মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৪

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (২৪) রাষ্ট্রপতিগণের চরিত্র ও গুণাবলী



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৬ 

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ২৪)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

রাষ্ট্রপতিগণের চরিত্র ও গুণাবলী 
রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই যথোপযোগী চরিত্র ও গুণাবলীর অধিকারী হতে হবে। অন্যথায় তিনি রাষ্ট্রের জন্য আপদ ও বোঝা হয়ে দাঁড়াবেন। তিনি যদি সাহসী না হন তা হলে তাঁর প্রতিপক্ষের সাথে যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হবেন। ফলে জনগণ তাকে হেয় চোখে দেখবে। তেমনি যদি তিনি ধৈর্যশীল না হনতাহলে জনগণ তাঁর হাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। তেমনি যদি তিনি বিজ্ঞ না হনতাহলে জনগণের কল্যাণ সাধনে তিনি অপারগ হবেন। 
রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই জ্ঞানীপ্রাপ্ত বয়স্কস্বাধীন ও পুরুষ হতে হবে। আরও হতে হবে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণক্ষম। তাঁকে দৃষ্টিশ্রবণ ও বাক শক্তির অধিকারী হতে হবে। জনগণ তাঁর ব্যক্তিত্ব ও খান্দানকে যেন মর্যাদার চোখে দেখে। তাঁর নিজের ও বাপ-দাদার এরূপ ভাল পরিচিতি থাকা চাই যা থেকে জনগণ তাঁর ওপর আস্থা স্থাপন করতে পারে। তারা যেন বিশ্বাস করতে পারে যেতার দ্বারা দেশ ও জাতির যথার্থ কল্যাণ হবে। 
রাষ্ট্রপতির এসব গুণাবলীর প্রয়োজনীয়তা জ্ঞানী মাত্রই উপলব্ধি করবেন। আর এ ব্যাপারে সকল বনী আদম একমত। যে দেশে আর যে সম্প্রদায়ের লোকই হোক না কেনএ ব্যাপারে তাদের কোন মতানৈক্য নেই। কারণ তারা জানেরাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা উপরিবর্ণিত চরিত্র ও গুণাবলী ছাড়া অর্জিত হতে পারে না। সে ক্ষেত্রে জনগণ স্বভাবতঃই তার প্রতি বিরূপ হবে এবং তাঁর বিরুদ্ধে গণ-অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়বে। যদি তারা প্রকাশ্যে কিছু নাও বলেতথাপি তারা অসন্তোষের কারণে রাষ্ট্রীয় কাজে উদাসীন থাকবে। 
তাই রাষ্ট্রপতির জন্য প্রয়োজন হল গণমনে তাঁর প্রভাব ফেলা ও তা সর্বক্ষণ অক্ষুণ্ন রাখা। তেমনি যে সব কাজ তাঁর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে সেগুলোর ব্যাপারে তাঁর সার্বক্ষণিক সতর্কতা প্রয়োজন। যে রাষ্ট্রপতি তাঁর প্রভাব সৃষ্টি করতে আর তা অক্ষুণ্ন রাখতে চানতাঁকে অবশ্যই উপরোক্ত চরিত্র ও গুণাবলীর অধিকারী হতে হবে। তাছাড়া রাষ্ট্রনায়ক সুলভ সব ধরনের গুণাবলীর অধিকারী হতে হবে। তাছাড়া রাষ্ট্রনায়ক সুলভ সব ধরনের গুণাবলীই তাকে অর্জন করতে হবে। যেমনসাহসিকতাবিজ্ঞতাবদান্যতাক্ষমাপরায়ণতাঔদার্য্য সার্বজনীন কল্যাণ প্রবণতা। 
জনগণের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করে তাদের মুঠোয় আনার জন্য রাষ্ট্রপতিকে শিকারীর ভূমিকা নিতে হবে। শিকারী যেরূপ জংগলে বিভিন্ন কলাকৌশলের মাধ্যমে হরিণ শিকার করে থাকেঠিক সেরূপ করতে হবে। শিকারী জংগলে গিয়ে যখন কোন হরিণ দেখতে পায়তখন সে হরিণের স্বভাব ও মেজাজের উপযোগী পন্থা ও কলাকৌশল ভেবে নেয়। তারপর সে শিকারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। যখন শিকার দৃষ্টিগোচর হয়তখন সেটার চোখ-কান থেকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা চালায়। যখন সন্দেহ হয় যে শিকার তার উপস্থিতি টের পেয়েছে তখনই নিষ্প্রাণ পাথরের মত নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। যখন বুঝতে পায়শিকার তার ব্যাপারে উদাসীন হয়েছেতখনই আগে বেড়ে যায়। কখনও শীশ দিয়ে সেটাকে খুশী করে আর তার সামনে তার প্রিয় বস্তু এগিয়ে দেয়তা সে এমনবাবে দেয় যেন সেটাকে মায়া করেই খাওয়ার জন্য দেয়শিকার করার ইচ্ছে তার আদৌ নেই। এভাবে দাতা ও গ্রহীতার ভেতর প্রীতি বেড়ে যায়। এ প্রীতির শৃঙ্খল লোহার শিকরের চেয়ে শক্ত। এভাবে সেটা শিকারীর সহজ শিকারে পরিণত হয়। ঠিক এভাবেই যে ব্যক্তি নিজেকে জনগণের সামনে পেশ করতে চায় তার উচিত জনগণের পছন্দনীয় পোশাককথাবার্তা ও আচার-আচরণ অবলম্বন করা। তারপর আস্তে আস্তে তাদের কাছাকাছি হতে থাকবে আর ছল চাতুরীমুক্ত নিঃখাত প্রীতি ও ভালবাসা তাদের বিলিয়ে চলবে। তারা যেন ঘুনাক্ষরেও সন্দেহ করতে না পারে যেতাঁর এ প্রীতিঅনুগ্রহ তাদের শিকার করার জন্যই দেখানো হচ্ছে। তাদের অন্তরে এটা মজবুত ভাবে বসিয়ে দিতে হবে যেতাদের জন্য তার মত হিতাকাঙ্ক্ষী আর কেউ হতে পারবে না। এভাবে তাদের অন্তর যেন তার প্রীতিতে ভরপুর হয়ে যায়। ফলে যেন তারা তার ব্যাপারে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। 
মোটকথারাষ্ট্রপতির এ সব ব্যাপার খুব লক্ষ্য রাখতে হবে। তার তরফ থেকে যেন এমন কাজ প্রকাশ না পায় যাতে উক্ত অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটায়। যদি কোন ভুলত্রুটি হয়ে যায়তাহলে ভাল কিছু করে সংগে সংগে তার প্রতিকার করবে। তারপর বুঝিয়ে দেবে যে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেটাকেই তাদের জন্যে ভালবেসে করা হয়েছিল এবং তাদের ক্ষরি জন্যে আদৌ করা হয়নি। 
তো গেল এক দিক। অপর দিকে যারা রাষ্ট্রপতির অবাধ্য হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি করতে চায় তাদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে। পক্ষান্তরে যারা তার আনুগত্য মেনে নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় সহযোগিতা করবে তাদের জন্য পদোন্নতি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। তবে খেয়ানতকারী এবং অবাধ্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদোন্নতি ও বেতন হ্রাসের ব্যবস্থা নিতে হবে। 
মোটকথাযে ব্যক্তি জনগণের অকল্যাণ করবে তার অকল্যাণ করতে হবে। তবে কারো বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আগে পরামর্শ সভায় তা আলোচনা করে তাদের বুঝিয়ে নিতে হবে যেসে শাস্তি পাবার যোগ্য। রাষ্ট্রপতির বা কোন সরকারী কর্মকর্তার পক্ষে জনগণকে অনুর্বল বা অনাবাদী জমি চাষ করতে কিংবা আবাদের জন্য কোন দূর দূরান্তে যেতে বাধ্য করা উচিত হবে না। 
রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই সুস্পষ্ট দৃষ্টিসম্পন্ন ও দূরদর্শী হতে হবে। জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ঙ্গম করার মত ক্ষমতা তার থাকতে হবে। সব ব্যাপারে তার ধারণা এরূপ স্বচ্ছ থাকতে হবে যেন তিনি সব কিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। 
রাষ্ট্রপতির জন্য অপরিহার্য হচ্ছে আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে না রাখা। তেমনি কেউ যদি তার বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র চালায়তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে শায়েস্তা না করা যায়ততক্ষণ তার ক্ষান্ত হওয়া ঠিক নয়।

পরবর্তী পর্ব
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৬ 
পরামর্শ পরিষদ ও কর্মকর্তাদের গুণাবলী ও দায়িত্ব 

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (২৩) রাজনীতি



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৫ 

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ২৩)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

রাজনীতি 
রাষ্ট্রবিজ্ঞান সেই বিদ্যাকে বলেযাতে নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক বর্ণনা করা হয়। কোন রাষ্ট্রের নাগরিক বলতে তাদের বুঝায়যারা ভিন্ন ভিন্ন থাকা সত্ত্বেও সম ভাবধারায় উদ্ধুদ্ধ ও জীবন-জীবিকার যাবতীয় কায়কারবারে পরস্পর সম্পৃক্ত। 
মূলতঃ যে কোন রাষ্ট্রের নাগরিকগণ একই ব্যক্তি সদৃশযার বিভিন্ন অংগ-প্রত্যংগ মিলে একক দেহ গঠিত হয়েছে। প্রত্যেকটি যৌগিক বস্তুর যে কোন অংশে ক্ষতি দেখা দেয়ার সম্ভাবনা থাকে কিংবা তাতে কোন ব্যাধি সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎতাতে যথাযথ অবস্থার বদলে কোন অব্যবস্থা দেখা দিতে পারে। অথবা তাতে যথাযথ অবস্থা বহাল থাকতে পারে এবং তা সুন্দর ও সুস্থ মনে হতে পারে। মোটকথাবিভিন্ন অংশের সমন্বয়ে সৃষ্ট যে কোন বস্তুতে এদুটো অবস্থা দেখা দিতে পারে। 
যে কোন রাষ্ট্রে বহু লোক বাস করে। ভাল-মন্দ ভাবনার ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত হওয়া স্বাভাবিক। কোন উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পরিষদ ছাড়া কেউ কারো নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে না। কারণতা করতে গেলে ঝগড়া-বিবাদ ও দাংগা-হাংগামা সৃষ্টি হবে। তাই গোটা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এমন এক ব্যক্তির হাতে থাকতে হবে যার আনুগত্য রাষ্ট্রের ভাংগা-গড়ার ক্ষমতাসম্পন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মেনে নেয়। অর্থাৎতিনি হবেন তাদেরই নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান। রাষ্ট্র প্রধানকে পূর্ণ ক্ষমতাবান হতে হবে। তার অধীনে সামরিক বাহিনী থাকতে হবে! সংকীর্ণমনা উগ্র স্বভাবের দাংগা-হাংগামা প্রিয় লোকদের জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন সর্বাধিক। 
এই ব্যবস্থার অবর্তমানে দেখা যায় যেদুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসে এবং তখন তারা ইনসাফের বিধি-বিধান বর্জন করে খেয়ালখুশী মত সমাজ পরিচালিত করে। এ ধরনের সংগঠনকে ডাকাত সংঘের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে শুধু জনসাধারণের সম্পদ লুণ্ঠন করা। অথবা তাদের কাজ হয় হিংসা-বিভেদ ছড়ানোশত্রুতা উদ্ধার করা ও যে কোন মূলে ক্ষমতায় জেঁকে বসা। এদের হাতে মানুষের চরম দুর্গতি নেমে আসে। এরূপ অবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে জনগণকে উদ্ধুদ্ধ ও সংঘবদ্ধ করে তাদেরকে উৎখাতের জন্য জেহাদ করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। 
সঠিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অবর্তমানে অন্যান্য যে সব জটিলতা ও অকল্যাণ দেখা দেবে তা হল এইঃ 
কোন দুর্ধর্ষ লোক যদি কাউকে হত্যা কিংবা আহত করেঅথবা নির্যাতন করেকিংবা কারো স্ত্রীকন্যাভগ্নির ইজ্জত নষ্ট করতে চায়অথবা তার ধন-সম্পদ গায়ের জোরে ছিনিয়ে নেয় বা রাতের আঁধারে চুরি করে কিংবা কারো সম্মান হানি ঘটায়অপবাদ রটায় ও নানা ভাবে ক্ষতি করে চলেতখন তার প্রতিকারের কোন উপায় থাকে না। 
এ সব প্রকাশ্য অপরাধ ছাড়াও বেশ কিছু অপ্রকাশ্য ও পরোক্ষ অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। যেমনযাদু করাবিষ খাওয়ানোমানুষকে ক্ষতিকর ব্যবহার শিক্ষা দানমানুষে মানুষে ঝগড়া বাঁধানোর ষড়যন্ত্র করারাষ্ট্রপতি ও নাগরিককর্মচারী ও মালিকস্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট করার চক্রান্ত চালাতো ইত্যাদি। 
তেমনি চরিত্র ধ্বংসকারী কার্যকলাপ যথা পুরুষ কিংবা নারীর সমকামিতা অথবা পশুর সংগে পাশবিকতার মত বদ-অভ্যেস মানব সমাজের সামাজিক রীতি-নীতির বিপর্যয় ঘটায়। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনে ভাংগত সৃষ্টি হয়কিংবা তারা অসুখী হয়। 
তেমনি সে সব বদঅভ্যেস যা মানব সমাজের বিবেক ও রুচির পরিপন্থী। যেসব পুরুষরা নারী সেজে নারী সুলভ আচরণ চালায় কিংবা নারীরা পুরুষ সেজে পুরুষকে আচরণ দেখায়। 
তেমনি সেসব স্বভাব যা বড় রকমের ঝগড়ার সৃষ্টি করে। যেমনএরূপ কোন নারী লাভের জন্য কয়েকজনে জুটে কাড়াকাড়ি করা যে নারী মূলতঃ কারো জন্যই নির্ধারিত নয়কিংবা মদ পান করে মাতলামী করা। 
তেমনি নাগরিক জীবন দুর্বিষহ করার বিভিন্ন গর্হিত কাজে লিপ্ত হওয়া। যেমনজুয়া খেলাঘুষের আদান-প্রদানমাপে কম দেয়াভেজাল মেশানোদুর্মূল্য সৃষ্টির জন্য গুদামজাত করাকিংবা ফটকাবাজারী করাঅন্যকে ফাঁসানোর জন্য দাম বাড়ানোর দালালী করা ইত্যাদি।
তেমনি নাগরিক জীবন অতীষ্টকারী ঘৃণ্য কার্যকলাপে লিপ্ত থাকা। মিথ্যা মামলাবানোয়াট ও জাল দলীল প্রণয়নমিথ্যা সাক্ষীমিথ্যা শপথ ইত্যাদি। কারণএসব কারণে সত্য উদঘাটন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা দুরূহ হয়ে পড়ে। পরন্তু নাগরিক নৈতিকতাও কলুষিত হয়। 
তেমনি শহরবাসী শহুরে পেশা ছেড়ে গ্রামে গিয়ে চাষাবাদ শুরু করে কিংবা গ্রামবাসী চাষাবাদ ছেড়ে সবাই ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করাও একটা ক্ষতিকর দিক। কারণযে পেশায় যারা দক্ষ তারা হঠাৎ পেশা বদল করলে সব ক্ষেত্রেই অদক্ষতা ও ব্যর্থতা দেখা দেয়। এ কারণে খাদ্য উৎপাদকদের যেমন খাদ্য উৎপাদনে থাকা উচিততেমনি অন্যান্য পেশাদারদের নিজ নিজ পেশায় দক্ষতা প্রয়োগে লেগে থাকা কর্তব্য। মূলতঃ কৃষিকাজ যেন খাদ্য আর অন্যান্য পেশ লবণ। একটি ছাড়া অপরটি বিস্বাদ ও অর্থহীন হয়ে যাবে। 
তেমনি হিংস্র জন্তু ও ক্ষতিকর এবং কীট-পতংগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়া। অথচ সেগুলো ধ্বংস করে ফেলা অপরিহার্য। 
এসব তো গেল রাষ্ট্রের নাগরিক জীবনের নিরাপত্তার জন্য নাগরিকদের নীতি-নৈতিকতার বিভিন্ন দিক। এখন আলোচ্য হচ্ছে তাদের বৈষয়িক সংরক্ষণ ও উন্নয়নের দিকসমূহ। যেমনরাজধানী ও কেন্দ্রীয় শহরগুলোয় জাতীয় প্রয়োজনের বিভিন্ন সৌধ নির্মাণপ্রাচীর ও দূর্গ তৈরীসারাইখানাবাজাররাস্তা-ঘাটও পুল তৈরীপুস্করিণীখাল ও কূপ খনননদী বন্দর ও জাহাজ তৈরী করে পণ্য আমদানী-রফতানী ও যোগাযোগের ব্যবস্থা করাচাকরীব্যবসা ও শিল্পের সৃষ্টি করাস্বদেশ ও বিদেশী মূলধন বিনিয়োগের আকর্ষণ ও সুযোগ সৃষ্টি করা ইত্যাদি। 
তাছাড়া প্রত্যেক পেশার লোকজনকে নিজ নিজ পেশার কাজের উৎসাহপরিবেশ ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বেকারদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শিল্পখাতে দ্রব্য যাতে উন্নতমানের হতে পারে তার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার উপর বিশেষ জোর দিতে হবে। কৃষি বিদ্যালয় গড়ে তুলতে হবে। ভূমি অনাবাদী রাখা যাবে না। ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্লানিংয়ে পারদর্শী লোক তৈরী করতে হবেদেশের নাগরিকদের সামগ্রিক অবস্থা জানার ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাহলে কার কোথায় কি প্রয়োজন তা যথাসময়ে নিরসনের ব্যবস্থা নেয়া যাবে। বিত্তবানদের সহায়তায় বিত্তহীনদের অবস্থার প্রতিকার করতে হবে। 
বিশেষতঃ রাষ্ট্রীয় তহবিল যেন বেকারভাতা আর ওলামাসেনানায়ককবি-সাহিত্যিক ইত্যাকার অনুৎপাদনশীল লোকের ভার বহন করে নিঃশেষ না হয়। তাহলে পেশাদার কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত ট্যাক্স বসিয়ে তাদের নিরুৎসাহ করা হবে। ফলে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডার অধিকতর দুর্বল হয়ে পড়বে। এ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তাই কর্মহীন সব লোককেই বেকারভাতা না দিয়ে কর্মক্ষমদের উৎপাদনশীল কাজে নিয়োগ করতে হবে এবং সামরিক ও পুলিশ বাহিনীতে প্রয়োজন মোতাবেক নিয়োগ করতে হবে। রাষ্ট্রনায়কদের উপরোক্ত ব্যবস্থাগুলো সতর্কতার সাথে অনুধাবন করতে হবে।

পরবর্তী পর্ব
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৬ 
রাষ্ট্রপতিগণের চরিত্র ও গুণাবলী 

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (২২) অর্থনৈতিক ব্যবস্থা



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৪ 

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ২২)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)


অর্থনৈতিক ব্যবস্থা 
অর্থনীতি এমন এক বিদ্যা যাতে মানুষের বৈষয়িক সহযোগিতার লেনদেন ও আয়-ব্যয়ের অবস্থা পর্যালোচিত হয়। অর্থনীতির মূলনীতি হল এইমানুষের চাহিদা যতই খুব বেড়ে গেল আর প্রত্যেকেই নিজ নিজ প্রয়োজন মনের মত করে পূরণ করার জন্য উদগ্রীব হলততই দেখতে পেল কারো পক্ষেই বিচ্ছিন্ন থেকে একাকী তা পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণকারো কাছে হয়তো প্রয়োজনাতিরিক্ত পানি রয়েছে কিন্তু খাবার নেই। ফলে একে অপরের মুখাপেক্ষী হতে বাধ্য হয়। এক্ষেত্রে বিনিময় ছাড়া তাদের গত্যন্তর নেই। তাই এ বিনিময়ের কাজটি অভাব পূরণের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হয়। তখন এটা অপরিহার্য মনে হল যেপ্রত্যেক ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোন এক প্রয়োজনীয় বস্তু উৎপাদন বা তৈরীর কাজে আত্মনিয়োগ করবে এবং সেটাকেই সুদৃঢ় ভিত্তিতে গড়ে তুলবে ও তার সর্ববিধ উপকরণ সংগ্রহ ও সরবরাহ করবে। এমনকি সেটাকে অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের বিনিময়ের মাধ্যম করার উপযোগী করবে। এ ভাবে বার্টার সিস্টেম অর্থনীতির এক সর্বজন স্বীকৃত মূলনীতি হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন দেখা গেলএকজনের পছন্দনীয় জিনিসটি অপর ব্যক্তির পছন্দ হচ্ছে নাতাই দ্রব্য বিনিময় কোন কোন ক্ষেত্রে অচল হয়ে পড়ছেতখন তারা এ ব্যবস্থার বিকল্প আবিস্কারে আত্মনিয়োগ করল। ফলে তারা স্থায়ীত্ব লাভকারী খনিজ দ্রব্য বিনিময় কোন কোন ক্ষেত্রে অচল হয়ে পড়ছেতখন তারা এ ব্যবস্থার বিকল্প আবিস্কারে আত্মনিয়োগ করল। ফলে তারা স্থায়িত্ব লাভকারী খনিজ দ্রব্য উত্তোলনপূর্বক মুদ্রা তৈরী করে বিনিময়ের মাধ্যম বানাল। তখন এটাই সর্বজন স্বীকৃত মাধ্যম হয়ে দাঁড়াল। খনিজ দ্রব্যের ভেতর সোনা ও রূপা এ কাজে ব্যবহৃত হয়। এগুলো মুদ্রাকারে তৈরী বিধায় মানুষের বহনের জন্যও সহজসাধ্য হল। তাছাড়া সোনা বা রূপার কোন গুণগত তারতম্য না থাকায় পছন্দ অপছন্দের বিরোধ দেখা দিল না। ফলে এ দুটোই সাধারণতঃ স্থায়ী সমাধান হয়ে দাঁড়াল। অন্য মাধ্যমটি শুধু উভয় পক্ষের স্বীকৃতির ভিত্তিতে অব্যাহত থাকল। 
উপার্জনের পন্থা হিসেবে মানুষ কৃষিপশুপালন ও পশু শিকারকাষ্ঠ ও ফলমূল সংগ্রহ এবং খনিজ দ্রব্য আহরণকে গ্রহণ করল। তাছাড়া কামারসূতারতাঁতী ইত্যাদি শিল্পজাত পেশাজীবী গড়ে উঠল। এর মাধ্যমে মানুষ তার আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভাবে কাজে লাগাল। ব্যবসা-বাণিজ্য এক গুরুত্বপূর্ণ পেশ হিসেবে দেখা দিল। 
তারপর শহর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য মেথর ও ঝাড়ুদার নামক পেশাদার সৃষ্টি হল। অতঃপর মানুষের নানাবিধ চাহিদা ও প্রয়োজন মেটাবার জন্য বিভিন্ন পেশাদার জন্ম নিল। এ ভাবে মানুষ যতই ভোগ-বিলাস ও আড়ম্বরের দিকে অগ্রসর হলতত বেশী পেশাদার সৃষ্টি হয়ে চলল। এমনকি এক এক পেশায় এক এক শ্রেণী নির্দিষ্ট হয়ে গেল। 
এর কারণ দুটো। প্রথমতঃ প্রত্যেকে তার নিজ নিজ দক্ষতা ও ক্ষমতা অনুসারে নির্দিষ্ট পেশ গ্রহণ করল। সাহসী বাহাদুরেরা সামরিক পেশায়মেধাবী ও ধীশক্তি সম্পন্নরা অফিস-আদালতের পেশায় এবং দৈহিক শক্তিধর ও পরিশ্রমীরা বোঝা বহন ও শ্রমের পেশায় নিয়োজিত হল। দ্বিতীয়তঃ সুযোগ-সুবিধার কারণেও পেশা নির্ধারিত হয়। যেমনএকজন কামারের ছেলের কিংবা তার সহচরদের জন্য কামার হওয়া যেরূপ সহজঅন্যের জন্য সেরূপ সহজ নয়তেমনি কামারের ছেলের জন্য অন্য কোন পেশাও সহজ সাধ্য নয়। যেভাবে নদীর কূলের বাসিন্দাদের জন্য জেলে হওয়া যত সহজঅন্য কিছু হওয়া তার জন্য তত সহজ নয়। 
এসব পেশাদার ছাড়াও কিছু লোক থাকে যাদের কোন ভাল পেশার সুযোগ বা শক্তি থাকে না। তখন তারা নাগরিকদের জন্য ক্ষতিকর পেশায় নিয়োজিত হয়। যেমন চুরিজুয়াডাকাতিভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদি। 
বিনিময় কার্যের আবার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। কখনও দ্রব্য দিয়ে দ্রব্যের বিনিময় হয়। সেটাকে বেচা-কেনা বলা হয়। কখনও দ্রব্যের বিনিময়ে কাজ নেয়া হয়। সেটাকে মজুরী বা ভাড়া বলা হয়। শহরবাসী কিংবা জনবহুল এলাকার নাগরিকদের ভেতর যেহেতু আত্মীয়তা বা প্রতিবেশী সুলভ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেতাই তাদের ভেতর হেবাউপহার ও ধার-কর্জের আদান-প্রদান ও লেনদেন চালু হয়। দরিদ্র শ্রেণীর জন্য দান-খয়রাতের রীতি প্রবর্তিত হয়। 
মূলতঃ যে কোন সমাজে কিছু লোক জ্ঞানী হয়কিছু লোক বোকা হয়কিছু লোক সবল হয়কিছু লোক কর্মঠ হয়কিছু লোক বিলাসী হয়কিছু হিসেবী হয়এবং এর ফলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়। তাই একে অপরের সহযোগিতা ছাড়া চলতে পারে না। এ সহযোগিতার ক্ষেত্রে চুক্তিশর্ত ও সমঝোতার প্রশ্ন দেখা দেয়। 
এ সবের জন্যই বর্গা প্রথাসমবায় প্রথাশেয়ারের ব্যভসাপাওয়ার অব এটর্নীইজারা প্রথা ইত্যাদি রীতি চালু হয়। এ ক্ষেত্রে ধার-কর্জও জরুরী হয়। কখনও আমানতের লেনদেন হয়ে থাকে এসব ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততার অভাব দেখা দেয়ায় সাক্ষী-সাবুদলেখা-পড়াদলীল-দস্তাবীজজামীন-জামানত ইত্যাদি ব্যবস্থা অনুসৃত হয়। মানুষ যত বেশী সম্পদ আহরণ করতে থাকলতত বেশী পারস্পরিক সহযোগিতার রীতি-নীতি চালু হতে লাগল। 
এভাবে সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের ভেতর লেনদেনের এসব রীতি-নীতির বিস্তার লাভ ঘটেছে। আপনার এও দেখতে পাবেনঅর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ভাল-মন্দের ভিত্তিতেই ন্যায়বান ও নিপীড়ক নির্ণীত হয়।

পরবর্তী পর্ব 
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৫
রাজনীতি 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...