বিভিন্ন স্বভাবের বিচিত্র মানুষ-
মানুষের স্বভাবের বিভিন্নতার কারণেতাদের কার্য-কলাপ, নৈতিকতা ও মর্যাদার পার্থক্য দেখা দেয়। এর সপক্ষে পাই মহানবীর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ হাদীসটি “যদি তুমিশোন কোন পাহাড় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে গেছে, তা হলে তুমি তা বিশ্বাস করলেও করতে পার। কিন্তু যদি শুনতে পাও অমুক ব্যক্তির স্বভাব প্রকৃতি বদলে গেছে, তাকে কখনও বিশ্বাস করো না। কারণ, অবশেষে সে তার মূল স্বভাবেই ফিরে আসবে”। অন্যত্র তিনি বলেন, “দেখ, আদম সন্তানের বিভিন্ন প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের ভেতর কিছু লোক মু’মিন হিসেবে জন্ম নিয়েও কাফের হয়ে মারা যায় ইত্যাদি”। এ হাদীসটি পুরোপুরি বর্ণনার পর ক্ষোভ, অধিকার, ঋণ প্রকাশ ও আদায়ের ব্যাপারে বিভিন্ন স্বভাবের মানুষের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার উল্লেখ করেন। এক স্থানে তিনি বলেছেন, সোনা ও রূপার খনি যেমন পৃথক হয়, তেমনি (গোত্র ও ঈমানের বিচারে) মানুষ বিভিন্ন প্রকৃতির হয়ে জন্ম নেয়।
স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ-
“(হে নবী) বলুন, প্রত্যেকেই যার যার স্বভাব মতে কাজ করে”। (সূরা বনী ইস্রাঈলঃ আয়াতঃ ৮৪)
উপরোক্ত হাদীসগুলোর যে অর্থ ও তাৎপর্য আমার কাছে ধরা দিয়েছে, যদি আপনিও তা হৃদয়ংগম করতে চান, তা হলে শুনে নিন, মানুষের ভেতরে দু’ধরনের ফেরেশতা খাসলাত পয়দা করা হয়েছে। তার ভেতর একটি উচ্চ পরিষদের অনুকূল জ্ঞানে পরিপূষ্ট থাকা, রহস্যময় স্রষ্টার গভীর ও সূক্ষ্ম রহস্যাবলীর খবর রাখা এবং নিখিল সৃষ্টির উত্তম ব্যবস্থাপনার রীতি-নীতি ভালভাবে আয়ত্ত করা। উদ্দেশ্য হল, সে সব জ্ঞান আয়ত্ত করে বাস্তবে রূপায়ণের জন্য সেদিকে সর্ব প্রয়াসে নিয়োজিত থাকা। দ্বিতীয়টি নিম্ন পরিষদের অনুকূল ও উপযোগী হয়। নিম্ন পরিষদের কাজই হল ওপরের হুকুম তামিল করা। তা আয়ত্তের চিন্তা করে না এবং সেদিকে সাহস ও প্রয়াস ব্যয় করে না, কেন্দ্রিভূতও করে না। তাই তারা সেগুলোর ব্যাপারে ওয়াকেফহাল থাকে না এবং আল্লাহর গুণাবলী ও নামাবলীর জ্ঞান থেকেও তারা বঞ্চিত। অবশ্য তাদের ভেতরে নূরের দ্যুতি রয়েছে। ফলে জৈব স্বভাব থেকে তারা পবিত্র ও উন্নত থাকে।
তেমনি জৈব স্বভাবও দু’ধরনের।
এক, প্রবল ও শক্ত স্বভাব। যেমন, অতি আদর-যত্নে পালিত ষাঁড়। তার যেমন বপু বিশাল, আওয়াজ বিকট, শক্তি বিপুল ও দেহ মেদুল হয়ে থাকে, তেমনি সে তীব্র কামপ্রবণ, ভীষণ হিংসুটে, প্রবল বিজয় বাসনা, কঠিন প্রতিশোধ স্পৃহা ও ভয়ানক বেপরোয়া প্রকৃতির হয়।
দুই, অত্যন্ত দুর্বল স্বভাব। তার উদাহরণ হল, জন্মগত ত্রুটিপূর্ণ কিংবা খাসী করা পশু। তা ছাড়া দুর্ভিক্ষ পীড়িত, অনশনক্লিষ্ট ও অযত্নে পালিত জীব। তার বপু কৃশ, আওয়াজ ক্ষীণ, প্রকৃতি দুর্বল ও সে প্রতিশোধ স্পৃহা বা বিজয় কামনাহীন হয়ে থাকে। প্রত্যেক মানুষের ভেতর এর যে কোন একটি জৈব শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে। ফলে যার ভেতর যে শক্তি ঠাঁই পায়, সে লোকটি সেভাবেই চিহ্নিত পরিচিত হয়। ফেরেশতা কি পশু শক্তি উভয়ের বেলায়ই এ দু’টো স্তরের পরিচয় মিলবে
মানুষ তার কার্যকলাপ দ্বারা এ সব অন্তর্নিহিত প্রাকৃতিক শক্তিকে অধিকতর শক্তিশালী বা দুর্বল হতে সহায়তা করে থাকে। ফেরেশতা ও পশু প্রবৃত্তির একই সংগে মানুষের ভেতরে অবস্থানের ফলে দুটো অবস্থা দেখা দেয়। এক, উভয় শক্তির ভেতরে টানা-পোড়ন চলতে থাকে। প্রত্যেকটি শক্তিই যখন নিজের দিকে মানুষটিকে টানতে থাকে ও তার দ্বারা নিজের দাবী প্রতিষ্ঠা করতে ও ইচ্ছা প্রতিফলিত করতে চায়, তখন এ টাগ-অফ-ওয়ার নিতান্তই স্বাভাবিক। এর যে শক্তিই বিজয়ী হোক অপর শক্তিটির প্রভাব মুছে ফেলবে। দ্বিতীয় অবস্থাটি হল, উভয়ের ভেতর সমঝোতা ও একতার। এ অবস্থায় ফেরেশতা প্রকৃতি প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিহার করেতার দাবীর কাছাকাছি কিছু মেনে নিয়ে কোন মতে গা বাঁচিয়ে চলে। যেমন বিবেক, মহানুভবতা, উদারতা, নিঃস্বার্থপরতা, পবিত্রতা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার থেকে কিছুটা শিথিলতা নিয়ে কাজ করা। পক্ষান্তরে পশু শক্তিও তার মূল অবস্থান থেকে কিছুটা উপরে উঠে এসে সাধারণের মতামতের সাথে মোটামুটি তাল মিলিয়ে চলে। এরূপ ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধী মত দুটো দ্বন্দ্বের বদলে সন্ধি করে নেয়। এ সন্ধি অবস্থায় মূলত উভয় প্রকৃতি মিলে গিয়ে এক তৃতীয় প্রকৃতির সৃষ্টি হয়। তারপর পশু শক্তি, ফেরেশতা শক্তি ও তৃতীয় মিশ্র শক্তির প্রত্যেকেরই দুটো চরম দিক ও একটি মধ্যপন্থা থাকে। তারপর চরমের কাছাকাছি, মধ্য পথের কাছাকাছি ইত্যাকার রূপে তিন প্রকৃতি বহু প্রকৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে হয়ে চলে। তার ভেতর প্রধান হল আটটি। এ আটটির পরিচয় পেলে তা থেকে অন্যান্যগুলোও জানা যায়। তার ভেতরে চারটি সৃষ্টি হয় মূল শক্তি দুটোর পারস্পরিক আকর্ষণ-বিকর্ষণ থেকে।
(১) প্রবলতম ফেরেশতা খাসলত ও প্রবলতম পশু স্বভাবের মিলনে এ শক্তির অভ্যুদয় ঘটে।(২) প্রবলতম ফেরেশতা শক্তি ও দুর্বলতম পশু শক্তির মিলনে উৎপত্তি।
(৩) দুর্বলতম ফেরেশতা স্বভাব ও প্রবলতম পশু স্বভাবের মিলনে এর জন্ম।
(৪) দুর্বলতম ফেরেশতা শক্তি ও দুর্বলতম পশু শক্তির মিলনে এর উদ্ভব ঘটে।
এভাবে এগুলোর পারস্পরিক সন্ধি ও মিলন থেকে অপর চারটি প্রকৃতি জন্ম নেয়। সেগুলোও স্বতন্ত্র রীতি ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং অপরিবর্তনীয়। কেউ যদি এ সব স্বভাবের বৈশিষ্ট্য ও রীতি জানতে পায়, সে অনেক হয়রানি থেকে বেঁচে যায়। আমি শুধু এখানে সে সব ব্যাপারই বলব যা এ গ্রন্থে প্রয়োজন হবে।
স্মরণ রাখা প্রয়োজন, যার পশু শক্তি সবলতম, তাকে কঠিন আত্মিক সাধনায় লিপ্ত হতে হবে। বিশেষত যার ভেতর তৃতীয় বা মিশ্র শক্তির সমাবেশ রয়েছে, তার জন্য এ সাধনা অপরিহার্য। মানবতার পূর্ণত্ব প্রাপ্তি তারই ঘটবে যার ভেতর ফেরেশতা শক্তি বা বিবেক বিজয়ী রয়েছে। মিলিত স্বভাবের লোক আচরণ ও কাজ-কর্মে সব চাইতে ভাল হয়। টানা-পোড়েন ক্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব যদি পশু শক্তি থেকে মুক্তি পায়, তা হলে ইলম ও মা’রেফতে উত্তম হয়। কিন্তু আমলের ক্ষেত্রে উদাসীন হয়। যে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে তারই উৎসাহ থাকেনা যার ভেতর পশু দুর্বল ভাবে সক্রিয়।
তেমনি প্রবল উন্নত (ফেরেশতা) স্বভাবের লোক সব কিছু ছেড়ে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করবে। দুর্বল উন্নত স্বভাবওয়ালা যদি সুযোগ মিলে ও পশু স্বভাব থেকে রেহাই পায়, আখেরাতের জন্যই পার্থিব কাজ-কর্ম ত্যাগ করবে, পার্থিব অলসতা বা আয়েশের জন্য নয়। বড় বড় কাজে সে ব্যক্তি দেহ-মন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে যার পশু প্রকৃতির প্রাবল্য রয়েছে। পক্ষান্তরে উন্নত প্রকৃতির লোকেরা নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের কাজে বেশী আত্মনিয়োগ করবে। মিশ্র প্রকৃতির লোক সব ধরনের কাজেই লিপ্ত হয়। দুর্বল বিবেকের মানুষ যুদ্ধ-বিগ্রহ ও দাংগা-হাংগামার কাজে বেশী নিয়োজিত থাকে।
বিবেক ও প্রবৃত্তির টানা-পোড়েনে বিক্ষত ব্যক্তি যদি প্রবৃত্তির অনুসারী হয়, শুধুই পার্থিব কাজে লেগে যাবে এবং যদি বিবেকের অনুগত হয়, শুধুই অপার্থিব কাজ ও সাধনায় ডুবে থাকবে। আপোষমূলক স্বভাবের লোকেরা পার্থিব ও অপার্থিব উভয় কাজে সমানে অংশ রাখবে। একই সঙ্গে পাপ ও পুণ্য দুটোই চালাবে।
এ সব প্রকৃতির ভেতর বিবেক যাদের খুবই উন্নত হবে, সে পার্থিব ও অপার্থিব, উভয় নেতৃত্বের উপযোগী হবে। আল্লাহর মর্জীতে তারা সব সময় সে ক্ষেত্রে জেঁকে বসবে। সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যথা লেখাফত (রাষ্ট্রপরিচালনা) ও ইমামত (জাতীয় নেতৃত্ব) তাদের হাতেই থাকবে। এ ধরনের লোকরাই নবী, নায়েবে নবী, ধর্মীয় দিকপাল, যুগনায়ক ও রাষ্ট্রনায়ক হয়ে থাকেন। যাদের জন্য আল্লাহর দ্বীন অনুসরণ অপরিহার্য করা হয়েছে, তারা মিশ্র স্বভাবের এবং ফেরেশতা প্রকৃতির জোর তাদের কিছুটা বেশী। পক্ষান্তরে মিশ্র প্রকৃতিতে ফেরেশতা প্রকৃতি যাদের অপেক্ষাকৃত দুর্বল, তারা উপরোক্ত দলের অত্যন্ত অনুগত হয়। কারণ এ ধরনের লোক আল্লাহর রহস্য পুরোপুরি লাভ করে। এদের কিছুটা দূরে থাকে টানা-পোড়েন বা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের দল। কারণ, এ দলটি সরাসরি প্রকৃতিগত আঁধারে হাবুডুবু খেয়ে সত্যের ওপর সঠিক ভাবে স্থির থাকতে পারে না। তবে এ দলের লোক যখন দ্বিধা কাটিয়ে ওঠে, তখন যদি উন্নত খেয়ালের লোক হয় তা হলে শরীয়তের রহস্য নিয়ে তারা গবেষণায় ডুবে থাকে। শরীয়তের বাহ্যিক রূপ ছেড়ে তারা সম্পূর্ণ শক্তি ও সাধনা ব্যয় করবে মা’রেফতের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রহস্য অবহিত হওয়ার ও সেই রঙে নিজকে রঞ্জিত করার জন্য। যদি তত উন্নতমনা না হয় তা হলে শুধু আধ্যাত্মিক সাধনায় কষ্ট-ক্লেশ করে কাশফ-ইশরাফ (অপরের মনের কথা জানা) ও দোয়া কবুলের মত ফেরেশতা স্বভাবের ঔজ্জ্বল্য নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। কিন্তু আল্লাহর আসল রহস্যাবলী তার অন্তরে ঠাঁই পাবে না। তা জানতে পারে শুধু প্রকৃতির ওপর জোর খাটিয়ে কিংবা প্রকৃতিগত আলোর আশ্রয় নিয়ে।
আমার প্রতিপালক আমাকে এ সব রীতি-নীতি জানিয়েছেন। এগুলো যারা গভীরভাবে অনুধাবন করবে, আল্লাহ প্রেমিকদের অবস্থাগুলো তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যাবে এবং তাদেরকে কতটুকু কামেল তা জানতে পাবে। তাদের রীতি-নীতির মর্তবাও তারা জানতে পাবে।
এ বিদ্যা আল্লাহ তা’লা শুধু আমাকেই দেন নি, আরও অনেককেই এরূপ অনেক জ্ঞান দান করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ লোকই এ দানের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।
দশম পরিচ্ছেদ
কর্ম প্রেরণার উৎস
কর্ম প্রেরণার উৎস

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন