বৃহস্পতিবার, ১৫ জুন, ২০২৩

অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৬) অন্তরের গুণাবলী ও উদাহরণ



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ৬) 

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


অন্তরের গুণাবলী ও উদাহরণ : 

জানা উচিত, মানব সৃষ্টি ও গঠনে চারটি মিশ্রণ আছে, গযে কারণে তার মধ্যে হিংস্র, শয়তানী, পৈশাচিক ও স্বর্গীয় —

এই চার প্রকার গুণের সমাবেশ ঘটেছে। মানুষের গঠনে ক্রোধ আছে বিধায় সে হিংস্র প্রাণীসুলভ কাজ-কর্ম করে এবং শত্রুতা, বিদ্বেষ, হাতাহাতি ও গালিগালাজ করে। কামভাবের মিশ্রণ থাকার কারণে সে পশুসুলভ কর্ম অর্থাৎ, লোভ, লালসা, হিংসা ইত্যাদিতে লিপ্ত হয়। মানুষ স্বয়ং স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে খোদায়ী আদেশ; যেমন আল্লাহ বলেন − “বলুন, রূহ্ আমার পালনকর্তার আদেশের অংশ”। এ কারণে সে প্রভুত্ব দাবী করে। এছাড়া সে স্বাতন্ত্র্য, প্রভুত্ব, উপাস্যতা ও নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি বিষয় পছন্দ করে। সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে। তাকে জ্ঞানী বলা হলে সে পুলকিত হয় এবং মূর্খ বলা হলে নাখোশ হয়। বলাবাহুল্য, সকল বিষয়ের স্বরূপ অবগত হওয়া এবং সকলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করা পালনকর্তার অন্যতম গুণাবলী। মানুষের মধ্যে শয়তানী গুণাবলীও রয়েছে, যদ্দরুন সে দুষ্ট বলে কথিত হয়। সে নিজের মতলব ছলচাতুরী, প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার মাধ্যমে হাসিল করে এবং উপকারের প্রতিদানে অপকার করে। এগুলো শয়তানের স্বভাব। মানুষের উপরোক্ত চারটি মিশ্রণ তার অন্তরে সমাবেশিত আছে। সুতরাং তার মজ্জার মধ্যে যেন শূকর, কুকুর, শয়তান ও প্রজ্ঞাশীল সত্তা বিদ্যমান রয়েছে। শূকর হচ্ছে তার কামস্বভাব। কেননা, শূকর তার বর্ণ ও আকৃতির কারণে নিন্দনীয় নয়; বরং অতিরিক্ত লোভ ও অধিক আহারের কারণে সে নিন্দার পাত্র। কুকুর হচ্ছে মানুষের ক্রোধ। কেননা, কুকুর যে দংশন করে, তা তার আকার-আকৃতির কারণে নয়; বরং তার মধ্যে হিংস্রতা ও শত্রুতা নিহিত থাকার কারণে। এমনিভাবে মানুষের অভ্যন্তরেও হিংস্র প্রাণীর মত কষ্ট প্রদান ও ক্রোধ এবং শূকরের মত লোভ-লালসা মওজুদ রয়েছে। সুতরাং শূকর তার লোভ-লালসার কারণে অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজের প্রতি আহ্বান করে এবং হিংস্র প্রাণী ক্রোধের কারণে যুলুম ও নিপীড়নের দিকে আহ্বান করে। অপর দিকে শয়তান তাদের লোভ ও ক্রোধকে উত্তেজিত্ব করতে থাকে। সে তাদের মূর্খতাকে তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করতে থাকে। মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি যা প্রজ্ঞাবান সত্তার মত, তাকে শয়তানের কলাকৌশল প্রতিহত করার আদেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং সে যদি তাই করে, তবে পরিস্থিতি অনেকটা ঠিক থাকবে। দেহের রাজত্বে ন্যায়বিচার প্রকাশ পাবে এবং সবকিছু সঠিক পথে পরিচালিত হবে। পক্ষান্তরে যদি প্রজ্ঞাবান সত্তা অর্থাৎ, জ্ঞান-বুদ্ধি এদেরকে পরাভূত করতে সক্ষম না হয়, তবে এরা তাকে দাবিয়ে রাখে এবং তার কাছ থেকে খেদমত গ্রহণ করে। তখন তাকে কুকুরকে সন্তুষ্ট রাখার এবং শূকরের পেট ভরার কৌশল খুঁজতে হয়। সে সর্বক্ষণ কুকুর ও শূকরের গোলাম থেকে যায়। অধিকাংশ লোকের অবস্থা তাই। তাদের বেশীরভাগ চেষ্টা পেট ও কামনা-বাসনার সেবায় ব্যয়িত হয়। আশ্চর্যের বিষয়, তারা মূর্তিপূজারীদেরকে ঘৃণা করে এবং মূর্তিপূজার নিন্দায় সোচ্চার থাকে, কিন্তু যদি স্বয়ং তাদের অবস্থার উপর থেকে যবনিকা সরিয়ে দেয়া এবং কাশফওয়ালাদের ন্যায় তাদের অবস্থাকে মূর্ত করে জাগ্রত অবস্থায় অথবা স্বপ্নে দেখানো হয়, তবে দেখা যাবে, তারা কখনও শূকরের সামনে সেজদা করেছে এবং কখনও তার আদেশ ও ইঙ্গিতের জন্যে অপেক্ষা করেছে । অথবা দেখা যাবে, তারা এক ক্ষেপা কুকুরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার এবাদত ও পূজা-অর্চনা করছে। এতে করে তারা আপন শয়তানকে সন্তুষ্ট করার জন্য সচেষ্ট থাকে। কেননা, শয়তান শূকর ও কুকুরকে মানুষের কাছ থেকে খেদমত নেয়ার জন্যে প্ররোচিত করে। ফলে তারা আসলে শূকর ও কুকুরের পূজা করে না; বরং শয়তানের আরাধনা করে ।


 মোট কথা, মানুষ যদি তার চলাফেরা, নিশ্চলতা, কথাবার্তা, চুপ থাকা এবং উঠাবসার প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করে, তবে দেখা যাবে, সমস্ত দিন সে কেবল এসব বস্তুরই এবাদতে সচেষ্ট থাকে। এটা চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্যায়। কেননা, এর ফলে সে মালিককে চাকর, প্রভুকে দাস এবং প্রবলকে দুর্বল সাব্যস্ত করে। মালিক ও প্রভু হওয়ার যোগ্য ছিল জ্ঞানবুদ্ধি, যাকে মানুষ কামনারূপী শূকর, ক্রোধরূপী কুকুর ও শয়তানের অনুগত সেবাদাসে পরিণত করে দেয়। এই আনুগত্যের ফল দাঁড়ায়, তার অন্তরে বিভিন্ন মন্দ স্বভাবের মরিচা পড়তে থাকে এবং পরিণামে সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। কামনারূপী শূকরের আনুগত্যের ফলে যে সকল মন্দ স্বভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, সেগুলো হচ্ছে নির্লজ্জতা, দুশ্চরিত্রতা, ব্যয়বহুলতা, কৃপণতা, লোভ-লালসা, হিংসা-দ্বেষ ইত্যাদি। আর ক্রোধরূপী কুকুরের আনুগত্য থেকে উদ্ভূত মন্দ স্বভাবগুলো হচ্ছে আত্মপ্রশংসা, আত্মম্ভরিতা, অহংকার, বিদ্রূপ, অপরকে হেয় জ্ঞান করা, অনিষ্ট সাধন করা ইত্যাদি । পক্ষান্তরে ক্রোধ ও কামনাপ্রীতির ফলে শয়তানের আনুগত্য থেকে উদ্ভূত মন্দ স্বভাবগুলো হচ্ছে, প্রতারণা, ধূর্তামি, ছলচাতুরী, প্রবঞ্চনা, আত্মসাৎকরণ, অশ্লীল কথন ইত্যাদি । অপরপক্ষে যদি মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি প্রবল হয় এবং কামনারূপী শূকরকে প্রতিহত করা হয়, তবে অন্তরে অনেক সদগুণ জন্মলাভ করে । যেমন- জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিশ্বাস, বস্তুনিচয়ের স্বরূপ সম্পর্কিত মারেফত, জ্ঞান-গরিমায় সকলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি। এছাড়া এমতাবস্থায় কামনা ও ক্রোধের পূজা করতে হয় না। কামনারূপী শূকরকে প্রতিহত করলে আরও যেসকল সৎস্বভাব উৎপন্ন হয়, সেগুলো হচ্ছে, সাধুতা, অল্পে তুষ্টি, স্থিরতা, সংসারনির্লিপ্ততা, খোদাভীতি, প্রফুল্লতা, লজ্জাশীলতা ইত্যাদি । অনুরূপভাবে ক্রোধশক্তিকে নত ও পরাভূত রাখলে এবং প্রয়োজনীয় সীমায় আনয়ন করলে বীরত্ব, দয়া, আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, স্থৈর্য, ধৈর্য, ক্ষমা, দৃঢ়তা, সাহসিকতা ইত্যাদি সৎস্বভাবের বিকাশ ঘটে । সুতরাং অন্তরকে আয়না মনে করা উচিত, যার মধ্যে এসব বিষয়ের প্রভাব একের পর এক প্রতিফলিত হতে থাকে, কিন্তু উপরোক্ত সৎস্বভাবসমূহের প্রভাবে অন্তররূপী আয়নার চমক ও জ্যোতি অধিকতর বৃদ্ধি পায় । অবশেষে তাতে আল্লাহ্’র দ্যুতি বিকশিত হয় এবং প্রার্থিত ধর্মীয় বিষয়াদির স্বরূপ উদঘাটিত হয়ে যায় । এই প্রকার অন্তরের দিকে ইঙ্গিত করেই হাদীসে এরশাদ হয়েছে - “যখন আল্লাহ্ তাআলা কোন বান্দার কল্যাণ সাধন করতে চান, তখন তার জন্যে একটি উপদেশদাতা অন্তর নির্দিষ্ট করে দেন”। এরূপ অন্তরেই আল্লাহ্ তাআলার যিকির অবস্থান গ্রহণ করে। আল্লাহ্ বলেন : “শুনে রাখ, আল্লাহ্ যিকির দ্বারাই অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। পক্ষান্তরে যে সকল নিন্দনীয় প্রভাব অন্তরের উপর ছায়াপাত করে, সেগুলো কাল ধোঁয়ার মত হয়ে থাকে। এগুলোর কারণে অন্তররূপী আয়না ক্রমশ কালবর্ণ ধারণ করতে থাকে, অবশেষে আল্লাহ্ থেকে আড়াল হয়ে যায়। কোরআন মজীদে এ অবস্থাকেই  ‘মোহর মারা ও ‘মরিচা পড়া’ বলা হয়েছে। এক আয়াতে বলা হয়েছে , “বরং তারা যা উপার্জন করত, তা তাদের অন্তরে মরিচা ধরেছে”।  অন্য আয়াতে আছে - “আমি ইচ্ছা করলে তাদেরকে তাদের গোনাহের কারণে পাকড়াও করব এবং তাদের অন্তরের উপর মোহর এঁটে দেব, ফলে তারা শ্রবণ করবে না”!  মোটকথা, অধিক গোনাহের কারণে যখন অন্তরের উপর মোহর লেগে যায়, তখন অন্তর সত্যোপলব্ধির ব্যাপারে অন্ধ হয়ে যায়। সে আখেরাতের বিষয়াদি হালকা ও দুনিয়ার কাজ গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং এতেই সর্বশক্তি ব্যয় করে। সে যখন আখেরাতের অবস্থা শ্রবণ করে, তখন এক কানে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দেয়। এই উপদেশ তার মধ্যে স্থান করে না এবং তওবার প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি করে না। এরূপ ব্যক্তিদের অবস্থা হচ্ছে –‘তারা আখেরাত থেকে নিরাশ হয়ে গেছে, যেমন কবরবাসীদের বিষয়ে কাফেররা নিরাশ হয়ে গেছে।' কোরআন ও হাদীসে বর্ণিত অন্তর কাল হওয়ার অর্থও তাই। মায়মুন ইবনে মহরান বলেন  : বান্দা যখন গোনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কাল দাগ পড়ে। তওবা করলে এ দাগ মিটে যায়। এর পর পুনরায় গোনাহ্ করলে এই দাগ আরও বেড়ে যায় এবং বাড়তে বাড়তে অবশেষে সমগ্র অন্তর কাল হয়ে যায়। এরই অপর নাম মরিচা। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন, “মুমিনের অন্তর পরিষ্কার। তাতে প্রদীপ জ্বলে। আর কাফেরের অন্তর কাল ও অধোমুখী”। এ থেকে জানা গেল, আল্লাহ্ তাআলার আনুগত্য ও কামপ্রবৃত্তির বিরোধিতা অন্তরকে ঔজ্জ্বল্য দান করে এবং আল্লাহর নাফরমানীর কারণে অন্তর কাল হয়ে যায়। সুতরাং যে গোনাহ করে, তার অন্তর কাল হয়ে যায়। যদি কেউ গোনাহের পরে সৎকাজ করে পূর্বের প্রভাব মিটিয়ে দিতে চায়, তবে কাল দাগ মিটে গেলেও নূরের মধ্যে কিছু ত্রুটি থেকে যায় ! যেমন— আয়নায় ফুঁ মেরে পরিষ্কার করার পর আবার ফুঁ মেরে পরিষ্কার করলে কিছু না কিছু পঙ্কিলতা থেকেই যায় ৷ নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন  : “অন্তর চার প্রকার । (১) পরিষ্কার অন্তর। তাতে প্রদীপ জ্বলে। এটা মুমিনের অন্তর। (২) কাল অধোমুখী অন্তর। এটা কাফেরের অন্তর। (৩) গেলাফে আবৃত মুখ বাঁধা অন্তর। এটা মোনাফেকের অন্তর। (৪) এমন অন্তর, যাতে ঈমান ও নেফাক উভয়টি রয়েছে। এতে ঈমানের প্রভাব এমন, যেমন সবুজ ঘাসকে পবিত্র পানি আরও সতেজ করে তোলে। আর নেফাকের প্রভাব এমন, যেমন পুঁজ ক্ষতস্থানকে আরও বিস্তৃত করে দেয়। অতএব ঈমান ও নেফাকের মধ্যে যেটি প্রবল হবে, অন্তরের অবস্থা তদনুরূপ হয়ে যাবে। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ “নিশ্চয় যারা খোদাভীরু, শয়তানের কল্পনা স্পর্শ করতেই তারা  আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তৎক্ষণাৎ চক্ষুষ্মান হয়ে যায়”। এ আয়াত ব্যক্ত করে যে, আল্লাহর স্মরণ দ্বারা অন্তরের ঔজ্জ্বল্য অর্জিত হয়। আর যারা খোদাভীরু, তারাই আল্লাহকে স্মরণ করে। অতএব জানা গেল, খোদাভীতি স্মরণ তথা যিকিরের ফটক, যিকির কাশফের দরজা এবং কাশফ হচ্ছে বৃহৎ নূর অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার দীদারের দ্বার । 


পরবর্তী পর্ব – 

জ্ঞানার্জনের দিক দিয়ে অন্তরের দৃষ্টান্ত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...