শনিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ৯) জান্নাত ও দোযখের স্তর পাপ ও পুণ্যের স্তরের উপর নির্ভরশীল

 


তওবা - পর্ব - ৯
জান্নাত ও দোযখের স্তর পাপ ও পুণ্যের স্তরের উপর নির্ভরশীল 

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


প্রকাশ থাকে যে, দুনিয়ার জীবন আখেরাতের মোকাবিলায় জাগরণের মোকাবিলায় স্বপ্নের মত। হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত। 

বলা হয়েছে— মানুষ নিদ্রিত। যখন তারা মরে যাবে, জাগ্রত হবে। জাগরণের বিষয় যখন স্বপ্নে আসে, তখন তা দৃষ্টান্তের মত মনে হয়। ফলে, তা'বীর তথা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। এমনিভাবে আখেরাতের জাগরণে যে অবস্থা হবে, তা দুনিয়ার স্বপ্নে দৃষ্টান্তস্বরূপই প্রকাশ পেতে পারে। অর্থাৎ, স্বপ্নের মত এ অবস্থাও ব্যাখ্যা সাপেক্ষ হবে। এখানে আমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কিত তিনটি কাহিনী নমুনাস্বরূপ উল্লেখ করছি। 

বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি হযরত ইবনে সীরীনের খেদমতে এসে আরয করল : আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমার হাতে একটি নামাঙ্কিত মোহর রয়েছে। তা দ্বারা আমি মানুষের মুখে এবং যৌনাঙ্গে মোহর করছি। তিনি বললেন : মনে হয় তুমি মুয়াযযিন, রমযানে সোবহে সাদেক হওয়ার পূর্বে আযান দাও। লোকটি বলল : আপনি ঠিকই  বলেছেন। 


অন্য এক ব্যক্তি এসে বলল  : আমি স্বপ্নে দেখেছি তৈলকে তৈলবীজের মধ্যে ঢালছি। তিনি বললেনঃ তুমি কোন বাদী ক্রয় করে থাকলে তার অবস্থা তদন্ত করে দেখ। মনে হয় সে তোমার জননী। কেননা, তৈলের মূল হচ্ছে তৈলবীজ। এ থেকে বুঝা যায় যে, লোকটি তার মূল অর্থাৎ জননীর কাছে যায়। এরপর লোকটি তদন্ত করে জানতে পারল যে, তার বাঁদী বাস্তবিকই তার জননী ছিল। 


অন্য এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলঃ আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, মোতির হার শূকরের গলায় পরিধান করাচ্ছি। হযরত ইবনে সীরীন বললেন : মনে হয় তুমি জ্ঞানের বিষয়াদি অযোগ্য লোকদেরকে শিখিয়ে যাচ্ছ। বাস্তবে তাই ছিল। এসব ব্যাখ্যা থেকে জানা গেল রূপক বিষয়বস্তুকে কিভাবে বর্ণনা করা হয়। রূপক বিষয় বলে আমাদের উদ্দেশ্য এমন বিষয়, যাকে প্রতীক হিসেবে দেখলে শুদ্ধ ও সঠিক মনে হয়, আর বাহ্যিক আকৃতির প্রতি লক্ষ্য করলে মিথ্যা মনে হয়। উদাহরণতঃ প্রথম স্বপ্নের ব্যাখ্যায় যদি মুয়াযযিন কেবল বাহ্যিক আংটির প্রতি দেখত এবং তা দ্বারা মোহর করা বুঝত, তবে এ স্বপ্নকে মিথ্যা মনে করতে বাধ্য হত। কেননা, এ কাজ সে কখনও করেনি। কিন্তু মর্ম ও প্রতীকের প্রতি লক্ষ্য করার ফলে স্বপ্নটি সত্য হয়ে গেল। কারণ, মোহর করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাধা দেয়া। মুয়াযযিন রমযান মাসে সোবহে সাদেকের পূর্বে আযান দিয়ে মানুষকে পানাহারে বাধা দিত। 

পয়গম্বরগণকে আদেশ করা হয়েছে তারা যেন মানুষের সাথে তাদের বুদ্ধির পরিমাপ অনুযায়ী কথাবার্তা বলেন। মানুষের বুদ্ধির পরিমাপ এই যে, তারা নিদ্রিত। নিদ্রিত ব্যক্তির কাছে বস্তুর স্বরূপ রূপক আকারেই উদঘাটিত হয়। তাই পয়গম্বরগণও মানুষের সাথে রূপক ভঙ্গিতে কথাবার্তা বলেন, যাতে তারা মূল উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, যদিও বাহ্যিক শব্দ দ্বারা অন্য কিছু অর্থ হয়। মৃত্যুর পর মানুষ যখন জাগ্রত হবে, তখন বুঝবে, পয়গম্বরগণের কথা ঠিকই ছিল। 

উদাহরণতঃ হাদীসে বলা হয়েছে– "মুমিনের অন্তর আল্লাহর দু'অঙ্গুলির মধ্যস্থলে অবস্থিত” আলেমগণ ব্যতীত কেউ এ হাদীসের মর্ম বুঝে না। মূর্খদের দৃষ্টি কেবল এর শাব্দিক অর্থের উপর থাকে। কেননা, তারা ‘তাড়ীল’ নামক তাফসীর সম্পর্কে অজ্ঞ। ফলে, তারা শাব্দিক অর্থ অনুযায়ী আল্লাহ তা'আলার হাত ও অঙ্গুলি সপ্রমাণ করে। (নাউযুবিল্লাহ) 

এমনিভাবে অপর এক হাদীসে আছে - “আল্লাহ আদমকে নিজের আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন”  এতে মূর্খরা কেবল বাহ্যিক আকৃতি ও রং বুঝে নিয়ে আল্লাহ তা'আলাকেও এমনি মনে করে। অথচ তিনি এ সকল বিষয় থেকে পবিত্র। এসব কারণেই কতক লোক আল্লাহ তা'আলার গুণাবলীর ব্যাপারে দারুণ 

হোঁচট খেয়েছে। এমনকি, তারা আল্লাহর কালামকে অক্ষর ও শব্দভুক্ত মনে করে নিয়েছে। আখেরাতের বিষয় সম্পর্কে যে সকল দৃষ্টান্ত হাদীসে বর্ণিত রয়েছে কেউ কেউ সেগুলোকে অস্বীকার করে একারণে যে, তাদের কাছে বাহ্যিক শব্দই উদ্দেশ্য। আর বাহ্যিক শব্দের মাঝে বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণতঃ হাদীসে আছে– “কিয়ামতের দিন মৃত্যুকে সাদা ভেড়ার আকারে উপস্থিত করে যবাহ করা হবে”। ধর্মদ্রোহী বোকারা এটা মানে না এবং পয়গম্বরণের প্রতি মিথ্যারোপ করে। প্রমাণ এই যে, মৃত্যু একটি অশরীরী বস্তু, আর ভেড়া শরীরী। অতএব, অশরীরী বস্তুর শরীরী হয়ে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এসব নির্বোধকে আপন রহস্যাবলীর মারেফত থেকে অনেক ক্রোশ দূরে রেখেছেন। 

তিনি বলেনঃ “কেবল বিজ্ঞ ব্যক্তিরাই এসব রহস্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারে”। মূর্খরা একথাও জানে না যে, কেউ যদি কাউকে বলে :  আমি স্বপ্নে একটি ভেড়া দেখেছি, যাকে মানুষ মহামারী বলে। ভেড়াটি পরে যবাহ হয়ে গেছে। একথা শুনে শ্রোতা জওয়াব দিল :  তুমি চমৎকার স্বপ্ন দেখেছ। মনে হয়, মহামারী খতম হয়ে যাবে। কেননা, যবাহ করা জন্তুর ফিরে আসা কল্পনাতীত। এখানে ব্যাখ্যাদাতাও সত্যবাদী এবং যে স্বপ্ন দেখেছে, সে-ও সত্যবাদী। আসলে স্বপ্ন দেখানো যে ফেরেশতার কাজ, সে নিদ্রিত ব্যক্তিকে “লওহে মাহফুযের” বিষয়টি দৃষ্টান্তের অনুরূপ বুঝিয়ে দিয়েছে। কেননা, নিদ্রিত ব্যক্তির পক্ষে দৃষ্টান্ত ছাড়া বুঝা সম্ভব ছিল না। এখন আমরা আসল উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে আসছি। আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, পাপ ও পুণ্যের ভিত্তিতে জান্নাত ও দোযখের স্তরসমূহের বিভাজন দৃষ্টান্ত ছাড়া বুঝা অসম্ভব। সুতরাং আমরা যে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করব, তা দ্বারা অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝে নিতে হবে, আকার ও শব্দের পেছনে পড়া যাবে না"।

আখেরাতে মানুষের অনেক প্রকার হবে। সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যে তাদের স্তর ও উপলব্ধির সীমাহীন তফাৎ হবে। যেমন, দুনিয়ার সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের ব্যাপারে তাদের তফাতের অন্ত নেই। এ ব্যাপারে দুনিয়া ও আখেরাতে কোন পার্থক্য নেই। কেননা, উভয় জগতের পরিচালক একমাত্র লা-শরীক আল্লাহ। তার চিরন্তন তরীকা ও পদ্ধতিও একই রকম। যেহেতু আমরা স্তরসমূহ গণনা করতে অক্ষম, তাই এগুলোর শ্রেণী সীমিত করে বর্ণনা করছি।


কিয়ামতের দিন মানুষ চার শ্রেণীতে বিভক্ত হবে। 

প্রথম ধ্বংসপ্রাপ্ত, দ্বিতীয় শাস্তিপ্রাপ্ত, তৃতীয় মুক্তিপ্রাপ্ত এবং চতুর্থ সফলকাম।

দুনিয়াতে এর দৃষ্টান্ত এই যে, কোন বাদশাহ যুদ্ধ করে কোন দেশ জয় করলে তার অধিবাসীদের কতককে হত্যা করে— এরা প্রথম শ্রেণী, কতককে দীর্ঘকাল জেলে আটকে রাখে— এরা দ্বিতীয় শ্রেণী, কতককে ছেড়ে দেয় — এরা তৃতীয় শ্রেণী এবং কতককে পুরস্কৃত করে — এরা চতুর্থ শ্রেণী।


বাদশাহ ন্যায়পরায়ণ হলে এসব আচরণ বিনা কারণে হবে না। হত্যা তাদেরকেই করবে, যারা তার অধিকারকে অস্বীকার করবে এবং তার বন্ধুর শত্রু হবে। 

জেলে তাদেরকে পাঠাবে— যারা তার আধিপত্য স্বীকার করবে; কিন্তু আনুগত্য ও খেদমতে ত্রুটি করবে। 

মুক্তি তাদেরকে দেবে, যারা কেবল তার বশ্যতা মেনে নেবে। 

পুরস্কৃত তাদেরকে করবে, যারা আজীবন তার খেদমত ও সহযোগিতায় দিনাতিপাত করবে। 

এরপর এটাও জরুরী যে, যে যেরূপ খেদমত করবে, সে অনুপাতেই সে পুরস্কার পাবে। হত্যাও বিভিন্ন প্রকার বের হবে। কারও শুধু গর্দান নেয়া হবে এবং কাউকে নাক, কান ও হাত-পা কেটে হত্যা করা হবে। অর্থাৎ অস্বীকারের স্তর অনুযায়ী হত্যাও বিভিন্ন স্তর হবে। 

অনুরূপভাবে যাদেরকে জেল দেয়া হবে, তাদেরও বিভিন্ন স্তর হবে— কাউকে কম সময়ের এবং কাউকে বেশী সময়ের। বলা বাহুল্ , প্রত্যেক শ্রেণীর স্তর অসংখ্যা ও অগণিত হতে পারে। অনুরূপভাবে কিয়ামতে এই চার শ্রেণীর স্তর অসংখ্য হবে। 

উদাহরণতঃ চতুর্থ শ্রেণী যারা সফলকাম হবে, তাদের কেউ জান্নাতে আদনে, কেউ জান্নাতে মাওয়ায় এবং কেউ জান্নাতুল ফেরদাউসে দাখিল হবে। শাস্তিপ্রাপ্ত শ্রেণীর মধ্যে কেউ অল্পদিন, কেউ হাজার বছর এবং কেউ সাত হাজার বছর শাস্তি ভোগ করবে। এরা সকলের পেছনে দোযখ থেকে বের হবে।

 এখন আমরা প্রত্যেক শ্রেণীর স্তর বিভাজন বর্ণনা করার প্রয়াস পাব। 

প্রথম শ্রেণী ধ্বংসপ্রাপ্তদের স্থর– 

তারা সে লোক, যারা আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করে না। কেননা, উল্লিখিত দৃষ্টান্তে বাদশাহর কাছে তারাই হত্যাযোগ্য ছিল, যারা বাদশাহের সন্তুষ্টি, সম্মান ও পুরস্কার প্রার্থনা করত না। 

বলা বাহুল্য, এটা হচ্ছে কাফেরদের শ্রেণী। তারা আল্লাহর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কেবল দুনিয়ার পূজারী হয়ে থাকে এবং আল্লাহ, তাঁর রসূল ও ঐশী গ্রন্থসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। কেননা, আল্লাহর নৈকট্যশীল হওয়া এবং তাঁর দীদারের গৌরব অর্জন করাই হচ্ছে পারলৌকিক সৌভাগ্য। ঈমান ব্যতীত এই নেয়ামত অর্জন করা সম্ভব নয়। কাফেররা এটা অস্বীকার করে। তাই তারা এই নেয়ামত থেকে চিরতরে বঞ্চিত থাকবে।


 দ্বিতীয় শ্রেণী শাস্তিপ্রাপ্তদের স্থর। 

তারা সেই লোক, যারা মূলত ঈমানদার ; কিন্তু ঈমান অনুযায়ী আমলে ত্রুটি করে। উদাহরণতঃ তারা ঈমান রাখে যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও এবাদত করা যাবে না। এখন যদি কেউ আপন প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তবে তার উপাস্য সেই প্রবৃত্তিই হবে। সে কেবল মুখে মুখে তাওহীদ বলে। সত্যিকার তাওহীদ তার মধ্যে নেই। সত্যিকার তাওহীদ তখন হবে, যখন “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার পর আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং সরল পথে কায়েম থাকে, যা এই আয়াতে বর্ণিত হয়েছে— “নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ্, এরপর সুদৃঢ় থাকে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সরলপথ থেকে কিছু না কিছু বিচ্যুতি অবশ্যই রয়েছে। কারণ, প্রত্যেকেই প্রবৃত্তির অনুসরণ অবশ্যই করে— যদিও তা সামান্য ব্যাপারে হয়। ফলে, নৈকট্যের স্তরেও ত্রুটি দেখা দেয়। সুতরাং প্রত্যেকেরই শাস্তি হবে। কিন্তু এই শাস্তির তীব্রতা ও স্বল্পতা ঈমানের শক্তি এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ কমবেশী হওয়ার উপর নির্ভরশীল হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন : "তোমাদের প্রত্যেকেই সেটা অতিক্রম করবে। এটা তোমার পালনকর্তার অনিবার্য সিদ্ধান্ত। এরপর আমি খোদাভীরুদেরকে উদ্ধার করব এবং যালেমদেরকে সেথায় নতজানু অবস্থায় রেখে দেব”। 

এ কারণেই আগেকার দিনের বুযুর্গগণ ভয় করতেন এবং বলতেন  : আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী দোযখ ভোগ নিশ্চিত এবং রক্ষা পাওয়া সন্দেহযুক্ত। এটাই আমাদের ভয়ের কারণ। হাদীসদৃষ্টে জানা যায়, সকলের শেষে যে ব্যক্তি দোযখ থেকে বের হবে, সে সাত হাজার বছর পরে বের হবে। কেউ কেউ মুহূর্তের মধ্যে দোযখের ওপারে চলে যাবে। কেউ বিদ্যুৎ গতিতে চলে যাবে। তাদের এক দণ্ডও দোযখে অবস্থান করতে হবে না। এক দণ্ড এবং সাত হাজার বছরের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অনেক স্তর রয়েছে।- 

এখন আমরা বলছি, যে ব্যক্তি মূল ঈমানকে শক্তিশালী করে সকল কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকবে, সকল ফরয কর্ম অর্থাৎ পাঞ্জেগানা নামায উত্তমরূপে আদায় করবে এবং মাত্র কয়েকটি সগীরা গোনাহই তার যিম্মায় থাকবে, যা সে উপর্যুপরি করেনি, মনে হয় তার কেবল হিসাবই নেয়া হবে— কোন প্রকার আযাব হবে না। হিসাবের সময় তার পুণ্যের পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। কেননা, হাদীসে বর্ণিত আছে, পাঞ্জেগানা নামায, জুমআ এবং রমযানের রোযা মধ্যবর্তী সকল গোনাহের জন্যে কাফফারা হয়ে যায়। কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা যে সগীরা গোনাহের জন্যে কাফফারা হয়ে যায়, একথা কোরআনের আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত। কাফফারা হওয়ার সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে হিসাব রোধ করতে না পারলেও আযাব রোধ করা। সুতরাং এরূপ ব্যক্তি হিসাব শেষ হওয়ার পর সুখে থাকবে। যে ব্যক্তি একটি অথবা বেশী কবীরা গোনাহ করে এবং ফরয কর্মও কতক বর্জন করে, সে মৃত্যুর পূর্বে খাটি তওবা করলে এমন হয়ে যাবে, যেমন সে কোন গোনাহই করেনি। আর যদি তওবার পূর্বে মারা যায়, তবে মৃত্যুর সময় তার অবস্থা আশংকাজনক হবে। উপর্যুপরি গোনাহ করা অবস্থায় মারা গেলে তার ঈমান না থাকা বিচিত্র নয়"।


তৃতীয় শ্রেণী মুক্তিপ্রাপ্তদের স্থর– 

তারা সেই লোক, যারা কেবল আযাব থেকে বেঁচে যাবে। তারা কোন খেদমত করেনি তাই পুরস্কার পাবে না এবং কোন দোষও করেনি তাই আযাবও হবে না। এ অবস্থা কাফেরদের মধ্য থেকে উন্মাদ, বালক ও অজ্ঞানদের হবে এবং সেসব লোকের হবে, যাদের কাছে জনপদ থেকে আলাদা থাকার কারণে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি। এরূপ লোকেরা না আল্লাহকে জানে, না তাঁকে অস্বীকার করে। ফলে, এবাদত ও গোনাহ কিছুই করে না। একারণেই তারা জান্নাতেও থাকবে না এবং দোযখেও যাবে না ; বরং জান্নাত ও দোযখের মধ্যবর্তী এক জায়গায় অবস্থান করবে, যাকে শরীয়তের পরিভাষায় ‘আ’রাফ’ বলা হয়। এটা কোরআনের আয়াত ও হাদীস দ্বারা নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত। তবে বিশেষ কোন সম্প্রদায় সম্পর্কে বলা হয় যে, তারাও অকাট্যরূপে আ'রাফে থাকবে — এটা অনিশ্চিত ; যেমন কাফেরদের বালকদের আ'রাফে থাকা অকাট্য নয়। কারণ বালকদের ব্যাপারে হাদীসও বিভিন্নরূপ বর্ণিত রয়েছে। একবার জনৈক বালক মারা গেলে হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেন : সে জান্নাতের পাখীদের অন্যতম। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কিরূপে জানলে ? এতে ব্যাপারটি অস্পষ্ট হয়ে গেল। 


চতুর্থ শ্রেণী সফলকাম যারা তাদের স্থর:

তারা সে লোক, যারা অনুকরণ ছাড়াই আল্লাহ তা'আলাকে চিনে নেয়। তারাই নৈকট্যশীল ও অগ্রগামী। তারা বর্ণনাতীত নেয়ামত ও সম্ভোগপ্রাপ্ত হবে। এ সম্পর্কে কোরআনে যা উল্লিখিত হয়েছে, তাই বর্ণনা করা যায়। আল্লাহর বর্ণনার অধিক কে কি বলবে ? যেহেতু এ জগতে এর বিস্তারিত বর্ণনা অসম্ভব, তাই আল্লাহ তা'আলা সংক্ষেপে বলে দিয়েছেন : 

“তাদের চক্ষু শীতল হওয়ার জন্য আল্লাহ তাদের জন্যে যা যা গোপন রেখেছেন, তা কেউ জানে না”।

এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন : 

“আমি আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের জন্যে এমন বস্তু প্রস্তুত রেখেছি, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কর্ণ শুনেনি এবং কোন মানুষের কল্পনায় উদয় হয়নি”।

খোদাপ্রেমিকদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সে অবস্থাই হয়, যা এ জগতে কোন মানুষের কল্পনায় আসতে পারে না। জান্নাতের হুর, প্রাসাদ, ফলমূল, দুধ, মধু, পানীয়, কংকন ও অলংকারের প্রতি তাদের আদৌ কোন মোহ থাকে না। তাদেরকে এসব বস্তু দেয়া হলে তারা এতেই সন্তুষ্ট থাকবে না ; বরং দীদার তথা আল্লাহকে দেখার আনন্দ লাভ করার জন্যে তারা উদগ্রীব থাকবে, যা হবে চূড়ান্ত সৌভাগ্য ও অপার আনন্দ। একারণেই হযরত রাবেয়া বসরীকে যখন জিজ্ঞেস করা হল, জান্নাতে আপনার ঔৎসুক্য কি হবে ? তখন তিনি বললেন : প্রথমে গৃহকর্তা, এরপর গৃহ। মোটকথা, খোদাপ্রেমিকদের অন্তর গৃহকর্তা অর্থাৎ আল্লাহ পাকের মহব্বতেই ডুবে থাকে৷ গৃহ অর্থাৎ জান্নাতের সাজ-সজ্জার প্রতি তাদের মোটেই ভ্রূক্ষেপ নেই। এমনকি, এই মহব্বতের কারণে তারা নিজেদের সম্পর্কেও বেখবর থাকে। ফলে, দৈহিক কষ্ট অনুভব করে না। এ অবস্থাকে বলা হয় ‘ফানা ফিল মাহবুব’ ( প্রেমাস্পদে লীন)। 



পরবর্তী পর্ব

সগীরা গোনাহ কিরূপে কবীরা হয়ে যায়

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...