মঙ্গলবার, ২ মে, ২০২৩

মহব্বত (পর্ব- 2) মহব্বতের স্বরূপ ও কারণাদি



মহব্বত (পর্ব- ২)

এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


মহব্বতের স্বরূপ ও কারণাদি :

চেনা ও জানা ছাড়া মহব্বত হতে পারে না। মানুষ তাকেই মহব্বত করে, যাকে সে চেনে। জড় পদার্থ মহব্বত করে না। কারণ, তার মধ্যে চেনার শক্তি নেই। তাই মহব্বত একমাত্র মানুষের বৈশিষ্ট্য। মানুষ যেসব বস্তু চেনে ও জানে, সেগুলো তিন প্রকার।

(১) মানুষেরই স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যশীল ও আনন্দদায়ক।

(২) মানব-স্বভাবের পরিপন্থী ও কষ্টদায়ক।

(৩) আনন্দ ও কষ্ট কোন কিছুই দেয় না।

এ তিন প্রকার বস্তুর মধ্যে যে বস্তু চিনলে ও জানলে মানুষ আনন্দ ও সুখ পায়, সে বস্তুই মানুষের প্রিয় হয়ে থাকে। আর যে বস্তু চিনলেও জানলে কষ্ট হয়, সে বস্তু অপ্রিয় হয়ে থাকে। যে বস্তু চেনা-জানার পর কষ্টও হয় না, সুখও হয় না, সেটাকে প্রিয়-অপ্রিয় কোন কিছুই বলা যায় না।

কোন বস্তু প্রিয় হওয়ার অর্থ, মানব-স্বভাবে তার প্রতি ঝোঁক থাকা, আর অপ্রিয় হওয়ার অর্থ ঝোঁকের পরিবর্তে ঘৃণা থাকা। সুতরাং যে বস্তু থেকে আনন্দ পাওয়া যায়, সে বস্তুর প্রতি স্বভাবের ঝোঁক থাকার নাম মহব্বত। এই ঝোক যদি পাকাপোক্ত ও শক্তিশালী হয়ে যায়, তবে তাকে বলা হয় এক। এ হচ্ছে মহব্বতের স্বরূপ, যা জানা অত্যন্ত জরুরী।


মহব্বতের প্রথম কারন-

মহব্বতের প্রথম কারণ হল মহব্বত চেনা ও জানার অনুগামী। চেনা ও জানার হাতিয়ার হচ্ছে ইন্দ্রিয়। ইন্দ্রিয় বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত বিধায় মহব্বতও বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হবে। কেননা, প্রত্যেক ইন্দ্রিয় দ্বারা একটি বিশেষ বস্তুকে চেনা যায় এবং বিশেষ বস্তু থেকেই আনন্দ পাওয়া যায়। উদাহরণত : চোখের আনন্দ দেখার বস্তুসমূহে। কানের আনন্দ হৃদয়গ্রাহী সঙ্গীত ও মনোমুগ্ধকর কণ্ঠস্বরে। নাকের আনন্দ উৎকৃষ্ট সুগন্ধিতে। আস্বাদন শক্তির আনন্দ সুস্বাদু খাদ্যে। স্পর্শ শক্তির আনন্দ মৃদুতা ও কোমলতায়। এসব বস্তু ইন্দ্রিয়কে আনন্দ দেয় বিধায় এগুলো প্রিয়।

রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) এরশাদ করেন "তোমাদের দুনিয়া থেকে আমার কাছে তিনটি বস্তু প্রিয়, তা হল- সুগন্ধি, নারী এবং আমার চোখের শীতলতা নামাযে।

এখানে তিনি সুগন্ধিকে প্রিয় বলেছেন। বলা বাহুল্য, এতে চোখ ও কানের কোন অংশ নেই; বরং এতে কেবল ঘ্রাণশক্তির অংশ রয়েছে। নারীকে প্রিয় বলা হয়েছে। এতে ঘ্রাণ শক্তির অংশ নেই; বরং দৃষ্টিশক্তি ও স্পর্শ শক্তির অংশ রয়েছে।

পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের আনন্দে মানুষের সাথে চতুষ্পদ জন্তুও শরীক। অতএব, মহব্বতকে শুধু পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সীমিত করলে আল্লাহ তা'আলার মহব্বত হতে পারে না। কেননা, আল্লাহ তা'আলা ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে চেনেন ও জানেন না। এমতাবস্থায় মানুষের বৈশিষ্ট্য যে মহব্বত, তা নিষ্ফল সাব্যস্ত হবে এবং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়- যা দ্বারা মানুষ জন্তু-জানোয়ার থেকে পৃথক এবং যাকে বুদ্ধি, নূর, অন্তর ইত্যাদি বলা যায়, তা মিথ্যা হয়ে যাবে। এটা অবান্তর। কেননা, অন্তদৃষ্টি চর্মচক্ষুর তুলনায় অধিক শক্তিশালী। অন্তর চোখের তুলনায় অধিক চেনে ও জানে। 

অর্থসম্ভার- যা বুদ্ধি দ্বারা জানা যায়, তার সৌন্দর্য চোখে দেখা আকৃতিসমূহের তুলনায় অনেক বেশী। অতএব, অন্তর যে সকল ইন্দ্রিয় বহির্ভুত বিষয় অনুভব করে এবং অনুভব করে আনন্দ পায়, সে আনন্দও অধিক পূর্ণাঙ্গ হবে। কেননা, সুস্থ স্বভাবের ঝোক সেদিকে অধিক জোরদার হবে। এই ঝোকের নামই হল মহব্বত। এমতাবস্থায় যে খোদায়ী মহব্বতকে অস্বীকার করবে, সে চতুষ্পদ জন্তুর স্তরে অবস্থান করবে অথবা পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের অনুভূতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

প্রত্যেক জীবিত ব্যক্তির কাছে সর্বপ্রথম প্রিয় বস্তু হচ্ছে তার নিজের সত্তা। নিজ সত্তাকে মহব্বত করার উদ্দেশ্য হল, তার স্বভাবের মধ্যে আপন অস্তিত্ব ও তার স্থায়িত্বের বাসনা এবং নাস্তি ও ধ্বংসের প্রতি অনীহা। এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মানুষের মজ্জার অন্তর্গত। সত্তার মহব্বতের কারণেই মানুষ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিরাপত্তা, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবকে মহব্বত করে। এগুলোর প্রতি মহব্বতের কারণ সয়ং এগুলোর সত্তা নয়; বরং এগুলোর মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বের স্থায়িত্ব ও পূর্ণতা নিশ্চিত হয় বলে। এ কারণেই মানুষ তার পুত্রকে মহব্বত করে, যদিও পুত্রের দ্বারা তার কোন উপকার হয় না এবং নানাবিধ কষ্ট ও পীড়া সইতে হয়। কেননা, তার মৃত্যুর পর পুত্রই হবে তার স্থলাভিষিক্ত। সে যেন বংশের স্থায়িত্বের মধ্যেও নিজের এক প্রকার স্থায়িত্ব দেখতে পায়। এমনিভাবে আত্মীয়-স্বজনের মহব্বত নিজ সত্তার মহব্বতের পূর্ণতার কারণেই হয়ে থাকে। কারণ, আত্মীয়-স্বজনের কারণে সে নিজেকে শক্তিশালী মনে করে এবং তাদের কৃতিত্বকে নিজের গৌরব মনে করে। এই বক্তব্য থেকে জানা গেল, প্রত্যেক মানুষের কাছে তার সত্তা, সত্তার পূর্ণতা ও তার স্থায়িত্ব মহব্বতের বিষয়। এ হচ্ছে মহব্বতের প্রথম কারণ।


মহব্বতের দ্বিতীয় কারণ-

মহব্বতের দ্বিতীয় কারণ হল অনুগ্রহ। কথায় বলে, মানুষ অনুগ্রহের দাস। অনুগ্রহকারীকে মহব্বত করা মানুষের মজ্জাগত স্বভাব। হাদীসে বর্ণিত আছে-"হে আল্লাহ ! কোন পাপাচারীর অনুগ্রহ আমার উপর রাখিয়েন-না। রাখলে আমার অন্তর তাকে মহব্বত করবে। এতে ইঙ্গিত হয়, অনুগ্রহকারীকে আন্তরিকভাবে মহব্বত করার ব্যাপারটি বাধ্যতামূলক। এটি এড়ানো যায় না। এ কারণেই মানুষ কখনও এমন ব্যক্তিকে মহব্বত করে, যার সাথে তার কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই-নিছক অপরিচিত।


মহব্বতের  তৃতীয় কারণ-

মহব্বতের তৃতীয় কারণ হল কোন বস্তুকে সেই বস্তুর সত্তার কারণে মহব্বত করা, তার কাছ থেকে কোন উপকার পাওয়ার কারণে নয়; বরং সে বস্তুর সত্তাই সাক্ষাৎ উপকার। এ মহব্বতকে হাকিকী তথা সত্যিকার মহব্বত বলা হয়। এরূপ মহব্বতের স্থায়িত্ব আশা করা যায়। উদাহরতঃ রূপ-সৌন্দর্যের মহব্বত কেবল রূপ ও সৌন্দর্যের কারণেই হয়। এতে সৌন্দর্য চেনা ও অনুভব করাই সাক্ষাৎ আনন্দ। এখানে ধারণা করা উচিত নয় যে, সুশ্রী অবয়বের মহব্বত কাম-বাসনা চরিতার্থ করা ও বাসনা করা ছাড়া সম্ভব নয়। উচিত এজন্যে নয় যে, কাম-বাসনা চরিতার্থ করা একটি ভিন্ন আনন্দ এবং স্বয়ং রূপও ভিন্ন আনন্দদায়ক। যেমন সবুজের সমারোহ ও বহমান পানিকে মহব্বত করা হয়, কিন্তু তা এ জন্যে নয় যে, এগুলোতে পানাহারের উপকার আছে। দেখা ছাড়া এগুলোতে অন্য কোন আনন্দ নেই। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-সাল্লাম) সবুজ শ্যামল বনানী ও বহমান পানিকে খুব মহব্বত করতেন। সকল সুস্থ মন বাগবাগিচা, ফুল, সুশ্রী জন্তু-জানোয়ার, মনোহারী ফলের বৃক্ষ এবং সুন্দর চিত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করা আনন্দের কারণ মনে করে। এমনকি, মানুষ এগুলোর দ্বারা মনের দুঃখ দূর করে। এমন কোন রূপ-সৌন্দর্য নেই, যা অনুভব করাতে আনন্দ নেই। এখন যদি প্রমাণিত হযয়ে যায় যে, আল্লাহ তা'আলা সৌন্দর্যশীল, তবে যার দৃষ্টিতে তার সৌন্দর্য ফুটে উঠবে, তার কাছে অবশ্যই তিনি মহব্বতের পাত্র হবেন। হাদীসে বলা হয়েছে - আল্লাহ সৌন্দর্যশালী। তিনি সৌন্দর্যকে ভালবাসেন।


মহব্বতের চতুর্থ কারণ-

মহব্বতের চতুর্থ কারণ স্বয়ং রূপ-সৌন্দর্য। এখানে রূপ ও সৌন্দর্যের অর্থ বর্ণনা করা জরুরী। ভাবুক ও কল্পনা-বিলাসীদের মতে যার দৈহিক গড়ন সুসমঞ্জস, আকার-আকৃতি সঠিক এবং রং উজ্জ্বল গৌর, সে রূপবান ও সৌন্দর্যশালী। অধিকাংশ মানুষের মতেও যা দৃষ্টিকে তৃপ্তি দেয়, তাই সুন্দর। তাই তাদের ধারণা, যে বস্তু দৃষ্টিগোচর হয় না, যার আকার-আকৃতি নেই, রং ও বর্ণ এবং এবং কল্পনায় প্রতিষ্ঠিত হয় না, তার রূপবান ও সৌন্দর্যশালী হওয়া সম্ভব নয়। যখন সৌন্দর্যশীল হবে না, তখন তাকে অনুভব করে আনন্দ হবে না। এটা তাদের বিরাট ভ্রান্তি। কেননা, দৃষ্টিগ্রাহ্য হওয়া, গড়ন সুসমঞ্জস হওয়া এবং রং উজ্জ্বল হওয়ার মধ্যেই সৌন্দর্য সীমিত নয়। উদাহরণতঃ আমরা বলি, এই হস্তলিপি সুন্দর, এই কণ্ঠস্বর সুন্দর। এখানে গড়ন, আকার-আকৃতি ও রং কিছুই নেই। অতএব, বুঝা গেল, মুখাকৃতি ও অবয়বের মধ্যেই সৌন্দর্য সীমিত নয়। প্রত্যেক বস্তুর সৌন্দর্যের মাপকাঠি হচ্ছে তার মধ্যে তার উপযুক্ত ও সম্ভাব্য সকল গুণের সমাবেশ ঘটা। যখন কোন বস্তুর মধ্যে সম্ভাব্য সকল গুণের সমাবেশ হয়ে যাবে, তখন সে বস্তু হবে সর্বাঙ্গ-সুন্দর। যদি কতক গুণের সমাবেশ ঘটে, তবে সৌন্দর্যও সে তুলনায়ই হবে। উদাহরণতঃ আমরা সে ঘোড়াকে সুন্দর বলব, যার মধ্যে সুশ্রী আকার-আকৃতি, রং-ঢং দ্রুতগতি ইত্যাদি সম্ভাব্য গুণ পূর্ণ মাত্রায় থাকে।

জানা দরকার, সৌন্দর্য ইন্দ্রিয়গাহ বিষয়াদির মধ্যেই সীমিত নয়; বরং ইন্দ্রিয় বহির্ভূত বিষয়াদির মধ্যেও বিদ্যমান। উদাহরণতঃ আমরা বলি এই চরিত্র কত সুন্দর। এই বিদ্যা কত ভালো। চরিত্র ও বিদ্যার মধ্যে কোনটিই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভূত হয় না; বরং অন্তদৃষ্টির নূর দ্বারা এগুলো উপলব্ধি করা হয়। এসব গুণ মানুষের প্রিয় এবং যারা এসব গুণে গুণান্বিত, তারাও প্রিয়। উদাহরণতঃ মানুষের এটা মজ্জাগত স্বভাব যে, তারা পয়গম্বরগণকে এবং সাহাবায়ে কেরামকে মহব্বত করে। অথচ তাদের কাউকে চোখে দেখেনি। মাযহাবসমূহের ইমামগণের মহব্বতও তেমনি। বলা বাহুল্য, তাদের এই মহব্বত বাহ্যিক আকার-আকৃতির কারণে নয়। বাহ্যিক আকার-আকৃতি তো কবে মাটির সাথে মিশে গেছে; বরং তাদের মহব্বতের কারণ হচ্ছে ধর্মীয় গুণাবলী যেমন, তাকওয়া, এলেম, ধর্ম প্রচার, শরীয়ত সম্পর্কে গবেষণা ইত্যাদি। এসব গুণের সৌন্দর্য অনুভব করা অন্তদৃষ্টির নূর ছাড়া সম্ভব নয়।


মহব্বতের পঞ্চম কারণ-

মহব্বতের পঞ্চম কারণ আত্মিক মিল, যা মহব্বতকারী ও মাহবুবের মধ্যে থাকে। প্রায়ই দু'ব্যক্তির মধ্যে প্রগাঢ় মহব্বত হতে দেখা যায়; কোন সৌন্দর্য ও উপকার পাওয়ার কারণে নয়; বরং কেবল আত্মিক মিলের কারণে। হাদীস শরীফে আছে- আত্মাসমূহের যেগুলো পরস্পর পরিচিত হয়েছে, সেগুলো পরস্পর মহব্বতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, আর যেগুলো পরিচিত হয়নি, সেগুলো পৃথক হয়ে গেছে।

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে মহব্বতের পাঁচটি কারণ পাওয়া গেল। (এক) নিজের অস্তিত্বের পূর্ণতা ও স্থায়িত্বের মহব্বত। ( দুই ) অনুগ্রহের কারণে মহব্বত। (তিন) কোন বস্তুর সত্তার কারণে মহব্বত করা। (চার) স্বয়ং রূপ-সৌন্দর্যের কারণে মহব্বত করা। (পাঁচ) আত্মিক মিলের কারণে মহব্বত। যদি এ কারণগুলো একই ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান থাকে, তবে নিঃসন্দেহে মহব্বত বহুগুণ বেশী হবে।


(পরবর্তী পর্ব- মহব্বতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহর সত্বা)


@everyone

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...