জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২২)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
মোনাযারা থেকে উদ্ভূত বিপদ-
প্রকাশ থাকে যে, নিজে প্রবল হওয়া, অপরকে নিশ্চুপ করা, নিজের গুণগরিমা প্রকাশ করা, মানুষের মধ্যে শুদ্ধভাষিতা, বাগ্মিতা ও গর্ব প্রদর্শন করা এবং মানুষের মন নিজের দিকে আকৃষ্ট করা ইত্যাদি হীন উদ্দেশে যে মোনাযারা করা হয়, তা আল্লাহ তাআলার কাছে নিন্দনীয় ও শয়তানের কাছে প্রশংসনীয় বদঅভ্যাসসমূহের উৎস হয়ে থাকে। অহংকার, হিংসা, আত্মম্ভরিতা, লোভ-লালসা, জাঁকজমকপ্রিয়তা ইত্যাদি আভ্যন্তরীণ অনিষ্টের সম্পর্ক মোনাযারার সাথে এমন, যেমন যেনা, গালি-গালাজ, হত্যা, চুরি ইত্যাদি বাহ্যিক অনিষ্টের সম্পর্ক মদ্যপানের সাথে। কোন ব্যক্তিকে মদ্যপান এবং এসব কুকর্ম করার ক্ষমতা দেয়া হলে যেমন সে মদ্যপানকে সামান্য মনে করে তা করে বসবে, এরপর মাতাল অবস্থায় অবশিষ্ট কুকর্মগুলো করে ফেলবে, তেমনি যার মনে অপরকে নিশ্চুপ করার আগ্রহ, মোনাযারায় জয়ী হওয়ার বাসনা এবং জাঁকজমক ও অহংকারপ্রীতি প্রবল থাকে, তার মনে সকল প্রকার লুকিয়ে থাকে এবং যাবতীয় বদভ্যাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। হাদীস ও কোরআনের আলোকে আমরা এসব বদভ্যাসের নিন্দা তৃতীয় খন্ডে বর্ণনা করব। এখানে কেবল এমন কতিপয় বদভ্যাস বর্ণিত হচ্ছে, যেগুলো মোনাযারা থেকে উদ্ভূত হয়। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে হিংসা। এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>“হিংসা সৎকর্মসমূহকে খেয়ে ফেলে যেমন আগুন কাঠকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়।”
যেব্যক্তি মোনাযারা করে, সে হিংসা থেকে মুক্ত হয় না। কারণ, সে কখনও জয়ী হয় এবং কখনও পরাভূত হয়। কখনও তার যুক্তির প্রশংসা করা হয় আবার কখনও প্রতিপক্ষের যুক্তি প্রশংসিত হয়। যে পর্যন্ত পৃথিবীতে এক ব্যক্তিও এমন থাকবে, যে জ্ঞান গরিমা ও মোনাযারায় স্বনামখ্যাত অথবা মোনাযারাকারীর ধারণায় তার যুক্তিই অধিক শক্তিশালী, সে পর্যন্ত অবশ্যই সে হিংসা পোষণ করবে, প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ফিরে কেবল মোনাযারাকারীর দিকে আকৃষ্ট হোক এমনটা পছন্দ করবে। সত্য বলতে কি, হিংসা একটি জ্বলন্ত আগুন। যে এতে লিপ্ত হয়, সে দুনিয়াতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে কালাতিপাত করে। আখেরাতের আযাব আরও বেশী ভয়ংকর। তাই হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন :
"জ্ঞান যেখানেই পাও, অর্জন কর। ফেকাহবিদদের যেসকল উক্তি একে অপরের বিরুদ্ধে, সেগুলো গ্রহণ করো না। তারা পালের ছাগলের ন্যায় লড়াই করে।"
দ্বিতীয় বদভ্যাস হচ্ছে অহংকার করা। এ সম্পর্কে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন : “যেব্যক্তি অহংকার করে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে হেয় করেন। আর যে বিনয়ী হয় আল্লাহ্ তাকে উঁচু করেন।”
হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে :
>“মাহাত্ম্য আমার পরিধেয় এবং বড়ত্ব আমার চাদর। যেব্যক্তি এতদুভয়ের মধ্য থেকে কোন একটিতে আমার সমকক্ষতার আকাঙ্ক্ষা করে, আমি তাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেই।”
মোনাযারাকারীরা তাদের সমসাময়িক ও সমপর্যায়ের লোকদের সাথে অহংকার,বড়ত্ব অন্বেষণ এবং আপন যোগ্যতার চেয়ে বড় আসন লাভের বাসনা থেকে মুক্ত থাকে না। এমনকি, সভাপতির আসনের নিকটে অথবা দূরের জায়গায় বসার জন্যে পর্যন্ত লড়াই করে এবং পথ সংকীর্ণ হলে আগে যাওয়ার জন্যে খুনাখুনিতে লিপ্ত হয়। মাঝে মাঝে তাদের কতক অনভিজ্ঞ ও প্রতারক ব্যক্তি বলে থাকে, এলেমের ইযযত রক্ষা করাই তাদের লক্ষ্য। ঈমানদার ব্যক্তি নিজেকে লাঞ্ছিত করতে পারে না। এটা শরীয়তে নিষিদ্ধ। এই বাহানায় তারা বিনয়কে লাঞ্ছনা বলে মনে করে। অথচ আল্লাহ তাআলা ও পয়গম্বরগণ বিনয়ের প্রশংসা করেছেন। যে অহংকার আল্লাহ্ তাআলার কাছে নিন্দনীয়, তারা তাকে ধর্মের সম্মানরূপে আখ্যায়িত করে এবং শব্দ পরিবর্তন করে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। এটা এলেম ও হেকমত শব্দকে পরিবর্তন করে অন্য অর্থ করারই মত।
আর একটি বদভ্যাস হচ্ছে পরশ্রীকাতরতা। খুব কম মোনাযারাকারীই এ দোষ থেকে মুক্ত থাকে। অথচ রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “ঈমানদার ব্যক্তি পরশ্রীকাতর হতে পারে না।” এর নিন্দায় অনেক কিছু বর্ণিত আছে। মোনাযারাকারী ব্যক্তি যখন কাউকে দেখে যে, সে প্রতিপক্ষের কথায় মাথা নাড়ে এবং তার কথা ভালরূপে শুনে না, তখন সে উদ্বিগ্ন হয় এবং তার প্রতি পরশ্রীকাতর হয়ে পড়ে।
আর একটি কুঅভ্যাস হচ্ছে গীবত তথা পরনিন্দা। আল্লাহ তাআলা একে মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণের সাথে তুলনা করেছেন। মোনাযারাকারী ব্যক্তি এরূপ মাংস ভক্ষণেই অভ্যস্ত হয়ে থাকে। সে সর্বদা প্রতিপক্ষের কথাবার্তা উদ্ধৃত করে তার নিন্দা করে। সে চরম সাবধানী হলে এটা করে যে, প্রতিপক্ষের কথা সত্য সত্য বর্ণনা করে- মিথ্য বলে না, কিন্তু এতেও এমন কথা বর্ণনা করে না, যদ্বারা তার দোষ, হেরে যাওয়া এবং মানহানি ঘটতে পারে। বলাবাহুল্য, এ ধরনের আলোচনা গীবতেরই অন্তর্ভুক্ত। আর যদি মিথ্যা বলে, তবে সেটা তো পুরোই অপবাদ, যা গীবত থেকেও জঘন্য।
অপর একটি বদভ্যাস হচ্ছে আত্মপ্রশংসা। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। কে মোত্তাকী সেটা আল্লাহ্ই ভাল জানেন।
জনৈক দার্শনিককে জিজ্ঞেস করা হয় : মন্দ সত্য কোনটি? তিনি বললেন : আত্মপ্রশংসা করা। যেব্যক্তি মোনাযারা করে, সে শক্তি-সামর্থ্য ও সমকক্ষদের উপর শ্রেষ্ঠত্বে অগ্রণী হওয়ার ব্যাপারে নিজের প্রশংসা নিজেই করে থাকে। বরং মোনাযারার মাঝখানে বলে উঠে- এ ধরনের বিষয় আমার কাছে গোপন থাকতে পারে না। এগুলো আমার নখদর্পণে। আমি হাদীস ও নীতিশাস্ত্রে পারদর্শী। সে এমনি ধরনের আরও অনেক কথাবার্তা কখনও আস্ফালনের ছলে এবং কখনও নিজের মতবাদ চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশে বলে থাকে। বলাবাহুল্য, আস্ফালন এবং দর্প প্রদর্শন করা শরীয়ত ও বিবেকের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ।
ছিদ্রান্বেষণও মোনাযারা থেকে উদ্ভূত একটি কুঅভ্যাস। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন : “তোমরা ছিদ্রান্বেষণ করো না।” মোনাযারাকারী ব্যক্তি প্রতিপক্ষের ত্রুটিবিচ্যুতি ও দোষ অন্বেষণ করে ফিরে। এমনকি, তার শহরে কোন মোনাযারাকারীর আগমনের সংবাদ পেলে সে এমন ব্যক্তির খোঁজ করে, যে তার আভ্যন্তরীণ অবস্থা বলে দিতে পারে। সে তাকে জিজ্ঞেস করে করে দোষ জেনে নেয় এবং প্রয়োজনে সেগুলো প্রকাশ করে প্রতিপক্ষকে লজ্জা দেয়। এমনকি, তার শৈশবকালীন অবস্থা এবং দৈহিক দোষ যেমন টেকো হওয়া ইত্যাদিও জেনে নেয়। এর পর মোনাযারার সময় তাকে সামান্যও প্রবল হতে দেখলে প্রথমে সম্ভ্রমের খাতিরে ইশারা ইঙ্গিতে সেসব দোষ বর্ণনা করে। অন্যরাও এ বিষয়টি পছন্দ করে এবং স্বয়ং মোনাযারাকারী এক একটি সূক্ষ্ম অস্ত্ররূপে গণ্য করে। পক্ষান্তরে দুর্মুখ হলে প্রকাশ্যে ও স্পষ্ট ভাষায় সেসব দোষ উল্লেখ করতে দ্বিধা করে না।
অপরের দুঃখে আনন্দিত হওয়া এবং আনন্দে দুঃখ করাও একটি বদ অভ্যাস, যা মোনাযারাকারীর মধ্যে পাওয়া যায়। অথচ যে নিজের জন্যে যা পছন্দ করে, মুসলমান ভাইয়ের জন্যে তা পছন্দ করে না, সে ঈমানদারদের চরিত্র থেকে বহু মনযিল দূরে অবস্থান করে। অতএব যেব্যক্তি গুণগরিমা প্রকাশ করে গর্ব করে, তার কাছে অবশ্যই তা ভাল লাগবে, যা তার সমকক্ষ ও গুণগরিমায় অংশীদারদের কাছে খারাপ লাগে। তাদের মধ্যে এমন শত্রুতা হবে, যেমন সতীনদের মধ্যে হয়ে থাকে। এক সতীন দূর থেকে অপর সতীনকে দেখে যেমন ক্ষেপে উঠে এবং মলিন হয়ে যায়, তেমনি মোনাযারাকারী ব্যক্তি যখন অপরকে দেখে, তখন তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায় এবং চিন্তায় বিক্ষিপ্ততা এসে যায়; যেন সামনে ভূত এসে গেছে অথবা কোন হিংস্র জন্তুর সম্মুখীন হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে সে মহব্বত ও মুখ কোথায়, যা খাঁটি আলেমগণের পারস্পরিক সাক্ষাতের সময় হয়ে থাকে? যেরূপ ভ্রাতৃত্ববোধ, সহানুভূতি ও সুখে দুঃখে শরীক থাকার কথা আলেমগণ থেকে বর্ণিত আছে, তা তাদের মধ্যে কোথায়? এমনকি, শাফেয়ী (রঃ) বলেন : গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের মধ্যে একটি নিকট আত্মীয়তার সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। এখন আমরা জানি না, যাদের মধ্যে এলেম ও শিক্ষা একটি চূড়ান্ত শত্রুতার কারণ হয়ে গেছে, তারা ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর মযহাব অনুসরণের দাবী করে কিরূপে? এটা কিরূপে সম্ভব, গর্ব, অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের স্পৃহা থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে মহব্বত ও সম্প্রীতি কায়েম থাকবে? এটা কখনও হতে পারে না। এ মোনাযারা যে মন্দ, তা জানার জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট যে, মোনাযারা তোমার কাছ থেকে মুমিনদের অভ্যাস ছাড়িয়ে নিয়ে মোনাফিকদের অভ্যাসের সাথে তোমাকে জড়িয়ে দেয়।
আরেকটি বদভ্যাস হচ্ছে নেফাক তথা কপটতা। এর অনিষ্ট প্রমাণসাপেক্ষ নয়। যারা মোনাযারা করে, তাদের কপটতাও করতে হয়। উদাহরণতঃ প্রতিপক্ষ অথবা তার বন্ধু ও অনুসারীদের সাথে সাক্ষাত হলে অপারগ হয়ে মুখে তাদের সাথে বন্ধুত্ব প্রকাশ করা হয়, তাদের প্রতি আগ্রহ ব্যক্ত করা হয় এবং তাদের মর্তবায় বিশ্বাস প্রকট করা হয়। অথচ বক্তা নিজে ও সম্বোধিত ব্যক্তি এবং অন্য যারা শুনে, সকলেই জানে, এ সব বানোয়াট, প্রতারণা, মিথ্যা ও দুষ্কর্ম বৈ কিছু নয়। বাহ্যতঃ মুখে বন্ধু হলেও আন্তরিকভাবে একে অপরের শত্রু। আল্লাহ তাআলা এহেন বদভ্যাস থেকে আপন আশ্রয়ে রাখুন।
নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন : যখন মানুষ এলেম শিক্ষা করে তদনুযায়ী আমল ছেড়ে দেয় এবং মুখে বন্ধু হয়ে থাকে, কিন্তু অন্তরে পরস্পরের শত্রু হয় এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেন, তাদেরকে বধির করে দেন এবং তাদের দৃষ্টিশক্তি বিলোপ করেন। অভিজ্ঞতার আলোকেও অবশ্যই এমনটি হতে দেখা গেছে।
আরেকটি বদভ্যাস হচ্ছে সত্য কথার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ ও সে সম্পর্কে লড়াই করার স্পৃহা।
মোনাযারাকারীদের কাছে সর্বাধিক মন্দ বিষয় হচ্ছে প্রতিপক্ষের মুখ থেকে সত্য প্রকাশ পাওয়া। এরূপ হলে মোনাযারাকারী তা অস্বীকার করা ও না মানার জন্যে সাধ্যানুযায়ী উঠে পড়ে লেগে যায় এবং যতদূর সম্ভব তা প্রতিহত করার জন্যে ধোঁকা ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়। ফলে সত্য বিষয়ে লড়াই করা তার মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়। যখনই কোন কথা কানে পড়ে, তখনই তাতে আপত্তি তোলার কথা ভাবতে থাকে। ক্রমশঃ এ বিষয়টি কোরআন পাকের দলীলসমূহে এবং শরীয়তের ভাষায়ও তার মনে প্রবল হয়ে যায়। সে এক দলীলের মোকাবিলা অন্য দলীল দ্বারা করে। অথচ বাতিলের মোকাবিলায়ও লড়াই ঝগড়া করতে শরীয়তে নিষেধ করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এক হাদীসে বলেন :
>“যেব্যক্তি বাতিলপন্থী হয়ে ঝগড়া বর্জন করে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে জান্নাতের এক কোণে গৃহ নির্মাণ করেন। আর যেব্যক্তি সত্যপন্থী হয়ে কলহ বর্জন করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে একটি গৃহ নির্মাণ করেন।"
আল্লাহ্ তাআলা স্বয়ং তাঁর নিজের উপর মিথ্যা বলা এবং সত্য বিষয় মিথ্য প্রতিপন্ন করাকে সমপর্যায়ভুক্ত করেছেন। সেমতে তিনি বলেন :
>“সে ব্যক্তির চেয়ে বড় জালেম কে, যে আল্লাহর উপর মিথ্যা গড়ে এবং সত্য বিষয়কে তার কাছে আসার পর মিথ্যা বলে জাহির করে।"
>“সে ব্যক্তির চেয়ে বড় জালেম কে, যে আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা ভাষণ দেয় এবং সত্য আসার পর তাকে মিথ্যা বলে?“
আর একটি বদভ্যাস হচ্ছে রিয়া তথা লোক দেখানো ভাব।
এটা অধিক দুরারোগ্য ব্যাধি। এর দ্বারা সর্ববৃহৎ কবীরা গোনাহ প্রকাশ পায়। এ সম্পর্কে রিয়া অধ্যায়ে বর্ণনা করা হবে।
বর্ণিত দশটি আভ্যন্তরীণ দোষই সকল অনিষ্টের মূল।
সম্ভ্রমশীল নয় - এমন লোকদের মধ্যে যেসব অনিষ্ট হয়ে যায়, সেগুলো এর অতিরিক্ত। উদাহরণতঃ এমনভাবে বিতর্ক করা যে, হাতাহাতি, ঠেলাঠেলি, কিলঘুষি, কাপড় ছিঁড়ে ফেলা, পিতামাতাকে ও ওস্তাদদেরকে মন্দ বলা এবং গালিগালাজ করার উপক্রম হয়ে যায়। এ ধরনের লোক মনুষ্যত্বের গণ্ডির বাইরে। যারা বুদ্ধিমান ও সম্ভ্রমশীল, তাদের মধ্যে এ দশটি অনিষ্ট অবশ্যই থাকে। হাঁ, মাঝে মধ্যে কোন মোনাযারাকারী এগুলোর মধ্যে কতক বদভ্যাস থেকে বেঁচেও থাকে, যদি তার প্রতিপক্ষ তার চেয়ে নিম্নস্তরের হয় অথবা অনেক বেশী উঁচু স্তরের হয়, অথবা তার শহর থেকে দূরে বসবাস করে। আর যার প্রতিপক্ষ সমকক্ষ, নিকটে বসবাসকারী ও সমস্তরের হয়, সে এই দশটি বদভ্যাস থেকে মুক্ত হয় না। এ দশটি বদভ্যাস থেকে আরও দশটি কুকাণ্ড প্রকাশ পায়, যার প্রত্যেকটির বিস্তারিত বিবরণ দীর্ঘ মনে করে আমরা এখানে উল্লেখ করছি না। উদাহরণতঃ নাক সিঁটকানো, রুষ্টতা, শত্রুতা, লোভ-লালসা, জাঁকজমক, আস্ফালন, ধনী ও সরকারী কর্মচারীদের সম্মান এবং তাদের কাছে আসা-যাওয়া, তাদের হারাম ধন সম্পদ গ্রহণ, নিষিদ্ধ পোশাকে সজ্জিত হওয়া, গর্ব অহংকারভরে অপরকে হেয় মনে করা, বেশী কথা বলা, মন থেকে ভয় ও আশা তিরোহিত হওয়া, এমন গাফেল হওয়া যে, নামাযে দাঁড়িয়ে কত রাকআত পড়েছে এবং কি পড়েছে তা মনে না থাকা, কার কাছে মোনাজাত করছে, তাও বোধশক্তিতে না থাকা। মোনাযারাকারী ব্যক্তি সারাজীবন মোনাযারা সম্পর্কিত এলেমের মধ্যে ডুবে থাকে এবং উত্তম বাক্য বলা, ছন্দপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা, বিরল কথাবার্তা স্মরণ করা ইত্যাদিতে ব্যাপৃত থাকে। অথচ এগুলো আখেরাতে কোন উপকারে আসবে না।
মোনাযারাকারীদের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। তাদের মধ্যে যেব্যক্তি অধিক ধার্মিক ও জ্ঞানী, তার মধ্যেও এসব বদভ্যাসের উপকরণ সঞ্চিত থাকে। সে মোজাহাদার মাধ্যমে একে গোপন রাখে। এই খারাপ অভ্যাসগুলো সে ব্যক্তির মধ্যেও বিদ্যমান থকে, যে ওয়াজ নসীহতে মশগুল থাকে, যদি ওয়াজ দ্বারা তার উদ্দেশ্য জনপ্রিয়তা অর্জন এবং ধন-দৌলত ও সম্মান অর্জন করা হয়।
যদি কোন ব্যাক্তবিচারকের পদ লাভ, ওয়াকফ সম্পাত্তর মুতাওয়াল্লী হওয়া এবং সমকক্ষদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার উদ্দেশে এলেম, মযহাব ও ফতোয়ায় নিয়োজিত থাকে, তবে তার মধ্যে এসব অভ্যাস অপরিহার্যরূপে পাওয়া যাবে। মোট কথা, যেব্যক্তি আখেরাতের সওয়াব ছাড়া অন্য কিছুর উদ্দেশে আলেম হবে, তার মধ্যেই এ সমস্ত বদভ্যাস পাওয়া যাবে। এ জন্যেই রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : কিয়ামতে মানুষের মধ্যে কঠোরতর আযাব সেই আলেমের হবে, যাকে আল্লাহ্ তাআলা তার এলেম দ্বারা কোন উপকার পৌঁছাননি। এক্ষেত্রে তার এলেম উপকার না করে বরং ক্ষতি করেছে। যে এলেম অন্বেষণ করে তার অবস্থা সে ব্যক্তির মত, যে দুনিয়াতে রাজত্ব অন্বেষণ করে। যদি ঘটনাক্রমে রাজত্ব না পায় তবে আশা করা যায় না যে, সে অন্য লোকদের মত বেঁচে থাকবে; বরং তাকে অবশ্যই বড় বড় লাঞ্ছনার সম্মুখীন হতে হবে। যদি বল, মোনাযারার অনুমতি দেয়ার মধ্যে উপকারিতা রয়েছে, এতে এলেম অন্বেষণের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি হয়, যা না থাকলে এলেম মিটে যাবে। তবে আমি বলব, তোমার এ কথা এক দিক দিয়ে ঠিক, কিন্তু উপকারী নয়। কারণ ছেলেদেরকে খেলার বল, ডাংগুলি ও খেলাধুলার প্রতিশ্রুতি না দিলে তারা মক্তবের প্রতি আগ্রহী হয় না। এতে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী হওয়া উত্তম হয়ে যায় না। এমনিভাবে জাঁকজমকপ্রীতি না হলে এলেম মিটে যাবে- এ বাক্য এ কথা বুঝায় না যে, যেব্যক্তি জাঁকজমক অন্বেষণ করবে, সে মুক্তি পাবে। বরং সে তো তাদেরই একজন যাদের সম্পর্কে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
>“আল্লাহ্ তাআলা এমন লোকের মাধ্যমেও এ দ্বীনকে শক্তিশালী করেন, যাদের দ্বীনে কোন অংশ নেই।”
অন্যত্র বলেন :
>“আল্লাহ তা'আলা পাপাচারী ব্যক্তির মাধ্যমে এ দ্বীনকে শক্তি দান করেন।”
এ থেকে জানা গেল, যারা জাঁকজম প্রিয়, তারা নিজেরা তো ধ্বংস হয় বটে, কিন্তু কখনো কোন সময় তাদের দ্বারা অন্যদের মঙ্গল হয়, যদি তারা অন্যদেরকে সংসার বর্জনের আহ্বান জানায়। এটা এরূপ নেতাদের মধ্যে হয়, যাদের অবস্থা বাহ্যতঃ পূর্ববর্তী মনীষীগণের বাহ্যিক অবস্থার অনুরূপ হয়; কিন্তু অন্তরে জাঁকজমকপ্রিয়তা লুক্কায়িত থাকে। তাদের দৃষ্টান্ত মোমবাতির মত। সে নিজে জ্বলে পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, কিন্তু অন্যেরা তার কাছ থেকে আলো লাভ করে। অর্থাৎ, এই নেতাদের ধ্বংসের মাধ্যমে অন্যদের মঙ্গল সাধিত হয়। কিন্তু যদি কোন নেতা সংসার অন্বেষণে উৎসাহ দেয়, তবে তাকে জ্বলন্ত অগ্নি মনে করতে হবে, সে নিজে প্রজ্বলিত এবং অপরকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়।
মোট কথা, আলেমগণ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত- (১) যারা নিজেরাও ধ্বংস হবে এবং অপরকেও ধ্বংস করবে। তারা এমন আলেম, যারা প্রকাশ্যে দুনিয়া অন্বেষণ করে এবং দুনিয়ার প্রতি মনোনিবেশ করে।
(২) যারা নিজেরাও ভাগ্যবান এবং অপরকেও ভাগ্যবান করে। তারা এমন আলেম, যারা মানুষকে যাহের ও বাতেন উভয় ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাআলার প্রতি আহ্বান করে।
(৩) যারা নিজেরা ধ্বংস হবে; কিন্তু অপরকে ভাগ্যবান করে। তারা এমন আলেম, যারা মানুষকে আখেরাতের দিকে আহ্বান করে এবং বাহ্যতঃ নিজেরাও সংসার নির্লিপ্ত; কিন্তু তাদের অন্তরে মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়া এবং জাঁকজমকের বাসনা লুক্কায়িত থাকে।
এখন তুমি নিজের ব্যাপারে চিন্তা কর, কোন্ শ্রেণীতে রয়েছ এবং কিসের উপকরণ সংগ্রহে লিপ্ত রয়েছ- দুনিয়ার না আখেরাতের? এটা মনে করো না যে, যেব্যক্তি আল্লাহর জন্যে খাঁটি নয়, আল্লাহ্ তাকে কবুল করবেন। ইনশাআল্লাহ্ আমরা রিয়া অধ্যায়ে বরং গোটা তৃতীয় খণ্ডে এমন আলোচনা করব, যাতে তুমি নিঃসন্দেহ হয়ে যাবে।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন