সগীরা গোনাহ কিরূপে কবীরা হয়ে যায়—
জানা উচিত যে, সগীরা গোনাহ কয়েকটি কারণে কবীরা হয়ে যায়। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে অব্যাহতভাবে করে যাওয়া। এ কারণেই বলা হয়েছে যে, কোন গোনাহ অব্যাহতভাবে করা হলে তা সগীরা নয় এবং যে কোন গোনাহ এস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) সহকারে করা হলে তা কবীরা নয়। এর সারমর্ম এই যে, যদি কোন ব্যক্তি একটি কবীরা গোনাহ করে বিরত থাকে এবং অন্য কবীরা গোনাহ না করে, তবে এতে ক্ষমা পাওয়ার আশা অধিক সেই সগীরা গোনাহের তুলনায়— যা অব্যাহতভাবে করা হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ যদি শক্ত পাথরের উপর এক এক ফোটা পানি অব্যাহতভাবে পতিত হতে থাকে, তবে এক সময়ে পাথরে চিহ্ন দেখা দেবে । পক্ষান্তরে যদি সকল ফোটার পানি একত্রিত করে এক সাথে সেই পাথরের উপর ঢেলে দেয়া হয়, তবে কোন চিহ্ন দেখা দেবে না। অব্যাহতভাবে করার এই প্রভাবের প্রতি লক্ষ্য করেই রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন– “সর্বোত্তম আমল তাই, যা অব্যাহতভাবে করা হয়। যদিও তা পরিমাণে কম হয়। এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, স্থায়ী আমল কম হলেও উপকারী। এর বিপরীতে আরও জানা গেল যে, অনেক আমল যা মানুষ একবারে করে নেয়, তা অন্তরের পবিত্রতায় কম উপকারী হয়ে থাকে। এমনিভাবে সগীরা গোনাহ যদি অব্যাহতভাবে করা হয়, তবে তা অন্তরকে মলিন ও তমসাচ্ছন্ন করার ব্যাপারে অধিক প্রভাবশালী হবে। তবে একথা ঠিক যে, অগ্রে ও পশ্চাতে সগীরা গোনাহ না করে সহসাই কবীরা গোনাহ করার দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। উদাহরণতঃ হত্যাকারী সহসাই কাউকে হত্যা করে না যে পর্যন্ত পূর্ব থেকে শত্রুতা না হয়। এমনিভাবে প্রত্যেক কবীরা গোনাহ করার মধ্যে প্রাসঙ্গিকভাবে শুরুতে ও শেষে সগীরাও করা হয়। যদি কোন ক্ষেত্রে সগীরা ব্যতিরেকেই সহসা কবীরা গোনাহ হয়ে যায় এবং পুনর্বার তা না করা হয়, তবে সম্ভবত এই কবীরা গোনাহ মাফ হওয়ার আশা সেই সগীরার তুলনায় বেশী, যা আজীবন করা হয়। সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যাওয়ার আরও একটি কারণ হচ্ছে গোনাহকে ছোট মনে করা। কেননা, এটাই নিয়ম যে, মানুষ নিজের গোনাহকে যত বড় মনে করবে, আল্লাহ তা'আলার কাছে তা ততই ছোট হবে এবং গোনাহকে যত সগীরা মনে করবে, তা ততই কবীরা হবে : কারণ, গোনাহকে বড় মনে করা এ বিষয়ের প্রমাণ যে, অন্তরে গোনাহের প্রতি বিতৃষ্ণা ও ঘৃণা বিদ্যমান রয়েছে। ফলে, অন্তরে এর প্রভাব বেশী হয় না। পক্ষান্তরে গোনাহকে ছোট মনে করলে বুঝা যায়, অন্তরে এর প্রতি টান রয়েছে। এ কারণেই অন্তরে এর প্রভাব বেশী হয়। আর এ কারণেই মানুষ অসাবধানতায় কোন পাপ করে ফেললে তজ্জন্য পাকড়াও করা হয় না। কেননা, এ অবস্থায় অন্তর প্রভাবিত হয় না। হাদীস শরীফে আছে, “ঈমানদার ব্যক্তি তার গোনাহকে এমন মনে করে যেন মাথার উপর একটি পাহাড় এসে গেছে এবং এক্ষণি তা মাথার উপর পড়ে যাবে। পক্ষান্তরে মুনাফিক তার গোনাহকে এমন মনে করে– যেন নাকের ডগায় মাছি বসেছে এবং তাকে উড়িয়ে দিয়েছে। ঈমানদারের অন্তরে গোনাহের এই গুরুত্বের কারণ এই যে, সে আল্লাহ তা'আলার প্রতাপ সম্পর্কে সম্যক অবগত। যখন সে চিন্তা করে যে, এই গোনাহের মাধ্যমে সে কার অবাধ্যতা করেছে, তখন সগীরা গোনাহও তার দৃষ্টিতে কবীরা প্রতিভাত হয়। বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা কোন এক নবীকে এই ওহী প্রেরণ করেন যে, উপঢৌকন কম;এদিকে লক্ষ্য করো না, বরং দেখ– যে প্রেরণ করেছে সে কতটুকু মহান। তোমার পাপ ছোট– এদিকে দেখো না, বরং ভেবে দেখ, এ পাপ করে তুমি কার মোকাবিলা করেছ ? এদিক দিয়েই জনৈক সাধক বলেন : সগীরা গোনাহের কোন অস্তিত্বই নেই। যে বিষয়ে আল্লাহ তা'আলার বিরোধিতা হয়, তা কবীরা-ই বটে৷
সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে গোনাহ করে উল্লসিত হওয়া এবং গর্ব করা। অতএব, মানুষ সগীরা গোনাহের যত বেশী স্বাদ পাবে, ততই তা কবীরা হবে। অন্তরকে তমসাচ্ছন্ন করার ব্যাপারে তার প্রভাবও বেশী হবে। এমনকি কতক গোনাহগার তাদের গোনাহের জন্যে বাহবা পেতে চায় এবং গোনাহ করে খুব আস্ফালন করে। উদাহরণতঃ কোন কোন ব্যবসায়ী বলে- দেখ, আমি খারাপ মাল কিভাবে চালিয়ে দিলাম এবং ক্রেতাকে ধোকা দিয়ে দিলাম। বলা বাহুল্য, এসব কারণে সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সময় দেয়া ও সহ্য করাকে তাঁর অনুগ্রহ মনে করে নিলেও সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যায়। এই অনুগ্রহ মনে করার কারণে গোনাহগার ব্যক্তি গোনাহ বর্জন করতে অলসতা করে। সে জানে না যে, এই সময় দেয়ার পেছনে আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্য হচ্ছে আরও বেশী গোনাহ করে নিক। সুতরাং বাস্তবে যা ক্রোধের কারণ, তাকেই অনুগ্রহের কারণ মনে করে নেয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন- “তারা মনে মনে বলে : আমাদের কথার কারণে আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন”? তাদের জন্যে জাহান্নাম যথেষ্ট। তারা তাতে প্রবেশ করবে। এটা অত্যন্ত মন্দ জায়গা। গোনাহ করে তা বলে বেড়ানো অথবা অপরের সামনে গোনাহ করার কারণেও সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যায়। কেননা, এতে প্রথমত, আল্লাহর পক্ষ থেকে যে গোপন রাখা হয়, তা ভেঙ্গে দেয়া হয়। দ্বিতীয়ত, অপরকে এ গোনাহের প্রতি উৎসাহিত করা হয়। ফলে, এক গোনাহের মধ্যে যেন দু’গোনাহ হয়ে যায়। হাদীসে বর্ণিত আছে, সকল মানুষের দোষ মার্জনা করা হবে ; কিন্তু যারা গোনাহ করে ফাঁস করে দেয়, তাদেরকে ক্ষমা করা হবে না। অর্থাৎ কেউ রাতের বেলায় দোষ করল, যা আল্লাহ তা'আলা গোপন রাখলেন। কিন্তু সকালে গাত্রোখান করে সে আল্লাহর পর্দাকে ছিন্ন করল এবং আপন গোনাহ প্রকাশ করে দিল। এরূপ ব্যক্তির দোষ মার্জনা করা হবে না। গুণ প্রকাশ করা, দোষ গোপন করা এবং গোপন বিষয় ফাঁস না করা বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলার অন্যতম নেয়ামত। যে ব্যক্তি নিজের দোষ প্রকাশ করে দেয়, সে এই নেয়ামতের নাশোকরী করে। জনৈক বুযুর্গ বলেন প্রথমত, মানুষের কোন গোনাহ না করা উচিত। যদি করেও, তবে অপরকে উৎসাহিত না করা উচিত। গোনাহগার ব্যক্তি আলেম ও অনুসৃত হলেও সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যায়। আলেম ব্যক্তি যখন কোন সগীরা গোনাহ করে এবং তার অনুসরণে অন্যরাও তা করতে থাকে, তখন এ গোনাহ আলেম ব্যক্তির জন্যে কবীরা হয়ে যাবে।
উদাহরণতঃ রেশমী বস্ত্র পরিধান করা, সন্দেহযুক্ত ধনসম্পদ গ্রহণ করা, শাসকবর্গের কাছে আসা-যাওয়া করা, তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করা এবং মুসলমানের মর্যাদাহানি করা ইত্যাদি।
মানুষ আলেমের এ ধরনের দোষের সনদ পেশ করে থাকে। আলেম মরে যায় কিন্তু তার অনিষ্ট অব্যাহত থাকে। বলা বাহুল্য, যে ব্যক্তির সাথে সাথে তার পাপও মরে যায়, সে চমৎকার ব্যক্তি। হাদীসে আছে— যে ব্যক্তি কুপ্রথা চালু করে , সে নিজে সেই কাজ করার জন্যে গোনাহগার হবে এবং অন্য যারা এ কাজ করবে, তাদের পাপও তার উপর বর্তাবে এমতাবস্থায় যে, তাদের পাপ হ্রাস করা হবে না। অর্থাৎ যারা করবে তাদের পাপ আলাদা হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি সেই আমল লিখি, যা তারা অগ্রে পাঠায় এবং সেই আমল, যার চিহ্ন তাদের পেছনে থাকে”।
এখানে ‘পেছনের চিহ্ন’ বলে সেই আমলকে বুঝানো হয়েছে, যা আমলকারীর মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন আলেমের দুর্ভোগ অপরের অনুসরণের কারণে হয়ে থাকে। সে ভুল করলে তওবা করে নেয় ; কিন্তু মানুষ এরপরও তার অনুসরণ করতে থাকে এবং কাজটিকে ছড়াতে থাকে। জনৈক বুযুর্গ বলেন : আলেমের দোষ নৌকা ভেঙ্গে যাওয়ার মত। এতে নৌকা নিজেও নিমজ্জিত হয় এবং যাত্রীদেরকেও ডুবিয়ে দেয়। বনী ইসরাঈলের জনৈক আলেম মানুষকে বেদআত শিক্ষা দিয়ে গোমরাহ করত। পরবর্তীতে তার তওবা নসীব হয় এবং সে দীর্ঘকাল পর্যন্ত মানুষের সংস্কারে নিয়োজিত থাকে। আল্লাহ তা'আলা সমসাময়িক পয়গম্বরের কাছে এই মর্মে ওহী পাঠালেন যে, তাকে বলে দাও,
“যদি তুমি কেবল আমারই দোষ করতে, তবে আমি তোমাকে মাফ করে দিতাম। কিন্তু তুমি তো বহু মানুষকে গোমরাহ করেছ, যে কারণে আমি তাদেরকে দোযখে নিক্ষেপ করেছি"।
এ থেকে বুঝা গেল, আলেমদের দুটি বিষয় করা উচিত। প্রথমত, তারা মূলতই গোনাহ বর্জন করবে। দ্বিতীয়ত, যদি গোনাহ হয়ে যায়, তবে তা প্রকাশ করবে না।
আলেমদের গোনাহের শাস্তি যেমন বেশী হয়, তেমনি তাদের পুণ্যকর্মের সওয়াবও অন্যদের অনুসরণের কারণে বেশী হয়। উদাহরণতঃ যদি আলেম বাহ্যিক সাজসজ্জা ও দুনিয়ার মোহ বর্জন করে এবং অল্প দুনিয়া নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, তার এই রীতি অন্যরাও অবলম্বন করে, তবে অন্যরা যে পরিমাণ সওয়াব পাবে, তার সমস্তই সে-ও পাবে।
পরবর্তী পর্ব—
পূর্ণাঙ্গ তওবা ও তার শর্তাবলী

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন