দায়িত্বই প্রতিদান চায় -
জেনে রাখুন, মানুষের জন্য রয়েছে যেমন কর্ম তেমন ফল। ভাল কর্মে তারা ফল পাবে, মন্দ কাজে পাবে মন্দ ফল। এ ক্ষেত্রে চারটি অবস্থা দেখা দেয়।
(১) জাতিগত স্বভাবের চাহিদা। যেমন গরু-ছাগল ঘাস খাবে ও বাঘ-শিয়াল মাংস খাবে। তা হলেই তাদের স্বভাব ঠিক থাকবে। তা না খেয়ে যদি বাঘ-শিয়াল ঘাস খায় ও গরু-ছাগল মাংস খায়, তখন তাদের স্ববাব খারাপ হবেই। মানুষও তেমনি। যদি তারা এমন সব কাজ করে যাতে আল্লাহর কাছে বিনয়, দেহের পাক-পবিত্রতা, মনের সারল্য ও খোদাভীরুতা, এবং বিবেকের ইনসাফ ও ন্যায়ানুগতা প্রকাশ পায়, তা হলেই তা তার ফেরেশতা স্বভাবের পরিপোষক হবে। পক্ষান্তরে যখন তার পরিপন্থী সব কাজ করবে, তখন তার স্বভাব নষ্ট হয়ে যায়। তারপর প্রাণ যখন তার দেহভার মুক্ত হবে, তখন ভাল কাজে সুখের প্রলেপ ও মন্দ কাজে দহন জ্বালা লাভ করবে।
(২) মালা-ই আলার প্রভাবেও মানুষের দুঃখ বা সুখানুভূতি লাভ হয়। কারো পায়ের নীচে আগুন বা বরফ থাকলে তার অনুভূতি শক্তি যেরূপ প্রভাবিত হয়, উচ্চতম পরিষদের ফেরেশতাদের খুশী-অখুশী দ্বারাও সে তেমনি প্রভাবিত হয়। এ প্রভাব মূলত দেখা দেয় স্বরূপ জগতের আদি মানুষটির, তথা মানবের জাতিগত আদি সত্তার ভেতর। সেই সত্তার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন ফেরেশতারা। মানব গোত্রের ওপর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। কায়া মানব যেভাবে অনুভূতি ও উপলব্ধি ছাড়া চলতে পারেনা তেমনি ছায়া মানব সেই ফেরেশতাদের ছাড়া চলতে পারে না। কোন মানুষ যখন একটি ভাল কাজ করে, তখন সেবক ফেরেশতারা খুশী হয় এবং তা থেকে আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হয়। তেমনি যদি কেউ কোন খারাপ কাজ করে, সেবক ফেরেশতারা অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয় এবং তা থেকে আঁধার ধোয়ার কুণ্ডুলী নির্গত হয়। এ দুটোই সেই মানব সত্তাটিকে প্রভাবিত করে এবং তাকে সুখ কিংবা দুঃখ দান করে কখনও সেই রশ্মি বা ধোঁয়া কিছু ফেরেশতা এবং বিশেষ একদল লোকের স্বভাবে প্রবিষ্ট হয়। ফলে তার স্বাভাবিক ইলহাম হয় ভাল কাজের মানুষটিকে ভালবাসার ও মন্দ কাজের মানুষটিকে ঘৃণা করার জন্য। সেই অনুসারে তারা সদ্ব্যবহার কিংবা দুর্ব্যবহার করে থাকে। এ অন্তর্লীন প্রভাবটির উদাহরণ এই, যখন কোন মানুষের পায়ের নীচে আগুন থাকে, তার অনুভূতি ঘটে দহন জ্বালায়। এ অনুভূতি তার মগজ থেকে বিষাদময় ধোঁয়া নির্গত করে ও তা তার অন্তরকে আচ্ছাদিত করায় দুঃখানুভূতি দেখা দেয়। ফলে স্বভাবেও বিমর্ষতা ফুটে ওঠে। অনুভূতি ও উপলব্ধি শক্তিগুলো যেভাবে দেহকে প্রভাবিত করে, ঠিক তেমনি প্রভাবিত করে সেই ফেরেশতারা আমাদের মন-মানসকে। আমাদের কারো যদি দুঃখ বা লাঞ্ছনার আশংকা দেখা দেয়, তখন সে ভয়ে কাঁপে এবং তার দেহ বিবর্ণ ও অবসন্ন হয়। কখনও বা কামনা লোপ পেয়ে প্রস্রাব লাল হয়ে যায়। এমনকি পায়খানা-প্রস্রাবও বেরিয়ে আসে। এ সবই ঘটে তার স্বভাবের ওপর অনুভূতি ও উপলব্ধির প্রভাবের কারণে। এ প্রভাব তার মগজের মাধ্যমে মনে রেখাপাত করে। বনী আদমের সাথে নির্দিষ্ট ফেরেশতার ঠিক দেহের সাথে অনুভূতির সম্পর্কের মতই সংযোগ। তাদের তরফ থেকে মানুষের ও নিম্নস্তরের ফেরেশতাদের ওপর স্বভাবজাত প্রভাব ও প্রকৃতিগত বিবর্তন চলতেই থাকে।
তারপর যেভাবে ভালর আলো ও মন্দের আঁধার ওপর থেকে নীচে নেমে আসে, তেমনি নীচ থেকেও তা ওপরে উঠে এমনকি পবিত্র দরবারে পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তার ফলে আল্লাহর জ্যোতিতে বিশেষ এক অবস্থার সৃষ্টি হয়, যাকে রহমত বা গজব বলা হয়। আগুনের তাপে যেমন পানি উত্তপ্ত হয়, যুক্তিজাল বিন্যাসের পর সিদ্ধান্ত বের হয় এবং দোয়া করলে কবুলের কারণ সৃষ্টি হয়, এও ঠিক তেমনি ব্যাপার। বস্তুত আল্লাহ জ্যোতিতে উক্ত অবস্থা সৃষ্টির পর আত্মিক জগতে নতুন নতুন অবস্থা ও বিবর্তনের সৃষ্টি হয়।
কখনও ক্ষোভ ও আক্রোশ সৃষ্টি হয়। তওবা হলে তা আবার লোপ পায়। কখন আবার রহমত দেখা দেয়। রহমত আবার অপরাধ হলে আজাবে রূপান্তরিত হয়। স্বয়ং আল্লাহ পাক বলেনঃ
“নিশ্চয় আল্লাহ কোন জাতির ভাগ্য বদলান না, যতক্ষণ তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরা না বদলায়”। (সূরা রা’দঃ ১১) মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বিভিন্ন হাদীসে বলেছেন, আদম সন্তানের যা কিছু কাজ ফেরেশতারা আল্লাহর সমীপে নিয়ে যান। কিংবা আল্লাহপাক ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, আমার বান্দাদের কি অবস্থায় রেখে এসেছ? অথবা আল্লাহর কাছে রাতের কার্যাবলীর আগে দিনের কার্যাবলী পৌঁছে থাকে। এ সব বক্তব্য থেকে বুঝা যায়, জ্যোতির্ময় আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের ভেতর পবিত্র পরিষদের মাধ্যমে যে সম্পর্ক বিদ্যমান, ফেরেশতারা সে সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্বই পালন করেন।
(৩) মানুষের ওপর যা কিছু অপরিহার্য করা হল তা শরীয়তেরই দাবী। এক জ্যোতির্বিদ যেমন জানেন, নক্ষত্রমণ্ডলীর যখন নিজ নিজ গতিপথ ও অবস্থানগুলোর বিশেষ এক স্থান লাভ ঘটে, তখন সেই স্থানের বিশেষ শক্তির প্রভাবে এক ধরনের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি হয়। সে অবস্থাটি আকাশের কোথাও কেন্দ্রিভূত হয়ে ছায়ারূপ ধারণ করে। তারপর যখন আকাশের রীতিনীতির নিয়ন্তা জগৎ উদ্ভাসিনী পূর্ণ চন্দ্রের সেই আত্মিক কথা গ্রহণের অবস্থাটিকে পৃথিবীতে প্রতিভাত করেন, তখন পৃথিবীর মানুষ সেই শীতল চন্দ্রালোক দ্বারা আকৃষ্ট ও অভিভূত হয়। ঠিক এভাবেই এক আল্লাহ প্রাপ্ত ব্যক্তি জানেন, বিশেষ এক সময় আসে যেটাকে লায়লাতুল কদর [কিংবা লাইলাতুল বরাত] বা বরকতের রাত বলে আখ্যায়িত করা হয় এবং যে সময়ে সমস্ত হিকমতপূর্ণ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত ও সেগুলো বণ্টিত হয়, তখনও মানুষের সাথে সম্পৃক্ত আত্মিক জগতে এক বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাই প্রয়োজন ও সময়ের চাহিদা মোতাবেক সেই যুগের উত্তম ও শ্রেষ্ঠ মেধাসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে ইলহাম বা ওহী অবতীর্ণ হয়। তাঁর মাধ্যমে সে সব ইলহাম পৌঁছানো হয় তাঁদের কাছে যাদের ব্যক্তিত্ব ও মেধা ঠিক তাঁরই কাছাকাছি রয়েছে। তারপর অন্যান্য সাধারণ লোকের অন্তরে এ ইলহাম পৌঁছানো হয় যে অবতীর্ণ ইলহামগুলোকে মেনে চলে এবং ভাল জানে। তারপর সে সব ইলহামের সমর্থক ও সহায়কদের সাহায্য করা হয়। পক্ষান্তরে সেগুলোর বিরোধীদের লাঞ্ছিত ও পরাভূত করা হয়। নিম্ন জগতের ফেরেশতাদের ইলহাম পৌঁছানো হয় অবতীর্ণ বিধানাবলীর অনুসারীদের সাথে সদ্ব্যবহার ও বিরোধীদের সাথে দুর্ব্যবহার চালাতে। তারপর এক ধরনের উজ্জ্বল দ্যুতি ও প্রভাব সাধারণ পরিষদ ও উচ্চতম পরিষদে পৌঁছে যায়। ফলে সেখান থেকে সন্তুষ্টি কিংবা অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেয়ে থাকে।
(৪) নবীর আনুগত্য। আল্লাহ পাক যখন কাউকে মানুষের মাঝে নবী করে পাঠান এবং এ কাজের মাধ্যমে তিনি মানুষের কল্যাণ সাধন ও তাদের ওপর অনুগ্রহ বর্ষন করতে চান, তখন মানুষের ওপর তাঁর আনুগত্য অপরিহার্য করেন। তখন নবীর কাছে তাঁর যে সব ওহী আসে সেগুলো নির্দিষ্ট বিদ্যায় রূপ লাভ করে। সে বিদ্যা নবীর হিম্মৎ ও দোয়ার ফলে সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে চলে। আল্লাহ তা'আলারও নির্দেশ হয় তা সুপ্রতিষ্ঠিত হবার ব্যাপারে সহায়তার জন্য।
যেমন কর্ম তেমন ফলের এ চার ধরনের প্রয়োজনের ভেতর প্রথম দু’ধরনের প্রয়োজন অর্থাৎ জাতিগত স্বাভাবিক চাহিদা ও উচ্চতম পরিষদের প্রভাবগত চাহিদা মানুষের সৃষ্টিগত প্রকৃতিরই চাহিদা মাত্র। যে প্রকৃতি দিয়ে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তা চির অপরিবর্তনীয়।
তবে পাপ ও পুণ্যের বিধান মানব প্রকৃতিতে সামগ্রিকভাবে বিধৃত রয়েছে, বিস্তারিত ভাবে নয়। এ প্রকৃতিগত মানবিক ধর্মটি কলোত্তীর্ণ ও সার্বজনীন। সব নবীই এ মৌলিক ধর্মের ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন মতাবলম্বী। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ
মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘নবীরা সবাই বৈমাত্রেয় ভাই। বাপ তাদের এক, মা পৃথক’। এ প্রকৃতিগত মানব ধর্মটুকুর জন্য প্রতিটি মানুষকে জবাবদিহি করা হবে। নবী তাঁর কাছে আসুক বা না আসুক।
তৃতীয় ধরনের প্রতিদান দাবী (শরীয়তের চাহিদা) যুগের পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়ে চলে। এ জন্যেই যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন নবী ও রাসূল পাঠাতে হয়েছে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদীসে এর ইংগিত এ ভাবে রয়েছে, ‘আমার ও আমার ওপর অবতীর্ণ বিধানের অবস্থা হল এই,কোন লোক যেন এক জাতির কাছে এসে বলল, হে জাতি! আমি নিজ চোখে শত্রু সৈন্য দেখে এলাম। তাই খোলাখুলি তোমাদের সাবধান করছি। তোমরা এক্ষুণি পালিয়ে প্রাণ বাঁচাও। তখন সেই জাতির একটি দল তার খবর শুনে মেনে নিল এবং শত্রু সৈন্য পৌঁছার আগেই ভোর না হতে পালিয়ে বাঁচল। অন্য দল তার খবরকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়ে সকাল পর্যন্ত আরামে নিদ্রা গেল এবং সকালেই শত্রু সেনারা এসে তাদের মেরে ফেলল। ঠিক তেমনি আমাকে যারা মানল ও আমার বিধানকে সত্য জানল, তারা বেঁচে গেল এবং যারা আমাকে মিথ্যা জানল ওআমার বিধানকে অমান্য করল, তারা মারা পড়ল।
এখন রইল চতুর্থ ধরনের প্রতিদান প্রকৃতি। সেটা হল নবী প্রেরণের চাহিদা। এ চাহিদা নবী প্রেরিত না হওয়া পর্যন্ত দেখা দেয় না। নবী এসে সবার কাছে সে বিধানগুলো পৌঁছে দেবার ও তাদের সব সংশয় সন্দেহ নিরসনের পর যারা জেনে শুনে বাঁচতে কিংবা ধ্বংস হতেচায়, তাদের বেলায় এ প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন আর এ প্রয়োজন অস্বীকার করার তাদের কোন অজুহাত অবশিষ্ট থাকেনা।
পরবর্তী পর্ব (নবম পরিচ্ছেদ)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন