আল্লাহর সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রত্যেক প্রকারের গাছের জন্য বিশেষ উপাদান নির্ধারিত হয়ে আছে। যেমন, খেজুর গাছের জন্য বিশেষ ধরনের মাটি তিনি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। তারপর মোটামুটিভাবে বলে দিয়েছেন, এ উপাদান খেজুরের রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করবে। অবশেষে বিস্তারিত ফরমানে বলা হল, খেজুরের পাতা এরূপ, ফল ওরূপ ও বীচি সেরূপ হবে।
প্রত্যেক শ্রেণীর কিছু বৈশিষ্ট্য তো সামান্য বুদ্ধি যার রয়েছে সে-ই বলতে পারে। কিন্তু কিছু বৈশিষ্ট্য এরূপ সূক্ষ্ম হয় যা বিজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া কেউ জানতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে ইয়াকুতের এক বিশেষ প্রভাবের কথা ধরে নিন। যার হাতে ইয়াকুত থাকে, অন্তরে তার আনন্দ ও সাহস বেড়ে যায়। ইয়াকুতের এ বৈশিষ্ট্যটি সাধারণতঃ কেউ দেখে না।
কোন কোন শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যগুলো তার গোটা সত্তার ভেতর পাওয়া যায়। তা ঘটে উপাদানের উপযুক্ততার জন্য (উপাদানের দুর্বলতার কারণে একই শ্রেণীর ফলফুলের ভেতর তারতম্য ঘটে)। তেমনি কোন শ্রেনীর কিছু সত্তায় সব বৈশিষ্ট্য থাকে, কিছু অংশে থাকে না। হালীলা ফল মুঠোয় নিলে এ সত্যটি সহজ হয়ে ধরা দেয়।
খেজুর এরূপ কেন এ কথা বলতে পারেন না। এ প্রশ্ন অবান্তর। কারণ, সেটা যেরূপ আছে তা-ই থাকবে। এর কারণ জানতে চাওয়ার পালা নেই।
তারপর আপনি যদি পশুর শ্রেনীগুলোর দিকে দৃষ্টি দেন, সেখানেও মাছের মতই প্রতিটি শ্রেণীর পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্য দেখতে পাবেন। সঙ্গে সঙ্গে এও দেখতে পাবেন, তাদের ভেতর এমন কতগুলো স্বতঃস্ফুর্ত ও প্রকৃতিগত ব্যাপার দেখা যায় যা থেকে সহজেই এক শ্রেনী হতে অপর শ্রেণীর পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। যেমন গৃহপালিত গরু, ছাগল ইত্যাদি ঘাস খায় ও চর্বিত চর্বন করে। অথচ ঘোড়া খচ্চর ইত্যাদি তৃণজীবি হয়েও চর্বিত চর্বন করে না। হিংস্র জন্তুর গোস্ত খেয়েই বাঁচে। পাখীরা উড়ে বেড়ায়। মাছ পানিতে সাঁতরায়। প্রত্যেক শ্রেণীর পশুর কণ্ঠস্বর ভিন্ন। সংগম ও দাম্পত্য পদ্ধতিও ভিন্ন ভিন্ন। বাচ্চা পালন ও ডিম প্রদানের রীতিও স্বতন্ত্র। এ সব সবিস্তারে বলতে গেলে গ্রন্থের কলেবর বেড়ে যাবে।
এরপর দেখি, প্রত্যেক শ্রেণীর ভেতর যতটুকু স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফুর্ত জ্ঞান রয়েছে যা তার একান্ত প্রয়োজন ও তার জন্য কল্যাণকর। এ সব হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান। শ্রেণী বৈশিষ্ট্যের ছিদ্র পথে তার আগমন। ফুলের রঙ ও রূপ এবং ফলের স্বাদ ও ঘ্রাণ যেরূপ শ্রেণী বিশেষের সাথে জড়িয়েই আবির্ভূত হয়, এও তেমনি এসে থাকে।
কোন শ্রেণীতে শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্যগুলোর সর্বত্র উপস্থিতি দেখা যায়। অথচ কোন শ্রেণীতে কিছু সংখ্যকের ভেতর পাওয়া যায় ও কিছু সংখ্যকের ভেতর পাওয়া যায় না। তার মূলে রয়েছে উপাদানের উপযোগিতা কিংবা দুর্বলতা। তবে শ্রেণী বিশেষের প্রত্যেকটি সত্তাই বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণের যোগ্যতা রাখে। বৈশিষ্ট্যে ব্যতিক্রমের অন্যতম উদাহরণ হল মধু মক্ষিকার রাজা ও গৃহপালিত তোতাপাখী। নিজ নিজ শ্রেণী থেকে তারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পেয়ে থাকে।
মানুষের দিকে লক্ষ্য করলেও আপনি গাছপালা ও জীবজন্তুর মতই কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য সেখানে দেখতে পাবেন। যেমন, জন্ম নেয়া, বৃদ্ধি পাওয়া, কাশী দেয়া, হাই তোলা, পায়খানা-প্রস্রাব করা, জন্ম নিয়ে মাতৃস্তন্য পান করা ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে এমন কতগুলো বৈশিষ্ট্যও পাবেন যেগুলো মানব জাতিকে অন্যান্য জাতীয় সৃষ্টি থেকে স্বতন্ত্র করে রেখেছে। যেমন, কথা বলা ও বুঝা, ভূমিকা বুঝেই বিষয়জ্ঞান অর্জন করা, সাধনা ও গবেষণা চালিয়ে বুদ্ধি-বিবেকের সাহায্যে গভীর তত্ত্বজ্ঞান হাসিল করা, বস্তুগত ধ্যান-ধারণার বাইরের বস্তুকে উন্নত জ্ঞানের সাহায্যে জেনে নেয়া (সভ্যতা ও দেশ, জাতি ও ব্যক্তি সংস্কার পদ্ধতি ইত্যাদি)। এ ব্যাপারগুলো যেহেতু মানুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্য ও জন্মগত উত্তরাধিকার, তাই জংগল বা পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসকারী মানুষের কাছেও তার পরিচয় মিলে। এও হচ্ছে আল্লাহর শ্রেণী বিন্যাসের জন্য নির্ধারিত বিশেষ উপাদানের বৈশিষ্ট্য। আসল তত্ত্ব হল এই, মানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য বা স্বভাবের দাবী হল এই, তার রিপুর ওপরে অন্তরের ও অন্তরের ওপরে বুদ্ধির প্রাধান্য থাকা চাই।
তারপর লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি শ্রেণী বিন্যাসে কত কলা-কৌশল ও অনুগ্রহ-প্রীতির পরিচয় দিয়েছেন। গাছ-পালায় যেহেতু গতি ও অনুভূতির উপাদান অবর্তমান, তাই তার শিকড়কে এত শক্তি দান করেছেন যে, হাওয়া, মাটি, আলো ইত্যাদি সংযোগে সৃষ্ট প্রয়োজনীয় উপাদান সে সংগ্রহ করে তার শাখা-প্রশাখা শ্রেণীগত চাহিদা মোতাবেক বর্দ্ধন করে দেয়। পক্ষান্তরে জীব-জন্তু যেহেতু অনুভূতিশীল, মর্জী মাফিক তারা চলতেও পারে, তাই তাদের মাটি থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান চুষে খাবার শিকড় দেয়া হয় নি। বরং তাদের আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান হল এই, ঘাস, পাতা ও পানি যেখানে পাবে, খুঁজে ফিরে খাবে। এ ভাবে তাদের অন্যান্য প্রয়োজন মিটাবার বুদ্ধিও দেয়া হল। যে সব শ্রেণী মাটি থেকৈ পোকার মত জন্ম নেয় না, তাদের আল্লাহ তা'আলা সন্তান উৎপাদন, ধারণ প্রসব ও পালনের শক্তি দান করলেন। সন্তানদাত্রীর ভেতর এমন তরল পদার্থ দিলেন যা পেটের সন্তান পালনে ব্যয় হতে পারে। তারপর সেই তরল পদার্থকে দুধে পরিণত করা হল এবং বাচ্চাকে ইলহাম করা হল বুক চুষে তা পান করার জন্য। চোষার ফলে দুধ তার কণ্ঠনালী পেরিয়ে পাকস্থলীতে চলে গেল।
তেমনি মুরগীর ভেতর এমন তরল পদার্থ দেয়া হয়েছে যা থেকে ডিম তৈরি হতে পারে। ডিম দেয়া শেষ হলে দেহের তরল পদার্থ শুকিয়ে যায় এবং পেট শূণ্য হয়ে যায়। তখন তার ভেতর এমন এক উন্মাদনা দেখা দেয় যে, অন্যান্য মোরগের সাথে মেলামেশা ভুলে সে ডিমে তা দিতে বসে থাকে। এর ফলে তার পেটের শূন্যতার অনুভূতি দূর হয়।
কবুতর জুটির ভেতর অদ্ভুত ভালবাসা দান করা হয়েছে। কবুতরীর পেটের খোলসটিকে ডিমে তা দেয়ার জন্য উপযোগী করে রাখা হয়েছে। তার ভেতরকার বাড়তি তরল পদার্থকে বমি আকারে বাচ্চার ওপর অনুগ্রহে পরিণত করা হয়েছে। বমির মাধ্যমে সে দানা-পানি বাচ্চার উপযোগী করে খাওয়ার এবং কবুতরকে আকৃষ্ট করে তার পথ অনুসরণ করে বাচ্চাকে খোরাক জোগাবার জন্য। তেমনি বাচ্চার প্রকৃতিতে তরল পদার্থ দিয়ে পালক সৃষ্টির পথ করা হয়েছে। তার সাহায্যে যেন সে উড়তে পারে।
মানুষের যেহেতু গতি, অনুভূতি, জৈব তাড়না ও বুদ্ধি-বিবেকের প্রেরণা রয়েছে, এমন কি বাড়তি জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতাও তার রয়েছে, তাই তাকে চাষাবাদ করা, বৃক্ষ রোপন, লেন-দেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সহজাত জ্ঞান দেয়া হল। কিছু লোককে নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব সুলভ ও কিছু লোককে দাসত্ব-আনুগত্য সুলভ স্বভাব দান করা হল। এক দলকে রাজকীয় স্বভাবের ও অন্য দলকে প্রজাসুলভ স্বভাবের অধিকারী করা হল। কাউকে আল্লাহতত্ত্ব, প্রকৃতিতত্ত্ব, তর্কশাস্ত্র ও ব্যবহারিক শাস্ত্রের গভীর ও জটিল জ্ঞান দান করা হল। কাউকে আবার এমন নির্বোধ করা হয়েছে যে, জ্ঞানী ব্যক্তির অনুসরণ করা ছাড়া তার নিজের কিছু বুঝবারই ক্ষমতা নেই। শহুরে হোক কিংবা গেঁয়ো, সবার ভেতরেই স্বভাবের ও ক্ষমতার এ বৈচিত্র্য বিদ্যমান।
লক্ষ্য করুন, গাছের প্রতিটি অংশ, শাখা, পাতা, ফুল তাদের বিজ্ঞতম স্রষ্টার সমীপে হাত পেতে রয়েছে। যদি সেগুলোর জ্ঞান থাকত, তা হলে স্রষ্টার প্রশংসায় মুখর থাকত এবং অধিক থেকে অধিকতর কৃতজ্ঞ হয়ে চলত। যদি কিছুটা বুঝ থাকত, তা হলে হাবভাবে প্রার্থনার বদলে কথা দিয়ে প্রার্থনা করত।
এ থেকে এটাও জানা গেল যে, মানুষ বড়ই বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান। তাই তারা হাবভাবে প্রার্থনার বদলে জ্ঞানপূর্ণ প্রার্থণা জানায়। মানব শ্রেণীর এটাও একটা বৈশিষ্ট্য যে, তাদের ভেতরে কেউ না কেউ অবশ্যই সকল তত্ত্বজ্ঞানের উৎসের দিকে কায়মনে নিবিষ্ট থাকেন। সে ব্যক্তি সেই উৎস থেকে ওহী, দিব্যজ্ঞান কিংবা স্বপ্নের মাধ্যমে আসল জ্ঞান শিখে নেন। অন্যান্য লোক তাঁর ভেতর পথের আলো ও পুণ্যের প্রভাব দেখে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি অনুগত হয়ে থাকে।
প্রত্যেকটি মানুষকে অদৃশ্য জগতের কথা জানার শক্তি দেয়া হয়েছে। হোক তা সে স্বপ্নের মাধ্যমে কিংবা দিব্যজ্ঞানের সাহায্যে অথবা গায়েবী আওয়াজ শুনে বা দূরদৃষ্টি প্রয়োগ করে জানুক। তবে এতটুকু তারতম্য অবশ্যই রয়েছে যে, কিছু লোক এক্ষেত্রে পূর্ণতা লাভ করেন এবং কিছু লোক অপূর্ণ থাকে। অপূর্ণদের তাই পূর্ণতা প্রাপ্তদের (বুজর্গদের) শরণাপন্ন হতে হয়। এ ছাড়াও মানুষের কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্যান্য জীবের ভেতর নেই। যেমন, বিনয়, পবিত্রতা, ন্যায়পরায়ণতা, দানশীলতা, উদারতা, প্রার্থনালব্ধ ঐশী প্রভাব ইত্যাদি। এ ভাবের আরও কিছু অবস্থা রয়েছে। যেমন কারামত।
মোট কথা যে সব বৈশিষ্ট্য মানুষকে জীবজগতে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে তার সংখ্যা অনেক। তবে সবগুলোরই মূলে হল দুটি শক্তি। (১) জ্ঞান বা বোধশক্তি। এর দুটো শাখা। একটি শাখার ঝোঁক থাকে মানবিক কল্যাণ ও তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিকগুলোর দিকে। অন্যটির ঝোঁক রয়েছে আল্লাহর কাছ থেকে সরাসরি সব কিছু জানার দিকে। (২) পূর্ণাঙ্গ কর্মশক্তি। এরও দুটো শাখা রয়েছে। একটির সাহায্যে মানুষ নিজের ইচ্ছানুসারে ভাল বা মন্দ কাজ করে থাকে। পক্ষান্তরে জীব-জন্তুর ইচ্ছা-অনিচ্ছার বালাই নেই। ভাল বা মন্দ কাজের ভাবনাও তাদের স্বভাবে নেই। ভাল বা মন্দ কাজ দ্বারা তারা প্রভাবিতও হয় না। তারা তো জৈবিক প্রাণের তাগাদায় চলে ও তার থেকেই শুধু প্রভাবিত হয়। তাই পশুরা এ ক্ষেত্রে বেপরোয়া। কিন্তু মানুষ যখন কোন কাজ করে, কাজ ফুরিয়ে গেলেও তার প্রাণ বা প্রভাব থেকে যায় এবং তা তার প্রবৃত্তির খোরাক হয়। ফলে হয় তা থেকে আত্মা আলোকময় হয় অথবা আঁধারের ম্লানিময় আচ্ছাদিত হয়।
শরীয়ত মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগ করে কাজ করার ক্ষেত্রেই শুধু জবাবদিহি করা হবে বলে শর্ত দিয়েছে। তার সাথে ডাক্তারের এ শর্তের মিল রয়েছে যে, বিষ পানের ক্ষতি ও আফিমের উপকার পেতে হলে তা গিলে পেটে পৌঁছাতে হবে। আমি বলেছি, মানুষের প্রবৃত্তি তার কাজের প্রভাব বা প্রাণশক্তি আহরণ করে এ বক্তব্যটি কোন না কোনরূপে আত্মিক সাধনা ও ইবাদতকে মানবকুলের সর্বসম্মত ভাবে ভাল বলে ঘোষণাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কারণ, তাদের অনুসন্ধিৎসা এর আলোকময়তা সম্পর্কে জেনে ফেলেছে।
তেমনি মানুষ সর্বসম্মত ভাবেই পাপাচার ও নাফরমানীকে খারাপ বলে জানে। কারণ, তাদের অনুসন্ধিৎসা তার তমসা ও ক্ষতি দেখতে পেয়েছে। জীব জগতে মানবের স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির দ্বিতীয় শক্তিটির দ্বিতীয় শাখা হল তার উন্নততর অবস্থা ও শ্রেষ্ঠতর মর্যাদা। এ অবস্থা ও মর্যাদা অন্যান্য জীবের নেই। যেমন, আল্লাহপ্রীতি ও আল্লাহর নির্ভরতা।
প্রকাশ থাকে যে, পরিমিত স্বভাব মানুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্য। অবশ্য তা নিম্ন জিনিসগুলো ছাড়া পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। (১) উন্নততর ও উত্তম ব্যক্তির অর্জিত যে বিদ্যাগুলো অন্যান্য মানুষ অনুসরণ করেছে, সে সব বিদ্যা অর্জন। (২) আল্লাহর যে বিধি-বিধানে আল্লাহর পরিচিতি এবং কল্যাণময় ব্যবস্থাদি রয়েছে, সেই শরীয়ত। (৩) যে সব নীতিমালা মানুষের ইচ্ছাকৃত কার্য-কলাপ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনের জন্য কার্যগুলোকে ফরজ, হারাম, মুস্তাহাব, মুবাহ ও মকরুহ এ পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেছে, সেই নীতিশাস্ত্র। (৪) মানবতার ও মানবিক সভ্যতার পূর্ণ বিকাশ ঘটানোর উপায় উপকরণাদি।
আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ ও কলাকৌশল পবিত্র অদৃশ্য জগতে থেকে ব্যক্তি বিশেষকে সব চাইতে মেধাবী ব্যক্তির উপযোগী জ্ঞান দান করে তাঁর দিকে আকৃষ্ট করে। তখন তাঁর কাছ থেকে সে ব্যক্তি উপরোক্ত জ্ঞান অর্জণ করে নেয়। তারপর অন্যান্য ব্যক্তিরা তাকে অনুসরণ করে। মধুমক্ষিকার ঝাঁক যেভাবে তাদের রাজ মক্ষিকা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, এও তেমনি ব্যাপার। যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজ মক্ষিকাকে সেই শক্তি না দেয়া হত, তা হলে মধুমক্ষিকার ঝাঁকের এ গৌরবজনক কীর্তিকলাপ সম্ভব হত না।
সে ভাবে কেউ যখন দেখে যে, কোন জন্তু ঘাস ছাড়া বাঁচে না, তখন সে অবশ্যই বিশ্বাস করে, তার জন্য কোন না কোন চারণ ক্ষেত্র সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। ঠিক সেভাবেই আল্লাহ পাকের কলা-কৌশল নিয়ে যারা চিন্তা-ভাবনা করে, তারা অবশ্যই বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ তা'আলা নিশ্চয়ই এমন কতক বিদ্যা কোথাও না কোথাও দান করে রেখেছেন যার সাহায্যে মানুষ তার জ্ঞানগত অভাব অভিযোগ দূর করে পূর্ণত্ব লাভ করতে পারে।
মোটকথা এ সব বিদ্যার অন্যতম হল স্রষ্টার একত্ব ও গুণাবলী সম্পর্কিত জ্ঞান। এ বিদ্যাটি এরূপ সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষিত হওয়া উচিত যা প্রত্যেকেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এরূপ জটিল ও অস্পষ্ট করে তা আলোচনা করা ঠিক নয় যা কারো পক্ষেই জানা ও বুঝা সম্ভব হয় না। তাই সে বিদ্যার বিশ্লেষণ আল্লাহ তা’আলা তাঁর পরিচিতির মাধ্যমে দিয়েছেন।
এ বিদ্যার বিভিন্ন শাখার ভেতর রয়েছে, উপাসনা পদ্ধতি, জীবন ধারণ পদ্ধতি, আলোচনা ও সমালোচনা পদ্ধতি, সত্য ও ন্যায়ের পথে নিম্নস্তরের লোকের সন্দেহ সংশয় নিরসন বিদ্যা, ইতিহাস ও বর্ণনা শাস্ত্র (যে বিদ্যায় আল্লাহর অনুগ্রহ, অভিলাষ, কবর, হাশর ইত্যাদির বর্ণনা এবং একই মানুষকে বংশানুক্রমে যুগে যুগে আল্লাহ যে যোগ্যতা ও বিবেক-বুদ্ধির পূর্ণত্ব দান করেছেন তার বর্ণনা থাকে) এ সব বিদ্যা অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম রহস্যের জ্ঞান সমৃদ্ধ মহাজ্ঞানীরা ভেতরেই সীমিত ও সমন্বিত হয়েছিল। এ অবস্থাটিকে আশায়েরা সম্প্রদায় ‘কালামে নফসী’ বা আদি বাক্য আখ্যা দান করেছে। এটা হল জ্ঞান, ইচ্ছা ও শক্তি ভিন্ন অন্য কিছু। তারপর যখন ফেরেশতা সৃষ্টির মুহুর্ত এল, আল্লাহ তা'আলা জানতে পেলেন, ফেরেশতা সৃষ্টি ছাড়া মানুষের কল্যাণের কাজ সুসম্পন্ন হবে না। জ্ঞানের বিভিণ্ন শাখার মতই ফেরেশততারা মানুষের ভেতর জড়িয়ে ও ছড়িয়ে থাকবে। সুতরাং ফেরেশতাদের তিনি মানুষের প্রতি রহমত হিসেবে সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ‘কুন’ (হয়ে যাও) বলা মাত্র হয়ে গেল। তখন তাদের ভেতর অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম তত্ত্বজ্ঞানীর ভেতর সীমিত ও সমন্বিত জ্ঞানের কিছুটা ঝলকানী দেয়া হল। ফলে তারা আত্মিক জীব হয়ে আত্মপ্রকাশ করল। আল্লাহ পাক এদের ব্যাপারেই বললেন, ‘আরশ বাহী ও তাদের পার্শ্বচররা’ ইত্যাদি।
এরপর যদি কেউ প্রশ্ন করে, নামায কোত্থেকে ফরজ হল? রাসূলের আনুগত্য কি করে ওয়াজিব হল? চুরি ও ব্যভিচার কোথায় হারাম হল? জবাবে বলব, যেখান থেকে গরু ছাগরের ঘাস খাওয়া ফরজ ও মাংস খাওয়া হারাম করা হয়েছে, মানুষের ফরজ হারামও সেখান থেকে করা হয়েছে। তেমনি যেখান থেকে মক্ষিকার ঝাঁকের জন্য রাজ মক্ষিকাকে অনুসরণ করা ওয়াজিব করা হল, সেখান থেকেই মানুষের জন্য নবীকে অনুসরণ করা ওয়াজিব করা হয়েছে। হ্যাঁ, তফাত এতটুকু যে, পশু-পাখীর জন্য ফরজ হারাম হয় প্রকৃতিগত ইলহামের দ্বারা এবং মানুষ সাধনা লব্ধ ওহীর ও দিব্যজ্ঞানের মাধ্যমে ফরজ হারামের সন্ধান পায়। তারপর অন্যান্যরা পায় ওহীপ্রাপ্ত ব্যক্তির অনুসরণের মাধ্যমে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন