উল্লেখ্য, তওবার অর্থ হল গোনাহ পরিত্যাগ করা। কোন কিছু পরিত্যাগ করা তখনই সম্ভব, যখন তাকে জেনে নেয়া যায়। তওবা ওয়াজিব বিধায় গোনাহসমূহ চেনাও ওয়াজিব। যে কাজ করলে আল্লাহ তা'আলার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ হয়, তাই গোনাহ। এর বিস্তারিত বিবরণ দিতে গেলে খোদায়ী বিধি-বিধানাবলী শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করতে হবে। অথচ আমাদের উদ্দেশ্য তা নয়। তাই নিম্নে সংক্ষেপে গোনাহসমূহের প্রকারভেদ তিনটি শিরোনামে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে।
গুনাহের প্রথম বিভাজন—
মানুষের স্বভাব ও চরিত্র অনেক। কিন্তু যেগুলো দ্বারা গোনাহ অস্তিত্ব লাভ করে, সেগুলো চার প্রকারে সীমিত-
প্রতিপালকসুলভ স্বভাব, শয়তানসুলভ স্বভাব, পশুসুলভ স্বভাব এবং হিংস্র স্বভাব—
(১)-প্রতিপালকসুলভ স্বভাৰ অহংকার, গর্ব, স্বৈরাচার, প্রশংসাপ্রীতি, সম্মান ও বিভপ্রীতি ইত্যাদি জন্ম দেয়। এ স্বভাব থেকে এমন সব কবীরা গোনাহ উৎপন্ন হয়, যেগুলোকে মানুষ গোনাহ গণ্য করে না। অথচ সেগুলো অত্যন্ত মারাত্মক ও অধিকাংশ গোনাহের মূল হয়ে থাকে।
(২)-শয়তানসুলভ স্বভাব থেকে হিংসা, অবাধ্যতা, কূটকৌশল, ষড়যন্ত্র, ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি বিষয় গজিয়ে উঠে। নিফাক, বেদআত ও পথভ্রষ্টতাও এর অন্তর্ভুক্ত।
(৩)-পশুসুলভ স্বভাব থেকে যেসব বিষয় অংকুরিত হয়, সেগুলো হচ্ছে তীব্র লোভ ও লালসা, উদর ও যৌনাঙ্গের স্পৃহা, ব্যভিচার ও সমকামিতা, চুরি, এতীমের মাল আত্মসাৎ করা, হারাম অর্থ সঞ্চয় ইত্যাদি।
(৪)-হিংস্র স্বভাবের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে ক্রোধ, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, মারপিট, গালিগালাজ, হত্যা ইত্যাদি।
মানুষের মধ্যে এ চারটি স্বভাব জন্মগতভাবে একের পর এক আগমন করে। সর্বপ্রথম পশুসুলভ স্বভাব প্রবল হয়। এরপর হিংস্রস্বভাব প্রকাশ পায়। এ স্বভাবদ্বয় একত্রিত হয়ে বুদ্ধি-বিবেককে প্রতারিত করে এবং এ থেকেই শয়তানী স্বভাব জোরদার হয়। সবশেষে প্রতিপালকসুলভ স্বভাব অর্থাৎ, গর্ব, অহংকার, ইযযত ও বড়ত্বের স্পৃহা এবং সকলের উপর সরদারী করার ইচ্ছা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। মোটকথা, এই স্বভাব চতুষ্টয়ই হচ্ছে গোনাহ ও নাফরমানীর উৎস। এরপর এগুলো থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গোনাহ ছড়িয়ে পড়ে। তন্মধ্যে কিছু গোনাহ বিশেষভাবে অন্তরের সাথে সম্পর্কযুক্ত; যেমন কুফর, নিফাক, মন্দ-বেদআত ইত্যাদি। কিছু গোনাহ চক্ষু ও কর্ণের সাথে, কিছু উদর ও যৌনাঙ্গের সাথে এবং কিছু হাত ও পায়ের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো সব সুস্পষ্ট বিধায় বিশদ বর্ণনার প্রয়োজন নেই।
গুনাহের দ্বিতীয় বিভাজন
গোনাহ দু'প্রকার।
(ক) যা আল্লাহ তা'আলা ও মানুষের মধ্যে হয়ে থাকে; যেমন নামায, রোযা ও অন্যান্য বিশেষ ফরযসমূহ পালন না করা।
(খ) যা মানুষের পারস্পরিক হকের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে থাকে। যেমন যাকাত না দেয়া, কাউকে হত্যা করা, কারও ধন-সম্পদ ছিনতাই করা, গালি দেয়া ইত্যাদি।
যে সকল গোনাহ মানুষের পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত, সেগুলো থেকে অব্যাহতি পাওয়া খুবই কঠিন। পক্ষান্তরে যে সকল গোনাহ আল্লাহ তা'আলা ও মানুষের সাথে সম্পৃক্ত, সেগুলোর মধ্যে ক্ষমা পাওয়ার আশা প্রবল- যদি তা শিরক না হয়।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে :
>“আমলনামা তিন প্রকার। এক প্রকার ক্ষমা করা হবে, এক প্রকার ক্ষমা করা হবে না এবং এক প্রকার ছেড়ে দেয়া হবে না।"
প্রথম প্রকার আমলনামা যা ক্ষমা করা হবে, সেসব গোনাহ, যা আল্লাহ তা'আলা ও মানুষের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
দ্বিতীয় প্রকার আমলনামার অর্থ শিরক। এটা ক্ষমা করা হবে না।
তৃতীয় প্রকার আমলনামার মানে মানুষের পারস্পরিক গোনাহ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষমা না করা পর্যন্ত এসব গোনাহের চুলচেরা হিসাব হবে।
গুনাহের তৃতীয় বিভাজন
গোনাহের তৃতীয় বিভাজন এই যে, গোনাহ হয় সগীরা হবে, না হয় কবীরা। এগুলোর সংজ্ঞা সম্পর্কে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন উক্তি বর্ণিত আছে।
কেউ কেউ বলেন : সগীরা বলতে কোন গোনাহ নেই; বরং যে বিষয়ে খোদায়ী আদেশের বিরুদ্ধাচরণ হবে, তা কবীরাই হবে। এই উক্তি অগ্রাহ্য। কেননা, সগীরা গোনাহের অস্তিত্ব কোরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
আল্লাহ তা'আলা বলেন :
>“যে বিষয়ে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়, তার মধ্য থেকে যদি কবীরাগুলো থেকে বেঁচে থাক, তবে আমি তোমাদের মন্দ কাজসমূহকে সরিয়ে দেব এবং তোমাদের সম্মানের স্থানে দাখিল করব”।
অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে-
>“তোমরা বেঁচে থাক কবীরা তথা বড় গোনাহ থেকে এবং নির্লজ্জতা থেকে ছোট ছোট মলিনতা বাদে”।
হাদীস শরীফে আছে-
>“পাঞ্জেগানা নামায এবং এক জুমআ অন্য জুমআ পর্যন্ত মধ্যবর্তী সকল গোনাহ দূর করে দেয়- যদি বড় গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করা হয়”।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আসের রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন :
>“কবীরা গোনাহ হচ্ছে আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতামাতার নাফরমানী করা, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া”।
কবিরা গুনাহের সংখ্যা
কবীরা গোনাহের সংখ্যা সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেঈগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) এর সংখ্যা চার এবং হযরত উমর (রাঃ) সাত বর্ণনা করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমরের মতে নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) যখন জানতে পারলেন যে, ইবনে উমর (রাঃ) কবীরা গোনাহের সংখ্যা সাত বলেন, তখন তিনি বললেন : সাত বলার চেয়ে সত্তর বলাই অধিক সঙ্গত।
হযরত ইবনে আব্বাস একথাও বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যা নিষিদ্ধ করেছেন তাই কবীরা।
কেউ কেউ বলেন : আল্লাহ তা'আলা যে গোনাহের কারণে দোযখের ওয়াদা করেছেন, তা কবীরা।
কারও কারও মতে যে গোনাহের কারণে দুনিয়াতে “হদ” অর্থাৎ , শাস্তি ওয়াজিব হয়, তা কবীরা।
কেউ কেউ বলেন, কবীরা গোনাহের সংখ্যা অজানা, যেমন শবে কদরের বিশেষ মুহূর্ত অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট।
হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ)-কে এর সংখ্যা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : সূরা নেসার শুরু থেকে (নিসা : ৩১) পর্যন্ত যতগুলো গোনাহ আল্লাহ তা'আলা নিষিদ্ধ করেছেন, সে সবগুলোই কবীরা।
আবূ তালেব মক্কী (রহঃ) বলেন : কবীরা গোনাহ সত্তরটি। হাদীস থেকে এবং হযরত ইবনে আব্বাস, ইবনে মসউদ ও ইবনে উমর (রঃ) প্রমুখের উক্তি থেকে এগুলো আমি সংগ্রহ করেছি।
তন্মধ্যে চারটি অন্তরে অর্থাৎ শিরক, গোনাহ উপর্যুপরি করে যাওয়া, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় না করা।
আর চারটি জিহ্বার সাথে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ- মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, সৎপুরুষকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া, অসত্যকে সত্য প্রতিপন্ন করার জন্যে মিথ্যা কসম খাওয়া এবং জাদু করা।
তিনটি উদর সম্পর্কিত―
মদ্য পান করা, এতীমের অর্থ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা এবং জেনেশুনে সুদ খাওয়া।
দুটি যৌনাঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ ব্যভিচার ও সমকামিতা। দু'টি হাতের সাথে সম্পর্কিত; অর্থাৎ হত্যা ও চুরি। একটি পায়ের সাথে সম্পর্কিত; অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা।
একটি সমস্ত দেহের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ, পিতামাতার নাফরমানী করা।
এই উক্তি যদিও কাছাকাছি; কিন্তু এতেও পূর্ণতা হয় না। কেননা, বাস্তবে কমবেশী হতে পারে। উদাহরণতঃ এ উক্তি অনুযায়ী সুদ খাওয়া ও এতীমের অর্থ আত্মসাৎ করা কবীরা গোনাহ। এটা ধন সম্পর্কিত গোনাহ।
প্রাণ সম্পর্কিত গোনাহ হত্যা লেখা হয়েছে। চক্ষু উৎপাটিত করা, হাত কাটা ইত্যাদি লেখা হয়নি। এমনিভাবে এতীমকে মারা ও তার অঙ্গ কর্তন করা নিঃসন্দেহে কবীরা গোনাহ।
এ ছাড়া হাদীসে একটি গালির পরিবর্তে দু’গালি দেয়া এবং মুসলমানের মানহানি করাকেও কবীরা গোনাহ বলা হয়েছে।
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী প্রমুখ সাহাবী বলেনঃ তোমরা এমন আমল কর, যা তোমাদের মতে চুলের় চেয়েও অধিক সূক্ষ্ম; কিন্তু আমরা রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহিমের ওয়াসাল্লাম)-এর আমলে এসব আমলকে কবীরা গোনাহ মনে করতাম।
কিন্তু এতগুলো উক্তি সত্ত্বেও কেউ যদি চুরি সম্পর্কে জানতে চায় যে, এটা কবীরা কি না, তবে কবীরার অর্থ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত না হওয়া পর্যন্ত এটা যথাযথরূপে জানা সম্ভবপর নয়। কেননা, কবীরা শব্দটি শাব্দিক দিক দিয়ে অস্পষ্ট। অভিধানে অথবা শরীয়তে এর কোন বিশেষ অর্থ নেই।
কবীরা ও সগীরা আপেক্ষিক বিষয়াদির অন্যতম। যা গোনাহ তা কতক গোনাহের তুলনায় বড় এবং কতক গোনাহের তুলনায় ছোট হতে পারে। অর্থাৎ, উপরের দিকে দেখলে ছোট এবং নিচের দিকে দেখলে বড় মনে হবে।
উদাহরণতঃ পর-নারীর সাথে শয়ন করা যিনার তুলনায় কম এবং কেবল চোখে দেখার তুলনায় বেশী গোনাহ। কিন্তু যেহেতু কোরআন মজীদে এবং হাদীস শরীফে কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার আদেশ রয়েছে, তাই কবীরা অর্থ জানা একান্ত জরুরী। নতুবা আদেশ পালিত হবে কিরূপে ?
অতএব, এ সম্পর্কে সুচিন্তিত বিষয় এই যে, শরীয়তে গোনাহ তিন প্রকার।
(এক) যার বড় হওয়া সকলেরই জানা। (দুই) যা ছোট গোনাহ বলে গণ্য। (তিন) যার সম্পর্কে শরীয়তের বিধান কিছুই জানা নেই। এরূপ সন্দিগ্ধ ও অস্পষ্ট গোনাহ জানার জন্যে কোন পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা পাওয়ার আশা করা বৃথা। কেননা, এটা তখনই সম্ভব হত, যখন রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এ সম্পর্কে বলে দিতেন যে, দশটি অথবা পাঁচটি গোনাহ কবীরা। এরপর স্পষ্টরূপে বর্ণনা করে দিতেন যে, এই এই দশটি অথবা এই এই পাঁচটি। কিন্তু বাস্তবে এরূপ হয়নি; বরং কতক রেওয়ায়েতে কবীরার সংখ্যা তিন এবং কতক রেওয়ায়েতে উল্লেখ করা হয়েছে সাত। এরপর আরও বর্ণিত আছে যে, এক গালির বিনিময়ে দু’গালি দেয়া অন্যতম কবীরা। অথচ এটা পূর্বোক্ত তিনের মধ্যেও অন্তর্ভুক্ত নয় এবং সাতের মধ্যেও নয়। এ থেকে জানা গেল যে, কবীরাকে কোন বিশেষ সংখ্যায় সীমিত করা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর উদ্দেশ্য ছিল না। অতএব, শরীয়ত প্রবর্তক নিজেই যখন কোন সংখ্যা নির্দিষ্ট করেননি, তখন অন্যারা তা গণনা করার আশা কিরূপে করতে পারে? সংখ্যা নির্দিষ্ট না করার কারণ সম্ভবত এই ছিল, যাতে মানুষ কবীরা গোনাহকে ভয় করতে থাকে এবং এই ভয়ের কারণে সগীরা গোনাহ থেকেও বেঁচে থাকে; যেমন শবে-কদরকে এ জন্যে অস্পষ্ট রাখা হয়েছে, যাতে মানুষ এর জন্যে মেহনত অব্যাহত রাখে।
অবশ্য আমাদের দ্বারা কবীরার প্রকারভেদ সঠিকভাবে বলে দেয়া এবং এর খুঁটিনাটি বিষয়াদি প্রবল ধারণা ও অনুমানের উপর ছেড়ে দেয়া সম্ভব। এছাড়া, যে গোনাহটি সর্ববৃহৎ কবীরা, তারও সংজ্ঞা বলে দিতে পারি; কিন্তু যেটি সর্বকনিষ্ঠ সগীরা গোনাহ, তার সংজ্ঞা দেয়া সম্ভব নয়। শরীয়তের প্রমাণাদি ও অন্তর্দৃষ্টির আলোকে আমরা জানি সকল শরীয়তের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ করুক এবং দীদারে ইলাহীর সৌভাগ্য অর্জন করুক। কিন্তু যে পর্যন্ত মানুষ আল্লাহর সত্তা, তাঁর গুণাবলী, ঐশীগ্রন্থ ও রসূলগণকে না চিনবে এ সৌভাগ্য অর্জিত হতে পারে না। নিচের আয়াতে এদিকেই ইশারা করা হয়েছে-
>“মানুষ ও জিনকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে তারা আমার বান্দা হয়ে যায়”। বান্দা তখন বান্দা হয়, যখন নিজের মালিকের প্রতিপালকত্ব ও নিজের দাসত্বকে চিনে। এটাই রসূল প্রেরণের আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু পার্থিব জীবন ছাড়া এই উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না। তাই দুনিয়াকে আখেরাতের কৃষিক্ষেত্র বলা হয়েছে।
এ থেকে জানা গেল যে, আখেরাতের খাতিরে দুনিয়ার হেফাযতও জরুরী।
আখেরাতের খাতিরে দুনিয়া সম্পর্কিত বিষয় দুটি। একটি প্রাণ, অপরটি ধন-সম্পদ। অতএব, যে গোনাহ দ্বারা খোদায়ী মারেফতের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তা সর্ববৃহৎ কবীরা।
এরপর সেই কবীরার পালা আসে, যা দ্বারা জীবিকার দ্বার রুদ্ধ হয়। কেননা, জীবিকা দ্বারাই প্রাণীর জীবন। সুতরাং আসল উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্যে যথাক্রমে তিনটি বিষয়ের হেফাযত জরুরী হল। প্রথম, অন্তরে খোদায়ী মারেফতের হেফাযত। দ্বিতীয়, দেহে প্রাণের হেফাযত। তৃতীয়, ধন-সম্পদের হেফাযত। এ বিষয়ত্রয়ের উপর ভিত্তি করেই গোনাহের বিভক্তি হয়ে থাকে। অর্থাৎ সর্ববৃহৎ গোনাহ সেটি, যা খোদায়ী মারেফতের অন্তরায় হয়।
এর নিচে সে গোনাহ, যা মানুষের প্রাণরক্ষায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
এরপর সেই গোনাহ— যা দ্বারা জীবিকার দ্বার রুদ্ধ হয়। এই তিনটি বিষয় সম্পর্কে কোন ধর্মেই মতভেদ হতে পারে না। অতএব, কবীরা গোনাহের তিনটি স্তর রয়েছে।
(এক) যা আল্লাহ ও রসূলের মারেফতের পরিপন্থী। একে বলা হয় কুফর। এর ঊর্ধ্বে কোন কবীরা নেই৷ এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর আযাবকে ভয় না করা এবং তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া। আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী ও ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কিত সকল প্রকার বেদআতও এর কাছাকাছি।
(দুই) প্রাণ সম্পর্কিত কবীরা। সুতরাং কাউকে হত্যা করা কবীরা গোনাহ। তবে কুফরের তুলনায় কম৷ কেননা, কুফরের কারণে মূল উদ্দেশ্য ফওত হয়ে যায়। আর হত্যার কারণে উদ্দেশ্যের উপায় বিনষ্ট হয়ে যায়। কেননা, পার্থিব জীবন খোদায়ী মারেফতের ওসীলা। হত্যা করলে এই ওসীলা লোপ পায়। হাত-পা কর্তন করা এবং মারপিট করা, যা মৃত্যুর কারণ হয়, তাও কবীরা গোনাহের মধ্যে গণ্য। তবে ইচ্ছাকৃত হত্যা অধিক কঠোর কবীরা। যিনা ও সমকামিতাও এই স্তরের মধ্যে দাখিল। সমকামিতা এ জন্যে দাখিল যে, যখন ধরে নেয়ার পর্যায়ে সকলেই পুরুষদের সাথে যৌনকর্ম সম্পাদন করতে শুরু করবে, তখন মানুষের বংশ বন্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং হত্যার মাধ্যমে মানুষের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করা যেমন কবীরা গুনাই, তেমনি যিনা ও ব্যভিচারও কবীরা গুনাহ। কেননা, তার দ্বারা যদিও বংশ বিস্তার বন্ধ হয় না; কিন্তু বংশ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং পারস্পরিক উত্তরাধিকার খতম হয়ে যায়। ফলে, জীবনের শৃঙ্খলাই বিনষ্ট হয়ে যায়। তবে যিনা হত্যার তুলনায় কম কবীরা।"
(তিন) ধন-সম্পদ সম্পর্কিত কবীরা। সুতরাং একে অন্যের ধন-সম্পদ চুরি করে, ছিনতাই করে অথবা অন্য কোন অবৈধ উপায়ে হস্তগত করা জায়েয নয়। তবে একের ধন-সম্পদ অন্যে নিয়ে নিলে তা ফেরত দেয়া সম্ভব। খেয়ে ফেললে বা ব্যয় করে ফেললে মূল্য অথবা বিনিময় দিতে পারে। এ দিক দিয়ে ধন-সম্পদ নেয়া তেমন গুরুতর নয়। হাঁ, যদি এভাবে নেয় যে, ক্ষতিপূরণ অসম্ভব হয়ে যায়, তখন এটা কবীরা গোনাহ হওয়া উচিত। এভাবে নেয়ার সম্ভাব্য পন্থা চারটি ।
(১) গোপনে নেয়া, যাকে চুরি বলা হয়। এতে কেন নিল, তা অজানা থাকার কারণে ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়।
(২) এতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা। বয়সের স্বল্পতা হেতু এতীম নালিশ করতে অক্ষম বিধায় এটাও গোপন পন্থার অন্তর্ভুক্ত।
(৩) মিথ্যা সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে কারও আর্থিক ক্ষতি করা।
(৪) মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে গচ্ছিত সামগ্রীর মালিক হয়ে যাওয়া।
এ চারটি পন্থা হারাম হওয়ার ব্যাপারে শরীয়তসমূহের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে। যদিও এগুলোর কোন কোনটিতে শরীয়ত কোন শাস্তি নির্ধারণ করেনি। কিন্তু পর্যাপ্ত নিন্দাবাণী উচ্চারণ করেছে এবং পার্থিব শৃঙ্খলা বিধানে এগুলোর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। তাই এগুলো কবীরা হওয়াই সঙ্গত। সূদ খাওয়ার মধ্যে কেবল এতটুকুই রয়েছে যে, অপরের ধন-সম্পদ তার সন্তুষ্টিক্রমে খাওয়া হয়। কিন্তু এতে শরীয়তের সন্তুষ্টি নেই। আর ধন ছিনতাইয়ের মধ্যে কারও সন্তুষ্টি থাকে না। এতদসত্ত্বেও ছিনতাই কবীরা গোনাহ নয়। কাজেই সূদ খাওয়া কবীরা না হওয়া দরকার। কারণ, এতে ধনের মালিকের সম্মতি থাকে এবং কেবল শরীয়তের সম্মতি অনুপস্থিত থাকে। যদি বলা হয় যে, শরীয়তে সূদ সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং পারলৌকিক শাস্তির কথা বলা হয়েছে, এতে কবীরা হওয়াই বুঝা যায়, তবে ছিনতাই ইত্যাদি যুলুমের ব্যাপারেও তো এরূপই বলা হয়েছে। এগুলোরও কবীরা হওয়া উচিত। অথচ এগুলো কবীরার তালিকায় দাখিল না হওয়াই প্রবল ধারণা।
এখন আবু তালেব মক্কী বর্ণিত কবীরাসমূহের মধ্যে গালি দেয়া, মদ্যপান করা, জাদু করা, জেহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা এবং পিতা-মাতার নাফরমানী করা সম্পর্কে আলোচনা করা দরকার। এগুলোর মধ্যে মদ্যপান কবীরা গোনাহ হওয়া উপযুক্ত।
প্রথমত, এ কারণে যে, শরীয়ত এ সম্পর্কে কঠোর শাস্তিবাণী উচ্চারণ করেছে।
বিতীয়ত, যুক্তির নিরিখেও এরূপ হওয়া উচিত। যুক্তি এই যে, প্রাণের হেফাযত করা যেমন জরুরী, বুদ্ধির হেফাযত করাও তেমনি জরুরী। কারণ, বুদ্ধি ছাড়া প্রাণ বেকার। এতে বুঝা গেল যে, মদ্যপান করে বুদ্ধি লুপ্ত করাও কবীরা গোনাহ। কিন্তু এই যুক্তি এক ফোঁটা মদের বেলায় প্রযোজ্য নয়। কেননা, এতে বুদ্ধি লোপ পায় না। সুতরাং এক ফোঁটা মদমিশ্রিত পানি পান করলে তা কবীরা না হওয়া উচিত; বরং একে নাপাক পানি বলা উচিত। কিন্তু শরীয়ত মদের জন্যে শাস্তি নির্ধারণ করেছে বিধায় একে কবীরা গণ্য করা হয়। শরীয়তের সকল রহস্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া মানুষের সাধ্যে নেই। সুতরাং এর কবীরা হওয়ার ব্যাপারে ইজমা প্রমাণিত হলে তা মেনে নেয়া ওয়াজিব।
অপবাদ আরোপের অবস্থা এই যে, এতে কেবল মানহানি হয়। মানের মর্যাদা ধন-সম্পদের তুলনায় কম। অপবাদের অনেকগুলো স্তর রয়েছে। সর্ববৃহৎ স্তর হচ্ছে যিনার অপবাদ আরোপ করা। শরীয়তে এটা খুব গুরুতর ব্যাপার। তাই এর জন্যে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। আমার প্রবল ধারণা, শরীয়তে যেসব গোনাহের কারণে “হদ” তথা শাস্তি ওয়াজিব হয়, সাহাবায়ে কেরাম সেগুলোকে কবীরা গণ্য করতেন। এদিক দিয়ে অপবাদ আরোপও কবীরা।
জাদুর অবস্থা এই যে, যদি তাতে কুফরী কথাবার্তা না থাকে, তবে কবীরা গোনাহ। নতুবা এর গুরুত্ব ততটুকুই হবে, যতটুকু ক্ষতি এর দ্বারা হবে; যেমন জীবন নাশ করা, রুগ্ন হওয়া ইত্যাদি।
যুদ্ধের সারি থেকে পলায়ন করা এবং পিতা-মাতার নাফরমানীও কিয়াস অনুযায়ী এমন যে, এ সম্পর্কে মত প্রকাশে বিরত থাকাই উপযুক্ত। এ ছাড়া এটা অকাট্যরূপে জানা আছে যে, যিনা ছাড়া মানুষকে অন্য কোন গালি দেয়া, মারা, যুলুম করা অর্থাৎ ধন ছিনিয়ে নেয়া, গৃহ থেকে উৎখাত করে দেয়া কবীরার অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা, কবীরা গোনাহের সর্বোচ্চ সংখ্যা সতের বর্ণিত আছে। এগুলো সেই সাতের মধ্যে উল্লিখিত নেই। এমতাবস্থায় যদি পলায়ন করা এবং পিতামাতার নাফরমানী করাকেও কবীরা বলা থেকে বিরত থাকা যায়, তবে তা অবান্তর হবে না। কিন্তু হাদীসে পলায়ন ও পিতামাতার নাফরমানীকে কবীরা নামে অভিহিত করা হয়েছে। এদিক দিয়ে এগুলোকে কবীরার তালিকায় দাখিল করা উচিত।
পূর্বোল্লিখিত এক আয়াতে বলা হয়েছে : তোমরা কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকলে আমি তোমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করে দেব। এ থেকে জানা যায়, কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকলে তা সগীরা গোনাহের জন্যে কাফ্ফ্ফারা হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, এটা সর্বাবস্থায় নয়; বরং তখন কাফ্ফারা হবে, যখন সামর্থ ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বেঁচে থাকে।
উদাহরণতঃ যদি কোন ব্যক্তি কোন নারীর সাথে যিনা করতে সক্ষম হয় এবং মনে আগ্রহও থাকে, এরপর সে নিজেকে বিরত রাখে এবং শুধু দেখে ও স্পর্শ করেই ক্ষান্ত থাকে, তবে যে অন্ধকার দেখা অথবা স্পর্শ করার কারণে তার অন্তরে সৃষ্টি হবে, তার তুলনায় নিজেকে যিনা থেকে বাঁচিয়ে রাখার কারণে নূর বেশী হবে। কাফ্ফারা হওয়ার অর্থ এটাই। কিন্তু যদি সেই ব্যক্তি পুরুষত্বহীন হয়, অথবা কোন কারণে সহবাসে অক্ষম হয়, তবে তার বিরত থাকা কাফ্ফারা হবে না।
এমনিভাবে যে ব্যক্তি মদ্যপানে মোটেই আগ্রহী নয়, এমনকি তা হালাল হলেও পান করত না, তার মদ্যপান থেকে বিরত থাকা সেসব ছোট গোনাহের জন্যে কাফফারা হবে, যা মদ্যপানের সূচনাতে হয়ে থাকে। কবীরা যেহেতু আখেরাত সম্পর্কিত বিধানাবলীর অন্যতম, তাই শরীয়তে এর সঠিক সংখ্যা ও পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা বর্ণিত হয়নি। উদ্দেশ্য, মানুষ যাতে নির্ভীক ও শংকামুক্ত হয়ে সগীরা গোনাহসমূহে লিপ্ত হয়ে না পড়ে।
হযরত আবু হুরায়রার রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন এক নামায অন্য নামাযের সময় পর্যন্ত কাফফারা হয় এবং এক রমযান অন্য রমযান পর্যন্ত কাফফারা হয় তিনটি গোনাহ ছাড়া— শিরক, সুন্নত বর্জন ও চুক্তি ভঙ্গকরণ। সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন : সুন্নত বর্জন ও চুক্তি ভঙ্গ বলতে উদ্দেশ্য কি ? তিনি বললেন : দল থেকে বের হয়ে যাওয়া সুন্নত বৰ্জন এবং কারও সাথে চুক্তি করার পর তলোয়ার নিয়ে তার সাথে যুদ্ধ করার জন্যে বের হয়ে পড়া চুক্তি ভঙ্গকরণ।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন