারা বিভ্রান্তিবশত মনে করে যে,সুফী হয়ে গেছে। অথচ তারা নিজেদেরকে কঠোর পরিশ্রম ও সাধনায় অভ্যস্ত করেনা। এবং নিজেদেরকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ গুনাহ থেকে পবিত্র করেনা। যা সাচ্ছা সুফীগণের মধ্যে মামুলী বিষয় বলে পরিগণিত হয়। কেউ এই সব বিষয় আরম্ভ করে দিলেও নিজেকে সুফী বলে গন্য করতে পারেনা এবং বড়বড় কথা বলতে পারেনা। এমতাবস্থায় যারা হারাম ও সন্দেহযুক্ত ধন সম্পদের বাছ বিছার করেনা। টাকা পয়সা দেখলে লাফিয়ে পড়ে। সামান্য বিষয়ে হিংসাবিদ্বেষ পোষন করে। কেউ সামান্য বিপরীত কথা বললে তার মান হানি করতে উদ্যত হয়, তারা কিভাবে সুফী হতে পারে? কিয়ামতের দিন যখন এই মেকী সুফীর দল আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে, যিনি বাহ্যিক ছেড়াবাস নয় বরং অন্তরের অবস্থা দেখেন। তখন তাদের দুর্দশার অন্ত থাকবেনা।
দ্বিতীয় প্রকার সূফীদের বিভ্রান্তি-
আরেক শ্রেনীর সুফীর আবার যেনতেন পোষাক পড়তে রুচীতে বাধে, আবার সুফী হওয়ার বাসনাও প্রবল। সুফীগণের পোষাক ছারা যেহেতু সুফী হওয়া যায়না, তাই তারা উৎকৃষ্ট খন্ড খন্ড কাপরের জোরা দিয়ে বিচিত্র ধরনের পোষাক তৈরী করে, যা রেশমী কাপড়ের ছেয়েও মুল্যবান। তারা মনে করে যে, পোষাকে তালি লাগিয়েই তারা সুফী হয়ে গেছে। পূর্ববর্তী সুফীগণ তালিযুক্ত পোষাক পরিধান করিতেন। তাই তারাও উৎকৃষ্ট খন্ড খন্ড পোষাককে তালিযুক্ত করে নেয়। অথচ বুঝা কঠিন যে, মুল্যবান বস্ত্রগুলি খন্ড খন্ড করে তালিযুক্ত করে তারা পূর্ববর্তী সুফীগণের অনুসরন হয়ে গেল কিরূপে?
বলাবাহুল্য তাদের এই খামখেয়ালী সকল বিভ্রান্তিকে ছারিয়ে গেছে। কেননা তারা মুল্যবান পোষাক পরে, সুস্বাদু খাবার খায়, যালেম ও পাপাসক্তদের অর্থ দুহাতে গ্রহন করে। এবং বাহ্যিক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকেনা, আন্তরিক গুনাহের কথা নাইবা বলা হল। এর পরও তারা সুফী বলে থাকে এবং নিজেদেরকে উত্তম মনে করতে থাকে। তাদের অনিষ্ট সাধারণ মানুষদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করে। কেননা যারা তাদের অনুসরণ করে, তারা তাদের মত বরবাদ হয়ে যায়। আর যারা অনুসরণ করেনা তাদের বিশ্বাস সুফী সম্প্রদায়ের প্রতি শিথিল হয়ে যায়। সকলকেই তারা এরূপ মনে করে। ফলে সত্যিকার সুফীগণ সম্পর্কে বিরূপ সমালোচনা করতে তারা দ্বিধা করেনা। বলাবাহুল্য এটা এই তথাকথিত সুফীদের কুকর্মেরই ফল।
তৃতীয় প্রকার সূফীদের বিভ্রান্তি
আরেক শ্রেনীর সুফী মারেফত জ্ঞানের দাবী করে, তারা বলে আমরা সকল মকাম ও হাল অতিক্রম করেছি, সর্বদা হকের মোশাহাদা করি এবং আল্লাহ্'র সান্নিধ্যে পৌছে গেছি।অথচ তারা এইসব বিষয়ের নাম ও শব্দই শুনেছে - এগুলোর স্বরূপ, শর্ত, আলামত ও বাধা-বিপত্তি সম্পর্কে কিছুই জানেনা। তারা মারেফত-ওয়ালাদের কিছু বিপরিত ধর্মী কথাবার্তা শিখে নেয় এবং সেগুলিই গেয়ে ফিরে। তাদের মতে এগুলি অত্যাধিক উচ্চস্থরের কথা। ফলে তারা আবেদ ও আলেমদেরকে মোটেই যোগ্য মনে করেনা। আবেদদের সম্পর্কে বলে এরা পরিশ্রমী শ্রমিক। আর আলেমদের সম্পর্কে বলে, এরা আল্লাহ্ থেকে আড়ালে। অথচ আল্লাহ্ তা'আলার কাছে এই ধরনের সুফীরাই মুনাফিক, বদকার, নির্বোধ ও মুর্খ। এরা না শিক্ষা গ্রহন করে, না চরিত্র সংশোধন করে এবং না অন্তরের হেফাজত করে। কেউ কেউ বলে, বাহ্যিক আমল ধর্তব্য নয়। আল্লাহ্ তায়ালা অন্তরকে দেখেন। আমাদের অন্তর আল্লাহর মহব্বতে পাগল পারা। দুনিয়াতে আমরা দেহের পিন্জরে আবদ্ধ। আর অন্তর অসীম-এর আস্তানা প্রদক্ষিনরত। আমরা সর্বসাধারণের স্থর থেকে অনেক উর্ধে চলে গেছি। সুতরাং দৈহিক আমল দ্বারা আত্মসংশোধনের প্রয়োজন নেই। যেহেতু আমরা মারেফতে শক্তিশালী, তাই কামনা ও খায়েশ আমাদেরকে আধ্যাত্মপথে বাঁধা দিতে পারেনা। তাদের এই সব কথাবার্তা থেকে বুঝাযায় যে, তারা পয়গম্বরগণের স্থরও অতিক্রম করে গেছে।
চতুর্থ প্রকের সূফীদের বিভ্রান্তি-
কতক সুফী দাবি করেযে তারা আল্লাহর আশেক ও তার মহব্বতের জালে আটকা পড়েছে। সম্ভবত তারা আল্লাহ্ সম্পর্কে এমন ধারনা পোষন করে, যেগুলো বিদআত অথবা কুফর হওয়া বিচিত্র নয়। তারা মারেফতের পূর্বেই মহব্বতের দাবি করে। অথচ কতক কাজ এমন করে যা আল্লাহর পছন্দনীয় নয়। যেমন আল্লাহর কাজের উপর নিজের খাহেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া, লোক লজ্জার কারণে কোন কোন কাজ না করা ইত্যাদি। এগুলো যে মহব্বতের পরিপন্থী সে কথা তারা জানেইনা। কতক লোক আহার, পোষাক ও বাসস্থানের হালাল তালাশ করেনা, অন্যেন্য ক্ষেত্রে হালালের জন্য আপ্রান চেষ্টা করে। তারা জানেনা যে আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার প্রতি না কেবল হালাল অন্নের জন্য সন্তুষ্ট হবেন; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হালাল অন্ন খাওয়া সহ সকল এবাদত করা জরুরী এবং সকল গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। যে মনে করে সামান্য বিষয় দ্বারাই সিদ্ধিলাভ হবে, সে বিভ্রান্ত। আধ্যত্ন পথ অতিক্রম করার জন্য যত প্রকার বিভ্রান্তি হতে পারে, সেগুলি পুরোপুরি বর্ণনা করার জন্য বিরাট পুস্তক দরকার। এলমে মোকাশাফার বিশদ বর্ণনা ছারা সবগুলো বিভ্রান্তি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। অথচ এলেমে মোকাশাফা বর্ণনা করার অনুমতি নেই।
পরবর্তী পর্ব









