বুধবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (২১) মোনাযারা


জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২১)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মোনাযারা
জানা উচিত, একশ্রেণীর আলেম কোন কোন সময় মানুষকে এই বলে বিভ্রান্ত করে যে, তাদের মোনাযারা বা বিতর্ক করার উদ্দেশ্য এমন বিষয়ে আলোচনা, যাতে সত্য প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে। কেননা সত্য কাম্য। চিন্তায় একে অন্যের সাহায্য করা এবং অনেক লোকের ঐকমত্য হওয়া নিঃসন্দেহে উপকারী। সাহাবায়ে কেরামও এ উদ্দেশ্যেই পরস্পর পরামর্শ করতেন। উদাহরণতঃ তাঁরা দাদা বিদ্যমান থাকলে পৌত্রদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, মদ্যপানের শাস্তি, ফরায়েযের মাসআলা ইত্যাদি বিষয়ে পরস্পর পরামর্শ করতেন। ইমাম শাফেয়ী, আহমদ, মুহাম্মদ, মালেক, আবু ইউসুফ (রহঃ) প্রমুখ ইমাম থেকে বর্ণিত মতভেদও এ বিষয়ে সহায়ক। আমি তোমাকে এ বিভ্রান্তির অন্তর্নিহিত রহস্য বলে দিচ্ছি, সত্য বিষয়ে একে অপরের কাছে সাহায্য চাওয়া অবশ্যই ধর্মসিদ্ধ। কিন্তু এর জন্যে কয়েকটি শর্ত ও আলামত রয়েছে।
প্রথম, মোনাযারা যেহেতু ফরযে কেফায়া। কাজেই যেব্যক্তি ফরযে আইন সমাপ্ত করেনি, তার পক্ষে এতে ব্যাপৃত হওয়া উচিত নয়। যা উপর ফরযে আইন রয়েছে, সে যদি ফরযে কেফায়ায় ব্যাপৃত হয় এবং বলে, তার উদ্দেশ্য সত্যান্বেষণ, তবে সে মিথ্যাবাদী। সে সে ব্যক্তিরই মত, যে নিজে নামায পড়ে না এবং বস্ত্র বয়নে ব্যাপৃত থেকে বলে : আমার উদ্দেশ্য যারা উলঙ্গ অবস্থায় নামায পড়ে এবং পোশাক পায় না, তাদের সতর আবৃত করা। কেননা, এরূপ হওয়া সম্ভবপর এবং বাস্তবে কখনও এরূপ হয়েও থাকে। যেমন, ফেকাহবিদগণ বলেন, তাদের বিরোধপূর্ণ বিষয়সমূহ বাস্তবে সংঘটিত হওয়া সম্ভবপর, যদিও কম সংঘটিত হয়। আজ যারা মোনাযারায় ব্যাপৃত থাকে তারা সর্বসম্মতিক্রমে ফরযে আইন বিষয়সমূহ বর্জন করে বসেছে। যদি কারও উপর তাৎক্ষণিকভাবে কোন আমানত আদায় করা ওয়াজেব হয়ে থাকে এবং সে তাতে অবহেলা করার বাহানারূপে নামায পড়তে থাকে, যা বাহ্যতঃ সর্বোত্তম সওয়াবের কাজ, তবে বলাবাহুল্য, এ নামায দ্বারা সে আল্লাহ তাআ'লার নাফরমানই হবে। এ থেকে জানা গেল, আনুগত্যের কোন কাজ করাই মানুষের আনুগত্যশীল হওয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়, যে পর্যন্ত না তাতে সময়, শর্ত ও ধারাবাহিকতা লক্ষ্য রাখা হয় ।
দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে, মোনাযারা অপেক্ষা অন্য কোন ফরযে কেফায়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ না দেখা। যদি অন্য কোন ফরযে কেফায়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, এরপরও মোনাযারায় ব্যাপৃত হয়, তবে সে নাফরমান হবে। তার দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোন ব্যক্তি একদল মানুষকে পিপাসায় কাতর হতে দেখে, কেউ যাদের খবর নেয় না। কিন্তু সে তাদেরকে পানি পান করাতে সক্ষম। এমতাবস্থায় সে পানি পান না করিয়ে যদি শিংগা লাগানোর কৌশল শিক্ষা করতে ব্যাপৃত হয় এবং বলে, এটা শিক্ষা করা ফরযে কেফায়া; শহরে এরূপ কুশলী ব্যক্তি না থাকলে শহরবাসীরা রোগে কষ্ট পাবে। যদি তাকে কেউ বলে, শহরে শিংগা লাগানোর লোক পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যমান আছে, তবে সে বলে, এতে এ কাজটি যে ফরযে কেফায়া, তা তো বিলুপ্ত হয় না। মোট কথা, যেব্যক্তি এরূপ করে এবং নেহায়েত জরুরী কাজটি করে না, অর্থাৎ পিপাসার্ত মুসলমানদেরকে পানি পান করায় না, তার অবস্থা এ ব্যক্তির মতই, যে মোনাযারাকে ফরযে কেফায়া মনে করে তাতে ব্যাপৃত থাকে এবং অন্য যেসব ফরযে কেফায়া কেউ পালন করে না, তাতে তৎপর হয় না।
উদাহরণতঃ ফতোয়ার কথাই বলা যাক, এর জন্যে অনেক লোক রয়েছে। প্রত্যেক শহরে কিছু না কিছু ফরযে কেফায়া পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। যেমন অধিকাংশ শহরে মুসলমান চিকিৎসক নেই, যার সাক্ষ্য চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়াদিতে শরীয়তের আইনে গ্রাহ্য হয়। অথচ ফেকাহবিদদের মধ্যে কারও চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রতি উৎসাহ নেই।
অনুরূপভাবে সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা একটি ফরযে কেফায়া। যারা মোনাযারা করে, তাদের অধিকাংশই মোনাযারার মজলিসে রেশমী পোশাক অথবা রেশমী ফরাশ বিছানো দেখে। অথচ সে এমন বিষয়ে মোনাযারা করে, যার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। যদিও থাকে, তবে তার বর্ণনাকারী থাকে অনেক। এরপরও তারা বলে, তারা ফরযে কেফায়ায় মশগুল হয়ে আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য কামনা করে।
হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করল : সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ কখন বর্জিত হবে? তিনি বললেন : “যখন তোমাদের চেয়ে উত্তম লোকদের মধ্যে শৈথিল্য দেখা দেবে, বড়দের মধ্যে নির্লজ্জতা ও ছোটদের মধ্যে রাজত্ব চলে আসবে এবং নীচদের মধ্যে ফেকাহ্ তথা ধর্মীয় জ্ঞান।”
তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, যে মোনাযারা করবে তার মুজতাহিদ হতে হবে। অর্থাৎ নিজের অভিমত অনুসারে ফতোয়া দেয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আযম (রঃ) প্রমুখের মযহাবের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে ফতোয়া দেবে না। এমনকি, সে যদি সত্য বিষয়টি ইমাম আযমের মযহাব থেকে জানতে পারে, তবে ইমাম শাফেয়ীর বক্তব্য বর্জন করবে এবং সত্য যা জানবে তদনুযায়ী ফতোয়া দেবে। সাহাবায়ে কেরাম ও ইমামগণ তাই করতেন। যেব্যক্তি ইজতিহাদের স্তরে উন্নীত হয়, তাকে কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হলে সে তার ইমামের উক্তি বর্ণনা করে দেয়। তার ইমামের মযহাবে কিছু দুর্বলতা জানতে পারলে সে তা বর্জন করে না। এরূপ ব্যক্তির মোনাযারায় ফায়দা নেই।
চতুর্থ শর্ত হচ্ছে, মোনাযারা এমন বিষয়ে করবে, যা হয়ে গেছে অথবা সত্বরই হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কেননা, সাহাবায়ে কেরাম এমনি ধরনের ঘটনাবলীতে পরামর্শ করেছেন, যা নতুন সংঘটিত হত অথবা প্রায়ই সংঘটিত হত। যেমন, ফরায়েযের বিষয়সমূহ। কিন্তু আজকাল যারা মোনাযারা করে, তাদেরকে এরূপ করতে দেখা যায় না। যেসব ব্যাপারে মানুষ প্রায়ই লিপ্ত হয়, সেগুলোর তথ্যানুসন্ধানে তারা প্রয়াস চালায় না; বরং এমন ব্যাপার তালাশ করে, যাতে কোন না কোন দিক দিয়ে বিবাদের অবকাশ থাকে। যেসকল ঘটনা সচরাচর ঘটে থাকে, সেগুলো প্রায়ই ছেড়ে দেয়া হয় এবং বলা হয়, এ বিষয়টি হাদীসের সাথে সম্পর্কযুক্ত অথবা এটা নিতান্ত ছোটখাট ব্যাপার। আশ্চর্যের বিষয়, উদ্দেশ্য তো সত্যানুসন্ধান, অথচ হাদীসের দোহাই দিয়ে বিষয়টি ছেড়ে দেয়া হয় অথবা ছোটখাট বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়! সত্য বিষয়ে তো সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে অভীষ্টে পৌছে যাওয়াই কাম্য হয়ে থাকে। দীর্ঘ আলোচনা কাম্য নয়।
পঞ্চম শর্ত, মজলিসে এবং আমীর ও শাসকদের সামনে মোনাযারা করা অপেক্ষা নির্জনতায় ও একান্তে মোনাযারা করা উত্তম মনে হতে হবে। কেননা, নির্জনতায় সাহস, চিন্তা-ভাবনা একত্রিত ও পরিষ্কার থাকে এবং সত্য বিষয় দ্রুত অনুধাবন করা যায়। পক্ষান্তরে লোকজনের সামনে নিজেকে প্রকাশ করার প্রেরণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে এবং প্রত্যেকেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করতে উৎসাহী হয়ে যায়- সত্যপন্থী হোক বিংবা মিথ্যাপন্থী। সকলেই জানে, এখন মোনাযারাকারীরা মজলিস ও জনগণের সমাবেশেই বিতর্কে প্রবৃত্ত হতে অধিক আগ্রহী। একজন অন্যজনের সাথে বহু দিন থাকে, কিন্তু একান্তে কোন বক্তৃতা দেয় না; কিংবা একজন কিছু জিজ্ঞেস করলে অন্যজন জওয়াব দেয় না। যদি কোন আমীর ব্যক্তি উপস্থিত থাকে অথবা জনসমাগম হয়, তবে বক্তৃতার কোন দিক বাকী রাখে না, যাতে প্রমাণিত হয়, সে একজন জবরদস্ত বক্তা।
ষষ্ঠ শর্ত, সত্য বিষয়ের অন্বেষণে এমন অবস্থা হতে হবে, যেমন কেউ হারানো বস্তু অন্বেষণ করে। হারানো বস্তুটি তার হাত দিয়ে পাওয়া যাক বা অন্যের হাত দিয়ে- তাতে কোন পার্থক্য থাকে না। বিতর্কে নিজেকে প্রতিপক্ষের সাহায্যকারী মনে করতে হবে; বিপরীত ও শত্রুপক্ষ নয়। সে ভ্রান্তি প্রকাশ করে দিলে অথবা সত্য বিষয় বলে দিলে তার কাছে কৃতজ্ঞ হবে।
উদাহরণতঃ হারানো বস্তুর অন্বেষণে যদি কেউ এক পথে চলতে থাকে এবং অন্য এক ব্যক্তি তাকে অন্য সড়কে যেতে বলে, তবে সে সেই ব্যক্তিকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ধন্যবাদ জানায়। তাকে মন্দ বলে না; বরং তার প্রতি খুশী হয়। সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শের অবস্থা তাই ছিল। সেমতে এক মহিলা হযরত ওমর (রাঃ)-এর ভাষণের মধ্যে বাধা দিয়ে তাঁকে সত্য বিষয় অবগত করালে তিনি বললেন : মহিলা ঠিক বলছে এবং পুরুষ (অর্থাৎ, আমি) ভুল করেছি। অন্য এক ব্যক্তি হযরত আলী (রাঃ)-কে কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি তার জওয়াব দিলেন। লোকটি বলল : আমীরুল মুমিনীন, মাসআলাটি এরূপ নয়; বরং এরূপ। হযরত আলী (রাঃ) বললেন : তোমার কথাই ঠিক। আমি ভুল করেছি। প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির উপরও জ্ঞানী রয়েছে। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে সে কথা বলে দিলেন যা থেকে তিনি বিচ্যুত হয়ে পড়েছিলেন। তখন আবু মূসা বললেন : যতদিন এ আলেম তোমাদের মধ্যে রয়েছেন, ততদিন আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করো না।
ঘটনাটি এই : এক ব্যক্তি হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল : এক ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদ করল এবং মারা গেল। তার কি অবস্থা হবে? তিনি বললেন : ‘সে জান্নাতে থাকবে।' তখন আবু মূসা (রাঃ) কূফার শাসনকর্তা ছিলেন। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) প্রশ্নকারীকে বললেন : আমীরকে পুনরায় জিজ্ঞেস কর। সম্ভবতঃ তিনি তোমার প্রশ্ন বুঝেননি। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস কললেন। আমীর আবারও একই জওয়াব দিলেন। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বললেন : আমি বলি, যদি সে মারা যায় এবং সত্যে পৌঁছে থাকে, তবে জান্নাতী হবে। হযরত আবু মূসা বললেন : আপনার কথাই ঠিক। বাস্তবে সত্যান্বেষী ব্যক্তির পক্ষে এরূপ ন্যায়সঙ্গত কথাই বলা উচিত। আজকাল এ ধরনের কথা কোন সামান্য ফেকাহবিদের কাছে কেউ বর্ণনা করলেও সে মানবে না; বরং বলবে- এ মাসআলায় সত্যে পৌঁছার কথা বলার কোন প্রয়োজন নেই । কারণ এটা সবাই জানে। মোট কথা আজকালকার মোনাযারাকারীদেরকে লক্ষ্য কর, যদি প্রতিপক্ষের মুখ দিয়ে সত্য প্রকাশ পায়, তবে তাদের মুখমণ্ডল কেমন কাল হয়ে যায়। এরপর গোপনে গোপনে যতদূর সম্ভব, এ সত্য অস্বীকার করার চেষ্টা করে। যেব্যক্তি তাদেরকে অভিযুক্ত করে, তার সারা জীবন তার নিন্দা চর্চা করতে থাকে। তার পরও মোনাযারায় নিজেদেরকে সাহাবায়ে কেরামের অনুরূপ বলতে তাদের লজ্জা করে না।
সপ্তম শর্ত, মোনাযারায় শরীক ব্যক্তি যদি এক প্রমাণ থেকে অন্য প্রমাণের দিকে যায় এবং এক আপত্তির বদলে অন্য আপত্তি পেশ করতে চায়, তবে তাকে বাধা দেয়া উচিত নয়। পূর্ববর্তী মনীষীগণের মোনাযারা এরূপই হত। বিতর্কের নবাবিষ্কৃত সূক্ষ্ম বিষয়াদি তাদের মোনাযারায় অনুপস্থিত ছিল। কেননা, সত্য বিষয়ের দিকে প্রত্যাবর্তন করা সর্বদাই মিথ্যার বিপরীত হয়ে থাকে। আর সত্য বিষয় কবুল করা ওয়াজেব।
অথচ মোনাযারার মজলিসে দেখা যায়, সারাক্ষণ একে অপরের কথা খণ্ডনে এবং বিবাদ বিসম্বাদে লিপ্ত থাকে। উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি তার ধারণায় কোন মূল বিধানের একটি কারণ বর্ণনা করলে অন্য ব্যক্তি জওয়াব দেয় : মূল বিষয়ে এ বিধান হওয়ার কারণ এটিই, এর প্রমাণ কি? উত্তরে সে বলে : আমার তো তাই মনে হয়। তুমি যদি অন্য কোন সুস্পষ্ট কারণ জান, তবে বর্ণনা কর। আমিও ভেবে দেখব। এরপর আপত্তিকারী পীড়াপীড়ি করে বলে : কারণ অন্যটি; আমি তা জানি কিন্তু বলব না। কেননা, বলা আমার জন্যে জরুরী নয়। এরপর পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও সে তা বর্ণনা করে না এবং মোনাযারার মজলিসে হট্টগোল হতে থাকে। আপত্তিকারী ব্যক্তি বুঝে না যে, 'আমি জানি কিন্তু বলব না'- তার একথা 'শরীয়ত বিরোধী' মিথ্যার নামান্তর। কেননা, যদি বাস্তবে কারণটি তার অজানা থাকে এবং কেবল প্রতিপক্ষকে অপারগ করে দেয়ার জন্যে জানার দাবী করে, তবে সে ফাসেক, মিথ্যাবাদী, আল্লাহ্ নাফরমান এবং তাঁর ক্রোধের পাত্র।
পক্ষান্তরে যদি সে আপন দাবীতে সত্যবাদী হয়, তবুও সে ফাসেক। কারণ, সে একটি জানা শরীয়তগত বিষয় গোপন করে। অথচ তার মুসলমান ভাই তা জেনে চিন্তাভাবনা করার জন্যে তাকে জিজ্ঞেস করছে। এটা সর্ববাদিসম্মত কথা যে, মানুষ ধর্মের যা কিছু জানে, কারও জিজ্ঞাসার পর তা বলা ও প্রকাশ করা ওয়াজেব। এখন সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শ ও পূর্ববর্তী আলেমগণের বক্তব্য দেখে বিচার করা দরকার, তাদের মধ্যে এ ধরনের বিষয় শুনা গেছে কি? তাদের কেউ কখনও এক প্রমাণ থেকে অন্য প্রমাণে যেতে নিষেধ করেছেন কি? তারা কি কিয়াস ছেড়ে সাহাবীর উক্তি অবলম্বন করতে এবং হাদীস ছেড়ে আয়াত অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন? তাঁদের সকল মোনাযারা এমন হত যে, তাঁরা অন্তরে যা চিন্তা করেছেন, মুখে হুবহু তা বর্ণনা করেছেন, অতঃপর তা নিয়ে সকলে মিলে চিন্তাভাবনা করেছেন।
অষ্টম শর্ত, মোনাযারা এমন ব্যক্তির সাথে করতে হবে, যার কাছ থেকে উপকার আশা করা যায় এবং যে জ্ঞানের বিষয়ে ব্যাপৃত। আজকাল প্রায়শঃ দেখা যায়, যারা মোনাযারা করে তারা বড় বড় আলেমের সাথে মোনাযারা করতে ভয় পায়। আশংকা এই করা হয় যে, সত্য বিষয় তার মুখ দিয়ে বের হয়ে পড়লে মোনাযারাকারীর প্রকৃত অবস্থা ফাঁস হয়ে পড়বে। ফলে যারা অজ্ঞানী তাদের সাথে মোনাযারা করার উৎসাহ বেশী দেখা যায়, যাতে তাদের সামনে বাতিলকেই সপ্রমাণ করা যায়।
মোনাযারার এই আটটি শর্ত ছাড়া আরও অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম শর্ত রয়েছে, কিন্তু এই আটটি শর্ত দ্বারাই তুমি মোনাযারাকারীর প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে, সে আল্লাহ্ জন্যে মোনাযারা করে না অন্য কোন কারণে। সারকথা, শয়তান মানুষের অন্তরকে ঘিরে রেখেছে। বাস্তবে শয়তান হল মানুষের সর্ববৃহৎ দুশমন ও ধ্বংসকামী। যেব্যক্তি এই শয়তানের সাথে মোনাযারা করে না এবং অন্য লোকের সাথে এমন বিরোধপূর্ণ বিষয়ে মোনাযারায় প্রবৃত্ত হয়, যাতে ইজতিহাদকারী সত্য বিষয়ে পৌছে অথবা সত্য বিষয়ে পৌছার সওয়াবে অংশীদার হয়, সে শয়তানের ক্রীড়নক এবং খাঁটি লোকদের জন্যে একটি শিক্ষা।

পরববর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...