বুধবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (২৩) শিক্ষার্থীর আদব



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২৩)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শিক্ষার্থীর আদব
শিক্ষার্থীর আদব অনেক হলেও সেগুলো মোটামুটি দশ ভাগে বিভক্ত।
প্রথম আদব,
শিক্ষার্থী নিজেকে হীন চরিত্র ও মন্দ অভ্যাস থেকে পবিত্র রাখবে। কেননা, শিক্ষা হচ্ছে অন্তরের এবাদত, আভ্যন্তরীণ সংশোধন এবং আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের উপায়। বাহ্যিক এবাদত নামায যেমন বাহ্যিক নাপাকী থেকে বাহ্যিক পবিত্রতা ছাড়া দুরস্ত হয় না, তেমনি আভ্যন্তরীণ এবাদত অর্থাৎ, এলেম দ্বারা অন্তরের এবাদতও মন্দ চরিত্র এবং নাপাক অভ্যাস থেকে পাক হওয়া ছাড়া দুরস্ত হয় না। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>“ধর্ম-কর্ম পরিচ্ছন্নতার উপর ভিত্তিশীল।"
সুতরাং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় প্রকার পরিচ্ছন্নতা প্রয়োজন। আল্লাহ তাআলা বলেন : >“মুশরিকরা নাপাক”।
এতে বুদ্ধিমানদের অবহিত করা হয়েছে যে, পবিত্রতা ও অপবিত্রতা বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপরই নির্ভরশীল নয়, যা চোখে পরিদৃষ্ট হয়। বস্তুতঃ মুশরিকরা গোসলও করে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাপড়-চোপড়ও পরিধান করে, অথচ তাদের অভ্যন্তরভাগ নাপাক থাকে। নাপাকী এমন বিষয়কে বলে, যা থেকে মানুষ বেঁচে থাকতে চায়৷ আভ্যন্তরীণ নাপাকী থেকে বেঁচে থাকা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এ নাপাকী পরিণামের দিক দিয়ে মারাত্মক। এ জন্যেই রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>“যে গৃহে কুকুর রয়েছে তাতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।”
অন্তর মানুষের একটি গৃহ, যাতে ফেরেশতাদের যাতায়াত, প্রভাব ও অবস্থান হয়ে থাকে। ক্রোধ, কামনা, পরশ্রীকাতরতা, হিংসা, অহংকার, আত্মম্ভরিতা ইত্যাদি হচ্ছে ক্ষ্যাপা কুকুর সদৃশ। অতএব অন্তরে যদি এসব কুকুর থাকে, তবে তাতে ফেরেশতাদের যাতায়াত কিরূপে হবে? শিক্ষার নূরও আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে অন্তরে পৌঁছান। সেমতে আল্লাহ তা'আলা বলেন : “কোন মানুষের যোগ্যতা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন; কিন্তু ওহীর মাধ্যমে অথবা যবনিকার অন্তরাল থেকে পাঠিয়ে দেন তিনি কোন পয়গামবাহক; সে তাঁর আদেশে যা ইচ্ছা পৌঁছে দেয়।”
অনুরূপভাবে জ্ঞান সংক্রান্ত রহমতের দায়িত্বেও “ফেরেশতাগণ নিয়োজিত। তারা নিন্দনীয় অভ্যাস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পাক পবিত্ৰ। সুতরাং তারা পাক জায়গাই দেখে এবং তাদের কাছে রক্ষিত আল্লাহ তাআলার রহমতের ভাণ্ডার পবিত্র অন্তরেই ভরে দেয়।
আমরা একথা বলি না যে, উল্লিখিত হাদীসে গৃহের অর্থ অন্তর এবং কুকুরের অর্থ ক্রোধ ও নিন্দনীয় অভ্যাসসমূহ বোঝানো হয়েছে। এরূপ বললে বাতেনিয়া সম্প্রদায় আপত্তি করবে, তোমরা আমাদেরকে যা করতে নিষেধ কর, এখন নিজেরাই তা করছ। বরং আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এ হাদীসে এ বিষয়টির প্রতি হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। বাহ্যিক শব্দ পরিবর্তন করে আভ্যন্তরীণ অর্থ গ্রহণ এক কথা এবং বাহ্যিক অর্থ বহাল রেখে আভ্যন্তরীণ অর্থের প্রতি হুশিয়ারী অবলম্বন ভিন্ন কথা। দ্বিতীয়টি জ্ঞানার্জনের পদ্ধতি। আলেম ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের এটাই নিয়ম৷ কেননা, জ্ঞানার্জনের অর্থ হল, যে বিষয় অন্যদেরকে বলা হয় তা কেবল তাদের মধ্যেই সীমিত না রাখা; বরং নিজেও তার মাধ্যমে উপদেশ গ্রহণ করা। যদি কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি অন্যের উপর বিপদ দেখে, তবে সে একে নিজের জন্যে শিক্ষা মনে করে এবং সেও বিপদের লক্ষ্য হতে পারে বলে বুঝে নেয়। কারণ, দুনিয়াতে পরিবর্তন হতেই থাকে। সুতরাং অন্যের অবস্থা দেখে নিজের দিকে খেয়াল করা এবং দুনিয়া সম্পর্কে চিন্তা করা একটি উৎকৃষ্ট শিক্ষা।
অনুরূপভাবে মানব নির্মিত গৃহ থেকে তুমিও অন্তরের দিকে খেয়াল কর, যা আল্লাহ তাআলার একটি গৃহ বিশেষ। কুকুর তার মন্দ অভ্যাস অর্থাৎ, হিংস্রতা ও অপবিত্রতার কারণে নিন্দনীয়- আকার আকৃতির কারণে নয়। তুমি কুকুর থেকে তার হিংস্রতার ধ্যান কর এবং জেনে নাও, যে অন্তর ক্রোধ, লোভ-লালসা, দুনিয়ার জন্যে কলহ-বিবাদ এবং ধন-সম্পদের জন্যে মানুষকে অপমান করা ইত্যাদি কুঅভ্যাসে পরিপূর্ণ, সে অন্তর আভ্যন্তরীণ কুকুর এবং বাহ্যিক অন্তর। জ্ঞানের নূর অভ্যন্তরভাগ দেখে, বাইরের অঙ্গ নয়।
সুতরাং যদি কেউ বলে, অনেক লোক কুচরিত্রের অধিকারী হয়েও জ্ঞান . অর্জন করেছে, তবে এর জওয়াব, এটা কখনও হতে পারে না। যেব্যক্তি কুচরিত্রের অধিকারী, সে আখেরাতে উপকারী ও চিরন্তন সৌভাগ্যের কারণ সত্যিকার জ্ঞান কখনও অর্জন করতে পারবে না। সে এ জ্ঞান থেকে অনেক মনযিল দূরে থাকবে। কারণ, এ জ্ঞানের সূচনাতেই শিক্ষার্থী জানবে, গোনাহ মারাত্মক সর্বনাশা বিষ। তুমি কখনও কাউকে জেনেশুনে মারাত্মক বিষ সেবন করতে দেখেছ কি? তুমি যে জ্ঞানের কথা শুনেছ, সেটা মানুষের একটি প্রথাগত বিষয়। তারা এটা মুখে উচ্চারণ করে এবং কখনও অন্তরে বার বার বলে। সত্যিকার জ্ঞানের উপর এর কোন দখল নেই। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : অধিক বর্ণনা দ্বারা জ্ঞান হয় না; বরং জ্ঞান অন্তরে গুপ্ত একটি নূর।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : জ্ঞান হচ্ছে কেবল আল্লাহর ভয়। কেননা আল্লাহ্ তাআলা বলেন :
>“একমাত্র জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।”
এখানে আল্লাহ্ তাআলা জ্ঞানের বিশেষ পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এদিক দিয়েই জনৈক অনুসন্ধানবিদ এ বাক্যের অর্থ করেছেন-“আমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য উদ্দেশে জ্ঞান লাভ করেছিলাম। কিন্তু জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে হতে অস্বীকার করেছে।”এর মর্মার্থ, জ্ঞান আমাদের অর্জিত হয়নি এবং এর স্বরূপ আমাদের সামনে উদঘাটিত হয়নি। কেবল বাহ্যিক শব্দ ও বাক্য অর্জিত হয়েছে।
যদি বল, আমরা অনেক অনুসন্ধানী আলেম ও ফেকাহবিদকে দেখি, তাঁরা শাখা ও মূলনীতিতে সেরা বিশেষজ্ঞরূপে গণ্য হয়; অথচ তাদের চরিত্র খারাপ তবে এর জওয়াব হচ্ছে, তুমি যখন জ্ঞানের স্তর ও আখেরাতের জ্ঞান সম্পর্কে অবগত হবে, তখন বুঝতে পারবে, যে জ্ঞানে তারা মশগুল রয়েছেন, সেটা জ্ঞান হিসাবে খুব কমই উপকারী। জ্ঞান কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে অর্জন করলেই এবং আল্লাহর নৈকট্য উদ্দেশ্য হলেই এর উপকার পাওয়া যায়। এদিকে আমরা ইতিপূর্বে ইঙ্গিত করেছি এবং সত্বরই এ অধ্যায়ে আরও সবিস্তার বর্ণনা করা হবে।

দ্বিতীয় আদব,
শিক্ষার্থী সাংসারিক কাজকর্মের সাথে সম্পর্ক হ্রাস করবে এবং আত্মীয়-স্বজন ও মাতৃভূমি থেকে দূরে থাকবে। কেননা সকল সম্পর্কই বিঘ্ন সৃষ্টিকারী ও বাধাদানকারী। আল্লাহ তা'আলা কোন মানুষের মধ্যে দু'টি মন সৃষ্টি করেননি। ফলে চিন্তা বিভক্ত থাকলে জ্ঞানের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটনে ত্রুটি দেখা দেবে। এজন্যেই কেউ বলেছেন : শিক্ষা তোমাকে তার সামান্য অংশও দেবে না, যে পর্যন্ত না তুমি তাতে সমস্ত মন প্রাণ নিবিষ্ট করবে। তুমি এরূপ করলে জ্ঞান তোমাকে যে সামান্য অংশ দেবে, তাও উপকারী কিনা জানা নেই। যে চিন্তা অনেক কাজে বিভক্ত থাকে, তা নালার পানির মত ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছু অংশ মাটি শুষে ফেলে এবং কিছু শুকিয়ে বাতাসের সাথে উড়ে যায়। ফলে ক্ষেতে পৌছার মত পানি থাকে না।

তৃতীয় আদব,
শিক্ষার্থী জ্ঞানের কারণে অহংকার করবে না এবং শিক্ষকের উপর শাসন চালাবে না; বরং নিজের ব্যাপার সর্বাবস্থায় পুরোপুরি শিক্ষকের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেবে। তার উপদেশ তেমনি মান্য করবে, যেমন মূর্খ রোগী দয়ালু ও বিচক্ষণ ডাক্তারের কথা মান্য করে। শিক্ষাগুরুর সাথে বিনয়াবনত ব্যবহার করা উচিত এবং তাঁর সেবা দ্বারা সওয়াব ও গৌরব কাম্য হওয়া দরকার। শা'বী (রঃ) বর্ণনা করেন, হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রাঃ) জানাযার নামায পড়লে তাঁর খচ্চর তাঁর নিকটে আনা হয়, যেন তিনি তাতে সওয়ার হন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আগমন করলেন এবং খচ্চরের সাথে সংলগ্ন লোহার আংটি চেপে ধরলেন। যায়েদ ইবনে সাবেত বললেন : হে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর চাচাত ভাই! আপনি লোহার আংটি ছেড়ে দিন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন : আলেম ও মহান ব্যক্তিদের সাথে এমনি ব্যবহার করার নির্দেশ আমি পেয়েছি। যায়েদ ইবনে সাবেত (রাঃ) তাঁর হস্ত চুম্বন করে বললেন : আমরাও আমাদের পয়গম্বরের পরিবার-পরিজনের সাথে এমনি ব্যবহার করার আদেশ পেয়েছি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন : খোশামোদ করা ঈমানদারের চরিত্র নয়; কিন্তু জ্ঞান অন্বেষণে খোশামোদ করা যায়। সুতরাং শিক্ষার্থীর অহংকার করা উচিত নয়। প্রসিদ্ধ ও সুবিদিত আলেমের কাছেই পড়ব- অন্যের কাছে নয়- এটাও শিক্ষার্থীর এক প্রকার অহংকার। এটা নির্বুদ্ধিতা বৈ নয়। কেননা, জ্ঞান মুক্তি ও সৌভাগ্যের কারণ। যেব্যক্তি কোন ইতর হিংস্র জন্তু থেকে আত্মরক্ষা করতে চায়, সে এ বিষয়ে পার্থক্য করবে না যে, তাকে আত্মরক্ষার কৌশল কোন স্বনামখ্যাত ব্যক্তি না অজ্ঞাত ব্যক্তি বলে দেবে। বলাবাহুল্য, যারা আল্লাহ তা'আলাকে জানে না, তাদের জন্যে অগ্নিরূপী সর্বগ্রাসী শত্রুর ক্ষতি প্রত্যেক হিংস্র প্রাণীর ক্ষতির তুলনায় ভয়ংকর হবে। জ্ঞান ঈমানদারের হারানো সম্পদ; যেখানে তা পাবে, সেখান থেকেই সৌভাগ্য মনে করে গ্রহণ করবে। কেউ এ জ্ঞান তার কাছে পৌছালে, সে যেই হোক তার অনুগ্রহ স্বীকার করবে। মোট কথা, বিনয়াবনত হওয়া ও কান লাগানো ছাড়া জ্ঞান অর্জিত হয় না। আল্লাহ তা'আলা বলেন : >“এতে সে ব্যক্তির চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে, যার অন্তর আছে অথবা যে মনোনিবেশ সহকারে শ্রবণ করে।”
অন্তর থাকার উদ্দেশ্য জ্ঞানের যোগ্যতা ও অনুধাবন করার প্রতিভা থাকা। অনুধাবনে সক্ষম হওয়াই যথেষ্ট নয়, যে পর্যন্ত না মনোনিবেশ সহকারে শুনবে। যাতে কানে যা কিছু ফেলা হয়, তা ভালরূপে শুনে বিনয়, শোকর, আনন্দ ও প্রতিজ্ঞা সহকারে কবুল করে নেয়। ওস্তাদের সামনে শাগরেদদের এমন থাকা উচিত, যেমন নরম মাটি, যার উপর অনেক বৃষ্টি পড়ে এবং মাটি সব পানি পান শুষে। ওস্তাদ কোন নিয়ম বললে শাগরেদ তার অনুসরণ করবে, নিজের মতামত খাটাবে না। কেননা, ওস্তাদ ভুল করলেও তা শাগরেদের নির্ভুলতা অপেক্ষা তার জন্যে অধিক উপকারী। অভিজ্ঞতা দ্বারা এমন সূক্ষ্ম বিষয় জানা যায়, যা শুনলে অবাক লাগে। কিন্তু তার উপকারিতা অনেক। উদাহরণতঃ অনেক গরম মেজাজের রোগীর চিকিৎসা চিকিৎসকরা গরম ওষুধ দ্বারাই করেন, যাতে রোগীর মধ্যে চিকিৎসার গুরুভার সহ্য করার মত উত্তাপ সৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু যারা চিকিৎসা শাস্ত্রে অভিজ্ঞ নয়, তারা একথা শুনে আশ্চর্যবোধ করে। আল্লাহ তা'আলা হযরত খিযির ও মূসা (আঃ)-এর ঘটনায় বিষয়টি ব্যক্ত করেছেন। হযরত খিযির বললেন : “আপনি আমার সাথে থেকে ধৈর্য ধরতে পারবেন না। আপনি এমন বিষয় দেখে ধৈর্য ধরবেনই বা কেমন করেও যার তত্ত্ব আপনার আয়ত্বাধীন নয়?”
এরপর হযরত খিযির মূসা (আঃ)-কে শর্ত দিলেন, চুপ থাকতে হবে এবং আমি নিজে না জানানো পর্যন্ত প্রশ্ন করা চলবে না। “অতএব আপনি যদি আমার সাথে থাকেন, তবে কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যে পর্যন্ত না আমি নিজে আপনাকে বলি।” কিন্তু হযরত মূসা (আঃ) সবর করতে পারলেন না, বার বার তাঁকে প্রশ্ন করতে থাকলেন। অবশেষে এটাই তাঁদের মধ্যে বিচ্ছেদের কারণ হয়ে গেল।
সারকথা, যে শাগরেদ তার ওস্তাদের মোকাবিলায় নিজের মত ও ক্ষমতা অব্যাহত রাখে, সে তার উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত হয়। অবশ্য আল্লাহ তা'আলা এক আয়াতে বলেছেন :
>“তোমাদের জ্ঞান না থাকলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করো।”
এ থেকে জিজ্ঞেস করার অনুমতি জানা যায়। এর উদ্দেশ্য, বাস্তবে জিজ্ঞেস করা বৈধ। কিন্তু যেসব বিষয় জিজ্ঞেস করার অনুমতি ওস্তাদ দেন সেগুলোই জিজ্ঞেস করতে হবে। কেননা, যে কথা অনুধাবন করার ক্ষমতা তোমার নেই, তা জিজ্ঞেস করা খারাপ। এ কারণেই হযরত খিযির মূসা (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করতে বারণ করেছিলেন।
মোট কথা, সময়ের পূর্বে জিজ্ঞেস করা উচিত নয়। তোমার কি প্রয়োজন এবং তা কখন বলা উচিত, সে সম্পর্কে ওস্তাদ অবহিত রয়েছেন। যে পর্যন্ত বলার সময় না আসে, জিজ্ঞেস করার সময়ও আসে না। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : আলেমের হক, তাকে অনেক প্রশ্ন করো না, জওয়াবের ব্যাপারে দোষারোপ করো না, যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন পীড়াপীড়ি করো না এবং সে ভুল করলে তাকে ক্ষমা মনে কর। যে পর্যন্ত আলেম আল্লাহর আদেশের হেফাযত করে, তার প্রতি সম্মান প্ৰদৰ্শন করা নিজের জন্য অপরিহার্য মনে কর। তার সামনে উপবেশন করো না।

চতুর্থ আদব,
শিক্ষার্থী প্রাথমিক অবস্থায় মানুষের মতভেদ শোনা থেকে বেঁচে থাকবে, সে দুনিয়ার জ্ঞান অন্বেষণ করুক অথবা আখেরাতের জ্ঞান। কেননা, মতভেদ শুনলে প্রাথমিক শিক্ষার্থীর জ্ঞান-বুদ্ধি বিহ্বল, চিন্তাধারা বিক্ষিপ্ত ও মতামত শিথিল হয়ে পড়ে এবং উপলব্ধি ও সূচনার ব্যাপারে সে নিরাশ হয়ে যায়। প্রথমে সে ওস্তাদের পছন্দনীয় কোন পন্থা বিশ্বাস করবে, এরপর অন্যান্য মাযহাব ও তাদের সন্দেহ শুনবে। যদি তার ওস্তাদ এক মত অবলম্বন করার ব্যাপারে পাকাপোক্ত না হয় এবং এক মাযহাব থেকে অন্য মাযহাব পাল্টানো ও তাঁদের উক্তি বর্ণনা করাই তাঁর অভ্যাস হয়, তবে এরূপ ওস্তাদ থেকে বেঁচে থাকা উচিত। কেননা, এরূপ ওস্তাদ হেদায়াত করে কম এবং পথভ্রষ্ট করে বেশী। অন্ধ কি অন্ধকে পথ দেখাতে পারে? যে নিজেই হারিয়ে গেছে, সে অন্যকে পথ দেখাবে কেমন করে?
প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে সন্দেহের পেছনে পড়তে বারণ করা, কোন নও মুসলিমকে কাফেরদের সাথে মেলামেশা করতে বারণ করারই মত। আর যে শিক্ষা সমাপ্ত করেছে, তাকে মতভেদসমূহে উৎসাহিত করা এমন, যেমন শক্ত ঈমানদারকে কাফেরদের সাথে দেখা সাক্ষাতে উৎসাহিত করা হয়। কেননা, প্রত্যেক কাজের জন্যে উপযুক্ত লোক দরকার। এ জন্যেই ভীরু কাপুরুষকে কাফেরদের উপর হামলা করতে বলা হয় না; বরং বীরপুরুষকে এ কাজের জন্য ডাকা হয়। এ সূক্ষ্ম তত্ত্ব সম্পর্কে গাফেল হয়ে কোন কোন দুর্বল লোক ধারণা করে যে, শক্ত লোকদের তরফ থেকে বর্ণিত শৈথিল্যে তাদের অনুসরণ করা জায়েয। তারা বুঝেনি যে, শক্ত লোকদের কাজ কারবার দুর্বল লোকদের কাজ কারবার থেকে আলাদা । এ সম্পর্কে জনৈক শায়খ বলেন : যেব্যক্তি আমাকে প্রথম অবস্থায় দেখেছে, সে যিন্দীক তথা খোদাদ্রোহী হয়ে গেছে। কারণ, শেষ অবস্থায় আমল বাতেনের মধ্যে অবস্থান গ্রহণ করে এবং বাহ্যিক অঙ্গ ফরয ক্রিয়াকর্ম ছাড়া অন্যান্য আন্দোলন থেকে স্তব্ধ হয়ে যায়। দর্শকরা মনে করে, এটা শৈথিল্য ও অকর্মণ্যতা। অথচ বাস্তবে তা নয়; বরং এটা অন্তরের পর্যবেক্ষণের আওতায় সার্বক্ষণিক যিকিরে ব্যাপৃত থাকা, যা সর্বোত্তম আমল। দুর্বল ব্যক্তি অঙ্গের বাহ্যিক অবস্থা দেখে এটাকে পদস্খলন মনে করে এবং নিজেও তদ্রূপ করে। তার দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোন ব্যক্তি এক গ্লাস পানিতে সামান্য নাপাক বস্তু ফেলে দেয় এবং বলে, সমুদ্রের জন্যে যা বৈধ তা গ্লাসের জন্যে আরও উত্তমরূপে বৈধ হওয়া উচিত। লোকটি জানে না যে, সমুদ্র তার শক্তির মাধ্যমে নাপাকীকে পানিতে পরিণত করে ফেলে এবং সমুদ্র প্রবল হওয়ার কারণে নাপাকীও সমুদ্রের মত হয়ে যায়। কিন্তু সামান্য নাপাকীই গ্লাসে প্রবল থাকে। সেটা গ্লাসকে নিজের মত নাপাক করে দেয়। এমনি ধরনের যুক্তির ভিত্তিতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর জন্যে এমন বিষয় জায়েয সাব্যস্ত হয়েছে, যা অন্যের জন্যে জায়েয নয়। উদাহরণতঃ তাঁর জন্যে চার জনের অধিক স্ত্রী গ্রহণ করা বৈধ হয়েছে। কেননা, তাঁকে যে শক্তি দান করা হয়েছিল, তার সাহায্যে তিনি স্ত্রীদের মধ্যে 'আদল' তথা সমতা বিধান করতে পারতেন- তাঁদের সংখ্যা যতই হোক না কেন। অন্য ব্যক্তি অল্প কয়েকজনের মধ্যেও ন্যায়বিচার করতে পারে না। বরং তাদের মধ্যকার ক্ষতি স্বয়ং তাকেও গ্রাস করবে; অর্থাৎ স্ত্রীদের মনোরঞ্জন করতে গিয়ে সে আল্লাহ তাআলার নাফরমানী করে বসবে। যেব্যক্তি ফেরেশতাকে কর্মকারের অনুরূপ মনে করে, সে সফলকাম হবে কি?

পঞ্চম আদব,
শিক্ষার্থী কোন উৎকৃষ্ট শাস্ত্রই না দেখে পরিত্যাগ করবে না। এতটুকু দেখবে যাতে তার উদ্দেশ্য ও মূল লক্ষ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। এর পর যদি জীবনে কুলায়, তবে সে সম্পর্কে পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা করবে। নতুবা অধিক গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রে আত্মনিয়োগ করে তাতে পূর্ণতা অর্জন করবে এবং অবশিষ্ট শাস্ত্রগুলো অল্প বিস্তর অর্জন করবে। কেননা, শাস্ত্র একে অপরের সহায়ক ও পরস্পর জড়িত। কোন শাস্ত্র শিক্ষা না করা শত্রুতাবশতই হতে পারে। কেননা, মানুষ যা করতে পারে না তার প্রতি বিরূপ হয়ে থাকে। আল্লাহ্ তা'আলা এরশাদ করেন : “যখন তাঁর হেদায়েতে তারা পথে আসে না, তখন বলবে- এটা একটা সনাতন মিথ্যা।”
জনৈক কবি বলেন, রোগের কারণে যার মুখের স্বাদ তিক্ত হয়ে যায়, সে মিঠা পানিকেও তিক্ত মনে করে। মোটকথা, উৎকৃষ্ট শাস্ত্র স্তর অনুযায়ী বান্দাকে আল্লাহ তা'আলার পথের, পথিক করে দেয় অথবা পথ চলায় কিছু না কিছু সাহায্য করে।

ষষ্ঠ আদব,
শিক্ষণীয় শাস্ত্রসমূহের মধ্য থেকে কোন একটি সহসা অবলম্বন করবে না; বরং ক্রমের দিকে লক্ষ্য রাখবে। যেটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ, সেটি থেকে শুরু করবে। কারণ, জীবন প্রায়শঃ সকল শাস্ত্ৰ আয়ত্ত করার জন্যে যথেষ্ট নয়। তাই সাবধানতা হচ্ছে, প্রত্যেক বস্তু থেকে উৎকৃষ্টটি অর্জন করবে এবং তা থেকে অল্প নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। অল্প জ্ঞান দ্বারা যে শক্তি অর্জিত হয়, তা সর্বোত্তম শিক্ষা তথা আখেরাত বিষয়ক শিক্ষার উভয় প্রকার মোআমালা ও মোকাশাফায় ব্যয় করবে।
এলমে মোআমালার অভীষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে এলমে মোকাশাফা এবং এর পরিণতি হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার মারেফাত। এলমে মোকাশাফা বলে আমাদের উদ্দেশ্য সে বিশ্বাস নয়, যা জনসাধারণ বাপ-দাদার কাছ থেকে শুনে এসেছে অথবা মুখস্থ করে নিয়েছে। কালাম শাস্ত্রের পদ্ধতিও উদ্দেশ্য নয়, যাতে প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় কথা টিকিয়ে রাখা হয়। কালাম শাস্ত্রীদের উদ্দেশ্য এতটুকুই। বরং এলমে মোকাশাফা বলে আমাদের উদ্দেশ্য হল এক প্রকার প্রত্যয়, যা সেই নূরের ফল, যা আল্লাহ তাআলা বান্দার অন্তরে স্থাপন করে দেন, যখন বান্দা সাধনা করে তার অন্তরকে অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করে। অবশেষে বান্দা হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর ঈমানের মর্তবা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যার সাক্ষ্য নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এভাবে দিয়েছেন—
যদি আবু বকরের ঈমান সারা বিশ্বের ঈমানের সাথে ওজন করা হয়, তবে আবু বকরের ঈমানই ভারী হবে। আশ্চর্যের বিষয়, কিছু লোক শরীয়তের প্রবর্তক রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছ থেকে এ ধরনের উক্তি শ্রবণ করার পর এর অনুরূপ যা কিছু শুনে, তাকে ঘৃণা করে এবং বলে যে, এগুলো সূফীদের অনর্থক ও দুর্বোধ্য কথাবার্তা।
সারকথা, তোমার সেই রহস্য জানার লোভ করা উচিত যা ফেকাহবিদ এবং কালামশাস্ত্রীদের সাহস ও আয়ত্তের বাইরে। এর অন্বেষণে লোভী না হয়ে তুমি এর পথ পাবে না।
মোট কথা, সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবকিছুর মূল লক্ষ্য যে শাস্ত্র, তা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার মারেফাত। এটা অতল সাগর। এতে সর্বাগ্রে রয়েছেন পয়গম্বরগণ, এর পর তাঁদের সাথে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিবর্গ। বর্ণিত আছে, পূর্ববর্তী দার্শনিকগণের মধ্যে দু'জন দার্শনিকের চিত্র এক উপাসনালয়ে পরিদৃষ্ট হয়। তাদের একজনের হাতে রাখা একটি চিরকুটে লেখা ছিল : যদি তুমি সকল বিষয় সংশোধন করে নাও, তবে মনে করো না যে, একটি বিষয়ও সংশোধন করতে পেরেছ, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তাআলার পরিচয় লাভ কর এবং তাঁকেই সকল কারণের মূল কারণ ও স্রষ্টা না জান। অপর হাতে রাখা চিরকুটে লিখিত ছিল : আল্লাহ তা'আলার মারেফাতের পূর্বে আমি পানি পান করতাম এবং পিপাসার্ত থাকতাম। অবশেষে যখন তাঁর মারেফাত অর্জিত হল তখন পানি পান করা ছাড়াই পিপাসা নিবৃত্ত হয়ে গেল।

সপ্তম আদব,
এমন কোন শাস্ত্রে পা রাখবে না, যে পর্যন্ত না তার আগে যেসব শাস্ত্র জানা দরকার সেগুলোর উপর পূর্ণ দক্ষতা অর্জিত হয়। কেননা, শাস্ত্রসমূহ এক জরুরী ক্রম অনুসারে বিন্যস্ত এবং এক শাস্ত্ৰ অন্য শাস্ত্রের পথ। যে এই ক্রম ও স্তরের প্রতি লক্ষ্য রাখে, সেই তওফীক প্রাপ্ত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
>“আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি, তারা তা যথার্থই পাঠ করে।”
অর্থাৎ, এলেম ও আমলের দিক দিয়ে এক শাস্ত্রে পাকাপোক্ত না হওয়া পর্যন্ত অন্য শাস্ত্রের দিকে অগ্রসর হয় না। যে শাস্ত্র অধ্যয়ন করবে তাতে তার উপরের শাস্ত্রে উন্নতি করার নিয়ত রাখবে। যদি কোন শাস্ত্রে মতভেদ হয় অথবা তাতে কয়েকজনই ভুল করে অথবা এলেম অনুসারে আমল না করে, তবে সে শাস্ত্র অর্থহীন বলে আখ্যায়িত করো না। যেমন কেউ কেউ চিকিৎসকের ভুল দেখে চিকিৎসা শাস্ত্রকে অকেজো মনে করে, জ্যোতিষীর কথাবার্তা ঘটনাচক্রে সত্য হতে দেখে কিছু লোক এর নির্ভুলতায় বিশ্বাসী হয় এবং কিছু লোক অন্য জ্যোতিষীর ভুল জেনে একে অকেজো বলে। অথচ তারা সকলেই ভ্রান্ত। বস্তুতঃ বিষয়টির বাস্তবতা স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে যাচাই করে নেয়া উচিত। কেউই কোন শাস্ত্রে এতটুকু ব্যুৎপত্তির অধিকারী হয় না যে, তার যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয়ে যাবে। এজন্যেই হযরত আলী (রাঃ) বলেন : মানুষকে দেখে সত্য চেনার চেষ্টা করো না; বরং সত্যকে জেনে নাও। এরপর সত্যপন্থীদেরকে আপনা আপনি জেনে যাবে।

অষ্টম আদব,
শাস্ত্রসমূহ যে কারণে একটি অপরটি থেকে শ্রেষ্ঠ, তা জানতে হবে। শ্রেষ্ঠত্ব দু'বিষয়ের কারণে হয়- ফলাফলের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে এবং শক্তিশালী প্রমাণের কারণে। উদাহরণতঃ ধর্মশাস্ত্র ও চিকিৎসাশাস্ত্র দেখলে দেখা যায়, প্রথমটির ফলাফল অনন্ত জীবনের সুখ এবং দ্বিতীয়টির ফলাফল ধ্বংসশীল জীবনের সুখ। সুতরাং এদিক দিয়ে ধর্ম শিক্ষা শ্রেষ্ঠ। কেননা, তার ফলাফল শ্রেষ্ঠ। অংকশাস্ত্র ও জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অংকশাস্ত্রের প্রমাণসমূহ পাকাপোক্ত ও শক্তিশালী। সুতরাং এটা জ্যোতিষশাস্ত্র থেকে শ্রেষ্ঠ। যদি অংকশাস্ত্রকে চিকিৎসাশাস্ত্রের সাথে মিলিয়ে দেখি, তবে চিকিৎসাশাস্ত্র অংকশাস্ত্র থেকে শ্রেষ্ঠ, যদিও চিকিৎসাশাস্ত্রের অধিকাংশই আন্দাজ অনুমান মাত্র।
এ বক্তব্য থেকে বুঝা গেল, আল্লাহ্, ফেরেশতা, কিতাব ও রসূলের পরিচয় বিষয়ক শাস্ত্রই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্র। আর যেসব শাস্ত্র এ শাস্ত্র পর্যন্ত পৌছার উপায় ও মাধ্যম, সেগুলোও শ্রেষ্ঠ। কাজেই এ শাস্ত্র ছাড়া অন্য কোন শাস্ত্রের প্রতি আগ্রহ ও লোভ করা তোমার উচিত নয়।

নবম আদব,
শিক্ষা দ্বারা শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্য হবে নিজের অভ্যন্তরকে সদগুণাবলী দ্বারা সজ্জিত করা এবং পরিণামে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ এবং ফেরেশতা ও ঊর্ধ্ব জগতের নৈকট্যশীলদের প্রতিবেশিত্ব অর্জন করা। শিক্ষার উদ্দেশ্য নেতৃত্ব, ধন-সম্পদ, জাঁকজমক, নির্বোধদের সাথে বিতর্ক এবং সমকক্ষদের উপর গর্ব করা না হওয়া উচিত। জ্ঞানের দ্বারা যার নিয়ত থাকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন, তার পক্ষে অবশ্যই এমন জ্ঞান অন্বেষণ করা দরকার, যা এই উদ্দেশের নিকটবর্তী। অর্থাৎ তার আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্র গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কিতাব ও সুন্নতের সাথে সম্পর্কযুক্ত ফতোয়াশাস্ত্র, অভিধানশাস্ত্র, ব্যাকরণশাস্ত্র ইত্যাদিকে ঘৃণার চোখে দেখতে পারবে না। এগুলো ফরযে কেফায়া শ্রেণীভুক্ত জ্ঞান। আমরা আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রের প্রশংসায় যে অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করেছি, এতে মনে করো না যে, উপরোক্ত শাস্ত্রসমূহ মন্দ। যারা এসব শাস্ত্রে আলেম, তারা তাদের মতই, যারা মাটির হেফাযত করে এবং আল্লাহর পথে জেহাদ করে। অর্থাৎ, তাদের কেউ যুদ্ধ করে, কেউ সাহায্য করে, কেউ তাদের পানি পান করায় এবং কেউ তাদের সওয়ারীর হেফাযত করে। আল্লাহর বাণীসমূহকে তুলে ধরা নিয়ত হলে তাদের কেউই সওয়াব থেকে বঞ্চিত নয়। আলেমগণের অবস্থাও তদ্রূপ। আল্লহ্ তাআলা বলেন-
>“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা আলেম, আল্লাহ তাদের মর্তবা উচ্চ করেন।”
অর্থাৎ আল্লাহর কাছে তাদের অনেক মর্তবা।
মোট কথা, আলেমগণের শ্রেষ্ঠত্ব আপেক্ষিক। কারও তুলনায় বেশী এবং কারও তুলনায় কম। তাঁরা স্বয়ং হেয় নয়। সুতরাং এরূপ ধারণা করা উচিত নয় যে, যে এলেম উচ্চ মর্তবার নিম্নে, তা মূল্যহীন। বরং জানা উচিত যে, সর্বোচ্চ মর্তবা পয়গম্বরগণের, এর পর মজবুত আলেমগণের, এরপর সৎকর্মশীল বান্দাগণের, তাদের স্তর অনুযায়ী। সারকথা, যে কণা পরিমাণ সৎকর্ম করবে তার সওয়াব সে পাবে। যেব্যক্তি এলেম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাইবে, তার এলেম যাই হোক না কেন, তার জন্যে উপকারী হবে এবং তার মর্তবা অবশ্যই উচ্চ করবে।

দশম আদব,
কোন্ শিক্ষা আসল উদ্দেশ্যের নিকটবর্তী এবং কোটি দূরবর্তী, তা জানতে হবে; যাতে নিকটবর্তীকে দূরবর্তীর উপর অগ্রাধিকার দেয়া এবং জরুরী জ্ঞান অবলম্বন করা যায়। জরুরী জ্ঞান অর্থ সে শিক্ষা যা তোমাকে চিন্তাশীল করবে।
বলাবাহুল্য, দুনিয়া ও আখেরাতে একমাত্র তোমার অবস্থাই তোমাকে চিন্তাশীল করে। দুনিয়ার ভোগবিলাস ও আখেরাতের সুখ-শান্তি একত্রে অর্জন করা তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। কোরআন পাকে একথা বর্ণিত হয়েছে এবং অন্তর্দৃষ্টিও এর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। তাই জ্ঞানই অনন্তকাল স্থায়ী হয়, সেটাই জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ। এমতাবস্থায় দুনিয়া হবে একটি মনযিল; দেহ হবে বাহন আর আমল হবে উদ্দেশ্যের দিকে চলা। উদ্দেশ্য আল্লাহ্ তা'আলার দীদার ব্যতীত অন্য কিছু নয়। কেননা, সকল সুখ ও আনন্দ এতেই নিহিত। তবে পৃথিবীর কম লোকই এর মূল্য অনুধাবন করে।
জ্ঞানকে আল্লাহ তাআলার সাক্ষাৎ ও দীদারের সাথে তুলনা করে দেখলে তা তিন প্রকার।
দীদারের যা উদ্দেশ্য তা পয়গম্বরগণ অন্বেষণ করতেন এবং তাঁরাই এটা বুঝতেন। সে দীদার উদ্দেশ্য নয়, যা জনসাধারণ ও কালামশাস্ত্রীদের মস্তিষ্কে আসে। একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তুমি এলেমের এই প্রকারত্রয় হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে।
দৃষ্টান্ত এই— কোন গোলামকে বলা হল, যদি তুমি হজ্জ কর এবং হজ্জের ক্রিয়াকর্ম পূর্ণরূপে পালন কর, তবে তুমি মুক্ত হয়ে যাবে এবং রাজত্বও লাভ করবে। আর যদি তুমি হজ্জের উদ্দেশে রওয়ানা হও এবং পথে কোন বাধার সম্মুখীন হও, তবে তুমি মুক্ত হয়ে যাবে কিন্তু রাজত্ব পাবে না। এখন এই গোলাম তিন প্রকার কাজের সম্মুখীন হবে- প্রথমতঃ সফরের সাজসরঞ্জাম প্রস্তুত করা অর্থাৎ, উট ক্রয়, মশক তৈরী ও খাদ্যশস্য সংগ্রহ, দ্বিতীয়তঃ দেশ ত্যাগ করে কা'বা গৃহের দিকে রওয়ানা হওয়া এবং তৃতীয়তঃ হজ্জের ক্রিয়াকর্মে আত্মনিয়োগ করা এবং এক একটি রোকন ক্রমানুসারে আদায় করা। এই তিনটি অবস্থা এবং এহরাম ও বিদায়ী তওয়াফ শেষ হওয়ার পর গোলাম আযাদী ও রাজত্বের অধিকারী হবে। প্রত্যেক অবস্থায় এই গোলামের অনেক স্তর রয়েছে। এখন যেব্যক্তি এখনও পাথেয় ও সওয়ারী প্রস্তুত করার কাজে লিপ্ত, অথবা চলা শুরু করেছে, সে সৌভাগ্যের এতটুকু কাছাকাছি হবে না, যতটুকু সেব্যক্তি হবে যে হজ্জের ক্রিয়াকর্ম শুরু করে দিয়েছে। কেননা, সে দুই অবস্থা অতিক্রম করে খুব কাছে পৌঁছে গেছে। অনুরূপভাবে জ্ঞানও তিন প্রকার।
এক প্রকার সফরের সাজসরঞ্জাম ক্রয় করার মত। এটা হচ্ছে চিকিৎসা ও ফেকাহ শিক্ষা এবং দুনিয়াতে দেহের উপযোগিতার সাথে সংশ্লিষ্ট জ্ঞানসমূহ।
দ্বিতীয় প্রকার শিক্ষা প্রান্তরে চলা ও উপত্যকা অতিক্রম করার মত। এটা হচ্ছে বদভ্যাসের ময়লা থেকে বাতেনকে পাক-পবিত্র করা এবং এমন উচ্চ মর্তবায় পৌঁছা, যেখানে তওফীকপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ পৌঁছতে পারে না। এসব বিষয় পথ চলার অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর জ্ঞান অর্জন করা পথের মনযিলসমূহ জানার মত। অতিক্রম না করে কেবল মনযিল ও পথ জেনে নেয়া যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি চরিত্র শুদ্ধ না করে কেবল চরিত্র শুদ্ধির উপায় জেনে নেয়াও যথেষ্ট নয়। জ্ঞান ছাড়া চরিত্র শুদ্ধি হতে পারে না।
তৃতীয় প্রকার জ্ঞান হজ্জ ও হজ্জের রোকনসমূহের মত। এটা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলা, তাঁর গুণাবলী ও ফেরেশতার জ্ঞান এবং এলমে মোকাশাফায় বর্ণিত বিষয়াদির জ্ঞান। এ প্রকার শিক্ষার পর মুক্তি ও সৌভাগ্য অর্জিত হয়। কিন্তু নিরাপত্তা এ পথের প্রত্যেক পথিকেরই অর্জিত হয় যদি তার উদ্দেশ্য সৎ হয়। যারা আল্লাহ তা'আলার আরেফ, তাদের ছাড়া অন্য কেউ সৌভাগ্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে পারে না। তারাই নৈকট্যশালী হয় এবং তাদের উপরই রহমত, সুখ ও জান্নাতের নেয়ামত বর্ষিত হয়। যারা পূর্ণতার স্তর থেকে দূরে থেকে যায়, তাদের নাজাত ও নিরাপত্তা অর্জিত হয়। সেমতে আল্লাহ তা'আলা বলেন :
>“অতঃপর যদি সে নৈকট্যশালীদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে তার জন্যে রয়েছে সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও জান্নাতের নেয়ামত। আর যদি সে হয় ডান দিকের লোকদের অন্তর্ভুক্ত, তবে তাদের তরফ থেকে আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।”
আর যারা উদ্দেশের প্রতি মনোযোগী হয় না এবং সেদিকে চলে না, অথবা চললেও আনুগত্য ও দাসত্বের নিয়তে চলে না; বরং জাগতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্যে চলে, তারা বাম দিকের লোকদের অন্তর্ভুক্ত; অর্থাং পথভ্ৰষ্ট হবে। তাদের জন্যে বলা হয়েছে :
>“তারা উত্তপ্ত পানি দ্বারা আপ্যায়িত হবে এবং জাহান্নামে প্রবিষ্ট হবে।”
মোট কথা, এলমে মোকাশাফার পরে সৌভাগ্য তথা সিদ্ধি লাভ হয়। আর এলমে মোকাশাফা এলমে মোআমালার পরে আসে। অর্থাৎ আখেরাতের পথে চলা এবং গুণাবলীর উপত্যকাসমূহ অতিক্রম করার পর এলমে মোকাশাফা অর্জিত হয়। আমরা চিকিৎসা ও ফেকাহশাস্ত্রকে হজ্জের জন্যে পাথেয় ও সওয়ারী প্রস্তুত করার সাথে তুলনা করেছি। এর কারণ, আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের জন্যে তাঁর দিকে অন্তর চলে, দেহ নয়। আমাদের মতে অন্তর সেই মাংসপিন্ড নয় যা চোখে উপলব্ধ হয়; বরং এটা আল্লাহ তা'আলার এক রহস্য। এটা ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধ হয় না। কখনও একে রূহ এবং কখনও নফসে মুতমায়িন্নাহ বলা হয়। শরীয়ত একে কলব তথা অন্তর বলে ব্যক্ত করে। কেননা, অন্তর হচ্ছে এ রহস্যের প্রথম সওয়ারী এবং অন্তরের মাধ্যমে সমগ্র দেহ তার সওয়ারী ও হাতিয়ারে পরিণত হয়। এলমে মোকাশাফা দ্বারা এ রহস্যের অবস্থা চমৎকাররূপে জানা যায়। এ রহস্য প্রকাশযোগ্য নয়; বরং এ সম্পর্কে আলোচনা করার অনুমতি নেই। বেশীর বেশী এতটুকু বলার অনুমতি আছে যে, এটি একটি উৎকৃষ্ট বিষয়, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়াদির তুলনায় শ্রেষ্ঠ এবং খোদায়ী নির্দেশ। সেমতে আল্লাহ্ বলেন-
>“তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলে দিন, রূহ্ আমার পালনকর্তার নির্দেশের অংশ।” উদ্দেশ্য এই যে, রূহ তার পালনকর্তার দিকে ধাবিত হয়। আল্লাহ্ তাআলাই এর উৎস এবং তাঁর দিকেই সে প্রত্যাবর্তন করে। দেহ এ রূহের সওয়ারী, যাতে সওয়ার হয়ে সে চলে। আল্লাহর পথে দেহ অন্তরের জন্যে এমন, যেমন হজ্জের পথে দেহের জন্যে উট অথবা পানির মশক। অতএব যে আমলের উদ্দেশ্য দেহের কল্যাণ সাধন, সেটা সওয়ারীর কল্যাণসমূহের অন্তর্ভুক্ত।
বলাবাহুল্য, চিকিৎসাশাস্ত্রের উদ্দেশ্যও দেহের কল্যাণ সাধন। কেননা, দৈহিক স্বাস্থ্যের দেখাশোনার জন্যে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রয়োজন হয়। ধরে নাও, মানুষ যদি একা থাকত, তবে তার চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রয়োজন হত- ফেকা প্রয়োজন হত না। কিন্তু মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যে, সে একাকী অবস্থায় জীবিত থাকতে পারে না। আহারের জন্যে হালচাষ, বপন এবং অন্ন ও বাসস্থান অর্জন প্রভৃতি একাকী সমাধা করা সম্ভব হতে পারে না। এর জন্যে অন্যের সাথে মেলামেশা করা ও সাহায্য চাওয়া জরুরী। মানুষ যখন পরস্পরে মেলামেশা করেছে এবং কামনা বাসনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন পরস্পরে কলহ-বিবাদ ও মারামারি করে বরবাদ হতে শুরু করেছে। এ কলহ বিবাদই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়েছে, যেমন দেহের পিত্তাদি বিগড়ে গেলে মানুষের মৃত্যু ঘটে থাকে। চিকিৎসাশাস্ত্রের মাধ্যমে পিত্তাদির দূষিত হওয়া থেকে নিরাপদ থাকা যায় এবং শাসন ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে বাহ্যিক ফ্যাসাদ দূর করে কামনা বাসনায় সমতা আনয়ন করা। পিত্তাদিতে সমতা কায়েম রাখার নিয়ম কানুন জানাকে ফেকাহশাস্ত্র বলা হয়। উভয়টি দেহের হেফাযতের জন্যে অন্তরের বাহন হয়। সুতরাং যেব্যক্তি কেবল ফেকাহ্ ও চিকিৎসাশাস্ত্রেই নিয়োজিত থাকে এবং নফসের উপর মোজাহাদা বা সাধনা না করে, সে যেন উট ক্রয় করে তার প্রতিপালনেই কেবল ব্যস্ত থাকে; কিন্তু হজ্জের পথে পা বাড়ায় না। যারা আত্মার সংশোধন তথা এলমে মোকাশাফার পথে চলমান, তাদের সাথে এই ফেকাহশাস্ত্রীদের তুলনা এমন, যেমন যারা হজ্জের রোকনসমূহ পালনে লিপ্ত, তাদের সাথে সে ব্যক্তির তুলনা, যে উট কিনে সেটিকে কেবল ঘাস খাওয়াচ্ছে- হজ্জের পথে রওয়ানা হচ্ছে না।
সুতরাং এ বিষয়টি প্রথমেই চিন্তা কর এবং সে ব্যক্তির উপদেশ মান্য কর, যে তোমার কাছে এর কোন মজুরি চায় না এবং যে সততঃ এতে মগ্ন রয়েছে। কঠোর পরিশ্রম ছাড়া তোমার জন্যে এ বিষয়টি অর্জিত হবে না। জনসাধারণ ও বিশিষ্ট লোকদের কাছ থেকে আলাদা হওয়ার জন্যে তোমাকে পূর্ণ সাহসিকতা প্রদর্শন করতে হবে এবং কেবল নিজের খেয়াল-খুশী অনুযায়ী তাদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। শিক্ষার্থীর জন্যে এতটুকু আদবই যথেষ্ট মনে হয়।

পরবর্তী পর্ব-

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...