রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ১১) পূর্ণাঙ্গ তওবা ও তার শর্তাবলী

 

তওবা - (পর্ব - ১১)
পূর্ণাঙ্গ তওবা ও তার শর্তাবলী

পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, তওবা সেই অনুশোচনাকে বলা হয়, যার ফলস্বরূপ সংকল্প অস্তিত্ব লাভ করে। নিজের এবং প্রেমাস্পদের মাঝে গোনাহের প্রাচীর খাড়া হওয়ার জ্ঞান হচ্ছে এই অনুশোচনার কারণ। সুতরাং তওবার অংশ হচ্ছে জ্ঞান, অনুশোচনা ও সংকল্প। এই অংশত্রয়ের প্রত্যেকটির জন্যে রয়েছে পূর্ণাঙ্গতার পরিচয় ও স্থায়িত্বের শর্তাবলী। এগুলো বর্ণনা করা জরুরী। জ্ঞানের বর্ণনা হচ্ছে তওবার কারণ বর্ণনার নামান্তর, যা পরে উল্লিখিত হবে। এখানে প্রথমে অনুশোচনা বলা হয় অন্তরের ব্যথাকে, যা প্রেমাস্পদকে হারানোর সংবাদ শুনে সৃষ্টি হয়। এর পরিচয় হচ্ছে অত্যধিক দুঃখ ও বেদনা হওয়া, অশ্রু বিসর্জন করা এবং প্রচুর কান্নাকাটি করা; যেমন কেউ আপন সন্তান অথবা কোন প্রিয়জনের বিপদ সম্পর্কে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করে এবং প্রচুর কান্নাকাটি করে।


এখন প্রশ্ন হল নিজের প্রাণের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কি, জাহান্নামের অগ্নির চেয়ে বড় বিপদ আর কি এবং গোনাহের চেয়ে বেশী আযাব নাযিল হওয়ার প্রমাণ কোন্‌টি? বরং একজন মানুষ যাকে চিকিৎসক বলা হয়, সে যদি কোন ব্যক্তিকে বলে দেয়, তোমার পুত্র দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে এবং সে অতিসত্ত্বর মারা যাবে, তবে তৎক্ষণাৎ সে দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পরে এবং কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। অথচ পুত্র প্রাণাধিক প্রিয় নয় এবং ডাক্তারও আল্লাহ ও রসূলের চেয়ে অধিক জ্ঞানী ও সত্যবাদী নয়। এ থেকে জানা গেল যে, মানুষের উচিত নিজের দুরবস্থার জন্যে অধিক দুশ্চিন্তা ও দুঃখ করা। দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও অনুতাপ যত বেশী হবে, সে পরিমাণে গোনাহ দূর হওয়ার আশা করা যাবে। মোটকথা, অন্তরের বিনম্রতা এবং অশ্রুপাত হল বিশুদ্ধ অনুশোচনার লক্ষণ। হাদীসে বর্ণিত আছে, তওবাকারীদের সংসর্গ অবলম্বন কর। তাদের অন্তর খুব নরম থাকে। অন্তরে গোনাহের স্বাদের পরিবর্তে তিক্ততা প্রতিষ্ঠিত হওয়াও অনুশোচনার একটি লক্ষণ। 


বর্ণিত আছে, বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি গোনাহ করার পর অনেক বছর পর্যন্ত এবাদতে মশগুল থাকে। কিন্তু তওবা কবুল হওয়ার কোন লক্ষণ প্রকাশ পেল না। অগত্যা সে সমসাময়িক পয়গম্বরের কাছে সুপারিশ প্রার্থী হল। পয়গম্বর আল্লাহর দরবারে তার জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ পাক এরশাদ করলেন: আমার ইযযত ও প্রতাপের কসম, যদি ভূ-পৃষ্ঠের সকলেই তার জন্যে সুপারিশ করে, তবুও আমি তার তওবা কবুল করব না- যতক্ষণ পর্যন্ত যে গুনাহ থেকে সে তওবা করেছে, তার স্বাদ তার অন্তরে থাকবে।

এখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, গোনাহ স্বাভাবিকভাবেই মানুষের কাছে সুস্বাদু হয়ে থাকে। সুতরাং এর তিক্ততা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হবে কিরূপে? জওয়াব এই যে, মনে কর কেউ বিষ মিশ্রিত মধু পান করল। অধিক মিষ্ট হওয়ার কারণে সে পান করার সময় বিষ টের পেল না। এরপর সে অসুস্থ হয়ে পড়ল, চুল বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল এবং সর্বাঙ্গ শক্ত হয়ে গেল। এখন যদি কেউ তার সামনে পূর্ববৎ বিষ মিশ্রিত মধু পেশ করে এবং সেও চরম ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত হয়, তবে সে এই মধুকে ঘৃণা করবে কি না? যদি বল করবে না তবে এটা অভিজ্ঞতার পরিপন্থী। নিয়ম এই যে, এহেন কষ্ট ভোগ করার পর যদি কেউ খাঁটি মধুও পেশ করে, তবে একরূপ রঙ দেখে তা-ও প্রত্যাখ্যান করবে। কথায় বলে চুন খেয়ে মুখ পুড়লে দৈ দেখলেও ভয় লাগে। অতএব, তওবাকারী ব্যক্তি অন্তরে গোনাহের যে তিক্ততা অনুভব করে, তাও এমনিভাবে বুঝা দরকার। প্রথমে সে জানে, প্রত্যেক গোনাহের স্বাদ মধুর মত মিষ্ট। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া বিষের অনুরূপ। এরূপ বিশ্বাস না হওয়া পর্যন্ত তওবা খাঁটি ও সাচ্চা হয় না। কিন্তু এরূপ বিশ্বাস খুব বিরল। তাই তওবা এবং তওবাকারীও বিরল। সকলেরই এক অবস্থা। তারা আল্লাহর প্রতি বিমুখ এবং গোনাহে অবিচল


এখন সংকল্প সম্পর্কে বলা যাক। এটা অনুশোচনা থেকে উৎপন্ন হয় এবং তিনটি কালের সাথেই এর সম্পর্ক। 

বর্তমানকালে সংকল্পের অর্থ এই যে, যে নিষিদ্ধ কাজ করে যাচ্ছে, তা বর্জন করবে এবং যে ফরয কর্ম করার উদ্যোগ নিয়েছে, তা তখনই আদায় করে নেবে। অতীতকালে সংকল্পের মানে এই যে, পূর্বে যে ত্রুটি হয়ে গেছে, তা পূরণ করবে। 

ভবিষ্যতকালে সংকল্পের উদ্দেশ্য হল মৃত্যু পর্যন্ত এবাদত-বন্দেগী অব্যাহত রাখবে এবং গোনাহ বর্জন করবে।

অতীতকালের সাথে সম্পর্কের দিক দিয়ে তওবা বিশুদ্ধ হওয়ার শর্ত এই যে, চিন্তা করে বের করবে কোন্ দিন সে বালেগ হয়েছিল। এটা জানা হয়ে গেলে সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত যতটুকু বয়স হয়েছে, তার এক এক বছর, মাস ও দিনের মধ্যে খোঁজ করে দেখবে কোন্ এবাদতে সে ত্রুটি করেছে অথবা কি পরিমাণ গোনাহ করেছে। যদি জানা যায় যে, কতক নামায সে পড়েনি, তবে সেই নামাযের কাযা পড়বে। এরূপ নামাযের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলে বালেগ হওয়ার দিন থেকে হিসাব করে যে পরিমাণ নামায নিশ্চিতরূপে আদায় করা হয়েছে, সেগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট নামাযের কাযা পড়বে। এরূপ নামাযের সংখ্যা আন্দাজ করে নেয়াও জায়েয। রোযার ক্ষেত্রেও এভাবে আন্দাজ করে নেবে, কয়টি রোযা রাখা হয়নি। এরপর সেগুলোর কাযা করে নেবে। যাকাত না দিয়ে থাকলে নিজের সমস্ত ধন -সম্পদকে দেখবে, কবে থেকে তার মালিকানায় এসেছে। তবে এতে বালেগ হওয়ার শর্ত নেই। কেননা, নাবালেগের মালেও যাকাত ফরয হয়। অতঃপর হিসাব করে প্রবল ধারণা অনুযায়ী যে পরিমাণ যাকাত ওয়াজিব হবে, তা আদায় করে দেবে। এ হচ্ছে এবাদতে খোঁজাখুঁজি করে ত্রুটি জানা ও তা পূরণ করার পদ্ধতি।


গোনাহের ক্ষেত্রে উপায় এই যে, বালেগ হওয়ার শুরু থেকে তওবার দিন পর্যন্ত নিজের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গোনাহ দিন ও ঘন্টায় চিন্তা করবে এবং পৃথক পৃথক গোনাহ সম্পর্কে অবগতি লাভ করবে। এরপর দেখবে এসব গোনাহের কোন্ কোন্‌টি আল্লাহর হক সম্পর্কিত এবং কোন্ কোন্‌টি বান্দার হক সম্পর্কিত। যে সকল গোনাহ্ আল্লাহর হক সম্পর্কিত, সেগুলো থেকে তওবার উপায় হচ্ছে দুঃখ ও অনুতাপ করা এবং প্রত্যেক গোনাহের বিনিময়ে সৎকর্ম করা। এমতাবস্থায় যে পরিমাণ গোনাহ হবে, সে পরিমাণে সৎকর্ম করতে হবে। কারণ, হাদীসে আছে — "তুমি যেখানেই থাক, আল্লাহকে ভয় কর এবং গোনাহের পশ্চাতে সৎকর্ম সম্পাদন কর;" বরং কোরআন পাকে বলা হয়েছে, “সৎকর্ম পাপকে মিটিয়ে দেয়”।

এই বিনিময়ের কয়েকটি দৃষ্টান্ত এই যে, যদি কেউ বাদ্যযন্ত্র শুনে থাকে, তবে তার বিনিময়ে ততক্ষণ কোরআন, ওয়ায অথবা যিকর শুনবে। মসজিদে নাপাক অবস্থায় বসে থাকলে, ততক্ষণ এতেকাফের নিয়তে বসে এবাদতে মশগুল হবে। উযু ছাড়া কোরআন মজীদ স্পর্শ করে থাকলে তার সম্মান করবে, অধিক পরিমাণে তেলাওয়াত করবে এবং চুম্বন করবে। মদ্যপান করে থাকলে হালাল উপার্জনের শরবত সদকা করবে। উদ্দেশ্য এই যে, প্রত্যেক গোনাহের বিপরীত পদ্ধতি দ্বারা সেই গোনাহের বিপরীত সৎকর্মের আলো ছাড়া দূর হবে না। উদাহরণতঃ কাল রঙ দূর করতে হলে সাদা রঙ প্রয়োগ করতে হবে। উত্তাপ ও শৈত্য দ্বারা তা দূর হবে না। গোনাহ দূর করার জন্যে এ পদ্ধতি অধিক ফলপ্রসূ ও সহজ – যদিও এক প্রকার এবাদত অব্যাহতভাবে করতে থাকলেও কিছুটা ফল লাভের আশা আছে। বিপরীত পদ্ধতি দ্বারা গোনাহ দূর হওয়ার কারণ এই যে, দুনিয়ার মোহ সকল গোনাহের মূল শিকড়। দুনিয়ার অনুগামী হওয়ার প্রভাবে অন্তর দুনিয়ার প্রতি তুষ্ট থাকে এবং তৎপ্রতি আগ্রহান্বিত হয়। 

অতএব, মুসলমান ব্যক্তির উপর এমন বিপদ আসা জরুরী, যা দ্বারা তার অন্তর দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কেননা, দুঃখ ও বেদনার কারণে অন্তর দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়। এটাও তার জন্যে গোনাহের কাফফারা হয়ে যায়।


হাদীসে আছে, কতক গোনাহের জন্য কেবল দুঃখ ও বেদনাই হয়ে থাকে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত এক রেওয়ায়েতে এরশাদ হয়েছে— যখন বান্দার গোনাহ বেশী হয়ে যায় এবং কাফফারার জন্যে আমল থাকে না, তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে অনেক দুঃখ ও কষ্টে ফেলে দেন এবং এ দুঃখ-কষ্টই তার গোনাহের কাফ্ফা হয়ে যায়।


এখানে প্রশ্ন হতে পারে যে, মানুষের দুঃখ-কষ্ট অধিকাংশ ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও জাঁকজমকের কারণে হয়ে থাকে। এটা গোনাহ। সুতরাং গোনাহের কাফফারা গোনাহ কিরূপে হবে? এর জওয়াব এই যে, ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততির মহব্বত গোনাহ এবং এগুলো থেকে বঞ্চিত থাকা এ গোনাহের বিনিময়। মহব্বতের চাহিদা অনুযায়ী ভোগ করলে পূর্ণ দোষী হত। 

বর্ণিত আছে, হযরত জিবরাঈল বন্দীশালায় হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর কাছে গমন করলে তিনি জিবরাঈলকে জিজ্ঞেস করলেন : সেই দরদী বৃদ্ধ অর্থাৎ হযরত এয়াকুব (আঃ)-কে কি অবস্থায় রেখে এসেছেন? জিবরাঈল (আঃ) বললেন : তিনি আপনার জন্যে যে দুঃখ সয়েছেন, তা এমন একশ' জন মহিলার দুঃখের সমান, যাদের সন্তান মারা গেছে। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন : তিনি আল্লাহর কাছে এই দুঃখ-কষ্টের সওয়াব কি পরিমাণে পাবেন? উত্তর হল : তিনি শহীদের অনুরূপ সওয়াব পাবেন। এ থেকে বুঝা গেল, দুঃখ-কষ্টও আল্লাহর হকের কাফ্ফারা হয়ে থাকে।


পরবর্তী পর্ব

বান্দার হক সম্পর্কিত তওবা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...