সোমবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (২৪) শিক্ষকের আদব

 

জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২৪)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শিক্ষকের আদব
জানা উচিত, জ্ঞানের ব্যাপারে মানুষের অবস্থা চার প্রকার, যেমন অর্থোপার্জনের ক্ষেত্রে মানুষের চার অবস্থা হয়ে থাকে। প্রথম, মানুষ অর্থ সৃষ্টি করে। তখন তাকে উপার্জনকারী বলা হয়। দ্বিতীয়, আপন উপার্জিত অর্থ সঞ্চয় করে, তখন সে ধনী হয়ে যায় এবং অন্যের মুখাপেক্ষী থাকে না। তৃতীয়, উপার্জিত অর্থ নিজের জন্যে ব্যয় করে, ফলে সে উপকৃত হয়। চতুর্থ, উপার্জিত অর্থ অন্যকে দেয়, তখন তাকে দাতা ও গুণী বলে গণ্য করা হয়। এই শেষ অবস্থা সকল অবস্থা থেকে শ্রেষ্ঠ।
জ্ঞানেরও তদ্রূপ চারটি অবস্থা রয়েছে-
এক, অর্জনের অবস্থা, দুই, অর্জিত জ্ঞানে এমন ব্যুৎপত্তি অর্জন করা যে, অন্যের কাছে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন না থাকে, তিন, অর্জিত জ্ঞান সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে তদ্বারা নিজে উপকৃত হওয়া এবং চার, সে জ্ঞান দ্বারা অন্যের উপকার করা।
শেষোক্ত অবস্থা সকল অবস্থা থেকে শ্রেষ্ঠ। কারণ, যেব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে, আমল করে এবং মানুষকে জ্ঞানদান করে— আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্বে তাকেই মহান বলা হয়। সে সূর্যের মত, অপরকে আলো দান করে এবং নিজেও আলোকময়। সে মেশকের মত, অপরকে সুগন্ধিতে আমোদিত করে এবং নিজেও সুগন্ধিযুক্ত। আর যেব্যক্তি অপরকে শিক্ষা দান করে, কিন্তু নিজে আমল করে না, সে শাণের মত, লোহাকে ধারালো করে কিন্তু নিজে কাটে না, অথবা সূচের মত, যে অন্যের জন্যে পোশাক তৈরী করে, কিন্তু নিজে উলঙ্গ থাকে। মানুষ যখন শিক্ষাদানে মশগুল হয়, তখন সে একটি বিরাট কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাই এর আদব ও নিয়মাবলী স্মরণ রাখা উচিত।
প্রথম শিষ্টাচার, ওস্তাদ শাগরেদদেরকে সন্তানের মত স্নেহ করবে। যেমন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>"সন্তানের জন্যে যেমন পিতা, আমিও তোমাদের জন্যে তেমনি।"
অর্থাৎ, শিক্ষক শাগরেদদেরকে আখেরাতের আগুন থেকে বাঁচানোর নিয়ত করবেন। এটা পিতামাতার তাদের সন্তানদেরকে দুনিয়ার আগুন থেকে বাঁচানোর তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যেই শিক্ষকের হক পিতামাতার চেয়ে বেশী। কেননা, পিতামাতা সন্তানের ধ্বংসশীল জীবনের কারণ, আর শিক্ষক অক্ষয় জীবনের কারণ। শিক্ষক না থাকলে পিতামাতার কাছ থেকে অর্জিত বিষয় সন্তানকে স্থায়ী ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিত, কিন্তু শিক্ষক বলতে আমরা এমন ব্যক্তিকে বুঝব, যে আখেরাত শাস্ত্র শিক্ষা দেয়। অথবা দুনিয়ার শাস্ত্র আখেরাতের নিয়তে শিক্ষা দেয়- দুনিয়ার নিয়তে নয়। কেননা, দুনিয়ার নিয়তে শিক্ষা দান করা মানে নিজে ধ্বংস হওয়া এবং অপরকে ধ্বংস করা। এমন শিক্ষকতা থেকে আল্লাহ হেফাযত করুন। এক পিতার পুত্ররা যেমন পারস্পরিক মহব্বত ও সম্প্রীতির সাথে থাকে এবং লক্ষ্য অর্জনে একে অপরকে সাহায্য করে, তেমনি এক ওস্তাদের শাগরেদদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভালবাসা থাকা উচিত। আখেরাত উদ্দেশ্য হলে শাগরেদরা এমনি হয়। কিন্তু দুনিয়া লক্ষ্য হলে তাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা ও শত্রুতা হয়ে থাকে। যারা দুনিয়ার নেতৃত্ব লাভের শিক্ষা গ্রহণ করে, তারা আল্লাহ তা'আলার এ উক্তির বাইরে-
>"এ মুমিনগণ পরস্পরে ভাই ভাই" এবং তারা এ উক্তির বিষয়বস্তুর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত :
>"যারা বন্ধু, তারা সেদিন পরস্পরের শত্রু হবে; কিন্তু খোদাভীরুরা শত্রু হবে না।"
দ্বিতীয় শিষ্টাচার হচ্ছে, শিক্ষাদানের ব্যাপারে শরীয়তের কর্ণধার রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরণ করবে। অর্থাৎ শিক্ষার জন্যে কোন পারিশ্রমিক চাইবে না, কোন বিনিময়ের নিয়ত করবে না এবং কৃতজ্ঞতাও প্রত্যাশা করবে না । বরং কেবল আল্লাহর ওয়াস্তে এবং তাঁর নৈকট্য লাভের জন্যে শিক্ষা দেবে। শাগরেদের প্রতি অনুগ্রহ হচ্ছে— এরূপ মনে করবে না; বরং শাগরেদদের অনুগ্রহভাজন হওয়া এবং এরূপ মনে করা জরুরী যে, তুমি তাদেরই কারণে গৌরবের অধিকারী হয়েছ। তারা তাদের আত্মশুদ্ধির কাজ তোমাকে সমর্পণ করেছে এবং তোমাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ দিয়েছে; যেমন কোন ব্যক্তি তার ক্ষেত তোমাকে ধার দেয়, যাতে তুমি নিজের জন্যে তাতে ফসল উৎপন্ন কর।
বলাবাহুল্য, এখানে ক্ষেতওয়ালার উপকারের তুলনায় তোমার উপকার বেশী হবে । সুতরাং শিক্ষাদানে শাগরেদের তুলনায় ওস্তাদের সওয়াব যখন বেশী হয়, তখন শাগরেদের উপর অনুগ্রহ করার কোন মানে নেই। শাগরেদ না হলে ওস্তাদ এ সওয়াব কোথায় পেত? তাই সওয়াব ও প্রতিদান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও কাছে চাওয়া উচিত নয় । আল্লাহ তা'আলা বলেন :
>“বলে দিন, আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না।”
কেননা, ধনদৌলত ও দুনিয়ার সামগ্রী দেহের খাদেম এবং মনের সওয়ারী। তারা সকলেই এলেমের খেদমত করে। অতএব যেব্যক্তি এলেমের বিনিময়ে ধন-দৌলত চাইবে, তার দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কারও জুতায় নাপাকী লেগে গেছে, সে তা পরিষ্কার করার জন্যে মুখে ঘষা দিয়ে নেয়। বলাবাহুল্য, এতে যে খেদমতের যোগ্য, তাকে খাদেম করা হয় এবং যে খাদেম তাকে খেদমত পাওয়ার যোগ্য করা হয়। এটা চরম বিপ্লব। এ ধরনের লোক কেয়ামতে অপরাধীদের সাথে মাথা নীচু করে আল্লাহ তা'আলার সামনে দন্ডায়মান হবে।
মোট কথা, গৌরব ও সম্মান ওস্তাদের প্রাপ্য। এখন দেখ, যারা বলে, আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য তাদের লক্ষ্য, ফেকাহ ও কালামশাস্ত্র শিক্ষাদানে তাদের দশা কি হবে? তারা ধন-সম্পদ ও প্রতিপত্তি ব্যয় করে এবং জায়গীর লাভের জন্যে রাজা-বাদশাহদের নানা রকম লাঞ্ছনা ভোগ করে। তারা এটা বৰ্জন করলে কেউ তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে না এবং কেউ তাদের কাছে আসবে না। তদুপরি ওস্তাদ শাগরেদের কাছে আশা করে, সে তার প্রত্যেক বিপদে কাজে লাগবে, শুভাকাঙ্ক্ষীদেরকে সাহায্য করবে, অমঙ্গলকামীদের সাথে শত্রুতা রাখবে এবং তার জাগতিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রাদি গাধার ন্যায় বহন করবে। যদি শাগরেদ এসব বিষয়ে সামান্যও ত্রুটি করে, তবে ওস্তাদজী তার আন্তরিক দুশমন হয়ে যায়। এ ধরনের আলেম নেহায়েত নীচ ও হীন।
তৃতীয় শিষ্টাচার, ওস্তাদ শাগরেদকে উপদেশ দেয়ার ব্যাপারে কোন ত্রুটি করবে না। উদাহরণতঃ শাগরেদ যদি যোগ্যতা অর্জনের পূর্বে কোন মর্তবা লাভের পেছনে পড়ে অথবা জাহেরী এলেম অর্জন করার পূর্বে বাতেনী এলেমে ব্যাপৃত হতে চায়, তবে তাকে নিষেধ করবে। এরপর তাকে বলবে, জ্ঞান অন্বেষণ আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্যে করবে- প্রভাব প্রতিপত্তি অন্বেষণ ও গর্ব করার জন্যে নয়। এটা যে মন্দ, একথা যথাসম্ভব প্রথমেই তার মনে প্রতিষ্ঠিত করে দেবে। কেননা, পাপাচারী আলেমের মঙ্গল কম এবং অনিষ্ট বেশী হয়ে থাকে। সুতরাং যদি ওস্তাদ শাগরেদের অন্তর থেকে জেনে নেয়, সে দুনিয়া লাভের জন্যেই এলেম অর্জন করছে এবং ফেকাহশাস্ত্রে বিতর্ক করার এবং আহকামে মুনাযারার শিক্ষা লাভ করছে, তবে তাকে বিরত রাখবে এবং বলে দেবে, এগুলো আখেরাতের শিক্ষা নয় এবং এমন শিক্ষাও নয়, যার সম্পর্কে জনৈক বুযুর্গ বলেন : আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে এলেম শিখছি, কিন্তু এলেম আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে হতে অস্বীকার করেছে। এ ধরনের এলেম হচ্ছে এলমে তফসীর, এলমে হাদীস ও এলমে আখেরাত, যার মধ্যে পূর্ববর্তী মনীষীগণ মশগুল থাকতেন। যদি শাগরেদ দুনিয়ার উদ্দেশে এসব এলেম শেখে, তবে তাকে নিষেধ করবে না। কেননা, শাগরেদ ওয়ায়েয হওয়ার লোভে এবং মানুষকে তার দলভুক্ত করার আশায় এসব এলেম শিখতে তৎপর হয় এবং প্রায়ই শিক্ষাজীবনে এর পরিণতি সম্পর্কে অবগত হয়ে যায়। ফলে সে তার নিয়ত ঠিক করে নেয়। কারণ এর মধ্যে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি এবং দুনিয়াকে তুচ্ছ ও আখেরাতকে বড় করে দেখার শিক্ষাও রয়েছে। এতে আশা করা যায়, পরিণামে শাগরেদ সঠিক পথে এসে যাবে।
ওস্তাদ যেসব বিষয়ের উপদেশ অন্যকে দেবে, সেগুলো নিজেও মেনে চলবে। শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় হওয়া এবং জাঁকজমক সৃষ্টির বাসনা এমন, যেমন পাখী শিকারের জালের চারপাশে দানা ফেলে দেয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের এসব বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখেছেন। তিনি কামভাব সৃষ্টি করেছেন, যাতে এর মাধ্যমে মানুষের বংশ বিস্তার অব্যাহত থাকে। জাঁকজমকপ্রীতি সৃষ্টি করার কারণও তাই যে, এর মাধ্যমে শিক্ষাদীক্ষা কায়েম থাকবে। এটা উল্লিখিত শিক্ষাসমূহের মধ্যে হতে পারে। কিন্তু নিছক বিরোধপূর্ণ বিষয়াদি শিক্ষা করা এবং কালাম শাস্ত্রের কলহ বিবাদ আয়ত্ত করা এমন যে, মানুষ এগুলোতেই মশগুল থাকলে এবং অন্য শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে অন্তরের কঠোরতা, আল্লাহ থেকে গাফেল হয়ে গোমরাহীতে পড়ে থাকা ও জাঁকজমক প্রীতিই বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া কোন উপকার হবে না। তবে আল্লাহ তা'আলা আপন রহমতে যাকে বাঁচিয়ে নেন অথবা যে এগুলোর সাথে অন্য ধৰ্মীয় শিক্ষা ও মিলিয়ে নেয়, তার অবশ্য উপকার হতে পারে।
একবার সুফিয়ান সওরীকে কেউ দুঃখিত দেখে কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আমরা দুনিয়াদারদের জন্যে বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে গেছি। তারা এলেম শিক্ষা করার জন্যে আমাদের পেছনে পড়ে। এরপর যখন শিখে ফেলে, তখন বিচারক, গভর্নর অথবা দারোগা নিযুক্ত হয়ে যায়।
চতুর্থ শিষ্টাচার, শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে উত্তম ও সঠিক পন্থা হল, শাগরেদকে কুচরিত্র থেকে যতদূর সম্ভব ইঙ্গিতে ও সস্নেহে নিষেধ করবে। কঠোর ভাষায় এবং ধমকের সুরে শাসাবে না। কেননা, স্পষ্ট ভাষা ভয়ভীতির পর্দা সরিয়ে দেয় এবং বিরুদ্ধাচরণে সাহস যোগায়। সেমতে ওস্তাদকুল শিরোমণি রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন :
>“মানুষকে ছাগলের লেজ চূর্ণ করতে নিষেধ করা হলে তারা তা অবশ্যই চূর্ণ করবে আর বলবে, আমাদেরকে এ কাজ থেকে নিষেধ করার মধ্যে নিশ্চয়ই কোন রহস্য আছে।”
হযরত আদম ও হাওয়ার কাহিনী এ বিষয়ের চমৎকার সাক্ষী। কাহিনী জেনে নেয়ার জন্যে আমরা তোমাকে এটা স্মরণ করিয়ে দেইনি, বরং তুমি এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সতর্ক হয়ে যাও। স্পষ্ট ভাষায় না বলার আরেক কারণ, যারা প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন ও মেধাবী, তারা ইঙ্গিতে বললেও অর্থ বুঝে নেয় এবং বুঝে নেয়ার খুশী তাদেরকে আমল করতে উৎসাহিত করে- যাতে অন্যেরা জানে, বিষয়টি তার বুদ্ধিমত্তায় ধরা পড়েছে।
পঞ্চম শিষ্টাচার, ওস্তাদ যে শাস্ত্র শিক্ষা দেয় তার উপরের শাস্ত্রসমূহের প্রতি শাগরেদের মন বীতশ্রদ্ধ করে না তোলা। উদাহরণতঃ যারা অভিধান শিক্ষা দেয়, তাদের অভ্যাস শাগরেদের সামনে ফেকাহকে মন্দ বলা এবং যারা ফেকাহ শিক্ষা দেয়, তাদের অভ্যাস হাদীস ও তফসীর শাস্ত্রের নিন্দা করা। তারা বলে হাদীস ও তফসীর নিছক ইতিহাসগত এবং শ্রবণের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এতে বিবেকের কোন দখল নেই। কালামশাস্ত্রীরা ফেকাহকে ঘৃণা করে এবং বলে : ফেকাহশাস্ত্র একটি শাখাগত ব্যাপার। এতে মহিলাদের মাসিকের কথা বর্ণিত হয়। এটা কালাম শাস্ত্রের মর্যাদা কিরূপে পেতে পারে, যাতে আল্লাহর সেফাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়? ওস্তাদদের এ অভ্যাস খুবই মন্দ, যা থেকে বেঁচে থাকা উচিত। যে ওস্তাদ এক শাস্ত্র শিক্ষাদানের দায়িত্ব নেয়, তার উচিত শাগরেদের মনে তার উপরের শাস্ত্র শিক্ষা করার পথও খুলে দেয়া।
ষষ্ঠ শিষ্টাচার, ওস্তাদ যেন এমন কোন কঠিন বিষয় বর্ণনা না করেন, যা হৃদয়ঙ্গম করতে শাগরেদের জ্ঞানবুদ্ধি অক্ষম হয়ে পড়ে, যাতে শাগরেদ ওস্তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে না পড়ে অথবা তার বুদ্ধিবিভ্রাট না ঘটে। এ ব্যাপারে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরণ করা উচিত। তিনি বলেন : আমরা পয়গম্বরগণ যেন মানুষকে তাদের স্তরে রেখে তাদের বুদ্ধি জ্ঞান অনুযায়ী তাদের সাথে কথা বলি- সেরূপ আদেশ আমাদেরকে দেয়া হয়েছে। সুতরাং শাগরেদ ভালরূপে বুঝবে- নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওস্তাদ শাগরেদের সামনে কোন বিষয়ের স্বরূপ প্রকাশ করবে না। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যখন কেউ কোন সম্প্রদায়ের কাছে এমন কথা বলে, যা তাদের বোধগম্য নয়, তখন তাদের কিছু লোকের জন্য এটা ফেতনা হয়ে যায়। একবার হযরত আলী (রাঃ) তাঁর বুকের দিকে ইশারা করে বললেন : এর মধ্যে অনেক জ্ঞান-বিজ্ঞান রয়েছে, যদি এগুলোর সমঝদার থাকে। অর্থাৎ, আমি এসব জ্ঞান বিজ্ঞান প্রকাশ করি না। কারণ, সমঝদার নেই। তিনি সত্যই বলেছেন : নেক বান্দাদের অন্তর রহস্যের আধার। এ থেকে জানা গেল, আলেম যা জানে, তা যে কোন ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করা উচিত নয়। এটা তখন, যখন শিক্ষার্থী বুঝে, কিন্তু উপকৃত হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। আর যখন বুঝেই না, তখন তার কাছে না বলা অধিক সঙ্গত। ঈসা (আঃ) বলেন : শূকরের গলায় মণি-মাণিক্য পরায়ো না। জ্ঞান-বিজ্ঞান মণি-মাণিক্যের চেয়ে উত্তম এবং যেব্যক্তি জ্ঞানকে খারাপ মনে করে, সে শূকরের চেয়ে অধম, এজন্যেই জনৈক বুযুর্গ বলেছেন : প্রত্যেককে তার বুদ্ধির মাপকাঠি অনুযয়ী মাপ এবং তদনুযায়ী তার সাথে কথা বল, যাতে তুমি তার কাছ থেকে বেঁচে থাক এবং এবং সে তোমার দ্বারা উপকৃত হয়। নতুবা সে মনোবলের সংকীর্ণতার কারণে মানবে না। জনৈক ব্যক্তি এক আলেমকে কোন কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি জওয়াব দিলেন না। প্রশ্নকারী বলল : আপনি কি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এ হাদীস শুনেননি, "যেব্যক্তি উপকারী এলেম গোপন করে, কেয়ামতে তার মুখে আগুনের লাগাম পরানো হবে"। আলেম বললেন : লাগামের কথা রাখ এবং চলে যাও। যদি কোন সমঝদার আসে এবং এলেম গোপন করি, তখন সে আমাকে লাগাম পরিয়ে দেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
>"তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ নির্বোধদের হাতে সমর্পণ করো না। এতে হুশিয়ার করা হয়েছে, এলেম যেব্যক্তিকে খারাপ করে দেয় এবং বিভ্রান্তিতে ফেলে, তাকে এলেম থেকে বিরত রাখা উত্তম।" অযোগ্য ব্যক্তিকে কোন বস্তু দেয়া যোগ্যকে না দেয়ার তুলনায় কম জুলুম নয়; বরং উভয় কাজ সমান জুলুম।
সপ্তম শিষ্টাচার, যখন শাগরেদের অবস্থা জানা যায় যে, তার বুদ্ধি-শুদ্ধি কম, তখন ওস্তাদ তাকে তার উপযুক্ত স্কুল বিষয় বলে দেবেন এবং এতে সূক্ষ্ম কথাও আছে, একথাও তাকে বলবেন না। কেননা, এরূপ বললে সেই স্থূল বিষয়ে শাগরেদের আগ্রহ স্তিমিত হয়ে যাবে। তার মন বিক্ষিপ্ত হবে এবং বলবে, তাকে শিক্ষাদানে কুণ্ঠাবোধ করা হচ্ছে। নিজের ধারণায় প্রত্যেক ব্যক্তি মনে করে, সে প্রতিটি সূক্ষ্ম জ্ঞানের উপযুক্ত । প্রত্যেকেই আল্লাহ তাআলার প্রতি এজন্যে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তাকে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান বুদ্ধি দান করেছেন। অথচ বাস্তবে সেই বেশী নির্বোধ, যে তার বুদ্ধি পূর্ণ হওয়ার ধারণায় বেশী আনন্দিত হয়। এ থেকে জানা যায়, সাধারণ লোকদের মধ্যে যদি কেউ শরীয়ত অনুসারী হয় এবং পূর্ববর্তী মনীষীদের কাছ থেকে বর্ণিত বিশ্বাসসমূহ নতুন ব্যাখ্যা ছাড়াই তার অন্তরে প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে তার বিশ্বাসকে বিক্ষিপ্ত করা উচিত নয়; বরং তাকে তার কাজে মশগুল থাকতে দেয়া উচিত। কেননা, তার সামনে বাহ্যিক ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হলে সে সাধারণের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে এবং বিশিষ্ট লোকদের মধ্যে দাখিল হওয়া তার জন্যে সহজ হবে না। ফলে তার মধ্যে ও গোনাহের মধ্যে যে আড়াল ছিল, তা দূর হয়ে যাবে। এর পর সে পুরোপুরি অবাধ্য শয়তান হয়ে নিজে ধ্বংস হবে এবং অন্যকেও ধ্বংস করবে। সুতরাং সাধারণের সামনে সূক্ষ্ম জ্ঞানের স্বরূপ বর্ণনা করা উচিত নয়; বরং তাদেরকে কেবল এবাদত এবং যেসব কাজ তারা করে, তাতে ঈমানদারী শিক্ষা দেয়া সমীচীন। কোরআনের বিষয়বস্তু অনুযায়ী জান্নাতের আগ্রহ এবং দোযখের ভয় দ্বারা তাদের অন্তর পূর্ণ করে দেয়া উচিত। তাদের সামনে কোন সন্দেহের অবতারণা করা যাবে না। কেননা, অধিকাংশ সন্দেহ তাদের মনে আটকে থাকে এবং তা বের হওয়া কঠিন হয়। ফলে তারা বরবাদ হয়ে যায়। সারকথা, সাধারণ লোকদের জন্যে বিতর্কের দ্বার উন্মোচিত করা উচিত নয়।
অষ্টম শিষ্টাচার, ওস্তাদ স্বীয় এলেম অনুযায়ী আমল করবেন। তার কথা ও কাজের মধ্যে গরমিল থাকতে পারবে না। কারণ, এলেম অন্তরের চক্ষু দ্বারা জানা যায়, আর আমল বাহ্যিক চক্ষু দ্বারা। বাহ্যিক চক্ষু দ্বারা দেখে এমন লোক অনেক। এমতাবস্থায় আমল এলেমের বিপরীত হলে হেদায়েত হবে না। যেব্যক্তি নিজে এক কাজ করে এবং অপরকে তা ক্ষতিকারক বলে করতে নিষেধ করে, মানুষ তার সাথে উপহাস করে এবং সেই কাজ করতে অধিক আগ্রহী হয়। তারা বলে, এ কাজটি ভাল ও আনন্দদায়ক না হলে ওস্তাদজী করেন কেন? ওস্তাদ ও শাগরেদ বাঁশ ও তার ছায়ার মত। যদি বাঁশ নিজে সোজা না হয়, তবে ছায়া সোজা হবে কিরূপে? আল্লাহ তাআলা বলেন :
>তোমরা কি লোকদেরকে সৎকাজের আদেশ কর এবং নিজেদেরকে ভুলে যাও?"
এতদসত্ত্বেও আলেমের উপর গোনাহের শাস্তি জালেমের তুলনায় বেশী হয়। কেননা, আলেম গোনাহে লিপ্ত হলে এক বিশ্ব গোনাহে লিপ্ত হয়ে যায়। মানুষ তার অনুসরণ করে। যেব্যক্তি কোন কুরীতি আবিষ্কার করে, তার উপর নিজের এবং যারা এ কুরীতির অনুসরণ করে তাদের গোনাহ্ বর্তে থাকে। এ জন্যেই হযরত আলী (রাঃ) বলেন : দু'ব্যক্তি আমার কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে— এক, সেই আলেম, যে তার ইজ্জত হারিয়ে ফেলেছে এবং প্রকাশ্যে গোনাহে লিপ্ত হয়েছে। দুই, সেই মূর্খ, যে দরবেশ হওয়ার ভান করছে। কেননা, মূর্খ দরবেশ হয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয় এবং আলেম গোনাহ্ করে বিভ্রান্তি ছাড়ায়।

পরবর্তী পর্ব-
ভাল ও মন্দ আলেমের পরিচয়

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...