মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৪

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১৭) বিচার জগতের তত্ত্বকথা



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ১৭)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

বিচার জগতের তত্ত্বকথা 
জেনে রাখুনমানব প্রাণের বিশেষ একটি প্রত্যাবর্তন স্থল রয়েছে। লোহাকে যেভাবে চুম্বক টেনে নেয়তেমনি টেনে নেয় প্রাণকে তার উৎসভূমি। সে জায়গার নাম হল, ‘হাযিরাতুল কুদস’ বা পবিত্র মজলিস। সব প্রাণই দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেখানকার ধারক প্রাণ বা শ্রেষ্ঠতম প্রাণের সাথে মিলিত হয়। রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সে প্রাণের আখ্যা দিয়েছেন বহুমুখী ও বহু ভাষী প্রাণ। এ সমাবেশ স্থলকে স্বরূপ জগত বা উপমা জগত যা ইচ্ছা বলতে পারেন। সেখানে মানব জাতির আদি নকশা বা চিত্র তৈরী হয়। এখানে ব্যক্তি বিশেষের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যমূল রীতি-নীতি ও কার্য-কলাপ লোপ পেয়ে তা মানব জাতির সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যের ও বিধি-বিধানের সাথে একাত্ম হয়। অন্য কথায়তার জড় বৈশিষ্ট্যের ওপর আত্মিক বৈশিষ্ট্যের বা রূপের ওপর স্বরূপের প্রাধান্য ঘটে এবং সেটাই অবশিষ্ট থাকে। 
কথাটির ব্যাখ্যা এইকিছু ব্যাপার মানুষের নেহাৎ ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যমূলক। সেগুলোই একটি মানুষকে অপর মানুষ থেকে পৃথক করে দেখায়। তেমনি কতকগুলো ব্যাপার সব মানুষের ভেতর সমানে পাওয়া যায়। সুতরাং যে ব্যাপারগুলো সব মানুষের ভেতরই সমভাবে বিদ্যমানস্বভাবতই সেগুলো মানবের জাতিগত বৈশিষ্ট্য। সেগুলোই হল মানব প্রকৃতি।
 প্রতিটি মানব শিশু তার প্রকৃতির ধর্ম (ইসলাম) নিয়ে জন্ম নেয় তার মা-বাপ (পরিমণ্ডল) তাকে অন্যান্য ধর্মে দীক্ষা দেয়’ হাদীসটি এ সত্যেরই প্রমাণ দেয়। 

সৃষ্টির প্রত্যেকটি জাতির বিশেষ প্রকৃতি বা রীতি-নীতির দুটি দিক রয়েছে। তার একটি দিক হল বাহ্যিক। যেমন তার জন্মআকৃতিবর্ণ পরিমাপস্বর ইত্যাদি। যে সত্তার ভেতর যে শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া যাবেতাকে সেই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ধরা হবে। কারণউপাদানে অভাব বা ত্রুটি না থাকলে শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্য ও চাহিদা মতেই সৃষ্টিটি গড়ে উঠবে। যেমনমানুষ মাত্রেই সরল আকৃতিরবাকসম্পন্ন ও মসৃণ ত্বকবিশিষ্ট হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে ঘোড়ার বাঁকা গড়নহ্রেষারবরোমশ চর্ম ইত্যাকার বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হয়। 
এ শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্য তার অন্তর্ভুক্ত কোন সত্তায়ই অবর্তমান হতে পারে না। হতে পারে যদি ভেতর বা বাইরের কোন কারণ তার প্রকৃতি বদলে দেয়। প্রতিটি শ্রেণীর রীতি-নীতিও ভিন্ন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন নামধুমক্ষিকাকে আল্লাহ কিরূপ দিব্যজ্ঞান দিয়েছেন যেবিভিন্ন গাছের ফল-ফুল থেকে সে খুঁজে খুঁজে মধু আহরণ করেসুনিপুণ ভাবে ঘর তৈরি করেঘরকেই আবার মধুর আকরে পরিণত করে
পাখীদের দেখুন। আল্লাহ তাদের সহজাত শিক্ষা দিলেন পুং পাখী স্ত্রী পাখীর প্রতি আসক্ত হবে এবং জোড়া মিলে বাসা বানাবে। সেখানে ডিম দেবে। ডিম থেকে বাচ্চা হবে। বাচ্চাকে যথাযথ ভাবে তারা লালন-পালন করবে। বাচ্চা বড় হলে তাদের বাপ-মা শিখিয়ে দেয়কোথায় পানি পাবে আর কোথায় পাবে খাদ্য। কি ভাবে শত্রু থেকে বাঁচতে হবে তাও শিখিয়ে দেয়। শিকায় কিভাবে বিড়াল আর শিকারী থেকে পালাতে হবে সে পদ্ধতি। কল্যাণ কোন পথে আসবে এবং নিজ জাতি ও মানব জাতির সৃষ্ট অকল্যাণ থেকে বাঁচার উপায় কিসবই সবিস্তারে বুঝিয়ে দেয়। কোন বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন লোক কি বলতে পারবেএ সব বিধি-বিধান জাতিগত চাহিদার অনুকূল নয় কিংবা কোন সম্পর্ক নেই এ সবের সেই পাখিকুলের সাথেজানা দরকারব্যক্তি সত্তার সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে জাতিগত বা শ্রেণীগত এ সহজাত বিধানের পূর্ণ আনুকূল্যের ভেতর। তাই শ্রেণীগত রীতি-নীতির বিরোধিতা করা কোন ব্যক্তি সত্তার জন্যই কল্যাণকর নয়। এ জাতিগত বিধানের তারতম্যের কারণেই সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের প্রশ্নে ব্যক্তি সত্তার ক্রিয়া-কলাপে পার্থক্য দেখা দেয়। যতক্ষণ ব্যক্তি তার শ্রেণীগত রীতির ওপর বহাল থাকেততক্ষণ তার কোনই দুর্ভোগ আসে না। কিন্তু বাইরের প্রভাবে যখনই ব্যক্তি জাতীয় স্বভাবের বাইরে চলে যায়দুর্ভোগ তার জন্য অপরিহার্য হয়। এটা যেন ঠিক মানুষের কোন অংগ-প্রত্যংগ বাইরের কোন আঘাত পেয়ে পংগু বা অচল হয়ে গেল। মহানবী (
সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এ হাদীসটি তারই ইংগিত দেয়ঃ 
প্রতিটি মানব শিশু নিজ প্রকৃতি (ইসলাম) নিয়ে জন্মে। তার বাপ-মা তাকে পরে ইহুদীনাসারা বা মাজুসী করে গড়ে তোলে 

জানা দরকারমানব প্রাণের পবিত্র দরবারে (হাযিরাতুল কুদস) উপনীত হবার দুটো পদ্ধতি রয়েছে। কোন প্রাণ নিজ সাহস ও দিব্য সৃষ্টির বদৌলতে সরাসরি সেখানে পৌঁছে। কোন প্রাণকে পুরস্কার বা শাস্তিদানের জন্য সেখানে রূপ দিয়ে নেয়া হয়। সাহস ও দিব্যদৃষ্টি নিয়ে পৌঁছার অর্থ হল এইযে ব্যক্তি জৈবিক অনাচার ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত রয়েছেতার প্রাণ সরাসরি পবিত্র দরবারে পৌঁছে যায়। তখন সেখানকার কিছু কিছু ব্যাপার সে জানতেও পায়। মহানবী (
সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এ হাদীস তার ইংগিত দেয়ঃ 
আদম ও মূসা নিজ প্রভুর দরবারে উপস্থিত রয়েছেন 
এ ছাড়া বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তাঁর কয়েকটি হাদীসেই বলা হয়েছেঃ 
পুণ্যবানদের প্রাণ শ্রেষ্ঠতম প্রাণের (রূহে আজম) পাশে সমবেত হয়। দ্বিতীয় ধরনের উপনীত হবার ব্যাপারটি হল এইকেয়ামতের দিন আবার মানব দেহকে প্রাণ দান করে উত্থিত করা হবে। এটা কোন নতুন জীবন নয়। আগের জীবনের এটা উপসংহার মাত্র। বেশি খেয়ে কারো বদ হজম হলে যেমন অসুস্থতার পর নতুন স্বাস্থ্য ফিরে পায়এও তেমনি ব্যাপার। যদি তা না হততা হলে ভিন্ন মানুষ হয়ে যেত। ফলে মৃত্যুপূর্ব মানুষটির জন্য মৃত্যুপরবর্তী নতুন মানুষটির কর্মফল ভোগ সংগত হত না। 

বাইরে আমরা যে সব বস্তু দেখছি তার অনেকটাই স্বপ্নে দেখা বস্তুর মত। বস্তু সত্তার ধারণাটি রূপ নিয়ে ধরা দেয়। যেমন হযরত দাউদের (আঃ) কাছে ফেরেশতা ঝগড়ারত অবস্থায় এসে বিচার প্রার্থী হলেন। দাউদ (আঃ) সংগে সংগে বুঝে ফেললেনউরিয়ার স্ত্রী বিচারের তিনি যে ভুল করেছেনসেটাকেই বস্তুরূপ দিয়ে ফেরেশতারা তাঁর সামনে তুলে ধরছেন।–[এ ঘটনাটির বিশুদ্ধতা যদিও প্রশ্নাতীত নহেতথাপি কোন কিছু বুঝাবার জন্য উপমা হিসেবে ব্যবহার করা আপত্তিকর হতে পারে না।]
অমনি তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন। এভাবে (শবে মেরাজ) মহানবীর সামনে ফেরেশতারা এক পেয়ালা দুধ ও এক পেয়ালা শরাব পেশ করলেন। তিনি দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করে শরাবের পেয়ালা প্রত্যাখ্যান করলেন। এখানে তাঁর উম্মতের জন্য দুধকে বিবেক (হেদায়েত) ও শরাবকে রিপুর (গোমরাহীর) প্রতীক হিসাবে উপস্থিত করা হল। দুধ গ্রহণ করে তিনি পুণ্যবান উম্মতের হেদায়েত লাভের ইংগিত দিলেন। তেমনি মহানবী (
সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বপ্নে দেখলেনতিনি হযরত আবু বকর (রা.) ও উমরকে (র.) নিয়ে একটি কূপের পাড়ে বসে আছেন এবং হযরত উসমান (রা.) পৃথক হয়ে অন্যত্র বসেছেন। এটা ছিল তাঁদের দাফন হবার বাস্তব রূপ। তাঁদের তিন জন একই স্থানে ও উসমান (রা.) অন্যস্থানে দাফন হবেন বলে জানানো হল। হযরত দাউদ ইবনুল মুসাইয়েবও মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বপ্নের এই ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এ থেকে আরও জেনে নিনশেষ বিচারে অনেক ব্যাপারই এ ধরনের ঘটবে। গুণাগুণকে বস্তুরূপে দাঁড় করিয়ে কাজ চালানো হবে। 

জানা দরকারসাধারণ লোকের আল্লাহদত্ত প্রাণ ও জৈব প্রাণের ভেতর গভীর সম্পর্ক হওয়ায় স্বরূপ জগতের ব্যাপারগুলো সম্পর্কে তারা জন্মান্ধের মত হয়ে যায়। জন্মান্ধ যেমন আলো ও রূপের মোটামুটি ধারণা নেয়তেমনি সাধারণ লোকদের ধারণা সৃষ্টির জন্য হাশরের দিন কিছু ব্যাপার আত্মপ্রকাশ করবে।–[তার ফলে তার জৈবিক প্রভাব লোপ পাবে এবং নিজের স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারবে।] 

এ উদ্দেশ্যেই যখস সবলোক উত্থিত হবে তখন শুরুতেই একদলকে তাদের পাপ ও পুণ্যের জন্য শাস্তি ও পুরস্কার দেয়া হবে। সে বিচার তাদের হাল্কা ভাবেই করা হোক কিংবা কঠিন ভাবে। কিছু লোককে পুলসিরাত পার হতে বলা হবে। পাপীরা হোঁচট খাবে এবং পুণ্যবানরা স্বচ্ছন্দে পার হবে। কিছু লোককে তাদের নেতার পিছু ধরতে বলা হবে। পুণ্যবান নেতৃত্বের অনুসারীরা মুক্তি পেয়ে যাবে এবং পাপী নেতার অনুসারীরা ধ্বংস হবে। কিন্তু লোকের হাত-পা কথা বলবে এবং কিছু লোক আমলনামা পড়বে। কখনও কৃপণের কার্পণ্য রূপ ধরে এসে তার পিঠে সোয়ার হবে কিংবা দাগ হয়ে বসে যাবে। 

মোটকথাএ সব উপমা-উদাহরণ তার জাতিগত কার্যকলাপেরই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। যে ব্যক্তির আল্লাহদত্ত প্রাণ সবল ও জৈবিক প্রাণ উদারতাদের সামনে উপমা-উদাহরণ আসবে সূক্ষ্মতর হয়ে ও পূর্ণত্ব নিয়ে। মহানবী (
সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যে বলেছেন, ‘আমার উম্মতের অধিকাংশের শাস্তি কবরেই হয়ে যাবে’-এ ব্যাপারটি ঠিক উক্ত উপমা-উদাহরণেরই অন্তর্ভুক্ত। হাশর মাঠে এমন কিছু উপমা-উদাহরণও পেশ করা হবে যা সবাই সমানে দেখতে পাবে। যেমন মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সার্বজনীন নবুয়তের প্রতীক হবে হাউজে কাওছার। তেমনি মানুষের সুরক্ষিত কার্যকলাপের প্রতীক হবে মীযান। তেমনি উৎকৃষ্ট পানীয় এ হিসেবে শরাবান তহুরা। গৌরবের পরিধেয় হিসেবে লেবাছে ফাখেরা। অনিন্দ্য সহচরী হিসেবে হুরে মাকসূরা’ এবং চিত্তাকর্ষী নিবাস হিসেবে কসূরে দিল নশীন’ পেশ করা হবে। তেমনি পাপের আঁধার থেকে আল্লাহর নিয়ামতের দিকে ফিরে আসার জন্য আশ্চর্য ধরনের সব পদ্ধতি রয়েছে। যেমন মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সবার শেষে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের ব্যক্তি সম্পর্কে সে সব বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি তার আকৃতি-প্রকৃতিও বলে দিয়েছেন।
[বোখারী ও মুসলিম শরীফের উক্ত হাদীসটি এই –“জনৈক জাহান্নামী আল্লাহর কাছে আরজ করবেদয়াময় প্রভু! দোযখের আগুন আমাকে ঝলসে ফেলেছেতাই তোমার দয়া থেকে আমাকে বঞ্চিত রেখ না। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেনকিরূপ দয়া চাও! সে আরজ করবেশুধু আমার মুখটাকে আগুন থেকে বাঁচাওআর কিছু চাইনা। এ কথার ওপর সে প্রতিজ্ঞাও করবে। যখন তার মুখ আগুনথেকে ওপরে উঠে আসবেতখন সে জান্নাতের ছায়াঘেরা বাগান দেখতে পাবে। অমনি তার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে। আরজ করবেপ্রভু! শুধু আমাকে বাগানটির কাছে যেতে দাও। তাকে ভালভাবে প্রতিজ্ঞা করিয়ে যখন গোসল সারিয়ে সেখানে নেয়া হবেকিছুক্ষণ কোনমতে চুপ থেকেই জান্নাতের লোভনীয় আরাম-আয়েশের সামগ্রী দেখে আবার নতুন আব্দার তুলবে ইত্যাদি।]

মানুষের সেখানেও মানবিক বাসনা ও কামনা দেখা দেবে। সেমতে আল্লাহর নেয়ামতও বস্তুরূপে ধরা দেবে। মানুষের কামনা-বাসনায় পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্যও দেখা দেবে। আল্লাহর দানও সে অনুযায়ী প্রকাশ পাবে। মহানবী (
সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদীসে তার ইংগিত পাই। তিনি বলেনঃ জান্নাতে ঢুকে আমি একটি রক্তিম অধরের শ্যামল তরুণী দেখতে পেলাম। প্রশ্ন করলামএ কে?-[মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) শ্যামল মেয়ে দেখে এ কারণে অবাক হলেন যেআরবের দৃষ্টিতে তা সুন্দর নয়। সুতরাং তা দেখানো হল কেন?] জবাব পেলামজাফর ইবনে আবু তালিব এ ধরনের সহচরী পসন্দ করে বলেই একে সৃষ্টি করা হল।–[জাফর ইবনে আবু তালিব হিজরত করে বেশ কিছুদিন আবিসিনিয়া ছিলেন। সেখানে এ ধরনের মেয়েকে সুন্দরী বলা হয়। তাই তিনি তা পসন্দ করতেন।] 
মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অন্যত্র বলেনযদি তুমি জান্নাতে গিয়ে চাও যেইয়াকুতের লাল ঘোড়ায় চড়ে সর্বত্র ঘুরে বেড়াবেতক্ষুণি তুমি পেয়ে যাবে এবং তোমার সুখ পূর্ণ হবে। অন্যত্র তিনি বলেনএক জান্নাতী আল্লাহর কাছে চাষাবাদের অনুমতি চাইবে। তাকে আল্লাহ প্রশ্ন করবেনতোমার মনের ইচ্ছা কি সব পূরণ করা হয় নিসে জবাব দিবে হ্যাঁসবই পূর্ণ হয়েছে। তবে আমি চাষাবাদ খুব ভালবাসি। তখন সে অনুমতি পেয়ে ফসল বুনবে। দেখতে না দেখতে তা গাছ হয়ে ফুলে ও ফলে সুশোভিত ও পরিপক্ক হয়ে কর্তিত হয়ে যাবে। এমন কি নিমেষে তার চারদিকে ফসলের পাহাড় তৈরী হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ বলবেননাও হে আদম সন্তান! তোমার পেট তো কিছুতেই ভরে না। অবশেষে মিশকের টিলায় চড়ে আল্লাহর দীদার সবাই পেয়ে ধন্য হবে। তারপর আরও অনেক কিছু ঘটবে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন সবিস্তারে এ সব বলেন নিআমিও তা প্রকাশ করা ঠিক মনে করলাম না।

পরবর্তী পর্ব-
সংগঠন উদ্ভাবন পদ্ধতি 

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১৬) কবরে মানুষের অবস্থা



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ১৬)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

কবরে মানুষের অবস্থা 
জেনে রাখুনকবরের অন্তর্বর্তী জীবনে মানুষের বিভিন্ন অবস্থা ও মর্যাদা দেখা দেয়। সে সব অবস্থা ও স্তরের সংখ্যা অশেষ। তবে প্রধান অবস্থা ও স্তর হল চারটি। 
(১) প্রথম শ্রেণীর লোক সচেতন প্রকৃতির হয়ে থাকে। তাদের সামনে তাদের কৃত ভাল বা মন্দ কাজগুলো স্বরূপে দেখা দিলে তথা অনুকূল বা প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হলেই তারা সুখ বা দুঃখ লাভ করে থাকে। নিম্ন আয়াতে সেটাই ইংগিত করা হলঃ 
যাতে কাউকে বলতে না হয়- হায় আফসোস! আমি আল্লাহর প্রতি (আমার কর্তব্যে) অবহেলা করেছিলাম, আর আমি তো ঠাট্টা বিদ্রূপকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।(সূরা যুমারঃ আয়াত ৫৬)
আমি এমন এক দল আল্লাহর ওলী দেখেছিযাদের মন ঠিক শান্ত পানিপূর্ণ পুকুরের মতই প্রশান্ত। বাতাসে সে পানিতে ঢেউ খেলে না। তাই ঠিক দুপুরে মধ্যাহ্ন সূর্যের আলো যখন তার বুকে পড়েতখন সেটা এক খণ্ড নূরের টুকরার মতই হয়ে যায়। তাঁদের সে নূর হল পুণ্য কাজ কিংবা পুণ্য স্মৃতি (আল্লাহর ধ্যান) অথবা আল্লাহর রহমতের নূর। 

(২) দ্বিতীয় ধরনের লোক তাদেরই কাছাকাছি হয়ে থাকে। কিন্তু তারা স্বাভাবিক নিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকে এবং যা কিছু স্বপ্নেই পেয়ে থাকে। স্বপ্নে আমরা স্বভাবতঃ তা-ই দেখিযা আমাদের মিশ্র অনুভূতিতে মওজুদ তাকে। সজাগ অবস্থায় সেদিকে খেয়াল যায় না কিংবা মনোযোগ থাকে না। শুধু কতিপয় ধারণা রূপে অন্তরে সেগুলো সঞ্চিত হয়ে থাকে। স্বপ্নে সেগুলোই হুবহু রূপ ধরে আমাদের কাছে ধরা দেয়। যেমনতপ্ত পিত্তের মানুষ স্বপ্নে দেখতে পায়প্রচণ্ড গ্রীস্মে সে এক জংগলে অবস্থান করছে। ভীষণ গরমে হাওয়া বয়ে চলছে। হঠাৎ জংগলে আগুন লেগে গেল। সে আগুন চারদিক থেকে তাকে ঘিরে নিল। সে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছে। পালিয়ে বাঁচার জন্য। কিন্তু পালাবার জায়গা পাচ্ছে না। ফলে সেই আগুনে সে জ্বলে মরছে। 
এভাবে তার ভীষণ কষ্ট ভুগতে হয়। তেমনি সর্দী-কাশীতে আক্রান্ত ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে যেশীতের রাতে সে নৌকায় কোথাও যাচ্ছে। হঠাৎ তুফান এসে তার নৌকা উল্টে ফেলল। তখন সে বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগল। কিন্তু বাঁচতে পারছিল না। ডুবে মরতে বসে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল।

মানুষের ভেতর অনুসন্ধান চালিয়ে আপনি এরূপ বিচিত্র অবস্থার লোক পাবেন যারা নিজ জীবনের বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত ধারণা ও ঘটনা সুখ বা দুঃখের স্বপ্ন রূপে নিদ্রাবস্থায় অর্জন করে। সেগুলো সাধারণত অভিজ্ঞতা অর্জনকারীর ধ্যান-ধারণা ও স্বভাবের অনুকূল হয়ে থাকে। তেমনি দ্বিতীয় ধরনের ব্যক্তির কবর জীবনে পাপ বা পুণ্যের ফল এভাবে স্বপ্নেই লাভ করবে। পার্থক্য শুধু এতটুকুএ এমন এক স্বপ্নকাল বা নিদ্রা যা থেকে মানুষ কেয়ামতের আগে মুক্ত হয় না। স্বপ্নদ্রষ্টা কখনও স্বপ্নে জানতে পায় না যেস্বপ্ন তার বাস্তব নয়শুধুই স্বপ্ন। এও বুঝতে পায় না যেআসলে তার কোন সুখ বা দুঃখ হচ্ছে না। বরং স্বপ্নকেই সে সত্য ভেবে থাকে। এখন যদি তার এ স্বপ্ন কেয়ামতের আগে শেষ না হত অর্থাৎ সে জাগ্রত না হততা হলে বাস্তব যে অন্যকিছু তা সে কোন দিনই জানতে পেত না। সুতরাং কবর জীবনকে স্বপ্ন জীবন না বলে বাস্তব জীবন বলাই অধিক সংগত। 

এ কারণেই হিংস্র প্রকৃতির লোক কবর জীবনে দেখতে পায়তাকে কোন হিংস্র জীব ছিঁড়ে খাচ্ছে। কৃপণরা দেখতে পায়তাদের সাপ-বিচ্ছু দংশন করে চলছে। 
তারপর ঊর্ধতন জগতের জ্ঞান থেকে যারা বঞ্চিত ছিলতারা দেখতে পায়দুফেরেশতা (মুনকার-নাকীর) এসে ঊর্ধতন জগতের তত্ত্ব জিজ্ঞেস করল। তারা প্রশ্ন করছে, ‘তোমার প্রভু কে?’ ‘তোমার দ্বীন কি?’ ‘তোমার রাসূল কে?’ ইত্যাদি। 

(৩) তৃতীয় শ্রেণীর লোকদের ভেতর পশুত্ব ও দেবত্ব দুটোই দুর্বল বলে মরার পর তারা কবর জীবনে নিম্ন স্তরের ফেরেশতাদের সাথে গিয়ে মিলিত হয়। কখনও নিজেদের প্রকৃতিগত ও জন্মগত কারণেকখনও আবার অন্য কোন কারণে তারা সেরূপ করে থাকে। প্রকৃতিগত কারণ হল এইতার দেবত্ব পশুত্বের প্রভাবে কমই আচ্ছন্ন হত। তারা না সে নির্দেশ মানতনা প্রভাব স্বীকার করত। অন্য কারণের একটি হল এইসে ব্যক্তি তার ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা দাবিয়ে রেখেছে ও ভালভাবে এ পথে স্থির রয়েছে। তারপর আত্মিক সাধনা চালিয়ে দেবত্বের জ্যোতি ও ইলহাম অর্জন করেছে। কখনও দেখা যায়নপুংসক ব্যক্তি পুরুষ আকারে জন্ম নিয়েও নারী প্রকৃতি ও স্বভাবের হয়ে থাকে। যদিও শৈশবে পুরুষ ও নারীর বাসনা কামনার স্বাতন্ত্র্য সে উপলব্ধি করে না। কারণসে বয়সটি হল খাওয়া-দাওয়া আর খেলা-ধূলার বয়স। তখন তার সে সবের দিকে খেয়ালই থাকে না। তখন যদি তাকে পুরুষের চাল-চলতে অভ্যস্ত করা হয় এবং নারীর চাল-চলন রোধ করা হয়তা হলে সে ইচ্ছায় হোক কি অনিচ্ছায়পুরুষ স্বভাবেরই হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন সে যুবক হয় এবং নিজ স্বভাবে বেপরোয়া হয়তখন সঠিক ভাবেই সে নারী প্রকৃতির ওপর জমে বসে। ফলে চলনে-বলনেআচার-আচরণে ও ইচ্ছায় অভিলাষে সে পুরোপুরিই নারী হয়ে যায়। এমন কি যৌন ক্ষেত্রেও সে কর্তার ভূমিকা ভুলে কর্মের ভূমিকা পালন করে চলে। এভাবে বেশ কিছুকাল চলার পর দেখা যাবেসে পুরুষের সমাজ ছেড়ে নারী সমাজেই বিচরণ করে ফিরছে। 

ঠিক এ অবস্থাই দাঁড়ায় মানুষের অন্যান্য ক্ষেত্রেও। মানুষ তার পার্থিব জীবনে খাওয়া-পরাবাসনা-কামনা এবং অন্যান্য রীতি-নীতিও প্রয়োজন সম্পাদনে নিয়োজিত থাকে। কিন্তু নিম্ন স্তরের ফেরেশতাদের সাথে তাদের আত্মিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। তাই আকর্ষণও সেদিকে থাকে। যখন সে মরে যায় এবং জড় দেহ থেকে মুক্তি পায়তখন সে সেই মূল স্বভাবে ফিরে যায় এবং ফেরেশতাদের সমাজে গিয়ে ঠাঁই নেয়। তখন তাদেরও ফেরেশতাদের মত ইলহাম হয়। তাদেরও পাখা পালক হয়। হাদীসে আছে, ‘আমি জাফর ইবনে আবু তালিবকে জান্নাতে পাখায় ভর করে ফেরেশতাদের সাথে উড়তে দেখেছি 

তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ কখনও আল্লাহর বাণীকে উচ্চকিত করার কাজে এবং আল্লাহর দলের সহায়তায় নিয়োজিত থাকেন। কখনও বা মানুষের পুণ্যের খেয়াল উদ্রেক করেন। কখনও তাদের কিছু লোকের স্বভাবগত আকাঙ্ক্ষা জাগে দেহ ধারণের। তাই স্বরূপ জগতের দুয়ার খুলে যায়। তখন তার জৈব প্রাণে এক ঐশী শক্তি এসে যায় এবং সেটা একটা জ্যোতির্ময় দেহের অধিকারী হয়। কখনও তাদের কিছু লোক খাওয়া-দাওয়া করতে চায়। তখন তাদের সে ইচ্ছা পূরণের জন্য তারা যা খেতে চায় তার সুব্যবস্থা করা হয়। কুরআন মজীদের নিম্ন আয়াতে তারই ইংগিত দেখতে পাইঃ  
আল্লাহর পথে যারা প্রাণ দিল তাদের মৃত ভেব না। বরং তারা জীবিত। নিজ প্রভুর কাছে তারা রুজী পেয়ে থাকে। আল্লাহদত্ত খোরাক খেয়ে তারা খুশীতে মাতোয়ারা থাকে (
সূরা আলে ইমরানঃ আয়াতঃ ১৬৯)

এ সব শ্রেণী ছাড়া শয়তানের প্রভাবিত শ্রেণীও রয়েছে। তারাও স্বভাবগত কিংবা অন্য কারণে এরূপ খারাপ প্রকৃতির হয় যেতাদের চিন্তা-ভাবনা সর্বদা ন্যায়ের পরিপন্থীসৃষ্টির নিয়ম-শৃঙ্খলা বিরোধী ও সচ্চরিত্রতার অন্তরায় হয়ে থাকে। তারা ইচ্ছা করেই এ ধরনের হীন ও জঘন্য চিন্তা ও অভ্যেস অনুসরণ করে থাকে। তাই আল্লাহর অসন্তোষ ও অভিশাপ তাদের ঘিরে রাখে। তারা মরে গিয়ে শয়তানের দলে মিলিত হয়। তাদের কালো পোশাক পরানো হয় এবং তাদের ইতর কাজ ও স্বভাবগুলো স্বরূপে তাদের সামনে দেখা দেয়। 

প্রথম শ্রেণীর লোকগুলোর অন্তরে আনন্দ থাকে বলে তারা স্বভাবতই তাদের পুরস্কার পেয়ে যায়। দ্বিতীয় শ্রেণী তাদের কৃতকার্যের স্বরূপ ও পরিণতি দেখে দুঃখ ও অনুতাপে দগ্ধ হয় বলে স্বভাবতই শাস্তি ভোগ করে। খোঁজারা যেভাবে নিজেদের মানব সামজের নিকৃষ্টতম পর্যায়ে দেখতে পেয়ে অত্যন্ত মানসিক যাতনা ভুগতে থাকেতা থেকে কোন মতেই অব্যাহতি পায় নাএও তেমনি ব্যাপার। 

শ্রেণী বিন্যাসকারীদের দৃষ্টিতে আরও এক ধরনের লোক রয়েছে। তারা হল সমঝোতাকারীর দল। তাদের ভেতর জৈবিক দিক প্রবল ও আত্মিক দিক দুর্বল থাকে। অধিকাংশ লোকই এ শ্রেণীভুক্ত। তাদের অধিকাংশ কাজই জৈব স্বভাবের হয়ে থাকে। জৈবিক চাহিদা পূরণেই তারা ব্যস্ত থাকে। এ শ্রেণীর লোকের দেহের সাথে প্রাণের সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয় নাবরং বাস্তব সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে চৈন্তিক সম্পর্কটা থেকে যায়। তার প্রবৃত্তি কখনও ভাবতে পারে না যেদেহের সাথে তার সম্পর্কচ্ছেদ ঘটেছে। তাই (মর) দেহটি যদি তার কেটে কুটে টুকরা করা হয় তো ভাবে যেতাকেই তা করা হচ্ছে। তাদের বৈশিষ্ট্য হল এইআন্তরিক ভাবেই তারা দেহগত প্রাণ হয় অর্থাৎ দেহকেই প্রাণ ভেবে থাকে। কিংবা মনে করেদেহছাড়া প্রাণের আলাদা অস্তিত্ব নেই। হয়ত সে বিশেষ সমাজ বা মতাদর্শের আওতায় পড়ে মুখে অন্যরূপ কথা বলে থাকে। 

এ ধরনের লোক মারা গেলে স্বরূপে জগতের হাল্কা জ্যোতি তাদের ওপর দেখা দেয়। তাদের ভেতর দেখা দেয় উদভ্রান্ত খেয়াল ও ধ্যান-ধারণা। এখানে আত্মিক সাধনাকারীদের যে অবস্থা দেখা দেয়তাদেরও ঠিক সেই অবস্থা দেখা দেয়। তাদের কৃত কাজকর্ম কখনও খেয়ালী রূপ নিয়েকখনও স্বরূপ জগতের অন্যান্য বস্তুর মত বাস্তব রূপনিয়ে তাদের সামনে দেখা দেয়। আত্মিক সাধনাকারীদের সামনে যে ভাবে সব কিছু স্বরূপে দেখা দেয়এও তেমনি ব্যাপার। 
এখানে যদি তারা ফেরেশতা সুলভ কাজ করে থাকেতা হলে সেগুলো তাদের ফেরেশতা আকরে দেখানো হয়। তাদের হাতে থাকে নরম রেশমী কাপড়। তাদের সাথে তারা খুব নম্র ও ভদ্রভাবে মিলে-মিলে ও কথা-বার্তা বলে। তাদের জন্য জান্নাতের জানালা খুলে ধরা হয়। তাই তারা জান্নাতের ঘ্রাণ পেতে থাকে। যদি তারা পশু সুলভ খারাপ কাজ করে থাকে ও অভিশপ্ত হয়তা হলে তারা কাজগুলো সে ভয়াবহ ও কুৎসিত ফেরেশতা রূপে দেখতে পাবে। তারা কলো চেহারা নিয়ে বিকট আওয়াজে রূঢ় ভাষায় কথা বলবে। সেখানে যেমন ক্রোধকে হিংস্র জীব ও কাপুরুষতাকে খরগোশ আকারে দেখানো হবেএও তেমনি দেখানো হবে। 
কবর জগতে এমন সব ফেরেশতা রয়েছেন যাদের নিজ নিজ যোগ্যতা অনুসারে কাজে নিয়োজিত রাখা হয়েছে। এ জগতে আগমনকারী মানুষদের শান্তি বা শাস্তি দেবার কাজেও তাদের ব্যবহার করা হয়। সুতরাং শান্তিপ্রাপ্ত কিংবা শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাদের দেখতে পেত না। 
জেনে রাখুনকবর জগত কোন আলাদা জগত নয়। এ জগতেরই পরিশিষ্ট বা শেষাংশ। সেখানে সে কিছু গায়বী খবর জানতে পায় মাত্র। প্রত্যেকের বিশেষ বিশেষ অবস্থা সেখানে প্রকাশ পায়। বিচার জগতের ব্যাপার অন্যরূপ। সেখানে মানুষের ব্যক্তিগত অবস্থা লোপ পেয়ে সকল মানুষের সামগ্রিক অবস্থা প্রকাশ পাবে। অর্থাৎ মানুষের ব্যক্তিগত খুঁটিনাটি কাজগুলোর স্ব স্ব রূপে আত্মপ্রকাশের ব্যাপারটি কবর জীবনেই শেষ হবে। বিচার জীবনে তার কাজের সামগ্রিক বিচার-বিবেচনা হবে। আল্লাহই ভাল জানেন।

পরবর্তী পর্ব
বিচার জগতের তত্ত্বকথা 

সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৪

জ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১৫) মৃত্যুরহস্য



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ১৫)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ 
মৃত্যুরহস্য 
জেনে রাখুনধাতব পদার্থউদ্ভিদপশু ও মানুষ এ সব স্তরের সৃষ্টির চার ধরনের ধারক ও ক্রিয়া-প্রক্রিয়া রয়েছে। যদিও আপাত দৃষ্টিতে কথাটি নিঃসংশয় মনে হয় না। মৌল উপাদানগুলো (আগুনবায়ুপানি ও মাটি) যখন অণু-পরমাণু আকারে সংঘাত মিলনের ব্রতে নিরত থাকেতখন তা থেকে কয়েক ধরনের যৌগিক বস্তু সৃষ্টি হয়। যেমন দুই উপাদানের মিশ্রণজাত তাপ বা বাষ্পধূলাধোঁয়াসতেজ মাটিচাষের জমীনঅংগারশিখা ইত্যাদি। তিন উপাদানের মিশ্রণজাত যেমনছানা মাটির বস্তুকাদা মাটি ইত্যাদি। তেমনি চার উপাদানের মিশ্রণজাত বস্তুও রয়েছে। 
এ সব জিনিসের বৈশিষ্ট্য বলতে এর অন্তর্ভুক্ত উপাদানেরই বিশেষত্ব বৈ নয়। মিশ্রিত উপাদানের বাইর থেকে কোন গুণ এতে আসতে পারে নাভেতরেও নতুন কোন গুণের উদ্ভব হতে পারে না। এ ধরনের বস্তুকে শূন্যাবস্থার বা প্রাথমিক সৃষ্টি বলা হয়। (বাষ্পপানি ও আগুনের এবং ধূলামাটি ও বায়ুর মিশ্রণজাত সৃষ্টিগুলো তাদের অন্তর্ভুক্ত।) 

এ স্তরের পরে আসে ধাতব যুগ। উক্ত মিশ্রণজাত বস্তুগুলোকে অনুগত বাহক বানিয়ে খনিজ পদার্থের আবির্ভাব ঘটেছে। ধারকের বৈশিষ্ট্যই তার বৈশিষ্ট্য। ধারকের প্রকৃতিকে সে নিজের ভেতর সুরক্ষিত রাখে। 

তৃতীয় স্তরে আসে উদ্ভিদ যুগ। ধাতব যুগের ওপর আরোহণ করেই তার আগমন। তবে তার শক্তি এত বেশী যেঅংশের উপাদান ও প্রাথমিক সৃষ্টিগুলোকে বদলে সে নিজ প্রকৃতিতে গড়ে তোলে। ফলে সে সব অংশগত উপাদানাদির প্রয়োজনীয় প্রভাব প্রক্রিয়া প্রকৃতিগতভাবে বিদ্যমান থাকে। 

এরপর আসে প্রাণীর স্তর। এ স্তরে বস্তুর ভেতর প্রকৃতিগত প্রাণের (খাদ্যগ্রহণ ও বর্ধন শক্তি) উন্নয়ন দেখা দেয় এবং প্রকৃতিগত প্রাণকে বাহন করেই জৈবিক প্রাণের আগমন ঘটে। এ স্তর প্রকৃতিগত প্রাণে অনুভূতি ও ইচ্ছার সংযোগ ঘটায়। ফলে নিজ আকাঙ্ক্ষিত ও উপকারী জিনিস অর্জনের জন্য প্রাণীর উদ্যোগী ও প্রয়াসী হয়। তেমনি ক্ষতিকারক ব্যাপার থেকে তারা দূরে থাকে। 

অবশেষে আসে মানুষের স্তর। জৈবিক প্রাণকে বাহন করে এর আগমন ঘটে। এ স্তরে জৈবিক প্রাণের সাথে বিচার-বুদ্ধিরও সংযোগ ঘটে। তাই এ প্রাণ চরিত্র ও দক্ষতার ওপর জোর দেয়। মানেভাল হতে ও ভাল কাজ করতে বলে এবং মন্দ হতে ও মন্দ কাজ করতে নিষেধ করে। এ উদ্দেশ্যে সে নৈতিক অনুভূতি ও চিন্তাশক্তি চাংগা রাখে। এবং তাদের উত্তম নীতি নিয়মের আওতায় সুবিন্যস্ত করে নেয়। এমন কি সেটাকে ঊর্ধ জগত থেকে পাবার সব কিছুর যোগ্য ধারক রূপে গড়ে তোলে। 

আপাত দৃষ্টিতে এ কথাগুলো যতই সংশয়মূলক মনে হোক না কেনভেবে দেখলে বুঝতে পাবেনপ্রতিটি প্রভাব ও প্রতিক্রিয়াকে তার নিজ স্বতন্ত্র উৎসের সাথে সম্পৃক্ত করতে হয়। তেমনি প্রত্যেক ধরনের সৃষ্টিকে তার নিজস্ব বাহনে বসিয়ে নিতে হয়। এটাও জানা প্রয়োজনপ্রতিটি ধরনের জন্য একটি ভিত্তিমূল থাকা দরকার। তার সাথে যেন সৃষ্টিটি স্থির থাকতে পারে। ধারকটির অবশ্যই ধরনটির উপযোগী হতে হবে। ধরনের ধারকটির প্রয়োজনীয়তা ঠিক মোমের পুতুলের যে ভাবে মোম প্রয়োজন তেমনি। 

সুতরাং যে ব্যক্তি বলেমানবের প্রকৃতিগত প্রাণ মৃত্যুর পর মানব দেহ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যায়সে ভুল বলে। হ্যাঁএ কথা সত্য যেমানব প্রকৃতির দুটো উপাদান থাকে (যার ভিত্তিতে তার সৃষ্টি) একটি মৌলিক। সেটাকে প্রকৃতিগত প্রাণ বলে। দেহের সাথে তার যোগ প্রত্যক্ষ। দ্বিতীয় উপাদানটি কৃত্রিম। সেটাকে জড়দেহ বলে (তার সাথে থাকে পরোক্ষ সম্পর্ক)। তাই মানুষ যখন মারা যায়তখন জড় দেহ বিচ্ছিন্ন হয় বটেতাতে প্রকৃতিগত প্রাণের কোন ক্ষতি হয় না। বরং প্রকৃতিগত প্রাণের সাথে জড় দেহের সম্পর্ক থেকে যায় অবিচ্ছেদ্য। 

একজন সুদক্ষ শিল্পীর হাত কেটে ফেললেও তার শিল্প ক্ষমতা যেমন যথারীতি অক্ষুণ্ন থাকে এও তেমনি ব্যাপার। তেমনি কোন দ্রুত গতির মানুষের পা কেটে ফেললে কিংবা কোন দৃষ্টি ও শ্রবণ শক্তির মানুষের চোখ ও কান হারালে তার চলারশোনার ও দেখার শক্তি বহাল থেকে যায়প্রকৃতিগত প্রাণ-মনেরও ঠিক সেই অবস্থা। উপাদান ছাড়াই শুধু প্রকৃতিগত প্রাণের সাথেই সে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। 

জানা দরকারমানুষের কার্যকলাপ কয়েক ধরনের হয়। কিছু কাজ তারা মনের ইচ্ছায় করে থাকে। যদি তাকে বাধা না দেয়া হয়তা হলে সে তা কার্যকরী করবে এবং খেয়াল-খুশীর বিরুদ্ধে সে কখনও যাবে না। কিছু কাজ তারা প্রকৃতিগত প্রয়োজনের তাগাদায় কিংবা বাইরের কোন প্রভাবে পড়ে করে থাকে। যেমনক্ষুধাতৃষ্ণা ইত্যাদি। যখন সে সবের কারণ চলে যায়তখন তা করার ইচ্ছাও চলে যায়। অবশ্য সেগুলোকে স্থায়ী অভ্যেসে পরিণত করে নিলে অন্য কথা। 

দেখুনএরূপ অনেক লোক আছে যারা কোন বিশেষ ব্যক্তি কিংবা কবিত্ব অথবা বিশেষ কোন জিনেসের প্রতি আসক্ত হয়। তখন তারা ভালবাসার ব্যক্তি বা বস্তুর অনুকূল পোশাক-আশাক ও চাল-চলন অনুসরণ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু যদি তারা স্বাভাবিক অবস্থায় থাকততা হলে তা বর্জন করে চললে তাদের কোনই অসুবিধা হত না। কিছু লোক অবশ্য এমন হয় যেঅন্তর থেকেই সে অনুরূপ পোশাক-আশাক ও চাল-চলন পসন্দ করে। তখন তাকে স্বাভাবিক অবস্থায়ও সেই পোশাক ও ঢং অনুসরণ করতে দেখা যাবে। 

তেমনি কিছুলোক এরূপ স্মরণ শক্তি রাখে যেনানা ধরনের কথা-বার্তার ভেতর থেকে সে তার প্রয়োজনীয় কথাগুলো বেছে নিয়ে স্মরণ রাখে। তার দৃষ্টি থাকে আলোচনার দিকেফলাফলের দিকে নয়। বাক চাতুর্যই তাকে আকৃষ্ট করে এবং বাক চাতুর্যের দক্ষতা কোত্থেকে এল তা নিয়ে তার ভাবনা নেই। এক ধরনের বেখেয়াল লোক এমন থাকে যেমূল কথা ছেড়ে আজে বাজে কথায় ডুবে থাকে। তার নজরে কারণ আসে নাআসে শুধু কাজ। ফলে কাজের প্রাণ সম্পর্কে উদাসীন থেকে কাজের রূপই তার স্মরণে রাখে। 

জেনে রাখুনযখন মানুষ মারা যায়তখন তার জড় দেহটি পচে-গলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু তার প্রকৃতিগত প্রাণ জৈবিক প্রাণের সাথে সংযোগ রাখে। তবে তার ভেতর (পার্থিব প্রয়োজনে) যে বৈশিষ্ট্যগুলো ছিলতা থাকে না। ফলে তার উদ্দেশ্যমূলক কাজ ছাড়া পার্থিব প্রয়োজনে যেগুলো করতে হততা আর প্রকাশ পায় না। শুধু যে সব উদ্দেশ্যমূলক নৈতিক কাজ তার ব্যক্তিত্বের প্রভাবে দেখা দিতসেগুলোই তার আসল প্রাণের সাথে থেকে যায়। তখন তার জীবনে বিবেক প্রাধান্য পায় ও রিপু অবদমিত হয়। তারপর যখন ঊর্ধতন জগৎ থেকে তার অন্তরে হাযিরাতুল কুদুস এবং তার সুরক্ষিত কৃতকার্যের আলোকপাত ঘটেতখন তার বিবেক হয় দুঃখ পায়নয় আনন্দ লাভ করে। 

এটাও জানা দরকারযখন বিবেক (পার্থিব জীবনে) রিপুর সাথে মিলে-মিশে সমঝোতা করে চলেতার কিছু না কিছু প্রভাব বিবেকে ঢুকে যায় এবং বিবেককে তা মেনে চলতে হয়। কিন্তু সব চাইতে ক্ষতিকর ও খারাপ ব্যাপার হল এইবিবেকে তার উদ্দেশ্য ও পরিণতির বিপরীত অভ্যেস ও অবস্থার সৃষ্টি হওয়া। তেমনি সব চাইতে উত্তম ও কল্যাণকর ব্যাপার হল এইবিবেকে তার অভ্যেস ও অনুকূল অবস্থাকে বহাল তবিয়তে কায়েম রাখা। 

মোট কথাখারাপ ব্যাপারের আরেক দিক হল,অন্তরে সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির এরূপ মায়া হওয়া যেদুটি ছাড়া জীবনে অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে বলে মনে না করা। দ্বিতীয় দিক হলঅন্তরে এমন সব সাধারণ খারাপ অভ্যেস ও অবস্থঅ মুদ্রিত হয়ে যাওয়া যা মানুষকে ধার্মিক ও ভাল হওয়া থেকে সরিয়ে রাখে। তৃতীয় দিক হল এইঅন্তরকে এরূপ অপবিত্র ও আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন রাখা যেনা কখনও সে আল্লাহকে জানতে চাইবেনা তাঁর সামনে সবিনয়ে আনত থাকবে। 
মোট কথা অন্তরে পবিত্রতা ও কল্যাণময়তার বিপরীত কিছু সৃষ্টি হতে দেয়া। চতুর্থ ব্যাপার এইঅন্তরের গতি সত্যের সহায়তা ও আল্লাহ-রাসূলের নির্দেশকে মর্যাদা দান এবং সাধারণ কল্যাণ প্রতিষ্ঠার কাজে ঊর্ধ্বতন জগতের কার্যক্রমের বিরোধী হওয়া। এমন কি তার ফলে তার উপর উর্ধ্বতম জগতের শত্রুতা ও লানত আসে। 

মোট কথাভাল দিকের ভেতর একটি হল এইএরূপ ভাল কাজ করা যাতে অন্তরের পবিত্রতা ও আল্লাহর সকাশে বিনয় অর্জিত হয়। এমন কি ফেরেশতাদের অবস্থা যেন স্মরণে আসে। তা ছাড়া এমন সব ধর্মীয় ধ্যান-ধারণার দিকে যেন খেয়াল যায় যাতে মানুষ শুধু পার্থিব জীবন নিয়েই তৃপ্ত না থাকে। দ্বিতীয় দিক হল এইমানুষটির যেন ধার্মিকতা ও ন্যায়পরায়ণতার পুতুল ও নম্র-দয়ার্দ্র অন্তরের হয়ে যায়। তৃতীয় কথা হলমানুষ যেন এরূপ পবিত্র থাকে যাতে করে ঊর্ধ্বতন জগতের দোয়া এবং তাদের সুনজর বহাল থাকে এবং সে যেন কল্যাণের জীবন বিধান অনুসরণ করে চলে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

ষষ্ঠদশ পরিচ্ছেদ 
কবরে মানুষের অবস্থা 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...