মহব্বত (পর্ব- ৪)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
খোদায়ী মহব্বত শক্তিশালী হওয়ার উপায়
আখেরাতে সে ব্যক্তি সর্বাধিক সৌভাগ্যবান হবে, আল্লাহ তা'আলার সাথে যার মহব্বত অধিকতর শক্তিশালী হবে। কেননা, আখেরাতের অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার কাছে গিয়ে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জন করা। বলা বাহুল্য, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন আশেক তার মাশুকের কাছে যাবে, তার দীদারে চিরতরে ধন্য হবে, কোনরূপ বাধা থাকবে না এবং মালিন্য ও বিচ্ছিন্নতার কোন আশংকা থাকবে না, তখন কি অভাবনীয় খুশী ও অপার আনন্দই না তার অর্জিত হবে ! কিন্তু এই আনন্দ মহব্বতের শক্তি অনুপাতে হবে।খোদায়ী মহব্বত শক্তিশালী হওয়ার উপায়
মহব্বত যত বেশী হবে, আনন্দও তত বেশী হবে—
দুনিয়াতে কোন ঈমানদার আল্লাহর মহব্বত থেকে খালি নয়। কিন্তু মহব্বতের আধিক্য যাকে এশ্ক বলা হয়, তা অনেকের মধ্যে নেই। এই এশ্ক অর্জনের উপায় দু'টি –
(১) দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং মন থেকে গায়রুল্লাহর মহব্বত বের করে দেয়া। কেননা, মন হচ্ছে পান পাত্রের মত। যদি পাত্রে পানি থাকে, তবে তাতে সিরকা রাখার অবকাশ থাকে না। আল্লাহ তা'আলা কাউকে দুটি মন দেননি যে, একটির দ্বারা আল্লাহকে মহব্বত করবে এবং অপরটি দ্বারা গায়রুল্লাহকে মহব্বত করবে। আল্লাহকে সর্বান্তকরণে চাওয়াই হচ্ছে পরিপূর্ণ মহব্বত। যে পর্যন্ত অপরের দিকে মনোযোগ রাখবে, সে পর্যন্ত মন অপরের সাথে একপ্রকার মশগুল থাকবে এবং যে পরিমাণ অপরের সাথে মশগুল থাকবে সে পরিমাণ মনে আল্লাহর মহব্বত কম হবে। এই একাগ্রতার দিকেই এ আয়াতসমূহে ইঙ্গিত রয়েছে :
>“বলুন আল্লাহ, এরপর তাদেরকে তাদের অসার চিন্তায় খেলা করতে দিন”।
আল্লাহ্ আরো বলেন
>“নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, এরপর তাতে দৃঢ় থাকে”। কালেমায়ে তাইয়েবা “লাইলাহা ইল্লাল্লাহ” - এর উদ্দেশ্যই তাই। অর্থাৎ কোন মাবুদ ও মাহবুব আল্লাহ ছাড়া নেই। বলা বাহুল্য, মাহবুবই মাবুদ হয়ে থাকে। তাই আল্লাহ বলেন—
>“দেখতো, যে মাবুদ করে নিয়েছে তার খেয়ালখুশীকে”!
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয় আলিহী ওয়া-সাল্লাম) বলেন –
>“সর্বনিকৃষ্ট মাবুদ, যার পূজা করা হয় পৃথিবীতে, সে হচ্ছে খেয়ালখুশী”।
অন্য এক হাদীসে আছে -
>“যে খাঁটি মনে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্' বলে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। এখানে খাঁটি অর্থ অন্তরকে আল্লাহর জন্যে খাঁটি করা, যাতে অপরের অংশীদারিত্ব না থাকে এবং আল্লাহ তা'আলাই অন্তরের মাবুদ, মাহবুব ও মকসুদ হওয়া। যার এই অবস্থা, দুনিয়া তার জন্যে জেলখানা। কারণ, মাহবুবের সাথে সাক্ষাতে দুনিয়া একটি বাধা। মৃত্যু তার জন্যে জেল থেকে মুক্তি পাওয়া এবং মাহবুবের কাছে যাওয়া। যার মাহবুব এক সত্তা এবং সে জেলখানায় থেকে দীর্ঘ প্রতীক্ষা করে, সে যদি জেল থেকে মুক্তি পেয়ে মাহবুবের সাথে মিলিত হয় এবং অনন্তকাল পর্যন্ত অনাবিল সুখে কাল কাটায়, তবে সে কতই না সৌভাগ্যশালী।
(২) মহব্বত শক্তিশালী হওয়ার আরেক উপায় হচ্ছে খোদায়ী মারেফত শক্তিশালী হওয়া ও অন্তরে তা বিস্তৃত হওয়া। দুনিয়ার যাবতীয় সম্পর্ক থেকে অন্তর পাক হওয়ার পর তা অর্জিত হয়। যেমন, শস্যক্ষেত্রকে সকল আগাছা থেকে সাফ করার পর তাতে বীজ বপন করা হয়। অন্তরকে এভাবে পাক করার পর তাতে মহব্বত ও মারেফতের বৃক্ষ উৎপন্ন করা হয়। এ বৃক্ষের নাম কালেমায়ে তাইয়েবা, যার দৃষ্টান্ত আল্লাহ পাক বর্ণনা করেছেন—
আল্লাহ কালেমায়ে তাইয়েবার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন, যা পবিত্র বৃক্ষের ন্যায়, যার মূল শিকড় মযবুত এবং শাখা আকাশে বিস্তৃত। নিম্নোক্ত আয়াতে এদিকেই ইশারা করা হয়েছে :
>“তারই দিকে উত্থিত হয় পবিত্র কালাম ও সৎকর্ম”।
এখানে পবিত্র কালামের অর্থ মারেফাতের বাহক ও খাদেমের মত। অন্তরকে পবিত্র করে তার পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখাই যাবতীয় সৎকর্মের উদ্দেশ্য। এভাবে মারেফত অর্জিত হলে তার পেছনে মহব্বত অবশ্যই থাকবে। মহব্বত থাকলে আনন্দও থাকবে।
———————
পরবর্তী পর্ব –
মহব্বত ও মারেফতে মানুষের বিভিন্ন অবস্থা

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন