📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
খ্যাতিহীনতার ফযীলত
রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, -
>"অনেক বিক্ষিপ্তকেশী ধূলি-ধূসরিত চাদরওয়ালা লোক রয়েছে, যাদের দিকে কেউ ভ্রূক্ষেপ করেনা, অথচ যদি তারা আল্লাহর নামে কসম খেয়ে কোন কথা বলে ফেলে, আল্লাহ্ তা বাস্তবায়িত করে দেন। যদি বলে ইলাহী আমি তোমার কাছে জান্নাতপ্রার্থনা করি, তবে আল্লাহ্ তাদেরকে জান্নাতই দিবেন এবং দুনিয়াতে কিছুই দেবেননা।"
হজরত আবুহুরায়রা (রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) থেকে বর্ণিত আছে জান্নাতি তাঁরাই, যাদের কেশ এলোমেলো এবং পোশাক দু'টি মাত্র চাদর। যদি তারা শাসকদের কাছে যেতে চায় কেউ যেতে দেয়না। বিবাহ করার প্রস্তাব দিলে কেউ তাদের প্রস্তাবের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করেনা। তাদের অভাব অনটন তাদের বুকের মধ্যেই ঘুরাফের করে। কিয়ামতে তাদের নুর বন্টন করা হলে সমস্ত মানুষের জন্য যতেষ্ট হয়ে যাবে।
বর্ণিত আছে, একবার হজরত ওমর (রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে দেখলেন, মুয়াজ ইবনে জাবল রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর রওজা মুবারকে বসে কাঁদছেন। তিনি কাঁদার কারন জিজ্ঞাসা করলে মুয়াজ (রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) বললেন, আমি রসূল-আল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে বলতে শুনেছি,
>"সামান্য রিয়াও শির্ক। আল্লাহ্ তা'আলা এমন আত্মগোপনকারীদের পছন্দ করেন, যারা উধাও হয়ে গেলে কেউ তাদের খোঁজ করেনা। আর সন্মুখে এলে কেউ তাদেরকে চিনেনা। তারা হেদায়েতের প্রদীপ।"
মুহম্মদ ইবনে সুয়ায়দ (রহঃ) বর্ণনা করেন, একবার মদিনা মনোয়ারায় খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। জনৈক সাধু ব্যাক্তি মসজিদে নববীতে থাকত এবং দোয়া করত। একদিন সকলেই দোয়ায় রত ছিল, এমন সময় জনৈক পুরাতন ও ছিন্ন বস্ত্র পরিহিত ব্যাক্তি আগমন করল। সে এসে সংক্ষেপে দু'রাকআত নামাজ পড়ল এবং হাত তুলে দোয়া করল : ইলাহী আমি তোমাকে কসম দিয়ে বলছি এ মুহূর্তেই বৃষ্টি বর্ষন কর। লোকটি দোয়া শেষ করার আগেই আকাশ মেঘাচছন্ন হয়ে গেল। এবং দেখতে দেখতে এমন বৃষ্টি বর্ষিত হল যে, মদিনার লোকজন ডুবে যাওয়ার আশংকায় ফরিয়াদ করতে লাগল। এর পর লোকটি আরজ করল :ইলাহী ! যদি তুমি মনে করযে এই পরিমান পানি তাদের জন্য যতেষ্ট, তবে বৃষ্টি থামিয়ে দাও। তখনি বৃষ্টি থেমে গেল। এর পর লোকটি সেই সাধু ব্যাক্তির পেছনে পেছনে চলল এবং তার গৃহের সন্ধান করে ভোরেই তার খেদমতে গিয়ে বলল : আমি একটি উদ্দেশ্য নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। তা এই যে, আপনি আমার জন্য বিশেষভাবে দোয়া করুন। সাধু ব্যক্তি বলল : সুবহানাল্লাহ্ ! তুমি আমাকে দোয়া করতে বলছ ! তোমার অবস্থাতো কালই জানতে পেরেছি। এখন বল এ মর্তবা তুমি কিরূপে লাভ করলে ? সে বলল : আমি আল্লাহ্ তা'আলার আদেশ ও নিষেধ মেনে চলেছি। তাই আমি তাঁর কাছে যেই প্রার্থনা করেছি তিনি তা কবুল করেছেন।
হযরত ইবনে মাসুদ (রঃ) বলেন : হে লোক সকল জ্ঞানের ও হেদায়েতের প্রদীপ হও। নিজ নিজ ঘরে বসে থাক। পুরাতন কাপড় পরিধান কর যাতে আকাশের বাসিন্দারা তোমাদের চিনে এবং পৃথিবীর লোক তোমাদেরকে না চিনে।
এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
>"আমার ওলিদের মধ্যে সেই মুমিন ব্যক্তি অধিকতর ঈর্শার যোগ্য, যে নিজের উপর পরিবার পরিজনের বোঝা কম রাখে, নামাজে অংশগ্রহন করে, পরোয়ারদেগারের এবাদত করে এবং গোপনে অনুগত্য কর। সে মানুষের মধ্যে এত সুখ্যাত নয় যে, মানুষ তার প্রতি আংগুলি নির্দেশ করবে। এরপর সে এ অবস্থায় সবর করে।"
হযরত ফুযায়ল (রহঃ) বলেন, যদি এমনভাবে থাকতে পারযে, তোমাকে কেউ না চিনে, তবে তাই কর। তোমাকে কেউ না চিনলে তাতে কোন ক্ষতি নেই। কেউ তোমার প্রশংসা না করলেও কোন দোষ নেই। যদি তুমি মানুষের কাছে মন্দ হও এবং আল্লাহ্ তা'আলার কাছে ভাল হও। তবে এতেও কোন অনিষ্ট নেই।
উপরোক্ত হাদিস ও মনীষীর উক্তি থেকে খ্যাতির নিন্দা এবং খ্যাতিহীনতার ফজীলত পরিষ্কার রূপে বুঝা যায়। খ্যাতির আসল লক্ষ্য হচ্ছে জাঁকজমক তথা মানুষের অন্তরে আসন প্রতিষ্ঠা করা। এটা অনর্থের মূল। এখানে প্রশ্ন হয় যে, পয়গম্বর গণ, খোলাফায়ে রাশেদীন ও ইমামগণ সর্বাধিক খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব। তাঁদের খ্যাতির ছেয়ে অধিক খ্যাতি আর কি হবে ? অতএব তাঁরা খ্যাতিহীনতার ফজীলত থেকে বঞ্চিত রয়ে গেলেন। এর জওয়াব এই যে, যে খ্যাতি অর্জন করে নেয়া হয়, তাই মন্দ। কিন্তু কোনরূপ চেষ্টা-তদবীর ছারা যে খ্যাতি আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে পাওয়া যায়, তা নিন্দনীয় নয়।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন