শনিবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৩

মহব্বত (পর্ব- ১২) রিযার স্বরূপ ও ফযীলত



মহব্বত (পর্ব- ১২)
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
রিযার স্বরূপ ও ফযীলত :
পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে, রিযা তথা সন্তুষ্টি মহব্বতের অন্যতম ফল এবং নৈকট্যশীলদের একটি উচ্চতম মকাম। এর স্বরূপ অনেকেরই অজানা। আল্লাহ তা'আলা যাদেরকে যথার্থ জ্ঞান ও বোধশক্তি দান করেছেন, তারাই এর সামঞ্জস্য ও অস্পষ্টতার সমাধান ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। অতএব রিযার স্বরূপ, ফযীলত ও রিযাবিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিষয় বর্ণনা করা প্রয়োজন। রিযার ফযীলত সম্পর্কে আয়াতসমূহ নিম্নরূপ :
>”আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।
>”অনুগ্রহের প্রতিদান অনুগ্রহই হতে পারে”
চূড়ান্ত অনুগ্রহ হচ্ছে বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি। এটা তখনই হয়, যখন বান্দা আল্লাহ তা'আলার প্রতি সন্তুষ্ট হয়।
"বসবাসের উদ্যানসমূহে পরিচ্ছন্ন ভবন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি সর্ববৃহৎ”। এ আয়াতে আল্লাহ পাক নিজের সন্তুষ্টিকে বসবাসের জান্নাত থেকে বৃহৎ বলেছেন। আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টিই জান্নাতবাসীদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,–
>“আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে মুমিনদের জন্যে জ্যোতি বিকিরণ করবেন এবং বলবেন : আমার কাছে প্রার্থনা কর। মুমিনরা আরয করবে- আমরা তোমার রিযা চাই। দীদারের পর এই রিযা প্রার্থনা করা থেকে রিযার অসাধারণ ফযীলত জানা যায়। আল্লাহ তা'আলার প্রতি বান্দার সন্তুষ্টির অর্থ পরে উল্লিখিত হবে। এখানে বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে। এর অর্থ বান্দার সাথে আল্লাহর মহব্বতের অর্থের কাছাকাছি, যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। এর স্বরূপ সম্পূর্ণ উন্মোচিত করা জায়েয নয়। কারণ, এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি অপারগ। যে ব্যক্তি এটা অর্জন করতে সক্ষম, তাকে অন্যের বলে দেয়ার প্রয়োজন হয় না। সে নিজে নিজেই এর স্বরূপ জেনে নেয়। সারকথা, আল্লাহ তা'আলার দীদারের চেয়ে বড় কোন মর্তবা নেই। দীদার লাভের পর জান্নাতীরা যে রিযা প্রার্থনা করেছে, তার কারণ রিযা হল, স্থায়ী দীদারের উপায়। তাই তারা রিযা প্রার্থনা করে যেন এটাই প্রার্থনা করেছে যে, আমাদের দীদার স্থায়ী হোক।

>“আমার কাছে আরও বেশি আছে”।
আল্লাহ তা'আলার এই উক্তির তাফসীর প্রসঙ্গে জনৈক তাফসীরকার লিখেন– জান্নাতীদের কাছে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তিনটি উপঢৌকন আসবে। এক, আল্লাহ তা'আলার তরফ থেকে এমন একটি হাদিয়া, যার তুলনা জান্নাতীদের কাছে থাকবে না। এই হাদিয়ার কথা নিম্নোক্ত আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে -
>“তাদের জন্যে যে কি চোখের শান্তি নিহিত রাখা হয়েছে, তা কেউ জানে না।”
দ্বিতীয় উপঢৌকন হল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদেরকে সালাম। এটা হবে প্রথম হাদিয়া থেকে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ পাক এরশাদ করেন :
>”দয়ালু পালন কর্তার পক্ষ থেকে সালাম বলা হবে।”
তৃতীয়, আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন-
>”আমি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট।”
এটা হাদিয়া ও সালাম উভয়টি থেকে শ্রেষ্ঠ। তাই আল্লাহ পাক বলেন–
>”আল্লাহর তরফ থেকে সন্তুষ্টি সর্ববৃহৎ”।
এ থেকে খোদায়ী সন্তুষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব জানা গেল। রিযার ফযীলত হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত।
বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) একদল সাহাবীকে জিজ্ঞেস করলেন : তোমরা কি? তারা আরয করলেন : আমরা ঈমানদার। তিনি প্রশ্ন করলেন : তোমাদের ঈমানের লক্ষণ কি? তারা আরয করলেন : আমরা বালা মুসীবতে সবর করি, স্বাচ্ছন্দ্যে শোকর করি এবং আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকি। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : কা'বার পালনকর্তার কসম, তোমরা ঈমানদার।
অন্য এক হাদীসে আছে,
>”মোবারকবাদ সে ব্যক্তিকে, যাকে ইসলামের পথপ্রদর্শন করা হয়, যার রূযী প্রয়োজন পরিমাণে এবং সে তাতে রাযী।”
আরও এরশাদ হয়েছে -
>”যে অল্প রিযিকে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ অল্প আমলে তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন।
আরও বলা হয়েছে-
>”কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের একদল লোকের প্রতি কৃপা করবেন। তারা তাদের কবর থেকে উড়ে জান্নাতের দিকে যাবে এবং যেভাবে ইচ্ছা সেখানে আনন্দ-উল্লাস করবে।
ফেরেশতারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে- ‘তোমরা কি পুলসিরাত পার হয়ে এসেছ’? তারা জওয়াব দেবে ‘আমরা তো পুলসিরাত দেখিনি’।
আবার প্রশ্ন করা হবে- ‘তোমরা কি দোযখ দেখেছ’?
তারা বলবে, আমরা তো কিছুই দেখিনি’।
ফেরেশতারা বলবে- ‘তাহলে তোমরা কোন্ পয়গাম্বরের উম্মত? তারা বলবে-
‘আমরা মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনার উম্মত’।
তারা শুধাবে, ‘আমরা কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, সত্য বল দুনিয়াতে তোমাদের আমল কি ছিল? তারা জওয়াব দিবে, ‘দুনিয়াতে আমাদের মধ্যে দুটি চরিত্র বিদ্যমান ছিল, যে কারণে আল্লাহ তা'আলার কৃপায় আমরা এ মর্তবায় পৌঁছেছি। প্রথম, আমরা যখন একাকী থাকতাম, তখন আল্লাহ তা'আলার নাফরমানী করতে লজ্জাবোধ করতাম। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্যে যা নির্দিষ্ট করতেন, তাতেই আমরা রাযী থাকতাম।’
ফেরেশতারা বলবে, ‘তাহলে তো তোমাদের এ অবস্থা হওয়াই উচিত’।”
অন্য এক হাদীসে আছে -
>”হে দরিদ্র শ্রেণী, তোমরা অন্তরের অন্তস্তল থেকে আল্লাহকে সন্তুষ্টি নিবেদন কর। তা হলে দারিদ্যের সওয়াব লাভে সফল হবে। অন্যথায় নয়।”
একবার বনী ইসরাঈল হযরত মূসা (আঃ)-এর খেদমতে আরয করল : আপনি আল্লাহ তা'আলার কাছে আমাদের জন্যে এমন কোন কাজের কথা জিজ্ঞেস করুন, যা করলে তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। মূসা (আঃ) আল্লাহর দরবারে আরয করলেন : ইলাহী, তারা যা বলে তা আপনি শুনেছেন। আদেশ হল : হে মূসা, তাদেরকে বলেদিন, তারা যেন আমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, যাতে আমি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকি। এমনিভাবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তিনিও এরশাদ করেন,
>”সে পছন্দ করে যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে তার যা আছে, তা জেনে নেবে, সে যেন দেখে, তার কাছে আল্লাহ তা'আলার জন্যে কি আছে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে নিজের কাছে সে স্তরে রাখেন, যে স্তরে বান্দা নিজের কাছে আল্লাহ তা'আলাকে রাখে।”
হযরত মূসা (আঃ) তার মোনাজাতে আরয করলেন : ইলাহী ! আপনার সৃষ্টির মধ্যে কে আপনার কাছে সর্বাধিক প্রিয়? এরশাদ হল – “যার কাছ থেকে আমি তার প্রিয়বস্তু নিয়ে নিলে সে আমার সাথে অনরঙ্গ সম্বন্ধ রাখে।
মূসা (আঃ) আরয করলেন : সে ব্যক্তি কে, যার প্রতি আপনি অসন্তুষ্ট হন? এরশাদ হল– যে কোন কাজে আমার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করে, এরপর যখন আমি আদেশ দিয়ে দেই, তখন সে নাখোশ হয়।
অন্য এক রেওয়ায়েত আরও কঠোর। আল্লাহ পাক বলেন :
>”আমি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। যে ব্যক্তি আমার দেয়া মুসীবতে সবর করে না, আমার নেয়ামতের শোকর করে না এবং আমার ফয়সালায় রাযী থাকে না, তার উচিত আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ বানিয়ে নেয়া।”
এরই অনুরূপ একটি হাদীসে কুদসী রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) থেকেও বর্ণিত আছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
>”আমি তাকদীর নির্ধারণ করেছি এবং কাজকর্ম সংহত করেছি। এখন যে রাযী হবে, তার প্রতি আমি রাযী আমার সাথে সাক্ষাত পর্যন্ত, আর যে নাখোশ হবে, তার জন্যে আমার অসন্তুষ্টি আমার কাছে আসা পর্যন্ত।”
অন্য এক হাদীসে কুদসীতে এরশাদ রয়েছে–
>”আমি ভাল-মন্দ উভয়টি সৃষ্টি করেছি। এখন সে ব্যক্তি ভাল, যাকে আমি কল্যাণের জন্যে সৃষ্টি করেছি এবং কল্যাণের পথে পরিচালিত করি। আর সে ব্যক্তি মন্দ, যাকে আমি অমঙ্গলের জন্যে সৃষ্টি করেছি এবং অমঙ্গলের পথে চালনা করি। সে ব্যক্তির জন্যে ধ্বংসই ধ্বংস, যে বিতর্ক ও প্রশ্ন করে।”

বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা হযরত দাউদ (আঃ)-এর কাছে ওহী পাঠালেন-
>”হে দাউদ, আপনি বাসনা করেন, আমিও বাসনা করি ; কিন্তু হবে তাই, যা আমি বাসনা করি। যদি আপনি আমার বাসনায় রাযী থাকেন, তবে আপনার বাসনার জন্যে আমি যথেষ্ট হব। পক্ষান্তরে যদি আপনি আমার বাসনা অমান্য করেন, তবে আপনার বাসনায় আমি আপনাকে পরিশ্রমে ফেলে দেব, এরপর হবে তাই, যা আমি চাইব।
মনীষীদের উক্তিসমূহেও রিযার অনেক ফযীলত পাওয়া যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : সর্বপ্রথম যাদেরকে জান্নাতে ডাকা হবে, তারা হবে এমন লোক, যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করে। অর্থাৎ, সর্বাবস্থায় রাযী থাকে। মায়মূন ইবনে মহরান বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় রাযী হয় না, তার নির্বুদ্ধিতার কোন প্রতিকার নেই। আবদুল আযীয ইবনে আবু রোয়াদ (রঃ) বলেন : সিরকা দিয়ে যবের রুটি খাওয়া ও পশমী পোশাক পরার মধ্যে জাঁকজমক নেই ; বরং জাঁকজমক হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় রাযী থাকার মধ্যে।
এক ব্যক্তি মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসের পায়ে যখম দেখে বলল : এই যখমের কারণে আপনার প্রতি আমার করুণা হয়। তিনি বললেন : এই যখম হওয়ার পর থেকে আমি আল্লাহ তা'আলার শোকর করছি যে, এটা আমার চোখে হয়নি।
বনী ইসরাঈলের কাহিনীতে বর্ণিত আছে, জনৈক ব্যক্তি দীর্ঘদিন পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার এবাদত করে। তাঁকে স্বপ্নে দেখানো হয় যে, অমুক মহিলা– যে ছাগল চরায়, সে জান্নাতে তোমার সঙ্গিনী হবে। আবেদ পর দিন সেই মহিলার খোঁজে বের হল এবং লোকের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার সন্ধান পেল। সে মহিলার আমল দেখার উদ্দেশ্যে তিন দিন তার বাড়িতে অবস্থান করল। এ সময় আবেদ নিজে সারারাত দাঁড়িয়ে এবাদত করত ; কিন্তু মহিলা আরামে ঘুমিয়ে থাকত। দিনের বেলায় আবেদ রোযা রাখত, আর মহিলা পানাহার করত। একদিন আবেদ তাকে জিজ্ঞেস করল : তোমার এ ছাড়া আরও কোন আমল আছে কি? মহিলা বলল : আর কিছু নেই। আপনি যা দেখেছেন, তাই। আমি নিজের মধ্যে অন্য কোন আমল জানি না।
আবেদ বলল : ভাল করে স্মরণ করে বল আরও কোন আমল আছে কিনা? হাঁ আমার মধ্যে আর একটি ছোট-খাটো অভ্যাস আছে। তা এই যে, আমি সংকটে পড়ে কোন সময় বাসনা করি না যে, আমার অবস্থা আরও ভাল হোক। রুগ্ন হয়ে আশা করি না যে, সুস্বাস্থ্য ফিরে আসুক। যদি রৌদ্রে থাকি, তবে ছায়ার প্রত্যাশী হই না।
এ কথা শুনে আবেদ নিজের মাথায় হাত রেখে বলল : এটা ছোটখাটো অভ্যাস নয় ; বরং এতই বড়, যা অর্জন করতে আবেদ অক্ষম।
জা'ফর ইবনে সোলায়মান হযরত রাবেয়া বসরীকে প্রশ্ন করলেন : বান্দা আল্লাহর প্রতি রাযী– একথা কখন বলা যায়? তিনি বললেন : যখন বিপদেও ততখানি খুশী হয়, যতখানি নেয়ামত পেয়ে হয়।
হযরত ফুযায়ল বলতেন– আল্লাহ তা'আলার দেয়া না দেয়া উভয়ই যখন বান্দার কাছে সমান হয়ে যায়, তখন সে আল্লাহর প্রতি রাযী হয়ে যায়।

পরবর্তী পর্ব-

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...