📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)
হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন : আল্লাহ তা'আলা একজন ফেরেশতা সৃষ্টি করেছেন, যার বিরাটকায় দেহের এক বাহু দুনিয়ার পূর্বপ্রান্তে এবং অপর বাহু দুনিয়ার পশ্চিম প্রান্তে মাথা আরশের সন্নিকটে এবং পদদ্বয় যমীনের সপ্তম তবককেও অতিক্রম করেছে। তাকে সমগ্র জগতে বিস্তৃত সৃষ্টির সমপরিমাণ পর-পাখা দেওয়া হয়েছে। আমার উম্মতের মধ্যে কোন পুরুষ বা নারী যখন আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে, তখন আল্লাহ তাআলা সেই ফেরেশতাকে এই মর্মে নির্দেশ প্রদান করেন যে, সে যেন আরশের নীচে অবস্থিত নূরের সাগরে ডুব দেয়।
আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুযায়ী সে দরিয়াতে নিমজ্জিত হয়ে বাহির হয় এবং সর্ব শরীর ঝাড়া দেয়। ফলে তার অসংখ্য পাখনাহতে অগণিত পানি বিন্দু ঝরে পড়ে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কুদরতের দ্বারা ফেরেশতার গা থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি বিন্দু হতে এক একজন ফেরেশতা সৃষ্টি করেন। এই অসংখ্য অগণিত ফোবশতা দরুদ পাঠকারী ব্যক্তির জন্য কিয়ামত পর্যন্ত গুনাহ মাফীর দো'আ করতে থাকে।
ফকীহ আবুল-লাইস (রহঃ) বলেছেন : ‘ কারও অন্তঃকরণে আল্লাহর ভয়-ভীতি আছে কি-না? এ বিষয়ে তুমি যদি জানতে চাও, তাহলে সাতটি আলামত ও লক্ষণের প্রতি লক্ষ্য কর।
(১) এ আলামতটি জিহবার সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, তার জিহ্বা মিথ্যা, বানোয়াট, গীবত, চুগলি, অপবাদ, অপ্রীতিকর কথাবার্তা ও অহেতুক বাক্যালাপ হতে বিরত থাকবে এবং সর্বদা আল্লাহর যিকর, কুরআন তিলাওয়াত ও দ্বীনি ইলমের চর্চায় নিমগ্ন থাকবে।
(২) দ্বিতীয় আলামত অন্তরের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, —অন্যের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা, অহেতুক কাউকে দোষারোপ করা এবং হিংসা, বিদ্বেষ প্রভৃতি ব্যাধি হতে সে সম্পূর্ণ মুক্ত-পবিত্র থাকবে। হাদীস শরীফে আছে : "হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে গ্রাস করে ফেলে, যেমনঅগ্নি কাষ্ঠকে জ্বালিয়ে শেষ করে দেয়।” এ কথা স্মরণ রাখতে হবে এবং সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে যে, হিংসা বিদ্বেষ মানব হৃদয়ের একটি দুরারোগ্য ব্যাধি। এ ধরণের আরও অসংখ্য ব্যাধি রয়েছে। এগুলো হতে নিষ্কৃতি পেতে হলে পরিপক্ক ইলম ও সনিষ্ঠ আমলের একান্ত প্রয়োজন।বস্তুতঃ উক্তরূপ ইলম ও আমলের সমন্বিত সাধনা ও পরিশ্রমের মাধ্যমেই আধ্যাত্মিক ব্যাধিসমূহ থেকে আত্মরক্ষা করা অথবা এসব রোগের সুচিকিৎসা করা সম্ভব হতে পারে।
(৩) তৃতীয় আলামত চক্ষু বা দৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, খোদাভীরু ও পরহেযগার ব্যক্তি স্বীয় দৃষ্টিকে হারাম খাদ্যদ্রব্য, নিষিদ্ধ পানীয় বস্তু, হারাম লেবাস -পোষাক থেকে হিফাযত করবে এবং পার্থিব বস্তুনিচয়ের প্রতি কখনও লোলুপ দৃষ্টি করবে না। বরং আল্লাহর অনুপম সৃষ্টি ও কুদরতের প্রতি দৃষ্টি করে শিক্ষা ও সবক হাসিল করবে। হারাম ও নিষিদ্ধ পদার্থের প্রতি মোটেও ভ্রুক্ষেপ করবে না।
(৪) চতুর্থ আলামত উদরের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, —পরহেযগার ব্যক্তি স্বীয় উদরকে হারাম পন্থায় উপার্জিত রিযিক হতে হিফাযত করবে। কেননা এহেন রিযিক ভক্ষণ করা স্বতঃসিদ্ধ মহাপাপ। হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন ‘ আদম সন্তানের উদরে যখন হারাম খাদ্যের কোন লুকমা পতিত হয়, তখন যমিন আসমানের সকল ফেরেশতা তার উপর লানত ও আভিশাপ দিতে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই লুকমা তারপেটে মওজুদ থাকে। আর যদি উক্ত লুকমা পেটে থাকা অবস্থায় সে মারা যায়, তাহলে তার ঠিকানা হয় জাহান্নাম।
(৬) ষষ্ঠ আলামত পদদ্বয়ের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, পরহেযগার ব্যক্তির পদদ্বয় আল্লাহ্ তা'আলার নাফরমানী ও অবাধ্যতার কাজে ব্যবহার হবে না। বরং সর্বদা আল্লাহর আনুগত্যও সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহৃত হবে এবং উলামা, মাশায়েখ ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের প্রতি বেগবান হবে।
(৭) সপ্তম আলামত ইবাদত ও রিয়াযত। অর্থাৎ, খালেস ও নেক নিয়তে একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদত-বন্দেগী ও সাধনা-পরিশ্রমে নিমগ্ন থাকবে। বস্তুতঃ মানবের উচিত এটাই যে, সর্ববিধ সাধনা ও ইবাদতের মূলে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ রাব্বুল-আলামীনের রেযা ও সন্তুষ্টিকেই সামনে রাখবে। এতে কোনরূপ রিয়াকারী, লোকদেখানো মনোবৃত্তি ও কপটতাকে প্রশ্রয় দিবে না।এ বিষয়ে সাফল্য অর্জন করতে পারলে সে ঐসব মহান ও ভাগ্যবান লোকের অন্তর্ভুক্ত হবে, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন : "মুত্তাকীদের জন্য রয়েছে তোমার প্রতিপালকের নিকট আখেরাতের কল্যাণ।" (যুখরুফ ! ৩৫)
অন্যত্র ইরশাদ করেছেন।"মুত্তাকীগণ থাকবে ঝর্ণাবহুল জান্নাতে"। (হিজর : ৪৫ )
আরও ইরশাদ করেছেন: "মুত্তাকীগণ থাকবে জান্নাতে ও ভোগ-বিলাসে" ( তুর :১৭ )
আরও ইরশাদ হয়েছে – "মুত্তাকীগণ থাকবে নিরাপদ স্থানে"।(দুখান ! ৫২)
উপরোক্ত আয়াতসমূহে আল্লাহ্ তাআলা প্রকারান্তরে এ ঘোষণাই করেছেন যে, কিয়ামতের দিবসে দোযখের অগ্নি হতে তারা অবশ্যই মুক্তি পাবে। ঈমানদার ব্যক্তি উচিত, যেন সে ভয় ও আশার মধ্যবর্তী স্থানে স্থিত থাকে। কেননা, এরূপ ব্যক্তিই কেবল আল্লাহ তাআলার রহমত অনুগ্রহের আশা করতে পারে এবং তার নিকট ক্ষমাপ্রাপ্তির বিষয়ে নিরাশ ও হয় না।
আল্লাহ তা'আলা বলেন– “তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না"। (যুমার : ৫৩)
একদা হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম নিজ গৃহে বসে পবিত্র যবুর কিতাব তিলাওয়াত করছিলেন। এমন সময় একটি গর্ত হতে লাল বর্ণের একটি কীট বের হয়। হযরত দাউদ(আ.)-এর দৃষ্টি সেই কীটের উপর পতিত হলে তার মনে প্রশ্নের উদ্রেক হয় যে, আল্লাহ তা'আলা এই কীটটিকে কি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন ; এর রহস্য ও তাৎপর্য কি?
তখন আল্লাহ্ তাআলা সেই কীটটিকে বাকশক্তি দান করে নবীর প্রশ্নের জওয়াব দিতে আদেশ করলেন।
হে আল্লাহর নবী। এখন বলুন, আপনি আমার সম্পর্কে কি মন্তব্য করছেন ; আমি আপনার দ্বারা উপকৃত হতে চাই। কীটের মুখে একথা শুনে হযরত দাউদ (আ.) অনুশোচনায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং ভীত-শঙ্কিত হয়ে তওবা করে নিজেকে আল্লাহর সোপর্দ করলেন।
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন স্বীয় পদম্খলনের কথা স্মরণ করতেন, তখন সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তেন এবং দূর হতে তাঁর বুকের ধড়ফড় আওয়ায শুনা যেতো।
এমনি এক অবস্থার সময় একদা আল্লাহ্ তাআলা হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে বললেন, –মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং জিজ্ঞাসা করেছেন যে, আপনি কি এমন কোন লোক দেখেছেন, যে তার বন্ধুকে ভয় করে?

