বৃহস্পতিবার, ১৫ জুন, ২০২৩

অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৫) মানব অন্তরের বৈশিষ্ট্য – ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৫) 

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মানব অন্তরের বৈশিষ্ট্য

প্রকাশ থাকে যে, আমরা যে সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও ইন্দ্রিয়  সম্পর্কে বর্ণনা করেছি, সেগুলো আল্লাহ তাআলা সকল জন্তু-জানোয়ারকেও দান করেছেন। উদাহরণতঃ কাম-ক্রোধ এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ইন্দ্রিয় সকল প্রাণীরই অর্জিত আছে। সেমতে ছাগল যখন ব্যাঘকে দেখে ফেলে, তখন তার শত্রুতা মনে মনে আঁচ করে তৎক্ষণাৎ পলায়ন করে। এ থেকে জানা যায়, পশুর মধ্যেও অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি বিদ্যমান আছে। এখন আমরা এমন বিষয় বর্ণনা করব যা একান্তভাবে মানুষের মধ্যে পাওয়া যায়, যার কারণে সে সৃষ্টির সেরা এবং খোদায়ী নৈকট্য লাভের যোগ্য হয়েছে। এরূপ বিষয় দুটি -একটি জ্ঞান ও অপরটি ইচ্ছা। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক বিষয়াদির জ্ঞান না ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সমূহের গণ্ডির মধ্যে দাখিল, না জন্তু-জানোয়ার এতে মানুষের সাথে শরীক। বরং সামগ্রিক জাজ্বল্যমান বিষয় সমূহের জ্ঞানও মানুষের বৈশিষ্ট্য। উদাহরণতঃ মানুষ এই জ্ঞান রাখে যে, এক ব্যক্তির একই সময়ে একই অবস্থায় দু’স্থানে বিদ্যমান হওয়া অসম্ভব। ইচ্ছার মানে, মানুষ যখন জ্ঞান দ্বারা কোন কাজের পরিণতি চিন্তা করে এবং তাতে কল্যাণ দেখে, তখন তার মনে সেই কল্যাণ হাসিল করার একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়। একেই বলা হয়েছে ইচ্ছা। এটা কামনার ইচ্ছার বিপরীত। উদাহরণতঃ কামনা ইনজেকশনের প্রতি অনীহা পোষণ করে, কিন্তু জ্ঞান তার ইচ্ছা করে এবং এর জন্যে টাকা-পয়সা পর্যন্ত ব্যয় করে। যদি আল্লাহ্ তাআলা জ্ঞান সৃষ্টি করতেন এবং ইচ্ছাকে সৃষ্টি না করতেন, তবে জ্ঞানের সিদ্ধান্ত নিষ্ফল হয়ে যেত। মোটকথা, মানুষের অন্তরস্থিত জ্ঞান ও ইচ্ছা পশুকুলের মধ্যে নেই; বরং প্রথমে শিশুদের মধ্যেও থাকে না। কেননা, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাদের মধ্যে ইচ্ছার উদ্ভব হয়, কিন্তু কাম, ক্রোধ, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ইন্দ্রিয় সমস্তই তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকে। হাঁ, শিশুর মধ্যে এসব জ্ঞান অর্জিত হওয়ার দুটি স্তর আছে। প্রথম স্তর হচ্ছে তার অন্তরে জাজ্বল্যমান বিষয়সমূহের জ্ঞান এসে যাওয়া। এই স্তরে প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়সমূহের জ্ঞান তার মধ্যে অর্জিত হবে না, কিন্তু সে তা অর্জিত হওয়ার কাছাকাছি চলে যাবে। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে কর্ম, অভিজ্ঞতা ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জিত হওয়া জ্ঞানের স্তরটি মনুষ্যত্বের সর্বোচ্চ শিখর, কিন্তু এতে অসংখ্য ও অশেষ ধাপ রয়েছে এবং জ্ঞানের আধিক্য ও স্বল্পতার দিক দিয়ে মানুষে মানুষে অনেক তফাৎ হয়। এছাড়া জ্ঞান অর্জনের পন্থার মধ্যেও তফাৎ হয়। কতক অন্তর প্রথম ধাপেই মুকাশাফা ও ইলহাম দ্বারা এ জ্ঞান অর্জন করে নেয়। কতক অন্তর অধ্যবসায় ও শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে অর্জন করে। এতেও অনেকে মেধাবী এবং কতক স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন হয়। এক্ষেত্রে নবী, আলেম, ওলী ও বিজ্ঞজনের স্তর বিভিন্নরূপ এবং উন্নতির কোন শেষ সীমা নেই। কেননা, জ্ঞাতব্য বিষয়সমূহের কোন সীমা-পরিসীমা নেই। এতে সেই পয়গম্বরের মর্যাদা সর্বোচ্চ, যার সামনে সকল স্বরূপ কেবল মুকাশাফা ও ইলহামের মাধ্যমে উদঘাটিত হয়ে যায়। এই সৌভাগ্যের বদৌলতই বান্দা আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য লাভ করে এবং এসব স্তরে উন্নতি করাই সাধকদের মনযিল। এসব মনযিলের কোন শেষ নেই ; বরং প্রত্যেক সাধক যে মনযিলে উপনীত হয়, তার সেই মনযিল ও নীচের মনযিলের অবস্থা জানা থাকে, কিন্তু সম্মুখের মনযিল সম্পর্কে তার কিছুই জানা থাকে না। তবে মাঝে মাঝে গায়েবের প্রতি বিশ্বাসস্বরূপ সেসব মনযিলকে সত্য বলে বিশ্বাস করে; যেমন আমরা নবুওয়ত ও নবীর প্রতি বিশ্বাস রাখি এবং তাঁদের অস্তিত্বকে সত্য বলে জানি; কিন্তু নবুওয়তের স্বরূপ নবী ব্যতীত কেউ জানে না। 

আল্লাহ্ তাআলার রহমত সকলের জন্যে ব্যাপক। এতে কারও সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে কৃপণতা নেই, কিন্তু এই রহমত সেসব অন্তরে প্রকাশ পায়, যারা রহমতের অপেক্ষায় থাকে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন  : তোমাদের জীবনের দিনগুলোতে আল্লাহ্ তাআলার রহমতের অনেক প্রবাহ আসে। অতএব তোমরা এর অপেক্ষায় থাক। রহমতের অপেক্ষায় থাকার মানে, অন্তরকে পাক সাফ রাখবে এবং দুশ্চরিত্রতা ও মালিন্য থেকে বেঁচে থাকবে। এই দুশ্চরিত্রতা ও মলিনতার কারণেই কতক অন্তরে খোদায়ী নূর অনুপস্থিত থাকে। নতুবা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কোন কার্পণ্য ও বাধা থাকে না। কেননা, অন্তরের অবস্থা পাত্রের মত। পাত্রে যতক্ষণ পানি ভর্তি থাকে, তাতে বায়ু প্রবেশ করতে পারে না। অনুরূপভাবে যখন অন্তর গায়রুল্লাহ্র সাথে ব্যাপৃত থাকে, তখন তাতে খোদায়ী মারেফত প্রবেশ করে না! নিম্নোক্ত হাদীসে এ বিষয়ের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে  : “যদি শয়তান আদম সন্তানদের অন্তরের চারপাশে ঘুরাফেরা না করত, তবে তারা আকাশের ফেরেশতা ও স্বর্গলোক দেখতে পেত”। সার কথা, মানুষের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান হচ্ছে আল্লাহর সত্তা, তাঁর গুণাবলী ও কর্মের জ্ঞান। এতেই মানুষের পূর্ণতা এবং এই পূর্ণতার কারণে সৌভাগ্য ও খোদায়ী দরবারে উপস্থিতি অর্জিত হয়। সুতরাং যেব্যক্তি তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে এমনভাবে কাজে নিয়োজিত করে, যদ্দ্বারা তার জ্ঞানার্জনে সহায়তা হয়, সে ফেরেশতাদের অনুরূপ এবং তাদের মধ্যে গণ্য হওয়ার যোগ্য। যে সকল মহিলা হযরত ইউসুফ (আঃ)-কে দেখতে এসেছিল, আল্লাহ তাআলা কোরআনে তাদের এই উক্তি উদ্ধৃত করেছেন  :  “সে তো মানুষ নয় ! সে তো একজন সম্ভ্রান্ত ফেরেশতা!” পক্ষান্তরে যেব্যক্তি তার সমস্ত সাহসিকতা দৈহিক আরাম-আয়েশে ব্যয় করে এবং চতুষ্পদ জন্তুদের মত খেয়ে যায়, সে পশুর স্তরে দাখিল হয়ে নিছক আনাড়ি বলদ হবে, না হয় শূকরের ন্যায় লোভী হবে। অথবা কুকুরের ন্যায় ঘেউ ঘেউকারী হবে। অথবা উটের ন্যায় বিদ্বেষকারী হবে। অথবা চিতাবাঘের ন্যায় দাম্ভিক হবে। অথবা শৃগালের ন্যায় ধূর্ত হবে। এই সবগুলো বিষয় কোন একজনের মধ্যে বিদ্যমান থাকলে সে হবে পুরাপুরি বিতাড়িত শয়তান। মানুষের সৌভাগ্য পূর্ণরূপে এ বিষয়ের মধ্যেই নিহিত যে, সে আল্লাহর দীদারকে নিজের লক্ষ্য স্থির করবে, পরকালকে আবাসস্থল মনে করবে, দুনিয়াকে মনযিল, দেহকে যানবাহন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে খাদেম জ্ঞান করবে এবং বোধশক্তিকে বাদশাহ সাব্যস্ত করবে, যার রাজধানী হচ্ছে অন্তর মস্তিষ্কের অগ্রভাগে অবস্থিত কল্পনাশক্তি হচ্ছে সেই বাদশাহের দূত। কেননা, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সমূহের সংবাদ তার কাছে একত্রিত হয়। মস্তিষ্কের পশ্চাদভাগে অবস্থিত স্মরণশক্তি হচ্ছে তার কোষাধ্যক্য, জিহ্বা ভাষ্যকার, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ লেখক এবং পঞ্চইন্দ্রিয় তার গুপ্তচর। পঞ্চইন্দ্রিয় নিজ নিজ এলাকার সংবাদ একত্রিত করে কল্পনাশক্তির কাছে পৌঁছে দেয়। সে এগুলো কোষাধ্যক্ষ অর্থাৎ, স্মরণশক্তির কাছে সোপর্দ করে। এর পর কোষাধ্যক্ষ বাদশাহ্ অর্থাৎ, বোধশক্তির দরবারে পেশ করে। বাদশাহ রাজত্ব পরিচালনার জন্যে যে সকল সংবাদ জরুরী, সেগুলো গ্রহণ করে নেয়। যে মানুষ নিজেকে এভাবে সক্রিয় রাখে, সে ভাগ্যবান, সফলকাম এবং খোদায়ী নেয়ামতের শোকরকারী হয়। পক্ষান্তরে যে এগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে রাখে, সে হতভাগা, লাঞ্ছিত ও অকৃতজ্ঞ সাব্যস্ত হয়ে পরিণামে আযাব, শাস্তি ও পরকালীন দুর্ভোগের পাত্র হয়ে যায় (নাউযু বিল্লাহ)। আমাদের বর্ণিত এ দৃষ্টান্তের প্রতি হযরত কাব ইবনে আহবার ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন : আমি হযরত আয়েশা (রাঃ) -এর খেদমতে হাযির হয়ে আরজ করলাম, মানুষের মধ্যে চক্ষু পথপ্রদর্শক, কান রক্ষক, জিহ্বা ভাষ্যকার, হাত লশকরের দু’বাহু, পা দূত এবং অন্তর বাদশাহ। সুতরাং বাদশাহ ভাল হলে তার অনুচরবর্গ ভাল হবে। হযরত আয়েশা (রঃ) বললেন : আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকেও এরূপ বলতে শুনেছি। হযরত আলী (রঃ) অন্তরের দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে বলেন  : পৃথিবীতে আল্লাহর পাত্র হচ্ছে অন্তর। সেই অন্তর আল্লাহর অধিক প্রিয়, যে নরম, স্বচ্ছ ও শক্ত। অতএব তোমরা মুসলমান ভাইদের সাথে নরম, বিশ্বাসে স্বচ্ছ এবং ধর্মের ব্যাপারে কঠোর হবে। এতে এই আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে : “তারা কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং পরস্পরে সংবেদনশীল”।  হযরত উবাই ইবনে কা'ব  (মাসালা নূরিহী কামিশকাতুন ফিহা মিসবাহ)

আয়াতের তফসীরে বলেন, এটা মুমিনের নূর ও তার অন্তরের দৃষ্টান্ত। তিনি— (আও কাজুলুমা-তিন ফী বাহরিল লুজ্জিইয়িইঁ) এই আয়াতের তফসীরে বলেন, এটা মোনাফেকের অন্তরের দৃষ্টান্ত। যায়েদ ইবনে আসলাম কোরআনে উল্লিখিত “লওহে মাহফুয” ( সংরক্ষিত ফলক ) সম্পর্কে বলেন, এটা মুমিনের অন্তর। হযরত সহল তস্তরী (রহঃ) বলেন  : অন্তর ও বক্ষের উপমা হচ্ছে আরশ ও কুরসী। 



পরবর্তী পর্ব– অন্তরের গুণাবলী ও উদাহরণ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...