জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২০)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
তর্কশাস্ত্রে মানুষের মনোযোগী হওয়ার কারণ-
প্রকাশ থাকে যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পরে খোলাফায়ে রাশেদীন খেলাফতের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তাঁরা ছিলেন একাধারে আলেম বিল্লাহ (আল্লাহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানী), তাঁর বিধি-বিধান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়ে ফতোয়া দানের ব্যাপারে পারদর্শী। এ কারণেই ফেকাহবিদদের কাছ থেকে সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন তাঁদের কমই হত। কেবল যেসব ব্যাপারে পরামর্শ ছাড়া উপায় ছিল না, সেগুলোতেই ফেকাহবিদদের প্রয়োজন দেখা দিত। এজন্যই আলেমগণ একনিষ্ঠভাবে আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রেই নিয়োজিত ছিলেন এবং তাঁদের অন্য কোন বৃত্তি ছিল না। তাঁরা আইনের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং এ নিয়ে বিতর্ক এড়িয়ে চলতেন এবং এ দায়িত্ব একে অপরের উপর ন্যস্ত করতেন। তাঁরা সর্বপ্রযত্নে আল্লাহ তা'আলার দিকে মনোযোগী ছিলেন। তাদের জীবনালেখ্য থেকে এ কথাই জানা যায়।
পরবর্তী পর্যায়ে এক শ্রেণীর আলেম যোগ্যতা এবং বিধি-বিধান ও ফতোয়া সম্পর্কে প্রগাঢ় জ্ঞান ছাড়াই শাসন কর্তৃত্বের বিভিন্ন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে তাদেরকে বাধ্য হয়ে ফেকাহবিদদের সাহায্য গ্রহণ করতে হয় এবং সর্বাস্থায় তাদেরকে সঙ্গে রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন তাবেয়ী আলেমগণের মধ্যে যাঁরা অবশিষ্ট ছিলেন, তাঁরা প্রথম যুগের রীতি-নীতিতে অভ্যস্ত, খাঁটি দ্বীনের অনুসারী এবং পূর্বসূরিদের পদাংক অনুসরণকারী ছিলেন।
ফলে শাসকবর্গ তাঁদেরকে ডাকলে তাঁরা পালিয়ে ফিরতেন এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতেন। তাই বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের বিভিন্ন পদ দান করার জন্যে শাসকবর্গ আলেমগণকে পীড়াপীড়ি করত। খলীফা, ইমাম ও প্রশাসন সবাই আলেমগণের তোয়াজ করতেন, কিন্তু আলেমগণ তাদের হাতে ধরা দিতেন না। সমসাময়িক লোকেরা যখন আলেমগণের এই সম্মান প্রত্যক্ষ করল, তখন তারা এলেম হাসিল করার প্রতি মনোনিবেশ করল, যাতে শাসকবর্গের কাছে সম্মান ও প্রতিপত্তি লাভ করা যায়। তারা ফতোয়া শাস্ত্রের প্রতি ঝুঁকে পড়ল এবং নিজেদেরকে শাসকবর্গের সামনে উপস্থাপন করল। তাদের সাথে পরিচিত হয়ে বিভিন্ন পদ ও পুরস্কার লাভ করল।
কিছু সংখ্যক তো এর পরেও বঞ্চিত রইল এবং কিছু সংখ্যকের উদ্দেশ্য সফল হল। যারা সফল হল, তারাও চাওয়ার লাঞ্ছনা এবং অনাহূত অবস্থায় দন্ডায়মান হওয়ার অবমাননা থেকে বাঁচতে পারল না। মোট কথা, যে ফেকাহবিদগণ পূর্বে প্রার্থিত ছিল, তারা এখন প্রার্থী হয়ে গেল। পূর্বে যারা শাসকবর্গের হাতে ধরা দিত না এবং সম্মানিত ছিল, এখন তাদের কাছে এসে তারা লাঞ্ছিত হন। কিন্তু এর পরেও যেসব আলেম তওফীকপ্রাপ্ত হলেন, তাঁরা সর্বদাই এই লাঞ্ছনা থেকে মুক্ত রইলেন। সে যুগে মানুষের অধিকাংশ মনোযোগ ফতোয়া ও বিচার বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রের প্রতি নিবদ্ধ ছিল। কেননা, পদ ও শাসনক্ষমতা লাভে এরই প্রয়োজন ছিল বেশী। তাদের পরে আকায়েদের রীতিনীতি সম্পর্কে মানুষের আলোচনা শুনে কিছু সংখ্যক শাসকের মনে কারণসমূহের প্রমাণাদি শুনার আগ্রহ সৃষ্টি হল। জনসাধারণ যখন জানতে পারল, এই শাসকগণ কালাম শাস্ত্রের মোনাযারা ও বিতর্কের প্রতি আগ্রহী, তখন তারা এরই চর্চা শুরু করে দিল। এতে অনেক গ্রন্থ রচিত হল এবং বিতর্কের পদ্ধতি, প্রতিপক্ষের বক্তব্যে আপত্তি উত্থাপনের পন্থা আবিষ্কৃত হল। তারা মনে করল, আল্লাহর দ্বীনের পক্ষ থেকে মন্দ বিষয়সমূহ প্রতিহত করা, সুন্নতের পক্ষ থেকে লড়াই করা এবং বেদআতের মূলোৎপাটন করাই আমাদের লক্ষ্য। যেমন- তাদের পূর্বসূরি ফেকাহবিদগণ বলতেন, তাদের উদ্দেশ্য ফতোয়া উত্তমরূপে জানা এবং মুসলমানদের প্রয়োজনীয় বিধি-বিধানের দায়িত্ব নেয়া।
এর কিছুকাল পরে এমন শাসকশ্রেণী আগমন করল, যারা কালাম শাস্ত্রের গবেষণা পছন্দের দৃষ্টিতে দেখল না। কারণ, এতে বিতর্কের দ্বার খুলে যাওয়ায় পারস্পরিক বিদ্বেষ ও কলহ সৃষ্টি হয়। এমনকি, খুনাখুনি এবং জনপদ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু তারা ফেকাহ সম্পর্কিত মোনাযারা, বিশেষতঃ ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আযম (রহঃ)-এর মাযহাবের উত্তম বিধান জানার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে। সেমতে জনসাধারণ কালাম শাস্ত্র ও অন্যান্য শাস্ত্র বাদ দিয়ে এই ইমামদ্বয়ের মধ্যে বিরোধীয় মাসআলাসমূহের প্রতি ঝুঁকে পড়ে।
ইমাম মালেক, আহমদ ও সুফিয়ান সওরী (রহঃ)-এর মধ্যেকার মতভেদসমূহের প্রতি তারা তেমন কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করেনি। তারা নিজেদের খামখেয়ালীতে একথা বুঝে নেয় যে, তাদের উদ্দেশ্য শরীয়তের সূক্ষ্ম বিষয়াদি বের করা, দ্বীনের কারণসমূহ সপ্রমাণ করা এবং ফতোয়ার মূলনীতির ভিত্তি স্থাপন করা। এ সম্পর্কে তারা অনেক গ্রন্থ রচনা করে, যাতে নানারকম বিতর্ক লিপিবদ্ধ করা হয়। জনসাধারণ এখন পর্যন্ত এ নীতিই অনুসরণ করে আসছে। জানি না, আমাদের পরবর্তী যমানায় আল্লাহ তা'আলা কি অবধারিত করে রেখেছেন। মোট কথা, মতভেদ ও মোনাযারার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার এটাই ছিল কারণ। যদি শাসকশ্রেণী এগুলো ছাড়া অন্য কোন শাস্ত্রের প্রতি আগ্রহী হয়ে যায়, তবে আলেমরাও তাদের অনুগামী হবে এবং এ বাহানা পেশ করা থেকে বিরত হবে না যে, যে শাস্ত্রে তারা মশগুল রয়েছে সেটা ধর্মীয় শাস্ত্র এবং আল্লাহ তাআ'লার নৈকট্য ছাড়া তাদের অন্য কিছু কাম্য নয়।
পরবর্তী পর্ব
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন