যশ ও রিয়া (পর্ব - ৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
যশপ্রীতির নিন্দা
আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন, -
>"আখেরাতের সেই গৃহ আমি তাদেরকে দান করব- যারা পৃথিবীতে উচ্চ হওয়ার এবং গোলযোগ সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেনা।"
আখেরাত তার জন্যেই যে উভয় প্রকার ইচ্ছা থেকে মুক্ত। অন্য আয়াতে আছে,
>"যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার সাজসজ্জা কামনা করে আমি তার আমল দুনিয়াতে পুরাপুরি দিয়া দেই। এবং তাতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। তাদের জন্য আখেরাতে আগুন ছারা কিছুই নেই।" (সূরা হুদ : ১৫-১৬)
এই আয়াতও তার ব্যাপকতার মধ্যে জাকজমকপ্রীতিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। কেননা এটা পার্থিব জীবনের সকল আনন্দের ছেয়ে বড় এবং সকল সাজসজ্জার ছেয়ে অধিক। হাদিসে বলা হয়েছে, -
> "ধনসম্পদ ও জাকজমকের মোহ অন্তরে এমনভাবে মুনাফেকী উৎপন্ন করে, যেমন বৃষ্টিরপানি শাক-সব্জিকে উৎপন্ন করে।"
আরো বলা হয়েছে,
>"দু'টি বাঘ ছাগলের পালে ছেরে দিলে এতটুকু ক্ষতি করেনা, যতটুকু ক্ষতি করে ধন-সম্পদের মোহ মুসলমান ব্যাক্তির ধর্মপরায়ণতার।"
হজরত আলী (রঃ)-কে বলা হয়েছে, খেয়ালখুশী ও প্রশংসাপ্রীতির কারণেই মানুষ ধ্বংস হয়েছে। আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া এই, তিনি আপন কৃপা ও অনুগ্রহে আমাদেরকে এই বিপদ থেকে মুক্ত রাখুন।
জানা উচিত যে, 'মাল' ও 'জাহ্' হচ্ছে দুনিয়ার দু'টি স্তম্ভ। 'মাল' মানে উপকারী বস্তু সমুহের মালিক হওয়া, 'জাহ্' বলা হয় সেইসব অন্তরের মালিক হওয়াকে, যাদের কাছ থেকে সন্মান ও অনুগত্য কামনা করা হয়। মালদার ও ধনী সেই ব্যাক্তিকে বলা হয়, যে টাকা পয়সার ক্ষমতা রাখে এবং এর মাধ্যমে নিজের সমস্ত উদ্দেশ্য, খায়েশ ও মানসিক কামনা-বাসনা পূর্ন করতে পারে। এমনিভাবে 'যশশীল' তথা প্রভাবশালী সেই ব্যাক্তিকে বলা হয়, যে মানুষের অন্তরকে এমনভাবে বশীভুত করে নেয় যে তাদের দ্বারা যে কোন মতলব যতেচ্ছ সিদ্ধ করতে পারে। অর্থসম্পদ যেমন বিভিন্ন পেশা ও কারিগরি দ্বারা অর্জন করা হয, তেমনি মানুষের অন্তরও বিভিন্ন প্রকার কাজ কারবারের মাধ্যমে আকৃষ্ট হয়। অন্তর যখন বিশ্বাস করে যে, অমুক ব্যক্তির মধ্যে অমুক বিষয়ে পূর্ণতাগুণ রয়েছে, তখন অন্তর তার বশীভূত হয়েযায়। এখানে সেই গুনটি বাস্তবেও পূর্ণতা গুন হওয়া শর্ত নয়। বরং ব্যক্তির মতে ও তার বিশ্বাসে পূর্ণতাগুণ হওয়াই যতেষ্ট। মাঝে মাঝে অন্তর এমন বিষয়কেও পূর্ণতাগুণ বলে বিশ্বাস করে, যা বাস্তবে পূর্ণতাগুণ নয় ; কিন্তু অন্তরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে সেটাকে পূর্ণতাগুণ বলে নিশ্চিত রূপে বিশ্বাস করে নেয়। এ কারনে অন্তর তার অনুগত হয়ে যায়। কেননা অনুগত্য হচ্ছে অন্তরের একটি অবস্থা- যা বিশ্বাসের অনুগামী হয়ে থাকে। সুতরাং যেমন বিশ্বাস হবে, তেমনি অবস্থা দেখা দেবে।
যে ব্যক্তি ধন-সম্পদের মহব্বত পোষন করে, সে যেমন চায়যে তার কাছে বাদী-গোলাম থাকুক, তেমনি যশপ্রিয় ব্যক্তিও চায়, সকল মানুষ তার গোলামী করুক এবং তাদের অন্তরের উপর তার সর্বময় ক্ষমতা প্রতিষ্টিত হোক; বরং যশপ্রিয় ব্যক্তি যা চায়, তা আরো বেশী। কেননা সম্পদশালী ব্যক্তি বলপূর্বক বাদী-গোলামের মালিক হয়। বাদী-গোলামরা মন থেকে কোন সময় কারো ক্রীতদাস হতে চায়না। কিন্তু যশপ্রিয় ব্যক্তির অনুগত্য মানুষ সানন্দে গ্রহন করে। স্বাধীন ব্যক্তি নিজের মনের আগ্রহে তার গোলাম হয়, এবং তার গোলামী ও অনুগত্যকে গর্বের বিষয় মনে করে। এ থেকে জানা গেল যে, 'জাহ' শব্দের অর্থ মানুষের অন্তরে আসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া; অর্থাত অন্তরেকোন ব্যক্তির কোন পূর্ণতা গুনের বিশ্বাস সৃষ্টি হয়ে যাওয়া। সুতরাং পূর্ণতার বিশ্বাস যে পরিমানে হবে, সেই পরিমানেই অনুগত্য হবে এবং যে পরিমানে অনুগত্য হবে, সেই পরিমানে মানুষের অন্তরের উপর আদিপত্য বিস্তৃত হবে। ক্ষমতা যত বেশী হবে, আনন্দ ও জশপ্রীতি তত অধিক হবে। এ পর্যন্ত 'জাহ' শব্দের অর্থ বর্ণিত হল। এখন এর ফলাফল দেখা উচিত।
'যশ' তথা প্রভাব-প্রতিপত্তির এক ফল হচ্ছে প্রশংসা কীর্তন করা, যা ব্যক্তি কারো পূর্ণতাগুণে, সে তার প্রশংসা করার ব্যাপারে চুপ থাকেনা।
প্রতিপত্তির আরেকটি ফল হচ্ছে, খেদমত করা ও সাহায্য-সহায়তা করা। বিশ্বাসী ব্যক্তি আপন বিশ্বাস অনুযায়ী নিজেকে বিস্বস্ত ব্যক্তির খেদমত ও সাহায্যে নিয়োজিত রাখে এবং গোলামের ন্যায় তার অনুগত হয়ে থাকে। এ ছারা 'যশ' ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অন্যতম ফলাফল হচ্ছে বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে অগ্রণী মনে করা। তার সাথে ঝগড়া-বিবাদ না করা, তাকে সন্মান প্রদর্শন করা এবং মজলিসে উত্তম যায়গায় বসানো।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন