মঙ্গলবার, ২৫ জুলাই, ২০২৩

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১০) আত্মপ্রসাদের ক্ষতি



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১০)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আত্মপ্রসাদের ক্ষতি

আত্মপ্রসাদ অহংকারের অন্যতম কারণ বিধায় আত্মপ্রসাদ যদি আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়, তবে এর কারণে মানুষ কোন কোন গোনাহকে স্মরণই করে না। যদি স্মরণ করে, তবে তাকে সাগীরা তথা ক্ষুদ্র গোনাহ জেনে তা পূরণে সচেষ্ট হয় না; বরং মনে করে নেয় যে, এতো মাফই হয়ে যাবে। এছাড়া মানুষ নিজের এবাদত ও আমলকে বড় মনে করে তাতে সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহর প্রতি অনুগ্রহ মনে করে এবং আল্লাহর নেয়ামত বিস্তৃত হয়। যখন কেউ নিজের আমলের কারণে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত হয়, তখন সে সেই আমলের বিপদ সম্পর্কে অন্ধ হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি আমলের বিপদ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, তার অধিকাংশ প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কেননা, বাহ্যিক আমল পাক-সাফ ও সংমিশ্রণমুক্ত না হলে তা খুবই কম উপকারী হয়ে থাকে। যার উপর ভয় প্রবল থাকে, সেই আমলের বিপদ খোঁজ করে। যে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত, সে অহেতুক নির্ভীক হয়ে থাকে। সে আল্লাহর আযাব থেকে নিজেকে মুক্ত মনে করে। এ কারণেই সে নিজের প্রশংসা নিজেই করতে থাকে। যে ব্যক্তি আপন মতামত ও বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারে আত্মপ্রীত, সে পরামর্শ গ্রহণ ও জিজ্ঞাসা করে জেনে নেয়া থেকে বঞ্চিত থাকে। সে নিজের চেয়ে বড় পণ্ডিত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করাকে দূষণীয় জ্ঞান করে এবং কোন উপদেশদাতার কথায় কর্ণপাত করে না; বরং অপরকে মূর্খতুল্য মনে করে। তার নিজস্ব মতামতটি যদি ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কিত হয়, তবে এর কারণে সে চিরতরে বরবাদ হয়ে যায়।



পরবর্তী পর্ব

আত্মপ্রসাদের সংজ্ঞা ও স্বরূপ

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৯) আত্মপ্রসাদের নিন্দা



 অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৯)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আত্মপ্রসাদের নিন্দা
আত্মপ্রসাদের নিন্দা কোরআন পাক ও হাদীস শরীফে বিধৃত হয়েছে। সেমতে আল্লাহ তা'আলা বলেন :

>“হুনায়ন যুদ্ধে তোমরা নিজেদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত হলে বটে, কিন্তু তা তোমাদের কোনই উপকার করেনি।” 

এখানে আত্মপ্রসাদ নিন্দার ভঙ্গিতে উল্লেখ করা হয়েছে। >“তারা ধারণা করল, তাদের দুর্গসমূহ তাদেরকে আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করবে। অতঃপর আল্লাহর শাস্তি এমন জায়গা থেকে তাদের কাছে আসল যার কল্পনাও তারা করেনি।”


এ আয়াতে কাফেরদের দুর্গ নিয়ে আত্মপ্রসাদের নিন্দা করা হয়েছে। এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তিনটি বিষয়কে বিনাশকারী বলে অভিহিত করেছেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আত্মপ্রসাদ। 

হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : দুটি বিষয় ধ্বংসাত্মক-একটি নৈরাশ্য, অপরটি আত্মপ্রসাদ। এরূপ বলার কারণ এই যে, সৌভাগ্য দুটি বিষয় দ্বারাই অর্জিত হয় একটি চেষ্টা ও অধ্যবসায়, অপরটি কর্মতৎপরতা। নিরাশ ব্যক্তি চেষ্টা করে না, আর যে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত, সে নিজেকে সৌভাগ্যশালী বলে বিশ্বাস করে। তাই অর্জন করা থেকে বিরত থাকে। 

আল্লাহ তা’আলা বলেন : (পালা তু্যাক্কু আনফুছাহুম)

ইবনে জুরায়জের মতে এর অর্থ কেউ যেন কোন সৎকাজ করে এ কথা না বলে যে, সে করেছে। যায়দ ইবনে আসলাম বলেন : নিজেকে সৎকর্মপরায়ণ বলে বিশ্বাস করো না। এটা আত্মপ্রসাদ। 

উহুদ যুদ্ধে হযরত তালহা (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে শত্রুর আঘাত থেকে মুক্ত রাখার জন্যে তাঁর উপর পড়ে গিয়েছিলেন, যাতে শত্রুর আঘাত তাঁর নিজের গায়েই লাগে। ফলে, তাঁর হাতের তালু ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল এবং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) অক্ষত ছিলেন। এটা একটা মহৎ প্রচেষ্টা ছিল বিধায় তাঁর দৃষ্টিতেও পরবর্তী সময়ে এর যথেষ্ট মাহাত্ম্য ছিল। হযরত উমর (রাঃ) নিজের অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা তাঁর এই আত্মপ্রসাদ জেনে নেন এবং বলেন : রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর জন্যে তালহার হাত ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পর থেকেই তার মধ্যে আত্মপ্রসাদ পরিলক্ষিত হচ্ছে। 

এখানে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এমন পুণ্যবান সাহাবীও যখন আত্মপ্রসাদ থেকে বাঁচতে পারলেন না, তখন দুর্বলচেতা মানুষ সাবধানতা অবলম্বন না করলে তাদের কি দশা হবে ! 

হযরত মুতরিফ (রহঃ) বলেন : আমি যদি সারারাত নাক ডাকিয়ে ঘুমাই এবং সকালে এই গাফলতির জন্যে অনুতাপ করি, তবে এটা সারারাত তাহাজ্জুদ পড়ে সকাল বেলায় আত্মপ্রসাদ বা আত্মতৃপ্তিতে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে ঢের উত্তম। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন :

>“যদি তোমরা গোনাহ না কর, তবে আমি তোমাদের জন্যে এর চেয়েও মারাত্মক বিষয়ের আশংকা করি। সেটা হচ্ছে আত্মপ্রসাদ। 

এখানে আত্মপ্রসাদকে সকল গোনাহের চেয়ে বড় বলা হয়েছে। 

বিশর ইবনে মনসুর (রহঃ) সদা এবাদতে মগ্ন থাকতেন। ফলে তাকে দেখলে আল্লাহ ও কিয়ামতের কথা স্মরণ হত। একদিন তিনি দীর্ঘক্ষণ নামায পড়লেন। জনৈক ব্যক্তি পিছন থেকে তাকে দেখল। সালাম ফিরানোর পর তিনি লোকটিকে বললেন : তুমি আমার যে অবস্থা দেখেছ, তাতে আশ্চর্যান্বিত হয়ো না। অভিশপ্ত ইবলীসও ফেরেশতাদের মধ্যে থেকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত এবাদত করেছিল। কিন্তু তার পরিণাম কি হয়েছে, তাতো তোমার অজানা নেই। হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে কেউ প্রশ্ন করল : মানুষ কখন খারাপ হয়? তিনি বললেন : “যখন সে নিজেকে ভাল মনে করতে থাকে”। 


আল্লাহ তা'আলা বলেন : >“তোমরা অনুগ্রহ প্রকাশ করে ও কষ্ট দিয়ে আপন সৎকর্ম বাতিল করো না।”

অনুগ্রহ প্রকাশ করা হচ্ছে দানকে বড় মনে করার ফল। বলা বাহুল্য, কোন আমলকে বড় মনে করাই আত্মপ্রসাদ বা আত্মপ্রীতি। অতএব জানা গেল যে, আত্মপ্রীতি নিশ্চিতই মন্দ কাজ।



পরের পর্ব

আত্মপ্রসাদের ক্ষতি 

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৮) অহংকারের প্রতিকার ও বিনয় অর্জনের উপায়



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৮)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অহংকারের প্রতিকার ও বিনয় অর্জনের উপায়

উপরোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেল যে, অহংকার একটি ধ্বংসমূলক বিষয়। খুব কম মানুষই এ থেকে মুক্ত। এই অহংকার দূর করা ফরযে আইন। কেবল বাসনা করলেই এটা দূর হবে না; বরং এমন ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে, যা তাকে সমূলে উৎপাটিত করে দেয়। দ্বিবিধ উপায়ে এর প্রতিকার সম্ভব। 

(১) অন্তরে নিহিত এর মূল শিকড় উপড়ে ফেলে এবং (২) যে সকল কারণে মানুষ অহংকার করে, সেগুলোকে দূর করে। 

মূল শিকড় উপড়ে ফেলার জন্যে দু'রকম চিকিৎসা দরকার একটি শিক্ষাগত ও অপরটি কর্মগত।




শিক্ষাগত চিকিৎসা

শিক্ষাগত চিকিৎসা এই যে, মানুষ নিজেকে চিনবে এবং আল্লাহ তা'আলাকে চিনবে। এতেই ইনশাআল্লাহ অহংকার দূর হয়ে যাবে। কেননা, মানুষ যখন নিজেকে যথাযথরূপে চিনবে, তখন বিশ্বাস করবে যে, সে নিজে সকল হেয় বস্তুর চেয়েও হেয়তম এবং সকল সামান্য বস্তুর চেয়েও সামান্যতম। অনুনয়, বিনয় ও লাঞ্ছনা ছাড়া কোন কিছুই তার প্রাপ্য নয়। এরপর যখন আল্লাহ তা'আলাকে চিনবে, তখন জানতে পারবে বড়ত্ব ও মহত্ত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারও জন্যে শোভনীয় নয়।


আল্লাহকে চিনা ও তার মাহাত্ম্য অনুধাবন করার বিষয়টি দীর্ঘ আলোচনা সাপেক্ষ। কেননা, এটাই এলমে মুকাশাফার চূড়ান্ত সীমা। যদিও আত্মজ্ঞান অর্জন করাও দীর্ঘ ব্যাপার। কিন্তু আমরা এখানে এ বিষয়বস্তু সম্পর্কে এতটুকু আলোচনা করব, যতটুকু বিনয় অর্জনের ক্ষেত্রে উপকারী। বলা বাহুল্য, এর জন্যে কোরআন পাকের একটি আয়াতের গূঢ়তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করে নেয়াই যথেষ্ট। আয়াতটি এই : 

>“মানুষ ধ্বংস হোক! সে কত যে অকৃতজ্ঞ! তিনি তাকে কি বস্তু দ্বারা সৃষ্টি করেছেন? বীর্য দ্বারা তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন, পরে তার বিকাশ সাধন করেছেন, অতঃপর তার জন্যে পথ সহজ করে দিয়েছেন, অতঃপর তার মৃত্যু ঘটান এবং কবরস্থ করেন। এরপর যখন ইচ্ছা তিনি তাকে পুনরুত্থিত করবেন।”


এ আয়াতে মানুষের প্রথম সৃষ্টি, পরিণতি ও মধ্যবর্তী অবস্থার কথা উল্লিখিত হয়েছে । মানুষ এসব অবস্থা চিন্তা করলে আয়াতের অর্থ হৃদয়ঙ্গম হয়ে যাবে।


উদাহরণতঃ প্রথম অবস্থায় মানুষের কোন উল্লেখও ছিল না। সে ছিল নাস্তির পর্দায় আবৃত। দীর্ঘকাল এ অবস্থাই অব্যাহত থাকে। নাস্তির সূচনা কখন হয়েছে, তাও জানা নেই। যে বস্তু অস্তিত্বহীন, তার চেয়ে অধিক নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত আর কি হবে? জন্মের পূর্বে মানুষ এরূপই ছিল। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাকে একটি হীন বস্তু অর্থাৎ মৃত্তিকা দিয়ে গড়ে তুলেন এবং অপবিত্র বস্তু অর্থাৎ বীর্য দ্বারা সৃষ্টি করেন। অতঃপর বীর্য থেকে জমাট রক্ত এবং জমাট রক্ত থেকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেন। এরপর অস্থি গঠন করেন এবং অস্থিকে মাংস ও ত্বকের আবরণ দান করেন। এ সব স্তর অতিক্রম করার পর মানুষ পৃথিবীতে উল্লেখযোগ্য হয়েছে। এরপরও জন্মের সাথে সাথে তার মধ্যে অনেক নিচ স্বভাব বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ, প্রথমে তাকে পাথরের ন্যায় জড় অবস্থায় সৃষ্টি করা হয়। সে কোন কিছু শুনত না, দেখত না, হৃদয়ঙ্গম করত না, নড়াচড়া করত না, কথা বলত না এবং কোন কিছু ধরত না। এক কথায়, সে যেন জীবন্ত ছিল না। সে ছিল শক্তিশালী হওয়ার পূর্বে নিঃশক্তি, জ্ঞানী হওয়ার পূর্বে অজ্ঞান, চক্ষুষ্মান হওয়ার পূর্বে অন্ধ, শ্রবণকারী হওয়ার পূর্বে বধির, বক্তা হওয়ার পূর্বে মূক, পথপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে পথভ্রষ্ট এবং সমর্থ হওয়ার পূর্বে অসমর্থ। আয়াতে এ কথাই বুঝানো হয়েছে। অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে :

>“জীবন লাভের পূর্বে কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে, যখন মানবসত্তা উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত বীর্য থেকে তাকে পরীক্ষা করার জন্যে।” 

বলা বাহুল্য, এখানেও পূর্বোক্ত বক্তব্য বিধৃত হয়েছে।

সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তা'আলা মানুষের পথ সহজ করে তার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যা এ বাক্যে ব্যক্ত হয়েছে। এতে মানুষ আমৃত্যু যা কিছু অর্জন করে, তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে-

>”তাকে সৃষ্টি করেছি মিলিত বীর্য থেকে তাকে পরীক্ষা করার জন্যে। অতঃপর আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন। আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি। হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ।”


সুতরাং যে মানুষের জন্ম ও জন্ম পরবর্তী অবস্থা এই, তার জন্যে গর্ব ও অহংকার করা কেমন করে বৈধ হবে? সে তো বাস্তবে নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতর এবং দুর্বল থেকে দুর্বলতম সত্তা। হাঁ, মানুষ যদি পূর্ণাঙ্গ সৃজিত হত, তার সব কাজ তারই এখতিয়ারভুক্ত থাকত এবং সে আপন ক্ষমতায় চিরঞ্জীব হত, তবে আপন সূচনা ও পরিণতি বিস্মৃত হয়ে অবাধ্য ও অহংকারী হওয়া তার জন্যে শোভা পেত। কিন্তু এখন অবস্থা অন্য রকম। তার স্বল্পকালীন জীবনে মারাত্মক রোগ-ব্যাধি এবং বিভিন্ন বিপদাপদ তাকে ঘিরে রাখে। ক্ষুধা, পিপাসা, জরামৃত্যু আরও কত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে তাকে দিন অতিবাহিত করতে হয়। নিজের লাভ-লোকসান, ইষ্ট ও অনিষ্টের এখতিয়ার তার নেই। সে অনেক কিছু জানতে চায়; কিন্তু অজ্ঞ থাকে। অনেক কিছু বিস্মৃত হতে চায়, কিন্তু পারে না। সার কথা, মানুষের অন্তর ও মন তার আয়ত্তের বাইরে। সে এমন বস্তু কামনা করে, যাতে তার ধ্বংস নিহিত এবং এমন বস্তুকে বর্জন করতে চায়, যাতে তার জীবন লুক্কায়িত। সে এমন খাদ্যকে সুস্বাদু মনে করে, যা খেয়ে বদহজমিতে ভোগে, মৃত্যুবরণ করে এবং তিক্ত ঔষধ, যা উপকারী ও জীবনদানকারী, তা খেতে চায় না। এমতাবস্থায় সে যদি নিজেকে চিনে, তবে অবশ্যই জানতে পারবে যে, তার চেয়ে হীন ও নিকৃষ্ট আর কিছু নেই। সুতরাং অহংকার করা মূর্খতা বৈ নয়।

এরপর যখন মানুষের মৃত্যু হবে, তখন সে পূর্বে যেরূপ জড় পদার্থ ছিল, তেমনি জড় পদার্থে পরিণত হবে। সে হবে একটি চেতনা ও অনুভূতিহীন কাঠামো। তাকে মাটিতে পুঁতে রাখা হবে। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গলে যাবে, অস্থিসমূহ পচে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বিভিন্ন কীট কিলবিল করে তার দেহকে খেয়ে ফেলবে। তখন কোন প্রাণী তার কাছে ভিড়বে না। মানুষ তাকে নাপাক মনে করবে এবং তীব্র দুর্গন্ধের কারণে তার কাছ থেকে দূরে পালাবে। কত ভাল হত যদি এই অবস্থায় মাটি হয়ে যাওয়ার পর সে মুক্তি পেত। কিন্তু এখানেই কাহিনীর শেষ নয়। সে পুনরুজ্জীবিত হবে। দেহের বিচ্ছিন্ন অংশসমূহ পুনরেকত্রিত হয়ে সে কবর থেকে উঠবে এবং কিয়ামতকে উপস্থিত দেখতে পাবে। সে দেখবে, আকাশ বিদীর্ণ, পৃথিবী পরিবর্তিত, পর্বতমালা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত, তারকারাজি নিষ্প্রভ এবং সূর্য গ্রহণে আবৃত। সর্বত্র অন্ধকারই অন্ধকার। তার সামনে আমলনামা রাখা হবে এবং বলা হবে এটা পাঠ কর। সে বলবে : এটা কিসের আমলনামা? 

উত্তর হবে- তোমার জীবদ্দশায় তোমার কাঁধে দু'জন ফেরেশতা নিয়োজিত ছিল। তুমি যা বলতে এবং যে কাজ করতে, তা তারা লিখে রাখত। তোমার ছোট-বড় সকল আমল এতে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তুমি ভুলে গেলে কি হবে, আল্লাহ ভুলে যাননি। এখন চল এবং হিসাব-নিকাশ দাও। একথা শুনতেই সে ব্যাকুল হয়ে পড়বে। এরপর আমলনামা পাঠ করে বলবে— হায় হায়! এতে তো ছোট-বড় সকল গোনাহই বিদ্যমান। এ হচ্ছে সকল মানুষের শেষ পরিণতি, যা (ثُمَّ إِذَا شَاءَ أَنشَرَهُ)-এ বাক্যে ব্যক্ত হয়েছে। 

এখন চিন্তার বিষয় এই যে, যে মানুষের এই অবস্থা, অহংকারের সাথে তার কি সম্পর্ক থাকতে পারে? আস্ফালন করা ও বড়াই করা তো দূরের কথা, তার তো এক মুহূর্তও আনন্দিত হওয়া উচিত নয়। এ হচ্ছে অহংকারের শিক্ষাগত চিকিৎসার বর্ণনা।




কর্মগত চিকিৎসা

এখন কর্মগত চিকিৎসা হল, প্রকাশ্যে বিনয় অবলম্বন করা এবং সকল মানুষের সাথে বিনম্র ব্যবহার ও সদাচরণ করা। যেমন আমরা ইতিপূর্বে সৎকর্মপরায়ণদের অবস্থা বর্ণনা করেছি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নত ও রীতিনীতির অনুসরণ করবে। 


বর্ণিত আছে, তিনি মাটিতে বসে আহার করতেন এবং বলতেন : আমি আল্লাহর বান্দা। তাই বান্দার মতই আহার করি। 

হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল : আপনি নতুন বস্ত্র পরিধান করেন না কেন? তিনি বললেন : আমি গোলাম; যেদিন মুক্তি পাব, সেদিন নতুন পোশাক পরিধান করব। এখানে মুক্তি বলে তিনি কিয়ামতের মুক্তি বুঝিয়েছেন।


বিনয় কর্মের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে। তাই আরব জাতিকে ঈমান ও নামাযের আদেশ করা হয়েছিল। কেননা, বিনয় ও নম্রতা তাদের স্বভাবের বিপরীত ছিল। এমনকি, কারও হাত থেকে বেত পড়ে গেলে তা উঠানোর জন্যে তারা নত হত না। জুতার ফিতা খুলে গেলে তা নুয়ে বেঁধে নিত না। সেমতে হাকীম ইবনে হেযাম যখন প্রথম বায়আত হয়েছিল, তখন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে শর্ত করেছিল যে, সে রুকু-সেজদা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে করবে। তিনি এ শর্ত মেনে নিয়েছিলেন। পরে অবশ্য হাকীম বুঝতে পারে এবং পাক্কা নামাযী হয়ে কামালাতের শীর্ষে পৌঁছান। মোটকথা, আরব জাতির কাছে সেজদা করা ও নত হওয়া ছিল চরম অপমানজনক। তাই নামাযের আদেশ হয়, যাতে তাদের অহংকার চূর্ণ হয় এবং অন্তরে বিনয় আসন গাড়ে। বলা বাহুল্য, নামাযের রুকূ, সেজদা ও দণ্ডায়মান থাকার মধ্যে পুরোপুরি বিনয়ভাব বিদ্যমান রয়েছে। এদিক দিয়েই নামাযকে “ধর্মের স্তম্ভ” আখ্যা দেয়া হয়েছে।


দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে অহংকারের কারণসমূহ দূর করার মাধ্যমে অহংকারের প্রতিকার করা। প্রথমত বংশ মর্যাদার কারণে যে ব্যক্তি অহংকার করে, তার দুটি বিষয় জানা উচিত। এক, বংশ নিয়ে গর্ব করা নিছক মূর্খতা। কেননা, অন্যের গুণ-গরিমা দ্বারা নিজের সম্মান হওয়া অর্থহীন। সুতরাং যে বংশের গর্ব করে, সে যদি নীচ স্বভাবের হয়, তবে অন্যের গুণ-গরিমা তার নীচ স্বভাবকে ঢেকে রাখবে কিরূপে। বরং যে ব্যক্তির বংশ নিয়ে গর্ব করে, সে জীবিত থাকলে একথাই বলত যে, শ্রেষ্ঠত্ব আমার মধ্যে রয়েছে। তুই তো আমার প্রস্রাবের কীট। তোর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব কোত্থেকে এল? দ্বিতীয় বিষয় এই যে, সে তার সত্যিকার বংশ চেনার চেষ্টা করবে এবং বাপ-দাদার কথা চিন্তা করবে। তার বাপ তো এক ফোঁটা নাপাক বীর্য এবং দাদা নিকৃষ্ট মৃত্তিকা। অতএব, যার মূল হচ্ছে নিকৃষ্ট মৃত্তিকা, যা পদতলে পিষ্ট হতে থাকে, সে অহংকার কিরূপে করতে পারে?                

অহংকারের অপর কারণ রূপ-লাবণ্য। এর চিকিৎসা এই যে, মানুষ তার অভ্যন্তর ভাগকে বুদ্ধির দৃষ্টিতে দেখবে জন্তু-জানোয়ারের ন্যায় কেবল বাহ্যিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে না। অভ্যন্তর ভাগের প্রতি লক্ষ্য করলে এমন ঘৃণ্য বিষয়াদি দৃষ্টিগোচর হবে, যা দ্বারা রূপের অহংকার নিমেষে বিলীন হয়ে যাবে। উদাহরণতঃ মানুষের সর্বাঙ্গ নোংরামিতে পূর্ণ। তার পেটে রয়েছে মল, মূত্রাশয়ে মূত্র, নাকে শ্লেষ্মা, মুখে থুথু, কানে ময়লা, ধমনীতে রক্ত, ত্বকে পুঁজ এবং বগলে দুর্গন্ধ। এ ছাড়া সে দিনে একবার অথবা দু’বার নিজের হাতে পায়খানা ধৌত করে এবং প্রত্যহ একবার অথবা দু'বার পেটের জঞ্জাল দূর করার জন্যে পায়খানায় যায়। পায়খানা তো দেখলেও ঘৃণা লাগে, স্পর্শ করা অথবা নাকে ঘ্রাণ নেয়া তো দূরের কথা। এ সব বিষয় মানুষের জন্যে অপরিহার্য করে দেয়া হয়েছে, যাতে সে সর্বদা আপন নাপাকী ও নীচতা ধ্যান করতে থাকে।


হযরত আনাস (রাঃ) বলেন : খলীফা আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) আমাদেরকে আমাদের নীচতা ও অপবিত্রতা স্মরণ করাতে যেয়ে বলতেন, মনে রেখ, তোমরা প্রস্রাবের পথ দিয়ে দু’বার নির্গত হয়েছ। সুতরাং মানুষ যখন চিন্তা করবে যে, সে নোংরা বস্তু থেকে সৃজিত হয়েছে, নোংরা বস্তুর মধ্যেই জীবন কাটিয়েছে এবং মৃত্যুর পরও নোংরা বস্তুই হয়ে যাবে, তখন নিজের রূপ-লাবণ্যকে গর্বের বস্তু মনে করবে না।


অহংকারের আরও একটি কারণ হচ্ছে দৈহিক শক্তি ও বল। এর প্রতিকার এই যে, মানুষ সাধারণত যে সকল রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, সেগুলোর কথা চিন্তা করবে। উদাহরণতঃ যদি একটি শিরায়ও ব্যথা দেখা দেয়, তবে মানুষ অক্ষমদের চেয়েও হীনতম হয়ে যায়। আরও চিন্তা করা উচিত যে, যদি কোন মশা নাকে ঢুকে যায় অথবা পিঁপড়া কানে প্রবেশ করে, তবে এটাও মৃত্যুর কারণ হতে পারে। পায়ে কাঁটা ফুটলেও মানুষ শক্তিহীন হয়ে যায়। একদিনের জ্বরে অনেক দিনের শক্তি-সামর্থ্য বিনষ্ট হয়ে যায়। অতএব, যে ব্যক্তি একটি কাঁটাও সহ্য করতে পারে না এবং মশা ও পিঁপড়া থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে না, শক্তি নিয়ে গর্ব করা তার পক্ষে শোভা পায় না।



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৭) অহংকারের কারণসমূহ



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৭)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অহংকারের কারণসমূহ

অহংকারের প্রথম কারণ 'এলম' তথা জ্ঞান।  

প্রকাশ থাকে যে, এমন লোকই অহংকার করে, যে নিজেকে বড় মনে করে। আর নিজেকে সে-ই বড় মনে করে, যে জানে তার মধ্যে কোন পার্থিব অথবা পারলৌকিক পূর্ণতার গুণ বিদ্যমান রয়েছে। 


পারলৌকিক পূর্ণতা দু'টি— এলম (জ্ঞান) ও আমল (কর্ম)। অপরপক্ষে পার্থিব পূর্ণতা পাঁচটি—বংশ, সৌন্দর্য, শক্তি, ধনসম্পদ এবং বন্ধু-বান্ধব ও সঙ্গী-সাথীদের প্রাচুর্য। অতএব, এ সাতটি বিষয়ই হচ্ছে অহংকারের কারণ। নিম্নে প্রত্যেকটি আলাদা আলাদাভাবে বর্ণিত হচ্ছে।


অহংকারের প্রথম কারণ এলম তথা জ্ঞান–

জ্ঞানী ব্যক্তিরা দ্রুত অহংকারী হয়ে পড়ে। তাই হাদীসে বলা হয়েছে

>জ্ঞানের বিপদ হচ্ছে অহংকার।”

অর্থাৎ, জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের মধ্যে জ্ঞানের পূর্ণতা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয়ে নিজেকে বড় এবং অন্যদেরকে মূর্খ ও তুচ্ছ মনে করতে থাকে। ফলে, পার্থিব কাজ-কারবারে সে নিজেকে অগ্রগণ্য মনে করে। অপরের কাছ থেকে প্রথমে সালাম পাওয়ার আশা করে। অন্যরা তার সাথে সদাচরণ করে, কিন্তু সে কারও সাথে সদাচরণ করে না। করলেও এটাকে তার প্রতি অনুগ্রহ মনে করে এবং কৃতজ্ঞতা আশা করে। আর ধর্মীয় ব্যাপারে জ্ঞানী ব্যক্তি অন্যের সাথে এভাবে অহংকার করে যে, সে নিজেকে আল্লাহর কাছে অন্যের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ও উত্তম মনে করে। ফলে অন্যের জন্যে সে যতটুকু ভয় করে, নিজের জন্যে ততটুকু করে না; বরং নিজের মুক্তির ব্যাপারে অন্যের চেয়ে বেশী আশাবাদী হয়।


বলা বাহুল্য, এরূপ জ্ঞানী ব্যক্তিকে মূর্খ বলাই অধিক সঙ্গত। তাকে জ্ঞানী কে ‘করেছে? সত্যিকার জ্ঞান তো তাকে বলে, যা দ্বারা মানুষ আল্লাহকে, নিজেকে এবং পরিণামের বিপদকে চিনে ও বুঝে। জ্ঞান দ্বারা খোদাভীতি, বিনয় ও নম্রতা বৃদ্ধি পায়। 


এখন প্রশ্ন হয়, জ্ঞানের কারণে কিছুসংখ্যক লোকের অহংকার ও নির্ভীকতা বেড়ে যায় কেন? 

এর কারণ দ্বিবিধ। প্রথমত এ সকল লোক এমন জ্ঞান চর্চায় মশগুল হয়, যা কেবল নামে মাত্রই জ্ঞান- সত্যিকার জ্ঞান নয়। সত্যিকার জ্ঞান দ্বারা খোদাভীতি বৃদ্ধি পাবেই। যেমন, আল্লাহ বলেন :

>”জ্ঞানী ব্যক্তিরাই আল্লাহকে ভয় করে।”


দ্বিতীয়ত এ সকল লোক যখন জ্ঞান চর্চা করে, তখন তাদের বাতেন অর্থাৎ অন্তরদেশ সংশোধিত থাকে না; বরং কুচরিত্র দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে। ফলে যে শিক্ষাই লাভ করুক না কেন, তা তাদের অন্তরে ভাল আসন পায় না। পরিণামে জ্ঞানের ফলও ভাল হয় না।


হযরত ওয়াহাব (রহঃ) এর একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : জ্ঞান হচ্ছে আকাশের পানির মত, যা পরিষ্কার ও মিষ্ট থাকে। কিন্তু বৃক্ষসমূহ আপন শিরা-উপশিরা দ্বারা যখন সেই পানিকে নিজেদের মধ্যে টেনে নেয়, তখন মূলত যে বৃক্ষের যে স্বাদ, সে পানিকে সেইভাবে বদলে নেয়। পানি পেয়ে তিক্ত বৃক্ষের তিক্ততা আরও বেড়ে যায় এবং মিষ্ট বৃক্ষের মিষ্টতাও তেমনি বৃদ্ধি পায়। জ্ঞানের অবস্থাও তদ্রূপ। যে জ্ঞানী ব্যক্তির মধ্যে যেরূপ সাহসিকতা ও খাহেশ থাকে, সে জ্ঞান তার জন্যে তেমনি হয়ে যায়। ফলে এর কারণে অহংকারীর অহংকার এবং বিনয়ীর বিনয় বেড়ে যায়।


অহংকারের দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে 'আমল' অর্থাৎ, এবাদত —

অনেক সংসারত্যাগী এবাদতকারী অহংকার, ইযযত ও মানুষকে আকৃষ্ট করার প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকে না। তাদের আচরণ থেকেও পার্থিব ও পারলৌকিক উভয় প্রকার কাজকর্মে অহংকার বুঝা যায়। পার্থিব কাজকর্মে যেমন তাদের কাছে মানুষের আসা, মানুষের কাছে তাদের যাওয়ার তুলনায় উত্তম বিবেচিত হয়। তারা মানুষের কাছে আশা করে যে, মানুষ তাদের অভাব-অনটন পূর্ণ করুক, সম্মান করুক, মজলিসে সবার আগে বসাক এবং পরহেযগার ও মুত্তাকীরূপে স্মরণ করুক। পারলৌকিক ব্যাপারে তাদের অহংকার এই যে, তারা নিজেদেরকে মুক্তিপ্রাপ্ত এবং অন্য সকলকে ধ্বংসপ্রাপ্ত মনে করে। অথচ বাস্তবে ধ্বংসপ্রাপ্ত তারাই?


রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এক হাদীসে বলেন : 

>”সব মানুষ বরবাদ হয়ে গেছে- যখন তোমরা কাউকে একথা বলতে শুন, তখন মনে কর, সর্বাধিক বরবাদ সেই হবে। যে ব্যক্তি এবাদতকারীকে আল্লাহর ওয়াস্তে প্রিয় মনে করে এবং আল্লাহর এবাদতের কারণে তার সম্মান করে, তার মধ্যে ও এবাদতকারীর মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। সে মুক্তি পাবে এবং আল্লাহর নৈকট্যশীল হবে। কিন্তু এবাদতকারী যেহেতু মানুষকে হেয় জ্ঞান করে, তাদের কাছে উঠাবসা করতে ঘৃণা পোষণ করত, তাই সে আল্লাহর গযবের যোগ্য হবে।” 


আশ্চর্যের বিষয় বটে, মানুষ তো তাকে ভালবাসার কারণে তার এবাদতের মর্তবা পাবে, আর সে নিজে কি না মানুষকে হেয় জ্ঞান করার কারণে আল্লাহর অসন্তোষের পাত্র হবে। 

বর্ণিত আছে, বনী ইসরাঈলের মধ্যে এক ব্যক্তি অধিক গুণ্ডামির কারণে “গুণ্ডা” নামে খ্যাত ছিল। অপরদিকে অন্য এক ব্যক্তি অধিক এবাদতের কারণে, “আবেদ” নামে প্রসিদ্ধ ছিল। তার অধিক এবাদতের ফলস্বরূপ একখণ্ড মেঘ তাকে সর্বক্ষণ ছায়া দান করত। একদিন গুণ্ডা লোকটি আবেদের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে মনে চিন্তা করল- এই আবেদ এবাদতে অনেক নাম করেছেন। আমি একজন গুণ্ডা। তার কাছে বসলে আল্লাহ আমার প্রতি রহম করতে পারেন। অতঃপর সে ভক্তি সহকারে আবেদের কাছে গিয়ে বসল। এদিকে আবেদ ভাবল- আমি তো একজন আবেদ। এই গুণ্ডা লোকটি এখানে বসল কেন? এই ভেবে সে গুণ্ডাকে সরোষে বলল : চলে যা এখান থেকে! আল্লাহ তা'আলা সেই সময়ের নবীর কাছে ওহী পাঠালেন : তাদের উভয়কে নতুন করে আমল করতে বল। আমি গুণ্ডাকে ক্ষমা করেছি এবং আবেদের সকল এবাদত বাতিল করে দিয়েছি। অতঃপর মেঘখন্ডের ছায়াও গুণ্ডার উপর চলে গেল।


অহংকারের তৃতীয় কারণ বংশ-মর্যাদা—

যার বংশ সম্ভ্রান্ত, সে নীচ বংশের লোকদেরকে হেয় মনে করে, যদিও তারা শিক্ষা-দীক্ষা ও কর্মে বেশী হয়। কেউ কেউ বংশগত অহমিকায় এত বেশী ক্ষিপ্ত যে, তারা অন্যদেরকে গোলাম মনে করে এবং তাদের সাথে উঠা-বসা করতে ঘৃণা করে। সম্ভ্রান্ত বংশের ধার্মিক ও জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিগণও এ ব্যাধি থেকে মুক্ত নয়। কিন্তু সাধারণ অবস্থায় এটা তাদের মধ্যে গোপন থাকে-মুখে ফুটে উঠে না। তবে ক্রোধ প্রবল হলে জ্ঞানবুদ্ধির নূর বিলীন হয়ে যায়। তখন অহংকার কথাবার্তায়ও ফুটে উঠে।


এক রেওয়ায়েতে হযরত আবূ যর (রাঃ) বর্ণনা করেন, একবার রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর সামনে এক ব্যক্তির সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়। ক্রোধের আতিশয্যে আমি তাকে বলে বসলাম - হে কৃষ্ণকায় নারীর সন্তান ! রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আমাকে বললেন : 

>”হে আবূ যর ! উভয় পাল্লা সমান। কৃষ্ণকায় নারীর সন্তানের উপর শ্বেতকায় নারীর সন্তানের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই।'


আবূ যর বলেন : একথা শুনে আমি মাটিতে শুয়ে পড়লাম এবং লোকটিকে বললাম : তুমি আমার গণ্ডদেশকে পদতলে পিষ্ট কর। এখানে লক্ষণীয় যে, হযরত আবূ যর যখন নিজেকে শ্বেতকায় মহিলার সন্তান বলে গর্ব করলেন, তখন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তাঁকে কিভাবে সতর্ক করে দিলেন। আরও লক্ষণীয়, তিনি কিভাবে তওবা করলেন এবং মন থেকে অহংকার মূলোৎপাটন করে দিলেন। তিনি বুঝে নিলেন, ইযযতের শিকড় যিললত ছাড়া উৎপাটিত হয় না। তাই যার সাথে অহংকার করেছিলেন, তারই পদতলে আপন গণ্ডদেশ স্থাপন করলেন।


অহংকারের চতুর্থ কারণ রূপ-লাবণ্য—

এ কারণটি মহিলাদের মধ্যে অধিক পাওয়া যায়। এই অহংকারের ফলে অপরের দোষ-ত্রুটি ও গীবত মুখে উচ্চারিত হয়ে যায়। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, একবার এক মহিলা রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে আগমন করলে আমি হাতের ইশারায় বললাম ‘বেঁটে’। এতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আয়েশা, তুমি তার গীবত করেছ। বলা বাহুল্য, গোপন অহংকারই ছিল এর কারণ। হযরত আয়েশা নিজে যদি বেঁটে হতেন, তবে মহিলাকে বেঁটে বলতেন না । অতএব, তিনি যেন নিজের দেহাবয়বকে উত্তম জ্ঞান করেছেন। এর বিপরীতে মহিলাকে খর্বাকৃতির মনে করে বেঁটে বলে দিয়েছেন।


অহংকারের পঞ্চম কারণ ধন-সম্পদ—

এ ধরনের অহংকার রাজা-বাদশাহরা তাদের ধন-ভাণ্ডার নিয়ে, ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যসামগ্রী নিয়ে, গ্রামীণ লোকেরা তাদের ভূ-সম্পত্তি নিয়ে এবং সাজ-সজ্জাকারীরা তাদের পোশাক ও যানবাহন নিয়ে করে থাকে। সুতরাং ধনাঢ্য ব্যক্তি নিঃস্ব ব্যক্তিদের সাথে অহংকার করে বলে : মিয়া, তুমি তো ভিখারী-মিসকীন। আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে কিনে নিতে পারি। 

ধনাঢ্যতার বিপদ ও দারিদ্র্যের ফযীলত সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই ধনীরা এসব কথা বলে। কোরআন পাকে এই ফযীলতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে–

>”অতঃপর কথাবার্তায় সে তার সঙ্গীকে বলল : আমার কাছে তোমার চেয়ে অধিক ধন-সম্পদ এবং অধিক জনশক্তি আছে।” 

সঙ্গী জওয়াব দিল :

>‘যদি তুমি আমার ধন ও জন কম দেখ, তবে তাতে কোন ক্ষতি নেই। আমি আশা করি আমার পালনকর্তা আমাকে কল্যাণ দান করবেন, যা তোমার বাগ-বাগিচার চেয়ে উত্তম হবে এবং তোমার বাগানের উপর আকাশ থেকে অগ্নিশিখা নিক্ষেপ করবেন, ফলে তা হয়ে যাবে বৃক্ষহীন ময়দান অথবা তার পানি শুকিয়ে যাবে। অতঃপর তা খোঁজাখুঁজি করেও পাবে না।”


কারুনের অহংকারও তেমনি ছিল। সে যখন খুব সাজগোছ করে সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে হাযির হত, তখন তারাও তার মত ধন-সম্পদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করতে লাগল। 


অহংকারের ষষ্ঠ কারণ দৈহিক শক্তি-বল—

যা নিয়ে দুর্বল ও অসমর্থদেরসাথে অহংকার করা হয়।


অহংকারের সপ্তম কারণ অনুগামী—

সাহায্যকারী, মুরীদ, চাকর-নওকর, পরিবার ও আত্মীয়বর্গের সংখ্যাধিক্য। রাজা-বাদশাহরা অধিক সৈন্য-সামন্ত নিয়ে এবং শিক্ষিতরা অধিক শিষ্য নিয়ে অহংকার করে- যদিও তাদের সৈন্য সামন্ত ও শিষ্যবর্গ ধ্বংস ও আযাবের কারণ হয়।


পরবর্তী পর্ব

অহংকারের প্রতিকার ও বিনয় অর্জনের উপায়

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৬) যার সাথে অহংকার করা হয়, তার স্তর এবং অহংকারের ফল



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৬)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যার সাথে অহংকার করা হয়, তার স্তর এবং অহংকারের ফল—

মানুষ মজ্জাগতভাবে যালেম ও মূর্খ বিধায় সে কখনও স্রষ্টার সাথে এবং কখনও সৃষ্টির সাথে অহংকার করে। এদিক দিয়ে অহংকার তিন প্রকার। 

প্রথম, আল্লাহর সাথে অহংকার। এটা সর্বনিকৃষ্ট অহংকার। এর কারণ কেবল মূর্খতা ও অবাধ্যতাই হয়ে থাকে। যেমন নমরূদ অহংকারবশত স্থির করেছিল যে, সে আল্লাহর সাথে লড়াই করবে অথবা যেমন অভিশপ্ত ফেরাউন খোদায়ী দাবী করেছিল। সে আল্লাহর বান্দা হতে অস্বীকার করেছিল। এই প্রকার অহংকার সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন :  “ঈসা মসীহ এবং নৈকট্যশীল ফেরেশতাগণ আল্লাহর বান্দা হওয়াকে অপছন্দ করে না। যে কেউ তাঁর বান্দা হওয়াকে অপছন্দ করবে এবং যারাই আমার এবাদত করতে অহংকার করবে, তারা জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে।”


দ্বিতীয়, রসূলগণের সাথে অহংকার করা। অহংকারী ব্যক্তি নিজেকে সম্মানী ও উচ্চ জ্ঞান করে  তাদের মতই কোন ব্যক্তির অনুসারী হতে অস্বীকার করে। এই অহংকার কখনও চিন্তাভাবনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, রেসালত কি, তা চিন্তাই করা হয় না। এ কারণেই সর্বক্ষণ অহংকারের দরুন মূর্খতার মধ্যে থেকে আনুগত্য করে না এবং নিজেকে সত্যপন্থী বলে ধারণা করতে থাকে। কখনও চিন্তা-ভাবনা করে; কিন্তু মন রসূলগণের আনুগত্য করে না। আল্লাহ তা'আলা কোরআনুল করীমে  কাফেরদের অনেক উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। যেমন– 

>”তারা বলত- আমরা কি আমাদের মতই মানুষকে মেনে নেব?”

>“তোমরা (নবী) তো আমাদের মতই মানুষ।”

>“যদি তোমরা তোমাদের মতই একজন মানুষের অনুগত হয়ে যাও, তবে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে”।

>“যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা করে না, তারা বলে, আমাদের প্রতি ফেরেশতা অবতীর্ণ হল না কেন অথবা আমরা পরওয়ারদেগারকে দেখে নিতাম। তারা মনের মধ্যে খুব অহংকার পোষণ করে।”


ফেরাউন সম্পর্কে বলা হয়েছে : 

>“সে নিজে এবং তার বাহিনী পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অহংকার করেছে।”

ফেরাউন আল্লাহ ও রসূল উভয়ের সাথে অহংকার করেছিল। সেমতে হযরত ওয়াহাব (রহঃ) বলেন : হযরত মূসা (আঃ) ফেরাউনকে বলেছিলেন : তুমি ঈমান আন। তোমার রাজত্ব তোমার হাতেই থাকবে। ফেরাউন বলল : আমি হামানের সাথে পরামর্শ করে নিই। হামানকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল : এখন তো আপনি উপাস্য। লোকজন আপনার উপাসনা করে। ঈমান আনলে আপনি দাস হয়ে যাবেন এবং অন্যের উপাসনা করবেন। অতঃপর ফেরাউন আল্লাহ তা'আলার দাস হতে এবং মূসা (আঃ)-এর অনুসরণ করতে অস্বীকার করল। 

মক্কার কোরায়শদের উক্তি কোরআন পাক এভাবে উল্লেখ করেছে :

>“এই কোরআন মক্কা ও তায়েফ এ দুই জনপদের কোন মহান ব্যক্তির উপর নাযিল হল না কেন?”

কাতাদাহ (রাঃ) বলেনঃ এটা ছিল ওলীদ ইবনে মুগীরা এবং আবূ মসউদ ছাকাফীর উক্তি। তারা বলত, মোহাম্মদ তো একজন এতীম বালক। তাকে আল্লাহ কিরূপে আমাদের নবী করলেন? কোন বড় সরদার ব্যক্তিকে নবী করলেন না কেন? আল্লাহ তাদের জওয়াবে বলেন :

“তারাই কি আপনার প্রভুর রহমত বন্টন করে?” কোরায়শরা রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে আরও বলেছিল, আমরা আপনার দরবারে কিরূপে বসতে পারি? এখানে তো দরিদ্র মুসলমানরা সব সময় আনাগোনা করে। তাদের এই হেয় জ্ঞান করার জওয়াবে আল্লাহ বলেন : “আপনি তাদেরকে তাড়িয়ে দেবেন না, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রভুকে ডাকে। তারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে।”


“আপনি নিজেকে তাদের সাথে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রভুকে ডাকে। তারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। আপনার চক্ষু যেন তাদেরকে ছেড়ে অন্যত্র না যায়।”


মোটকথা, কতক কোরায়শ কাফের এমন ছিল, যারা অহংকারের কারণে চিন্তাভাবনা থেকে বিরত ছিল এবং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যে সত্য নবী ছিলেন, এ বিষয়ে মূর্খ ছিল। আবার কতক এমন ছিল, যারা জানত তিনি সত্য নবী; কিন্তু অহংকারের কারণে মুখে তা স্বীকার করত না। আল্লাহ বলেন : “যখন তাদের কাছে তাদের জানা বিষয় আগমন করল, তখন তারা অস্বীকার করে বসল।' এই দ্বিতীয় প্রকার অহংকার প্রথম প্রকারের চেয়ে কম হলেও তার কাছাকাছি।


তৃতীয়, বান্দার সাথে অহংকার করা, অর্থাৎ নিজেকে বড় ও অপরকে হেয় জ্ঞান করার কারণে কারও আনুগত্য না করা। এটা প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকার অহংকারের তুলনায় কম হলেও দু’কারণে খুবই মারাত্মক। প্রথম কারণ, বড়ত্ব, মাহাত্ম্য ও ইযযত সর্বশক্তিমান আল্লাহর জন্যেই শোভনীয়। বান্দা দুর্বল ও অক্ষম বিধায় তার অহংকার করা উচিত নয়। অতএব, বান্দা যখন অহংকার করে, তখন সে যেন আল্লাহ তা'আলার বিশেষ গুণে তাঁর অংশীদার হতে চায়। এটা মাথায় বাদশাহের মুকুট পরিধান করে কোন গোলামের সিংহাসনে বসে পড়ার মত। এখানে চিন্তা করা দরকার যে, বাদশাহ এরূপ গোলামের প্রতি কতটুকু ক্রুদ্ধ হবেন। কেননা, গোলামের কাজটি নিরতিশয় ধৃষ্টতাপূর্ণ। এ কারণেই এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন : 

>“মাহাত্ম্য আমার পরিধেয় এবং অহম আমার চাদর। এতে যে আমার সাথে বিরোধ করবে, আমি তাকে চুরমার করে দেব”। 


বান্দার সাথে অহংকার করা আল্লাহ তা'আলারই বৈশিষ্ট্য বিধায় যে ব্যক্তি বান্দার সাথে অহংকার করবে, সে আল্লাহর সাথে বিরোধকারী সাব্যস্ত হবে। এটা নিঃসন্দেহে মারাত্মক অপরাধ।


দ্বিতীয় কারণ এই যে, অহংকারের কারণে মানুষ আল্লাহ তা'আলার বিধি-বিধানের বিরোধিতা করতে বাধ্য। কেননা, অহংকারী ব্যক্তি যখন কারও মুখ থেকে সত্য কথা শুনে, তখন অহংকারবশত তা মেনে নেয় না; বরং অস্বীকার করতে তৎপর হয়ে উঠে। এ কারণেই যে সকল শিক্ষিত ব্যক্তি ধর্মীয় ব্যাপারাদিতে মোনাযারা তথা বিতর্ক করে, তারা দাবী এটাই করে যে, নিছক সত্য আবিষ্কার করা ও তা প্রতিষ্ঠা করাই উদ্দেশ্য। কিন্তু এরপর তারা সত্যকে মেনে নিতে অহংকারীদের ন্যায় অস্বীকার করে। এক পক্ষের মুখ দিয়ে সত্য প্রকাশিত হয়ে গেলে অপরপক্ষ তা মানে না এবং মিথা প্রমাণ করার জন্যে ও তা খন্ডন করার জন্যে সচেষ্ট থাকে। এটা কাফের ও মোনাফিকদের অভ্যাস। কোরআন পাকে আছে :

>“কাফেররা বলল: তোমরা এই কোরআন শ্রবণ করো না এবং এতে গোলমাল সৃষ্টি কর, যাতে তোমরা প্রবল থাক।”


যারা প্রবল হওয়ার জন্যে এবং অপরকে নিরুত্তর করে দেয়ার জন্যে বাহাস করে—সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যে নয়, তারা এই অভ্যাসে মোনাফিকদের সাথে শরীক।


মোটকথা, মানুষের সাথে অহংকার অত্যন্ত মন্দ অভ্যাস। এর কারণে আল্লাহ তা'আলার বিধানাবলীর সাথে অহংকার হয়ে যায়। অহংকারে বিশ্বজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন ইবলীশের কথা কোরআন মজীদে এ কারণেই উল্লিখিত হয়েছে, যাতে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে। সে বলেছিল : আমি ៖ মানুষের চেয়ে উত্তম। আমি আগুন দ্বারা সৃজিত, আর মানুষ মাটির দ্বারা। ইবলীশের এই অহংকারের পরিণতিতে সে সেজদার আদেশ মানতে অস্বীকার করেছে। অতএব, তার অহংকার সূচনাতে ছিল আদম (আঃ) -এর সাথে এবং পরিণামে আল্লাহর সাথে হয়ে গেল। ফলে, সে চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেল।


বর্ণিত আছে, হযরত ছাবেত ইবনে কায়েস ইবনে শাম্মাম রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করেন : আপনি জানেন, আমি অত্যধিক পরিচ্ছন্নতাপ্রিয়। এটা কি অহংকারে গণ্য হবে? তিনি জওয়াবে বললেন : না, এটা অহংকার নয়; বরং অহংকার হচ্ছে সত্য বিষয়ের অবাধ্য হওয়া, মানুষের দোষ অন্বেষণ করে তাদেরকে হেয় করা। অতএব যে ব্যক্তি নিজেকে অপরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে, অন্য মুসলমান ভাইকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে এবং সত্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রত্যাখ্যান করে, সে বান্দার ব্যাপারাদিতে অহংকারী হবে। অপরপক্ষে যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করতে লজ্জাবোধ করে এবং রসূলের অনুসরণ করে বিনম্র হতে কুণ্ঠিত হয়, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ব্যাপারাদিতে অহংকারী হবে।


পরবর্তী পর্ব

অহংকারের কারণসমূহ

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৫) অহংকারের স্বরূপ ও তার লাভ-লোকসান



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৫)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অহংকারের স্বরূপ ও তার লাভ-লোকসান—

অহংকার দু'প্রকার। একটি বাহ্যিক, অপরটি অভ্যন্তরীণ। অভ্যন্তরীণ অহংকার হচ্ছে মনের অভ্যাস এবং বাহ্যিক অহংকার হচ্ছে ক্রিয়াকর্ম, যা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। বাস্তবে অভ্যন্তরীণ অভ্যাসকেই অহংকার বলা সঙ্গত। ক্রিয়াকর্ম এই অভ্যাসেরই ফলাফল। অভ্যাসই ক্রিয়াকর্মের কারণ হয়ে থাকে। অঙ্গের উপর যখন অভ্যাসের প্রতিক্রিয়া ফুটে ঊঠে, তখন ‘অহংকার করেছে’ বলা হয়। 


মোটকথা, মানসিক চরিত্রসমূহের মধ্যে একটি চরিত্রকে বলা হয় অহংকার। তা হচ্ছে নিজেকে অন্যের উপর সেরা দেখে আনন্দ পাওয়া এবং তাতেই আকৃষ্ট হওয়া।


বলা বাহুল্য, অহংকার একটি আপেক্ষিক বিষয়। এতে একাধিক বিষয়ের উপস্থিতি দরকার– 

(১) অহংকারী, (২) যার সাথে অহংকার করা হয়, (৩) যে বিষয় নিয়ে অহংকার করা হয়।


অহংকার ও আত্মপ্রীতির মধ্যে তফাৎ এখানেই৷ আত্মপ্রীতিতে কেবল কর্তার উপস্থিতিই যথেষ্ট। মানুষ যদি একাই সৃজিত হয় এবং তার সাথে অন্য কোন কিছু না থাকে, তবে সে আত্মপ্রীতিতে লিপ্ত হতে পারবে- অহংকার করতে পারবে না। এ থেকে বুঝা গেল, অহংকারে কেবল নিজেকে বড় মনে করা যথেষ্ট নয়। কেননা, মাঝে মাঝে মানুষ নিজেকে বড় মনে করে। কিন্তু অপরকে নিজের চেয়েও বড় অথবা সমান জ্ঞান করে। এতে অহংকার হয় না। অনুরূপভাবে অপরকে হেয় মনে করাও অহংকারের জন্যে যথেষ্ট নয়। কেননা, মাঝে মাঝে মানুষ অপরকে হেয় মনে করে; কিন্তু নিজেকে তার চেয়েও অধিক হেয় মনে করে। এমতাবস্থায় সে অহংকারী হয় না। অপরকে নিজের অনুরূপ মনে করলেও অহংকার হয় না। অহংকারের জরুরী বিষয় হচ্ছে নিজের একটি মর্যাদা জানা এবং অপরের একটি মর্যাদা জানা। অতঃপর নিজের মর্যাদাকে অপরের মর্যাদার চেয়ে সেরা মনে করা। 

বিশ্বাসের মধ্যে এ তিনটি বিষয় একত্রিত হলে অহংকার হবে। কেবল নিজের মর্যাদা জানার নাম অহংকার নয়; বরং এই জানার কারণে ও বিশ্বাসের ফলে মনের মধ্যে একটি ফুৎকার পড়ে এবং মান-সম্মান ও আনন্দের দিকে গতিশীল হয়। সম্মান ও আনন্দের দিকে এই গতিশীলতাকেই অহংকার বলা হয়। হাদীস শরীফেও উপরোক্ত ফুৎকার উল্লিখিত হয়েছে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :

“(হে আল্লাহ!) আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই অহংকারের ফুৎকার থেকে।”


জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে ফজরের নামাযের পর ওয়ায করার অনুমতি চাইলে তিনি এমনিভাবে তাকে বলেছিলেন : আমার আশংকা হয় যে, তুমি ফুলে-ফেঁপে 'সপ্তর্ষিমণ্ডল পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। 


এ থেকে জানা গেল যে, মানুষ যখন অহংকার করে, তখন ফুলে উঠে। এই ফুলে উঠাকে মাহাত্ম্যবোধও বলা হয়। সেমতে হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) নিম্নোক্ত আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে তাই বলেছেন– “তাদের অন্তরে কেবল অহংকারই রয়েছে, যে পর্যন্ত তারা পৌঁছতে সক্ষম হবে না।”

অর্থাত, এমন মাহাত্ম্যবোধ যা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকর্মের কারণ হয়ে থাকে। অতঃপর সে ক্রিয়াকর্মকে অহংকার বলা হয়। অর্থাৎ, যখন কারও কাছে তার নিজের মর্যাদা অপরের চেয়ে বড় সাব্যস্ত হয়, তখন সে অপরকে হেয় জ্ঞান করে তার কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইবে। তার কাছে বসা, তার সাথে আহারে শরীক হওয়া অপছন্দ করবে। অহংকারের মাত্রা বেশী হলে মনে করবে, এ লোকটির উচিত আমার সামনে গোলামের মত নত হয়ে দাঁড়ানো।


অহংকারের অনিষ্ট খুব মারাত্মক। এর কারণে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ধ্বংস হয়ে যায় এবং আবেদ, সংসারত্যাগী এবং শিক্ষিত লোকগণ কমই এ থেকে মুক্ত থাকে, জনসাধারণের তো কথাই নেই। 


অহংকার যে ধ্বংসাত্মক, তার বড় প্রমাণ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই উক্তি : “যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে না।”


এর কারণ এই যে, অহংকারের কারণে বান্দা ঈমানের কোন চরিত্র অর্জন করতে পারে না। উদাহরণতঃ মানুষ যে পর্যন্ত অহংকারী থাকে, সে নিজের জন্যে যা প্রিয়, তা অন্য মুমিনের জন্যে প্রিয় মনে করবে না। 


বিনয় হল পরহেযগারদের চরিত্রের মূল বিষয়, অহংকারী ব্যক্তি তা করতে পারবে না। অহংকারে থাকা অবস্থায় কেউ হিংসা-বিদ্বেষ বর্জন করতে পারবে না। সদা সত্য কথা বলতে পারবে না। ক্রোধ ও রাগ দমন করতে সক্ষম হবেনা। নিজে নম্রতা সহকারে কাউকে উপদেশ দেবে না এবং অন্যের উপদেশে কান লাগাবে না। মোটকথা, এমন কোন মন্দ অভ্যাস নেই, যা অহংকারী ব্যক্তি নিজের অহংকার রক্ষার খাতিরে করতে বাধ্য না হবে। পক্ষান্তরে এমন কোন উৎকৃষ্ট গুণ নেই, যা সে নিজের মানহানির ভয়ে বর্জন না করবে। এ কারণেই বলা হয়েছে, যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে না। 


আর মন্দ চরিত্র কখনও একা বিদ্যমান থাকে না। কারও মধ্যে একটি মন্দ চরিত্র থাকলে সে অপরটিকে টেনে আনে। সে অহংকার সর্বনিকৃষ্ট, যা কারও কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং সত্যকে মেনে নিতে ও তার অনুগত হতে দেয় না। এমনি ধরনের অহংকার সম্পর্কে কোরআনুল করীমে বলা হয়েছে : 

 “ফেরেশতারা হাত প্রসারিত করে বলবে- বের কর তোমাদের প্রাণ। আজ তোমাদের প্রতিদান দেয়া হবে অপমানজনক শাস্তি। কারণ, তোমরা আল্লাহর বিরুদ্ধে অসত্য বলতে এবং তার আয়াতসমূহ থেকে অহংকার করতে।”


“যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত, তারা অহংকারীদেরকে বলবে, তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই ঈমানদার হতাম।”


হযরত ঈসা (আ.) বলেনঃ "নরম মাটিতে ফসল উৎপন্ন হয়, পাথরে হয় না।" এমনিভাবে শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান বিনম্র অন্তরে প্রভাব বিস্তার করে; অহংকারীর অন্তরে করে না। লক্ষণীয়, যদি মানুষ তার মাথা অতিমাত্রায় উঁচু করে এবং ছাদ পর্যন্ত নিয়ে যায়, তবে ছাদে টক্কর লেগে তার মাথাই চূর্ণ হবে। আর যে ব্যক্তি নুয়ে থাকবে, সে ছাদ দ্বারা আরাম ও ছায়া সবই পাবে।



পরবর্তী পর্ব

যার সাথে অহংকার করা হয়, তার স্তর এবং অহংকারের ফল

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৪) বিনয়

 

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিনয় —

আমরা যেখানে অহংকার ও গর্বের নিন্দা লিপিবদ্ধ করেছি, সেখানে কিছুটা বিনয়ের ফযীলত লেখাও সমীচীন মনে হয়।

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন, –“ক্ষমার কারণে আল্লাহ তা'আলা কেবল বান্দার ইযযতই বৃদ্ধি করেন এবং আল্লাহর জন্যে যে বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে উঁচুতে তুলে দেন।”


এক হাদীসে আছে, – ”প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে দু'জন ফেরেশতা রয়েছে। তারা বলগার সাহায্যে তাকে নিমন্ত্রণ করে। যদি সে ব্যক্তি নিজেকে উঁচু করে, তবে ফেরেশতারা বলগা টেনে ধরে এবং বলে ইলাহী, তুমি এই ব্যক্তিকে নিচু করে দাও। আর যদি বিনয় ও আনুগত্য করে, তবে ফেরেশতারা দোয়া দেয় এবং বলে, ইলাহী, একে উঁচু কর।” 


আরও বলা হয়েছে- ”সে ব্যক্তি সুখী, যে দরিদ্র না হয়েও বিনয় করে, সৎপথে উপার্জিত ধন ব্যয় করে, অবহেলিত ও দরিদ্রদের প্রতি দয়া করে এবং জ্ঞানীদের সাথে সাক্ষাৎ করে।”


আবূ সালমা মুদায়নী তার পিতার কাছ থেকে বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) রোযা রেখে মসজিদে কুবায় অবস্থান করছিলেন। ইফতারের সময় আমরা এক পিয়ালা দুধের সাথে সামান্য মধু মিশ্রিত করে পেশ করলাম । তিনি তা মুখে দিয়ে যখন মধুর স্বাদ আস্বাদন করলেন, তখন জিজ্ঞেস করলেন: এটা কি? আমরা বললাম : দুধের সাথে সামান্য মধু মিশ্রিত করেছি । তিনি পিয়ালা রেখে দিলেন এবং বললেন : আমি একে হারাম করি না । এরপর তিনি নিম্নোক্ত বাক্যাবলী উচ্চারণ করলেন

“যে আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় করে, আল্লাহ তাকে উঁচু করেন। যে অহংকার করে আল্লাহ তাকে নিচে নামিয়ে দেন । যে মধ্যপথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে ধনী করেন । যে অপব্যয় করে, আল্লাহ তাকে ফকীর করেন, আর যে আল্লাহর যিকির করে আল্লাহ তাকে বন্ধু করে নেন।”


এক হাদীসে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন-- ”আমার পালনকর্তা আমাকে দু'টি বিষয়ের যে কোন একটি বেছে নেয়ার ক্ষমতা দিলেন- হয় আমি দাস ও রসূল হব, না হয় বাদশাহ ও নবী হব। কিন্তু কোন্‌টি বেছে নিব তা নিয়ে সংশয় করলাম । ফেরেশতাদের মধ্যে আমার বন্ধু জিবরাঈল উপস্থিত ছিলেন । আমি তার দিকে মাথা তুলে তাকালে তিনি বললেন : আল্লাহর সামনে বিনয় করুন । সেমতে আমি আরয করলাম : আমি বান্দা ও রসূল হতে চাই।” 


হযরত মূসা (আ.)-এর প্রতি আল্লাহ তা'আলা এই মর্মে ওহী করেন যে, 

>"আমি এমন ব্যক্তির নামায কবুল করি, যে আমার মাহাত্ম্যের সামনে বিনয়ী হয়, আমার বান্দাদের সাথে অহংকার করে না, অন্তরে আমার ভয় রাখে, অষ্টপ্রহর আমাকে স্মরণ করে এবং আমার খাতিরে নিজেকে কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখে।" 


এক হাদীসে বলা হয়েছে : “মহত্ত্ব হচ্ছে খোদাভীতি, গৌরব হচ্ছে বিনয় এবং বিশ্বাস হচ্ছে ধনাঢ্যতা।”


হযরত ঈসা (আ.) বলেন, – "সুসংবাদ তাদের জন্যে, যারা দুনিয়াতে বিনয়ী হয়। তারা কিয়ামতে মিম্বরের উপর উপবেশন করবে। সুসংবাদ তাদের জন্যে, যারা দুনিয়াতে মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপন করে। কিয়ামতে তারা জান্নাতুল ফেরদাউসের অধিকারী হবে। সুসংবাদ তাদের জন্যে, যারা দুনিয়াতে আপন অন্তরকে পাক রাখে। কিয়ামতে তাদের আল্লাহর দীদার নসীব হবে।" 


অন্য এক হাদীসে আছে– ”চারটি বিষয় এমন রয়েছে, যা কেবল সে ব্যক্তি পায়, যাকে আল্লাহ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে নেন–

(১) চুপ থাকা- যা এবাদতের সূচনা, 

(২) আল্লাহর উপর ভরসা করা, 

(৩) বিনয় এবং 

(৪) সংসারবিমুখতা।


হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণিত রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন :  "যে ব্যক্তি বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে সপ্তম আকাশ পর্যন্ত উচ্চতা দান করেন।" 


রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) একদিন সাহাবায়ে কেরামকে বললেন : “ব্যাপার কি, আমি তোমাদের মধ্যে এবাদতের মিষ্টতা পাইনা কেন?"  তারা আরয করলেনঃ এবাদতের মিষ্টতা কি? তিনি বললেন : 'বিনয়'।


হযরত উমর (র.) বলেন : যখন বান্দা আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় অবলম্বন করে, তখন আল্লাহ্ তা'আলা তার জ্ঞান-গরিমা বাড়িয়ে দেন। আর যখন অহংকার ও যুলুম করে, তখন তাকে ভূগর্ভে বিলীন করে দেন এবং আদেশ করেন- দূর হ ! আল্লাহ তোকে দূর করেছেন। এরূপ ব্যক্তি স্বজ্ঞানে বড় হলেও মানুষের দৃষ্টিতে ছোট।


হযরত ফুযায়ল (রহ.)-কে কেউ বিনয় সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন :  "বিনয় হচ্ছে সত্যের সামনে বিনম্র ও অনুগত হওয়া যদিও সেই সত্য কোন বালক অথবা মূর্খের মুখ দিয়ে প্রকাশ পায়।" 


ইবনে মোবারক বলেন : "বিনয় হচ্ছে নিজেকে সে ব্যক্তির চেয়ে কম মনে করা, যে পার্থিব নেয়ামতে তোমার চেয়ে কম এবং নিজেকে সেই ব্যক্তির চেয়ে অধিক মনে করা, যে পার্থিব নেয়ামতে তোমার চেয়ে বেশী।" 


কাতাদাহ (রা.) বলেন : "যে ব্যক্তি ধন, রূপ অথবা জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে তাতে বিনয় করে না, কিয়ামতে এসব বিষয় তার জন্য শাস্তির কারণ হয়ে যাবে।" 


হযরত কা'ব (র.) বলেন : "আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে দুনিয়াতে যে নেয়ামত দান করেন, সে যদি তার শোকর করে এবং আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় প্রদর্শন করে, তবে আল্লাহ তা'আলা সেই নেয়ামতের উপকার তাকে দুনিয়াতেও দান করেন এবং আখেরাতেও তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। 

পক্ষান্তরে যদি বান্দা সেই নেয়ামতের শোকর এবং বিনয় প্রদর্শন না করে, তবে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়াতেও তার উপকার মওকুফ রাখেন এবং আখেরাতে তার জন্যে জাহান্নামের স্তর খুলে দেন।"


হযরত সোলায়মান (আ.)-এর রীতি ছিল যে, তিনি সকালে বড়লোক, ধনাঢ্য ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের দিকে মনোযোগ দিতেন, এরপর ফকীর ও মিসকীনদের মধ্যে আসতেন এবং তাদের কাছে এই বলে বসে যেতেন যে, মিসকীন মিসকীনদের মধ্যেই এসেছে।


বর্ণিত আছে, একবার ইউসুফ, আইয়ুব ও হাসান (রহ.) পথে বের হলেন। চলতে চলতে বিনয় সম্পর্কে আলোচনা শুরু হল। হযরত হাসান জিজ্ঞেস করলেন: "বিনয় কি জান?- বিনয় হল গৃহ থেকে বের হওয়ার পর পথিমধ্যে যে মুসলমানের সাথে দেখা হয়, তাকে নিজের চেয়ে উত্তম মনে করা।" 


হযরত মুজাহিদ বলেন: যখন নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায় মহাপ্লাবনে নিমজ্জিত হল, তখন প্রত্যেক পাহাড় একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে উঁচু হতে লাগল। কিন্তু জুদী পাহাড় বিনয় অবলম্বন করল। আল্লাহ তা'আলা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করলেন এবং নূহ (আ.)-এর নৌকা তার উপর অবস্থান নিল। 


যিয়াদ নুমায়রী বলেনঃ "যে দরবেশের মধ্যে বিনয় নেই, সে ফলহীন বৃক্ষসদৃশ।" 


হযরত আবূ ইয়ায়ীদ বুস্তামী (রহ.) বলেন :  "ব্যক্তি যতক্ষণ মনে করে যে, মানুষের মধ্যে তার চেয়েও নিকৃষ্ট কেউ আছে, ততক্ষণ সে অহংকারী।" লোকেরা প্রশ্ন করল : তা হলে বিনয়ী কখন হবে? তিনি বললেন: যখন নিজের জন্যে কোন স্থান ও মর্যাদা চিন্তা না করে। মানুষ যে পরিমাণে আল্লাহকে ও নিজেকে চিনে, সে পরিমাণে বিনয়ী হয়। 


ইয়াহইয়া ইবনে খালেদ বারমাকী (রহ.) বলেন : "ভদ্রলোক এবাদতকারী হলে বিনয়ী হয় এবং নির্বোধ ও অভদ্র ব্যক্তি এবাদতকারী হলে নিজেকে বুযুর্গ মনে করতে থাকে।" 


হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ায বলেনঃ "যে ব্যক্তি ধন-সম্পদের কারণে তোমার সাথে অহংকার করে, তার সাথে তোমার অহংকার করাই বিনয়।" 

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে বিনয় দান করুন। আমিন॥


পরবর্তী পর্ব

অহংকারের স্বরূপ ও তার লাভ-লোকসান

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...