মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫

বিবাহ (২৫) পারস্পরিক জীবন যাপনের চতুর্থ আদব শাসন করা



বিবাহ (পর্ব – ২৫) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের চতুর্থ আদব শাসন করা —
চতুর্থ আদব, স্ত্রীর চাহিদার এত বেশী অনুসরণ করবে না যাতে তার মেযাজ বিগড়ে যায় এবং তার সামনে নিজের কোন ভয়ভীতি না থাকে বরং এতে সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখবে। খারাপ কিছু দেখলে তাতে কখনও সম্মত হবে না। স্ত্রী শরীয়ত অথবা ভদ্রতা বিরোধী কোন কিছু করলে তৎক্ষণাৎ ক্রোধ প্রকাশ করবে। হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন: যেব্যক্তি স্ত্রৈণ অর্থাৎ, স্ত্রী যা চায় তাই করে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে উপুড় করে দোযখে ফেলে দেবেন। 
হযরত ওমর (র.) বলেন, স্ত্রীদের মর্জির বিপরীত কাজ কর, এতে বরকত হয়। তিনি আরও বলেন: স্ত্রীদের সাথে পরামর্শ কর এবং তারা যে পরামর্শ দেয় তার বিপরীত কর।  
হাদীসে আছে- স্ত্রীর গোলাম ধ্বংস হোক। এর কারণে, স্ত্রীর খাহেশের বিষয়াদিতে তার আনুগত্য করলে তার গোলামী করা হবে। আল্লাহ্ তা'আলা তাকে স্ত্রীর মালিক করেছেন, কিন্তু সে নিজেকে তার গোলাম করে দিয়েছে। ফলে ব্যাপার উল্টে গেছে। সে কোরআনে বর্ণিত শয়তানের এই উক্তিরও আনুগত্য করেছে- 
"আমি মানুষকে আদেশ করব, তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে পাল্টে দিক। পুরুষের হক ছিল অনুসৃত হওয়ার অনুসাবী হওয়ার নয়। অথচ আল্লাহ্ তা'আলা পুরুষদেরকে নারীদের উপর শাসক সাব্যস্ত করেছেন।
যেমন বলা হয়েছে, "পুরুষরা স্ত্রীদের উপর শাসক। সুতরাং স্ত্রীদের লাগাম সামান্য শিথিল করে দিলে তারা পুরুষদেরকে কয়েক হাত হেঁচড়ে নিয়ে যাবে। পক্ষান্তরে লাগাম টেনে রাখলে এবং জায়গা মত কঠোর হলে স্ত্রীরা আয়ত্তে থাকবে"। 
ইমাম শাফেয়ী বলেন: তিনটি বস্তু এমন রয়েছে, তুমি তাদের সম্মান করলে তারা তোমাকে অপদস্থ করবে এবং তুমি অপদস্থ করলে তারা তোমাকে সম্মান করবে। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে স্ত্রী দ্বিতীয়টি খাদেম এবং  তৃতীয়টি নিবর্তী। ইমাম শাফেয়ীর উদ্দেশ্য, যদি কেবল সন্মান কর এবং মাঝে মাঝে নরমের সাথে সাথে শক্ত না হও, শক্ত কথা না বল, তবে নিঃসন্দেহে মাথায় চড়ে বসবে। মোট কথা, আকাশ ও পৃথিবী সমতা এবং মধ্যবর্তিতার উপরই প্রতিষ্ঠিত। মধ্যবর্তিতা থেকে সামান্য বিচ্যুত হলে ব্যাপার উল্টে যায়। তাই বুদ্ধিমানের উচিত হল স্ত্রীর সাথে আনুকূল্য ও বিরোধিতায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করা এবং প্রত্যেক ব্যাপারে সত্যের অনুসরণ করা, যাতে তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায়। কেননা, স্ত্রীদের কলাকৌশল অত্যন্ত মন্দ এবং তাদের অনিষ্ট প্রকাশ্য। তাদের মানসিকতায় অসদাচরণ ও জ্ঞানবৃদ্ধির স্বল্পতা প্রবল। এতে সমতা তখনই আসবে, যখন নরম ও শক্ত উভয় প্রকার ব্যবহার তাদের সাথে করা হয়। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: তিনটি বিপদ থেকে আশ্রয় চাইবে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে দুশ্চরিত্রা নারী। সে বার্ধক্যের পূর্বেই বৃদ্ধ করে দেয়। 
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিবিগণ ছিলেন মহিলাদের মধ্যে সর্বোত্তম। তাঁদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন : তোমরা ইউসুফ (আঃ)-এর সহচরী: রসূলুল্লাহ [সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম] ওফাতের পূর্বে যখন রোগশয্যায় শায়িত ছিলেন এবং নামায পড়ানোর শক্তি তাঁর ছিল না, তখন এরশাদ করেন: আবু বকরকে নামায পড়াতে বল। এতে হযরত আয়েশা আপত্তি করে বলেন: আমার পিতা কোমলচিত্ত। মানুষ আপনার স্থান শূন্য দেখে তিনি স্থির থাকতে পারবেন না। তখন রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উপরোক্ত বাক্য করেন। অর্থাৎ, তুমি যে আবু বকরকে নামায পড়াতে নিষেধ করছ, এটা সত্য পরিহার করে খেয়াল-খুশীর দিকে ঝুঁকে পড়ার শামিল। 
এক হাদীসে আছে- "যে সম্প্রদায়ের মালিক নারী, তার কল্যাণ হবে না।

পরবর্তী পর্ব — 
পারস্পরিক জীবন যাপনের পঞ্চম আদব সন্দেহ না করা

বিবাহ (২৪) পারস্পরিক জীবন যাপনের তৃতীয় আদব প্রমোদ



বিবাহ (পর্ব – ২৪) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের তৃতীয় আদব প্রমোদ —
তৃতীয় আদব, পীড়ন সহ্য করা সত্ত্বেও স্ত্রীদের সাথে হাসি তামাশা ও আনন্দ করবে। এতে তাদের মন প্রফুল্ল হবে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিয়ম ছিল, তিনি বিবিগণের সাথে ব্যঙ্গ-কৌতুক করতেন এবং কাজে ও চরিত্রে তাদের স্তরে নেমে যেতেন। এমন কি বর্ণিত আছে, তিনি হযরত আয়েশার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতাও করেছেন। একদিন হযরত আয়েশা দৌড়ে জিতে গেলেন। এর পর একদিন রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দৌড়ে এগিয়ে গেলেন এবং বললেন: আয়েশা! (র.) এটা সেদিনের প্রতিশোধ। 
হাদীসে আছে, অন্য সব মানুষের তুলনায় রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বিবিগণের সাথে অধিক আনন্দ করতেন। হযরত আয়েশা (র.) বলেন: একদিন আমি আবিসিনিয়ার লোকদের আওয়াষ শুনলাম। তারা আশুরার দিন খেলাধুলা করছিল। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে বললেন: তুমি কি তাদের খেলা দেখতে চাও। আমি বললাম: হাঁ। তিনি খেলোয়াড়দেরকে ডাকলেন। তারা হাযির হলে তিনি দরজার উভয় কপার্টের মাঝখানে দাড়িয়ে গেলেন এবং নিজের হাত কপাটের উপরে ছড়িয়ে দিলেন। আমি আমার চিবুক তাঁর হাতের উপর রেখে খেলা দেখতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: আয়েশা, আর কত। আমি দুই কিংবা তিন বার বললামঃ আর একটু রাখুন। অতঃপর তিনি এরশাদ করলেন: আয়েশা, আর না। এবার শেষ কর। আমি, বললাম ঠিক আছে, চলুন তার পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) খেলোয়াড়দেরকে ইশারা করলে তারা চলে গেল। এক হাদীসে বলা হয়েছে: "মুমিনদের মধ্যে অধিক কামেল মুমিন সে ব্যক্তি, যার অভ্যাস ভাল এবং সে পরিবার পরিজনের প্রতি অধিক কৃপাশীল"। 
এক হাদীসে আছে  "সর্বোত্তম সে ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীদের জন্যে সর্বোত্তম। আমি আমার স্ত্রীদের জনে! তোমাদের চাইতে উত্তম।"
হযরত ওমর (র.) কঠোর চিত্ত হওয়া সত্ত্বেও বলেন: পুরুষের উচিত নিজের ঘরে শিশুদের মত থাকা। যখন তার কাছে কোন জিনিস চাওয়া হয় তখন পুরুষ হয়ে যাবে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত জাবেরকে বলেছিলেন, কুমারী নারীকে বিবাহ করলে না কেন, যাতে তুমি তার সাথে কৌতুক করতে এবং সে তোমার সাথে আনন্দ করতো।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের চতুর্থ আদব শাসন করা —

বিবাহ (২৩) পারস্পরিক জীবন যাপনের দ্বিতীয় আদব সদাচরণ



বিবাহ (পর্ব – ২৩) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের দ্বিতীয় আদব সদাচরণ —
দ্বিতীয় আদব স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করা এবং দয়াপরবশ হয়ে তাদের নিপীড়ন সহ্য করা। কেননা, তাদের জ্ঞানবুদ্ধি অপূর্ণ। আল্লাহ তা'আলা বলেন : "মহিলাদের সঙ্গে সদাচরণ সহকারে জীবন যাপন কর"। 
ওফাতের সময় রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওসিয়ত ছিল তিনটি বিষয়। সেগুলো বলতে বলতেই তাঁর কন্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে যাচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, "নামায কায়েম কর, নামায কায়েম কর। তোমরা যেসকল গোলাম ও বাঁদীর মালিক, তাদেরকে তাদের সাধ্যাতীত কাজ করতে বলো না। স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তারা তোমাদের হাতে বন্দী। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকারের মাধ্যমে গ্রহণ করেছ এবং তাদের লজ্জাস্থান আল্লাহর কলেমা উচ্চারণ করে হালাল করেছ।"
এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে- যেব্যক্তি তার স্ত্রীর অসদাচরণে সবর করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে এই পরিমাণ সওয়াব দেবেন, যে পরিমাণ হযরত আইউব (আঃ)-কে তাঁর বিপদের কারণে দিয়েছিলেন। 
পক্ষান্তরে যে স্ত্রী তার স্বামীর বদমেযাজীতে সবর করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ফেরাউন-পত্নী আছিয়ার সমান সওয়াব দান করবেন। 
প্রসঙ্গতঃ স্মরণ রাখা দরকার, স্ত্রীর সাথে সদাচরণের অর্থ স্ত্রী পীড়ন না করলে সদাচরণ করা নয়; বরং অর্থ হচ্ছে, স্ত্রীর পীড়নের জওয়াবে সদাচরণ করা। স্ত্রী রাগ করলে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরণে তার রাগ সহ্য করা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিবিগণও তাঁর সামনে রাগ করতেন এবং তাঁদের কেউ কেউ সারাদিন তাঁর সাথে কথা বলতেন না। তিনি এসব বিষয় নীরবে সহ্য করতেন এবং তাঁদের সাথে কঠোর ব্যবহার করতেন না। 
হযরত ওমর (রা.)-এর পত্নী একবার তাঁর কথার জওয়াব দিলে তিনি রাগতস্বরে বললেন: হে উদ্ধত, তুমি আমার কথার জওয়াব দিচ্ছ। পত্নী বললেন: রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিবিগণও তাঁর কথার জওয়াব দেন। অথচ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তোমার চেয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ। 
হযরত ওমর বললেন: হাফসা জওয়াব দিয়ে থাকলে সে খুব খারাপ করেছে। অতঃপর তিনি কন্যা হাফসাকে সম্বোধন করে বললেন: হে হাফসা, সিদ্দীকের কন্যা হবার লোভ করো না। সে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদরিণী। তুমি কখনও রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কথার জওয়াব দেবে না।
বর্ণিত আছে, পবিত্র বিবিগণের একজন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বুকে হাত রেখে তাঁকে ধাক্কা দেন। এ জন্যে তাঁর মা তাঁকে শাসালে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বললেন: ছাড়,
তাকে কিছু বলো না। এই পত্নীরা তো এর চেয়ে বড় কান্ডও করে! 
একবার রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও হযরত আয়েশা (র.)-এর মধ্যে কিছু কথা কাটাকাটি হলে তাঁরা উভয়েই হযরত আবু বকরের কাছে বিচারপ্রার্থী হন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আয়েশাকে বললেন: তুমি আগে বলবে, না আমি বলব। 
হযরত আয়েশা আরজ করলেন: আপনি বলুন, কিন্তু সত্য সত্য বলবেন। একথা শুনে হযরত আবু বকর (র.) কন্যা আয়েশাকে সজোরে এক চপেটাঘাত করে বললেন : তুই কি বলছিস, হযরত কি সত্য ছাড়া মিথ্যা বলতে পারেন। 
হযরত আয়েশা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আশ্রয় চাইলেন এবং তাঁর পেছনে গিয়ে লুকালেন। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আবু বকর (র.)-কে বললেন: আমরা তোমাকে এজন্যে ডাকিনি এবং তুমি এরূপ করবে এটাও আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। 
একবার কোন এক কথায় রাগান্বিত হয়ে হযরত আয়েশা (র.) বললেন, আপনিই বলেন, আপনি পয়গম্বর। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মুচকি হেসে তা সহ্য করে নিলেন। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আয়েশাকে বলতেন: আয়েশা, আমি তোমার রাগ ও সন্তুষ্টি বুঝে নিতে পারি। তিনি আরজ করলেন: আপনি তা কেমন করে বুঝতে পারেন? তিনি বললেন: যখন তুমি আমার প্রতি সন্তুষ্ট থাক, তখন কসম খেতে গিয়ে বল- মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আল্লাহর কসম, আর রাগের অবস্থায় বল- ইবরাহীম (আ.)-এর আল্লাহর কসম। হযরত আয়েশা আরজ করলেন: আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি কেবল আপনার নামটিই বর্জন করি। 
কথিত আছে, ইসলামে সর্বপ্রথম যে প্রেম হয়, তা ছিল রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও হযরত আয়েশা (রা.)-এর মধ্যকার প্রেম। তিনি হযরত আয়েশাকে বলতেন: আমি তোমার সাথে এমন যেমন আবু সূরা তার স্ত্রী উম্মে সূরার সাথে ছিল, কিন্তু আমি তোমাকে তালাক দিব না। (শামায়েলে তিরমিযীতে বর্ণিত উম্মে সূরার হাদীসটি সুবিদিত। তা একদিন এগার জন মহিলা হযরত আয়েশার কাছে সমবেত হয়ে নিজ নিজ স্বামীর অবস্থা বর্ণনা করল। এই এগার জনের মধ্যে উম্মে সরাও ছিল। তার স্বামী তার সাথে অনেক সদ্ব্যবহার করেছিল এবং অবশেষে তালাক দিয়েছিল। হযরত আয়েশা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এই মহিলাদের বিস্তারিত কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন। তখন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে একথা বলেছিলেন।) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পত্নীদেরকে বলতেন: তোমরা আয়েশার ব্যাপারে আমাকে পীড়ন করো না। আল্লাহর কসম, আমার কাছে যখন ওহী আসে, তখন আমি তার লেপের নীচে থাকি। (অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে কারও কাছে এরূপ হয়নি।) হযরত আনাস (র.) বলেন: রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নারী ও শিশুদের প্রতি সবার তুলনায় অধিক দয়াশীল ছিলেন।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের তৃতীয় আদব প্রমোদ


বিবাহ (২২) পারস্পরিক জীবন যাপনের প্রথম আদব ওলিমা



বিবাহ (পর্ব – ২২) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

পারস্পরিক জীবন যাপনের প্রথম আদব ওলিমা —;
প্রথম আদব ওলিমা, এটা মোস্তাহাব। হযরত আনাস (র.) বলেন, - "রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফের গায়ে হলুদের চিহ্ন দেখে জিজ্ঞেস করলেন- এটা কি? তিনি আরজ করলেন, আমি এক মহিলাকে বিয়ে করেছি এবং খোরমার বীচি পরিমাণ স্বর্ণ মোহরানা সাব্যস্ত করেছি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: মোবারক হোক। একটি ছাগল দিয়ে হলেও ওলীমা কর। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত সফিয়্যাকে বিয়ে করার পর খোরমা ও ছাতু দিয়ে ওলীমা করেন। 
স্বামীকে মোবারকবাদ দেয়া মোস্তাহাব। যেব্যক্তি তার কাছে আসবে, সে এরূপ বলবে : আল্লাহ তোমাকে মোবারক করুন, তোমার প্রতি বরকত নাযিল করুন এবং তোমাদের মধ্যে পুণ্য কাজে মতৈক্য সৃষ্টি করে দিন।
হযরত আবু হোরায়রা (র.) রেওয়ায়েত করেন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে দফ বাজানো ও হৈচৈ করা। আরও বলা হয়েছে- "এ বিবাহ ঘোষণা কর, একে মসজিদে সম্পন্ন কর এবং এর জন্যে দফ্ বাজাও।
রবী বিনতে মোয়াওভেষ রেওয়ায়েত করেন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার কাছে বাসর রাত্রির ভোরে এসে আমার শয্যায় বসে গেলেন। আমাদের কয়েকজন বালিকা দফ বাজাচ্ছিল এবং বদর যুদ্ধে আমার পরিবারের নিহত ব্যক্তিদের কীর্তিগাথা আবৃত্তি করছিল। তাদের একজন এমনও বলে ফেলল, আমাদের মধ্যে একজন নবী আছেন, যিনি আগামীকাল যা ঘটবে তা জানেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকে একথা বলতে বারণ করে বললেন: পূর্বে যা বলছিলে, তাই বল।

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের দ্বিতীয় আদব সদাচরণ 

বিবাহ (২১) বরের স্বভাব-চরিত্র যাচাই করা



বিবাহ (পর্ব – ২১) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 

বরের স্বভাব-চরিত্র যাচাই করা —
বরের স্বভাব-চরিত্র ভালরূপে যাচাই করে নেয়া কনের অভিভাবকেরও কর্তব্য। অভিভাবকের উচিত, কনের প্রতি স্নেহপরবশ হওয়া এবং এমন ব্যক্তির সাথে তাকে বিবাহ না দেয়া, যার দৈহিক গঠনে কোন ত্রুটি আছে, অথবা যার স্বভাব-চরিত্র ভাল নয় অথবা যে দ্বীনদারীতে দুর্বল অথবা স্ত্রীর হক আদায়ে অক্ষম অথবা বংশগত দিক দিয়ে কনের সমকক্ষ নয়। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: কনেকে বিবাহ দেয়ার মানে তাকে বাঁদী করা। অতএব নিজের কন্যাকে কোথায় দিচ্ছ তা দেখে নাও। কনের জন্যে সাবধানতা অবলম্বন করা খুবই জরুরী। কেননা, বিবাহের কারণে সে এমন বন্দিদশায় পড়ে যা থেকে রেহাই পেতে পারে না। পুরুষ এরূপ নয়। সে সর্বাবস্থায় তালাক দিতে সক্ষম। যখন কোনব্যক্তি তার কন্যার বিবাহ কোন জালেম, পাপাচারী, বেদআতী অথবা মদখোরের সাথে দেয়, তখন সে নিজের দ্বীনদারীতে কলংক লেপন করে এবং আল্লাহ তা'আলার ক্রোধের পাত্র হয়।কেননা, সে আত্মীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে এরূপ পাত্রের হাতে কন্যাদান করে। 
এক ব্যক্তি হযরত হাসান বসরী (রহ.)-এর খেদমতে আরজ করল: কয়েকজন লোক আমার কন্যার জন্যে বিবাহের পয়গাম পাঠিয়েছে। আমি কার সাথে তাকে বিবাহ দেব। তিনি বললেন: তাদের মধ্যে যেব্যক্তি খোদাভীরু, তার সাথে বিবাহ দাও। কেননা, সে তোমার কন্যাকে ভালবাসবে এবং খাতির সমাদর করবে। সে তোমার কন্যাকে অপছন্দ করলেও জুলুম করবেনা। 
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যেব্যক্তি পাপাচারীর হাতে কন্যাদান করে, সে আত্মীয়তা ছিন্ন করে।

পারস্পরিক জীবন যাপনের আদব
স্বামীর করণীয় আদব—
যেসকল আদবের প্রতি লক্ষ্য রাখা স্বামীর জন্যে জরুরী, নিম্নে সেগুলো বিস্তারিত উল্লেখ করা হল!

পরবর্তী পর্ব —
পারস্পরিক জীবন যাপনের প্রথম আদব ওলিমা 

বিবাহ (২০) কনের লক্ষ‍্যনীয় ষষ্ঠ গুন কুমারী হওয়া



বিবাহ (পর্ব – ২০) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

কনের লক্ষ‍্যনীয় ষষ্ঠ গুন কুমারী হওয়া  —
ষষ্ঠ গুণ- কুমারী হওয়া। হযরত জাবের (র.) এক পূর্ব বিবাহিতা মহিলাকে বিবাহ করলে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বলেছিলেন: কুমারী মেয়েকে বিবাহ করলে না কেন, এতে তুমি তার প্রতি এবং সে তোমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকত। 
স্ত্রী কুমারী হওয়ার উপকারিতা তিনটিঃ 
(১) স্ত্রীর মনে স্বামীর প্রতি ভালবাসা ও মহব্বত জন্মে। এছাড়া প্রথম পরিচিত মজনের সাথে মন লাগে। যে নারী পূর্বে একজন পুরুষের সঙ্গ লাভ করে আসে এবং অবস্থা দেখে-শুনে আসে, পূর্বপরিচিত বিষয়াদির বিপরীতে কোন কিছুতে রাজি না হওয়া তার জন্যে বিচিত্র নয়। এটাই দ্বিতীয় স্বামীকে খারাপ মনে করার কারণ হয়ে যেতে পারে। 
(২) কুমারী স্ত্রীকে স্বামী মহব্বত করে। কেননা, যে নারীকে অন্য কেউ স্পর্শ করে, তার প্রতি স্বামীর মনে স্বভাবগতভাবে ঘৃণা থাকে। মনে এ ধারণা উদয় হতেই স্বামীর মন ভারী হয়ে যায়।এ ব্যাপারে কোন কোন লোক অত্যধিক আবেগপ্রবণ হয়ে থাকে। 
(৩) কুমারী হলে স্ত্রী প্রথম স্বামীকে স্মরণ করে না। এ স্মরণও জীবনে এক প্রকার তিক্ততা সৃষ্টি করে। প্রথম প্রিয়জনের প্রতি যে মহব্বত হয়, প্রায়শঃ সেটাই সর্বাধিক পাকাপোক্ত হয়।
(৭) সপ্তম গুণ- অভিজাত বংশের অর্থাৎ, দ্বীনদার ও সৎ পরিবারের কনে হওয়া। কেননা, এরূপ পরিবারের মেয়েরা আপন সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষায় মনোযোগী হয়। যে নারী স্বয়ং শিষ্টও বিনীত নয়, সন্তানদেরকে সুন্দরভাবে শিষ্ট ও বিনীত করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। এ কারণেই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "তোমরা গোবরের স্তূপের শাক-সব্জি থেকে বেঁচে থাক"। 
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন : গোবরের স্তূপের শাক-সব্জি কি? 
তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: সুন্দরী নারী, যে নীচ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। 
তিনি আরও বলেন: নিজের বীর্যের জন্যে ভাল নারী পছন্দ কর। কেননা, আত্মীয়তার শিরা পিতামাতার চরিত্র সন্তানের মধ্যে টেনে আনে।
(৮) অষ্টম গুণ- কনের নিকট সম্পর্কীয়া না হওয়া। এটা কামস্পৃহা হ্রাস করে। রসূলে করীম(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: নিকট সম্পর্কীয়া নারীকে বিবাহ করো না, দুর্বল সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। কামস্পৃহা দুর্বল হওয়াই সন্তান দুর্বল্ হওয়ার কারণ। কেননা, কামস্পৃহা দৃষ্টি ও স্পর্শ শক্তি থেকে উদ্দীপ্ত হয়। নারী নতুন ও অপরিচিতা হলে এই শক্তি জোরদার হয়। যে নারী সর্বদা এক সময় দৃষ্টির সামনে থাকে, তাকে দেখতে দেখতে মানুষ নিস্পৃহ হয়ে যায় এবং পূর্ণ আকর্ষণ থাকে না। ফলে কামস্পৃহাও উদ্দীপ্ত হয় না।
মোট কথা, কনের উপরোক্ত গুণসমূহের কারণে তাকে বিবাহ করার আগ্রহ জন্মায়। 

পরবর্তী পর্ব —
বরের স্বভাব-চরিত্র যাচাই করা 

বিবাহ (১৯) কনের লক্ষ‍্যনীয় পঞ্চম গুন বন্ধ্যা না হওয়া



বিবাহ (পর্ব – ১৯) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

কনের লক্ষ‍্যনীয় পঞ্চম গুন বন্ধ্যা না হওয়া —
পঞ্চম গুণ- কনের বন্ধ্যা না হওয়া। যদি বন্ধ্যাত্ব জানা যায়, তবে সেই কনেকে বিবাহ করবেনা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, এমন কনেকে বিবাহ করবে, যে সন্তান দেয় এবং স্বামী আসক্তা হয়। সুতরাং কনের পূর্বে বিবাহ না হওয়ার কারণে যদি সে বন্ধ্যা কি না তা জানা না যায়, তবে স্বাস্থ্যবতী ও যুবতী হওয়ার প্রতি লক্ষ্য করবে।কারণ, এ দু'টি গুণ কনের মধ্যে থাকলে তার সন্তান দেয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

পরবর্তী পর্ব —
কনের লক্ষ‍্যনীয় প্রথম গুন কুমারী হওয়া 

বিবাহ (১৮) কনের লক্ষ‍্যনীয় চতুর্থ গুন মোহরানা কম হওয়া



বিবাহ (পর্ব – ১৮) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)
কনের লক্ষ‍্যনীয় চতুর্থ গুন মোহরানা কম হওয়া—
চতুর্থ গুণ হচ্ছে, মোহরানা কম হওয়া। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তারাই উত্তন স্ত্রী, যাদের চেহারা-নমুনা ভাল এবং মোহরানা কম। তিনি সীমাতিরিক্ত মোহরানা নির্ধারণ করতে নিষেধ করেছেন এবং নিজে কোন কোন বিবাহ দশ দেরহাম ও গৃহের আসবাবপত্রের বিনিময়ে করেছেন। গৃহের আসবাবপত্রের মধ্যে ছিল একটি আটা পেষার যাঁতা, একটি মাটির কলসী ও একটি নরম গদি। তিনি কোন বিবির বিবাহে যবদ্বারা ওলীমা করেছেন, কোন বিবির ওলীমা খোরমা দ্বারা এবং কোন বিবির ওলীমা ছাতু দ্বারা করেছেন। হযরত ওমর (র.) অধিক মোহরানা ধার্য করতে নিষেধ করে বলতেন: রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজেও চারশ' দেরহামের অধিক মোহরানার বিনিময়ে বিবাহ করেননি এবং নিজের কন্যাগণের বিবাহেও এর বেশী মোহরানা ধার্য করেননি। যদি অধিক মোহরানা ধার্য করার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য থাকত তবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সবার আগে তা করতেন। কতিপয় সাহাবী বিবাহে এ পরিমাণ স্বর্ণ মোহরানা হিসাবে ধার্য করেন, যার মূল্য পাঁচ দেরহামের বেশী ছিল না।হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যিব (র.) আপন কন্যার বিবাহ হযরত আবু হোরায়রা (র.)-এরসাথে দু'দেরহামের বিনিময়ে দেন। তিনি রাতের বেলায় আপন কন্যাকে নিয়ে তার গৃহের দ্বারেপৌঁছে দিয়ে আসেন এবং সাত দিন পর কন্যার কাছে গিয়ে তার কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। সকল ইমামের মাযহাব পালন করার নিয়তে মোহরানা দশ দেরহাম ধার্য করলে কোন ক্ষতিনেই। হাদীসে আছে, স্ত্রী তখন মোবারক হয় যখন তাড়াতাড়ি বিবাহ হয়, তাড়াতাড়ি সন্তান হয় এবং মোহরানা কম হয়। 
আরও আছে, সেই স্ত্রীর মধ্যে বরকত বেশী যার মোহরানা সবচেয়ে কম। স্ত্রীর পক্ষ থেকে মোহরানা বেশী হওয়া যেমন মাকরূহ, তেমনি পুরুষের পক্ষ থেকে স্ত্রীর ধন-সম্পদের খবর নেয়াও মাকরূহ। ধনসম্পদের লোভে বিবাহ করা উচিত নয়। 
সুফিয়ান সওরী (রহ.) বলেন: যখন কেউ বিবাহ করে এবং জিজ্ঞেস করে, কনের কি কি ধন-সম্পদ আছে, তখন বুঝে নেবে সে চোর। স্বামী কোন উপহার শ্বশুরালয়ে প্রেরণ করলে এই নিয়ত করবে না যে, এর বদলে সেখান থেকে বেশী পাওয়া যাবে। তদ্রূপ কনের পরিবারের লোকজন কিছু পাঠালেও এরূপ নিয়ত করবে না। বেশী পাওয়ার নিয়ত করা খুবই খারাপ। তবে উপহার পাঠানো মোস্তাহাব ও পারস্পরিক সম্প্রীতির কারণ। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: "একে অপরকে হাদিয়া পাঠাও এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি কর!" এতে বেশী পেতে চাওয়া আল্লাহ তাআলার এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত: "অধিক পাওয়ার নিয়তে দিয়ো না"। 
মোট কথা, বিবাহে এ ধরনের কাজ মাকরূহ ও বেদআত। এটা ব্যবসা ও জুয়ার মত এবং এতে বিবাহের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

পরবর্তী পর্ব —
কনের লক্ষ‍্যনীয় পঞ্চম গুন বন্ধ্যা না হওয়া 


বিবাহ (১৭) কনের লক্ষ‍্যনীয় তৃতীয় গুন রূপলাবণ্য



বিবাহ (পর্ব – ১৭) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

কনের লক্ষ‍্যনীয় তৃতীয় গুন রূপলাবণ্য —
তৃতীয় গুণ রূপলাবণ্য। এ গুণটিও এজন্যে কাম্য যে, এর ফলে স্বামী যিনা থেকে মুক্ত থাকে। স্ত্রী কুশ্রী হলে মানুষ স্বভাবতই অতৃপ্ত থাকে। এছাড়া যার মুখমণ্ডল সূশ্রী হবে, তার চরিত্রও ভাল হয়। এটাই সাধারণ নিয়ম। আমরা পূর্বে লেখেছি যে, কনের দ্বীনদারীর প্রতিলক্ষ্য রাখা জরুরী এবং রূপ-লাবণ্যের কারণে তাকে বিবাহ করা উচিত নয়। এর অর্থ এই নয় যে, রূপলাবণ্যের প্রতি লক্ষ্য করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরং উদ্দেশ্য এই যে, যখন দ্বীনদারীর অভাব হয়, তখন কেবল রূপলাবণ্যে আসক্ত হয়ে বিবাহ করা উচিত নয়। কেননা, শুধু সুন্দরী হওয়া বিবাহে উৎসাহিত করে ঠিক, কিন্তু দ্বীনদারীর ব্যাপারে শিথিল করে দেয়। তবে রূপলাবণ্যের কারণে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই মহব্বত ও সম্প্রীতি থাকে বিধায় এটাও লক্ষ্যণীয় বিষয়। মহব্বতের কারণাদি বিবেচনা করাতে শরীয়তও নির্দেশ দিয়েছে। এ কারণেই বিবাহের পূর্বে কনেকে দেখে নেয়া মোস্তাহাব। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তাআলা তোমাদের অন্তরে যখন কোন মহিলাকে বিবাহ করার আগ্রহ সৃষ্টি করে দেন, তখন তোমাদের উচিত তাকে দেখে নেয়া। কেননা, এটা পারস্পরিক প্রেম-প্রীতির জন্যে উপযোগী। তিনি আরও বলেন:  আনসারদের চোখে কিছু আছে। যখন তোমাদের কেউ তাদের কাউকে বিবাহ করতে চায়, তখন তাকে দেখে নেয়া উচিত। কথিত আছে, আনসাররা ক্ষীণদৃষ্টি ছিলেন। কেউ বলেন: তাদের চোখ ছোট ছিল। পূর্ববর্তী কোন কোন বুযুর্গ এমন ছিলেন, যাঁরা অভিজাত পরিবারে বিবাহ করলেও পাত্রী দেখে নিতেন। 
আ'মাশ বলেন: পূর্বে না দেখে যে বিবাহ করা হয় তার পরিণতি হয় দুঃখ কষ্ট। বলাবাহুল্য, প্রথম দৃষ্টিতে তো চরিত্র ও দ্বীনদারী জানাই যায় না- কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য জানা যায়। এথেকে বুঝা গেল যে, রূপলাবণ্যের প্রতি খেয়াল রাখাও শরীয়তে কাম্য। 
বর্ণিত আছে, হযরত ওমর (র.)-এর খেলাফতকালে এক ব্যক্তি চুলে খেযাব লাগিয়ে বিবাহ করে নেয়। কয়েক দিন পর তার খেযাব সরে গেলে শ্বশুরালয়ের লোকেরা খলীফার কাছে নালিশ করে বসে যে, তারা যুবক মনে করে তার কাছে বিবাহ দিতে সম্মত হয়েছিল। খলীফা লোকটিকে শাস্তি দিলেন এবং বললেন: তুমি মানুষকে বিভ্রান্ত করেছ। 
বর্ণিত আছে, হযরত বেলাল ও হযরত সোহায়ব রূমী (র.) এক আরব পরিবারে গিয়ে বিবাহের প্রস্তাব দেন। গৃহকর্তা তাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলে হযরত বেলাল বললেন: আমি বেলাল এবং সে আমার ভাই সোহায়ব! আমরা পথভ্রষ্ট ছিলাম, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন। আমরা গোলাম ছিলাম, আল্লাহ আমাদেরকে মুক্ত করেছেন। আমরা নিঃস্ব ছিলাম, আল্লাহ আমাদেরকে ধনবান করেছেন আপনারা আমাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করলে আলহামদুলিল্লাহ আর অস্বীকার করলে সোবহানাল্লাহ, অতঃপর তাদেরকে বলাহলঃ আপনাদের বিবাহ হয়ে যাবে। হযরত সোহায়ব হযরত বেলালকে বললেন : হায়, তুমি আমাদের ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রমের কথাও উল্লেখ করতে পারতে, যা আমরা রসূলে করীম(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সঙ্গে থেকে আনজাম দিয়েছি! হযরত বেলাল বললেন: চুপ থাক। আমরা সত্য কথা বলে দিয়েছি। এ সততাই বিবাহ সম্পন্ন করেছে। বাহ্যিক রূপলাবণ্য ও আভ্যন্তরীণ চরিত্র উভয়ের মধ্যে ধোঁকা হতে পারে। রূপলাবণ্যের ধোঁকা দেখার মাধ্যমে দূর করা মোস্তাহাব। চারিত্রিক ধোঁকা দোষগুণ শুনার মাধ্যমে দূর হতে পারে। তাই বিবাহের পূর্বে উভয় কাজ সেরে নেয়া উচিত, কিন্তু দোষগুণ ও চরিত্র মাধুর্য কেবল বুদ্ধিমান, সত্যবাদী এবং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ব্যক্তিকেই জিজ্ঞাসা করা উচিত। সে যেন কনের পক্ষ না হয় এবং শত্রুও না হয়। কেননা, ইদানীং বিবাহ পূর্ব বিষয়াদিতে এবং কনের গুণ বর্ণনার ব্যাপারে মানুষের মন স্বল্পতা ও বাহুল্য প্রবণ হয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে সত্য কথা বলে এরূপ লোকের সংখ্যা খুবই কম। বর্তমানে প্রবঞ্চনা ও বিভ্রান্ত করার প্রচলন অত্যন্ত বেড়ে গেছে। মোট কথা, যেব্যক্তি কেবল সুন্নত আদায়, সন্তানলাভ ও ঘরকন্নার জন্যে বিবাহ করতে চায়, সে যদি রূপলাবণ্যের প্রতি উৎসাহী না হয়, তবে এটা সংসারবিমুখতার অধিক নিকটবর্তী। কেননা, রূপলাবণ্যও একটি পার্থিব বিষয়, যদিও মাঝেমাঝে এবং কোন কোন ব্যক্তির পক্ষে এটা দ্বীনদারীতে সহায়ক হয়। 
হযরত আবু সোলায়মান দারানী বলেন: সংসারবিমুখতা সবকিছুতেই হয়, এমনকি স্ত্রীর মধ্যেও হয় সংসারবিমুখতা অবলম্বন করার জন্যে মানুষ কোন বৃদ্ধাকে বিবাহ করতে পারে। 
মালেক ইবনে দীনার বললেন: মানুষ এতীম ও নিঃস্ব মহিলাকে বিবাহ করে না, যাকে খাওয়ালে পরালে সওয়াব পাওয়া যায়, ভরণপোষণ সহজ হয় এবং সামান্যতে সন্তুষ্ট থাকে; বরং তারা দুনিয়াদারদের কন্যাকে বিবাহ করে, যে সর্বদা নতুন নতুন কামনা বাসনা উপস্থিত করে বলে,আমাকে অমুক শাড়ী পরাও, অমুক বস্তু খাওয়াও।

ইমাম আহমদ দু'ভগিনীর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন, তাদের মধ্যে বুদ্ধিমতী কোন্টি, তাঁকে উত্তরে বলা হয়: যে বুদ্ধিমতী, তার চোখ নেই। তিনি বললেন: আমি এই অন্ধকেই বিবাহ করব। মোটকথা, যেব্যক্তি আনন্দের জন্যে নয়, বরং প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশে বিবাহ করতে চায়, তার নিয়মনীতি এরূপই হওয়া উচিত, কিন্তু যেব্যক্তি আনন্দ ব্যতীত দ্বীনদারী ঠিক রাখতে পারে না, তার রূপ-লাবণ্য দেখা উচিত। কারণ, বৈধ বিষয় দ্বারা আনন্দ লাভ করা দ্বীনদারীর একটি দুর্গ।
কথিত আছে, সুন্দরী, চরিত্রবতী, কালকেশী আনতনয়না, গৌরবর্ণা ও স্বামী নিবেদিত! স্ত্রী কেউ পেয়ে গেলে সে যেন বেহেশতের হুর পেয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদের পত্নীদেরকে এসব বিশেষণেই বিশেষিত করেছেন। 
বলা হয়েছে: চরিত্রবতী, সুন্দরী, আনতনয়না, সোহাগিনী ও সমবয়স্কা, অপ্সরা আয়তলোচনা।বলাবাহুল্য, এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে আনন্দ পূর্ণতা লাভ করে। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সেই উত্তম, যাকে দেখে তার স্বামী আনন্দিত হয়, যে স্বামীর আদেশ পালন করে, স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের হেফাযত করে এবং স্বামীর ধনসম্পদ দেখাশুনা করে।" বলাবাহুল্য, সোহাগিনী স্ত্রীকে দেখেই স্বামী আনন্দিত হয়।

পরবর্তী পর্ব —
কনের লক্ষ‍্যনীয় চতুর্থ গুন মোহরানা কম হওয়া

বিবাহ (১৬) কনের লক্ষ‍্যনীয় দ্বিতীয় গুন সদাচারী হওয়া।



বিবাহ (পর্ব – ১৬) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

কনের লক্ষ‍্যনীয় দ্বিতীয় গুন  সদাচারী হওয়া —
দ্বিতীয় গুণ– সদাচারী হওয়া। যেব্যক্তি স্বাচ্ছন্দ্যে ও দ্বীনদারীতে সাহায্য প্রত্যাশা করে, তার জন্যে সদাচারিণী স্ত্রী একটি বড় আশীর্বাদ। কেননা, স্ত্রী প্রগলভ, কটুভাষিণী ও কঠোরস্বভাব হলে তার দ্বারা উপকারের চেয়ে অপকারই বেশী হবে। স্ত্রীদের কটু কথায় সবর করা এমন একটি বিষয়, যা দ্বারা ওলীগণের পরীক্ষা নেয়া হয়। 

জনৈক আরব বলেন: ছয় প্রকার নারীকে বিবাহ করো না- আন্নানা, মান্নানা, হান্নানা, হাদ্দাকা, বাররাকা ও শাদ্দাকা।
(১) "আন্নানা” সেই নারীকে বলা হয় যে সর্বদা কাতরায় ও হায় আফসোস করতে থাকে এবং রোগিনী হয়ে থাকে। এরূপ নারীর বিবাহে কোন বরকত নেই।
(২) "মান্নানা" সেই নারীকে বলা হয়, যে স্বামীর প্রতি প্রায়ই অনুগ্রহ প্রকাশ করে বলে, আমি তোমার জন্যে এই করেছি সেই করেছি।
(৩) "হান্নানা" সেই নারীকে বলা হয়, যে তার পূর্ব স্বামীর প্রতি অথবা তার সন্তানদের প্রতি আসক্ত থাকে।
(৪) "হাদ্দাকা" সেই নারীকে বলা হয় যে সবকিছুর উপরই লোভ পোষণ করে এবং তা পেতে চায়। এর পর তা ক্রয় করার জন্যে স্বামীকে তাগিদ দেয়।
(৫) "বাররাকা” হেজাযীদের পরিভাষায় সেই নারীকে বলা হয়, যে সারাদিন কেবল সাজসজ্জা ও প্রসাধনে মেতে থাকে। আর ইয়ামানীদের পরিভাষায় সেই নারীকে বলা হয়, যে খেতে বসেরাগ করে এবং একাই খায়। প্রত্যেক বস্তু থেকে নিজের অংশা আলাদা করে রাখে।
(৬) "শাদ্দাকা" সেই নারীকে বলে, যে খুব বকবক করে।

তিনটি বিষয় পুরুষের জন‍্য মন্দ নারীর জন‍্য প্রশংসনীয়—
হযরত আলী (র.) বলেন: যে সকল অভ্যাস পুরুষের জন্য মন্দ সেগুলো নারীর জন্য প্রশংসনীয়। এ জাতীয় অভ্যাস হচ্ছে কৃপণতা, অহংকার ও ভীরুতা। কেননা, নারী কৃপণ হলে নিজের ও স্বামীর অর্থসম্পদ বাঁচিয়ে রাখবে। অহংকারী হলে প্রত্যেকের সাথে নম্র ও মোহনীয় কথাবার্তা বলতে ঘৃণা করবে। আর ভীরু হলে সবকিছুকে ভয় করে চলবে, গৃহের বাইরে যাবেনা এবং স্বামীর ভয়ে অপব্যয়ের স্থান থেকে দূরে থাকবে।

পরবর্তী পর্ব —
কনের লক্ষ‍্যনীয় তৃতীয় গুন রূপলাবণ্য 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...