মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৭) দায়িত্ব মানুষের বিধিলিপি



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ৭)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

দায়িত্ব মানুষের বিধিলিপি 
এ কথা সুস্পষ্ট যেআল্লাহ্ তা'আলার এ সৃষ্টিজগতে এমন অজস্র নিদর্শন রয়েছে যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে বেশ বুঝা যায়আল্লাহ্ তা'আলা যে তাঁর বান্দাদের শরীয়তের বিধি-নিষেধ পালনের দায়িত্ব দিয়েছেন তার ভেতর বহু কল্যাণকর উদ্দেশ্য রয়েছে। তাঁর কাছে এর সমর্থনে সকল যুক্তি-প্রমাণও রয়েছে। 
এখন একবার গাছের পাতাফুল ও ফলের দিকে তাকান। তা দেখে এবং স্বাদ ও গন্ধ নিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়তার দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করুন। দেখতে পাবেনপ্রত্যেক ধরনের পাতাকে আল্লাহ বিশেষ রূপ দিয়েছেন। প্রত্যেক জাতীয় ফুলকে দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন রঙ ও ঘ্রাণ। প্রত্যেক প্রকারের ফলকে দিয়েছেন স্বতন্ত্র স্বাদ। এ থেকে কোনটি কোন গাছের পাতাকিসের ফুল ও কোন ফল তা সহজেই বলা যায়। এ সবগুলোই শ্রেণীরূপের অন্তর্গত। যে সূত্র থেকে যেভাবে শ্রেনী বিন্যাস হয়ে থাকেএগুলো সেখান থেকেই একই ভাবে বিন্যস্ত হয়। 

আল্লাহর সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রত্যেক প্রকারের গাছের জন্য বিশেষ উপাদান নির্ধারিত হয়ে আছে। যেমনখেজুর গাছের জন্য বিশেষ ধরনের মাটি তিনি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। তারপর মোটামুটিভাবে বলে দিয়েছেনএ উপাদান খেজুরের রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করবে। অবশেষে বিস্তারিত ফরমানে বলা হলখেজুরের পাতা এরূপফল ওরূপ ও বীচি সেরূপ হবে। 

প্রত্যেক শ্রেণীর কিছু বৈশিষ্ট্য তো সামান্য বুদ্ধি যার রয়েছে সে-ই বলতে পারে। কিন্তু কিছু বৈশিষ্ট্য এরূপ সূক্ষ্ম হয় যা বিজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া কেউ জানতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে ইয়াকুতের এক বিশেষ প্রভাবের কথা ধরে নিন। যার হাতে ইয়াকুত থাকেঅন্তরে তার আনন্দ ও সাহস বেড়ে যায়। ইয়াকুতের এ বৈশিষ্ট্যটি সাধারণতঃ কেউ দেখে না। 

কোন কোন শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যগুলো তার গোটা সত্তার ভেতর পাওয়া যায়। তা ঘটে উপাদানের উপযুক্ততার জন্য (উপাদানের দুর্বলতার কারণে একই শ্রেণীর ফলফুলের ভেতর তারতম্য ঘটে)। তেমনি কোন শ্রেনীর কিছু সত্তায় সব বৈশিষ্ট্য থাকেকিছু অংশে থাকে না। হালীলা ফল মুঠোয় নিলে এ সত্যটি সহজ হয়ে ধরা দেয়। 

খেজুর এরূপ কেন এ কথা বলতে পারেন না। এ প্রশ্ন অবান্তর। কারণসেটা যেরূপ আছে তা-ই থাকবে। এর কারণ জানতে চাওয়ার পালা নেই। 

তারপর আপনি যদি পশুর শ্রেনীগুলোর দিকে দৃষ্টি দেনসেখানেও মাছের মতই প্রতিটি শ্রেণীর পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্য দেখতে পাবেন। সঙ্গে সঙ্গে এও দেখতে পাবেনতাদের ভেতর এমন কতগুলো স্বতঃস্ফুর্ত ও প্রকৃতিগত ব্যাপার দেখা যায় যা থেকে সহজেই এক শ্রেনী হতে অপর শ্রেণীর পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। যেমন গৃহপালিত গরুছাগল ইত্যাদি ঘাস খায় ও চর্বিত চর্বন করে। অথচ ঘোড়া খচ্চর ইত্যাদি তৃণজীবি হয়েও চর্বিত চর্বন করে না। হিংস্র জন্তুর গোস্ত খেয়েই বাঁচে। পাখীরা উড়ে বেড়ায়। মাছ পানিতে সাঁতরায়। প্রত্যেক শ্রেণীর পশুর কণ্ঠস্বর ভিন্ন। সংগম ও দাম্পত্য পদ্ধতিও ভিন্ন ভিন্ন। বাচ্চা পালন ও ডিম প্রদানের রীতিও স্বতন্ত্র। এ সব সবিস্তারে বলতে গেলে গ্রন্থের কলেবর বেড়ে যাবে। 

এরপর দেখিপ্রত্যেক শ্রেণীর ভেতর যতটুকু স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফুর্ত জ্ঞান রয়েছে যা তার একান্ত প্রয়োজন ও তার জন্য কল্যাণকর। এ সব হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান। শ্রেণী বৈশিষ্ট্যের ছিদ্র পথে তার আগমন। ফুলের রঙ ও রূপ এবং ফলের স্বাদ ও ঘ্রাণ যেরূপ শ্রেণী বিশেষের সাথে জড়িয়েই আবির্ভূত হয়এও তেমনি এসে থাকে। 

কোন শ্রেণীতে শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্যগুলোর সর্বত্র উপস্থিতি দেখা যায়। অথচ কোন শ্রেণীতে কিছু সংখ্যকের ভেতর পাওয়া যায় ও কিছু সংখ্যকের ভেতর পাওয়া যায় না। তার মূলে রয়েছে উপাদানের উপযোগিতা কিংবা দুর্বলতা। তবে শ্রেণী বিশেষের প্রত্যেকটি সত্তাই বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণের যোগ্যতা রাখে। বৈশিষ্ট্যে ব্যতিক্রমের অন্যতম উদাহরণ হল মধু মক্ষিকার রাজা ও গৃহপালিত তোতাপাখী। নিজ নিজ শ্রেণী থেকে তারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পেয়ে থাকে। 

মানুষের দিকে লক্ষ্য করলেও আপনি গাছপালা ও জীবজন্তুর মতই কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য সেখানে দেখতে পাবেন। যেমনজন্ম নেয়াবৃদ্ধি পাওয়াকাশী দেয়াহাই তোলাপায়খানা-প্রস্রাব করাজন্ম নিয়ে মাতৃস্তন্য পান করা ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে এমন কতগুলো বৈশিষ্ট্যও পাবেন যেগুলো মানব জাতিকে অন্যান্য জাতীয় সৃষ্টি থেকে স্বতন্ত্র করে রেখেছে। যেমনকথা বলা ও বুঝাভূমিকা বুঝেই বিষয়জ্ঞান অর্জন করাসাধনা ও গবেষণা চালিয়ে বুদ্ধি-বিবেকের সাহায্যে গভীর তত্ত্বজ্ঞান হাসিল করাবস্তুগত ধ্যান-ধারণার বাইরের বস্তুকে উন্নত জ্ঞানের সাহায্যে জেনে নেয়া (সভ্যতা ও দেশজাতি ও ব্যক্তি সংস্কার পদ্ধতি ইত্যাদি)। এ ব্যাপারগুলো যেহেতু মানুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্য ও জন্মগত উত্তরাধিকারতাই জংগল বা পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসকারী মানুষের কাছেও তার পরিচয় মিলে। এও হচ্ছে আল্লাহর শ্রেণী বিন্যাসের জন্য নির্ধারিত বিশেষ উপাদানের বৈশিষ্ট্য। আসল তত্ত্ব হল এইমানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য বা স্বভাবের দাবী হল এইতার রিপুর ওপরে অন্তরের ও অন্তরের ওপরে বুদ্ধির প্রাধান্য থাকা চাই। 

তারপর লক্ষ্য করুনআল্লাহ তা'আলা প্রতিটি শ্রেণী বিন্যাসে কত কলা-কৌশল ও অনুগ্রহ-প্রীতির পরিচয় দিয়েছেন। গাছ-পালায় যেহেতু গতি ও অনুভূতির উপাদান অবর্তমানতাই তার শিকড়কে এত শক্তি দান করেছেন যেহাওয়ামাটিআলো ইত্যাদি সংযোগে সৃষ্ট প্রয়োজনীয় উপাদান সে সংগ্রহ করে তার শাখা-প্রশাখা শ্রেণীগত চাহিদা মোতাবেক বর্দ্ধন করে দেয়। পক্ষান্তরে জীব-জন্তু যেহেতু অনুভূতিশীলমর্জী মাফিক তারা চলতেও পারেতাই তাদের মাটি থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান চুষে খাবার শিকড় দেয়া হয় নি। বরং তাদের আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান হল এইঘাসপাতা ও পানি যেখানে পাবেখুঁজে ফিরে খাবে। এ ভাবে তাদের অন্যান্য প্রয়োজন মিটাবার বুদ্ধিও দেয়া হল। যে সব শ্রেণী মাটি থেকৈ পোকার মত জন্ম নেয় নাতাদের আল্লাহ তা'আলা সন্তান উৎপাদনধারণ প্রসব ও পালনের শক্তি দান করলেন। সন্তানদাত্রীর ভেতর এমন তরল পদার্থ দিলেন যা পেটের সন্তান পালনে ব্যয় হতে পারে। তারপর সেই তরল পদার্থকে দুধে পরিণত করা হল এবং বাচ্চাকে ইলহাম করা হল বুক চুষে তা পান করার জন্য। চোষার ফলে দুধ তার কণ্ঠনালী পেরিয়ে পাকস্থলীতে চলে গেল। 

তেমনি মুরগীর ভেতর এমন তরল পদার্থ দেয়া হয়েছে যা থেকে ডিম তৈরি হতে পারে। ডিম দেয়া শেষ হলে দেহের তরল পদার্থ শুকিয়ে যায় এবং পেট শূণ্য হয়ে যায়। তখন তার ভেতর এমন এক উন্মাদনা দেখা দেয় যেঅন্যান্য মোরগের সাথে মেলামেশা ভুলে সে ডিমে তা দিতে বসে থাকে। এর ফলে তার পেটের শূন্যতার অনুভূতি দূর হয়। 

কবুতর জুটির ভেতর অদ্ভুত ভালবাসা দান করা হয়েছে। কবুতরীর পেটের খোলসটিকে ডিমে তা দেয়ার জন্য উপযোগী করে রাখা হয়েছে। তার ভেতরকার বাড়তি তরল পদার্থকে বমি আকারে বাচ্চার ওপর অনুগ্রহে পরিণত করা হয়েছে। বমির মাধ্যমে সে দানা-পানি বাচ্চার উপযোগী করে খাওয়ার এবং কবুতরকে আকৃষ্ট করে তার পথ অনুসরণ করে বাচ্চাকে খোরাক জোগাবার জন্য। তেমনি বাচ্চার প্রকৃতিতে তরল পদার্থ দিয়ে পালক সৃষ্টির পথ করা হয়েছে। তার সাহায্যে যেন সে উড়তে পারে। 

মানুষের যেহেতু গতিঅনুভূতিজৈব তাড়না ও বুদ্ধি-বিবেকের প্রেরণা রয়েছেএমন কি বাড়তি জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতাও তার রয়েছেতাই তাকে চাষাবাদ করাবৃক্ষ রোপনলেন-দেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সহজাত জ্ঞান দেয়া হল। কিছু লোককে নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব সুলভ ও কিছু লোককে দাসত্ব-আনুগত্য সুলভ স্বভাব দান করা হল। এক দলকে রাজকীয় স্বভাবের ও অন্য দলকে প্রজাসুলভ স্বভাবের অধিকারী করা হল। কাউকে আল্লাহতত্ত্বপ্রকৃতিতত্ত্বতর্কশাস্ত্র ও ব্যবহারিক শাস্ত্রের গভীর ও জটিল জ্ঞান দান করা হল। কাউকে আবার এমন নির্বোধ করা হয়েছে যেজ্ঞানী ব্যক্তির অনুসরণ করা ছাড়া তার নিজের কিছু বুঝবারই ক্ষমতা নেই। শহুরে হোক কিংবা গেঁয়োসবার ভেতরেই স্বভাবের ও ক্ষমতার এ বৈচিত্র্য বিদ্যমান। 

যা কিছু আলোচিত হল সবই মানুষের জৈবিক জীবন ও জীবসুলভ শক্তি সম্পর্কিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ বৈ নয়। এখণ তার ফেরেশতাসুলভ শক্তির দিকে চলুন। এটাও আপনি জানেনমানুষ অন্যান্য জীবের মত নয়: বরং তাকে সকল জীবের চাইতে উত্তম পর্যায়ের জ্ঞান দান করা হয়েছে। তার সে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ভেতর যেটাকে সবার অনুসরণ করতে হয়তা হচ্ছে তার জন্ম ও প্রতিপালনের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কিত জ্ঞান। তারা তখন এটাও জেনে ফেলে যেসৃষ্টির এ বিশাল কারখানার একজন মহান পরিচালক রয়েছেন। তিনিই সবাইকে সৃষ্টি করেছেন এবং রুজী সরবরাহ করছেন। তাই তারা সবাই মিলে অন্তত হাবভাবে সেই মহান প্রতিপালক ও বিজ্ঞতম স্রষ্টার কাছে বিনয়াবনত থাকছে। এটাই হচ্ছে আল্লাহ পাকের নিম্ন আয়াতের তাৎপর্যঃ 

"(হে রাসূল) ! আপনি কি দেখেন না নতোমণ্ডলের বাসিন্দারাপৃথিবীর অধিবাসীচন্দ্রসূর্যনক্ষত্রপাহাড়গাছপালাচতুষ্পদ জন্তু এবং বহু সংখ্যক মানুষ আল্লাহর সমীপে বিনয়াবনত রয়েছেতবে বহু লোক এমনও রয়েছে যাদের ভাগ্যে (নাফরমানীর কারণে) রয়েছে নির্ধারিত শাস্তি (সূরা হাজ্জঃ আয়াত ১৮) 

লক্ষ্য করুনগাছের প্রতিটি অংশশাখাপাতাফুল তাদের বিজ্ঞতম স্রষ্টার সমীপে হাত পেতে রয়েছে। যদি সেগুলোর জ্ঞান থাকততা হলে স্রষ্টার প্রশংসায় মুখর থাকত এবং অধিক থেকে অধিকতর কৃতজ্ঞ হয়ে চলত। যদি কিছুটা বুঝ থাকততা হলে হাবভাবে প্রার্থনার বদলে কথা দিয়ে প্রার্থনা করত। 

এ থেকে এটাও জানা গেল যেমানুষ বড়ই বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান। তাই তারা হাবভাবে প্রার্থনার বদলে জ্ঞানপূর্ণ প্রার্থণা জানায়। মানব শ্রেণীর এটাও একটা বৈশিষ্ট্য যেতাদের ভেতরে কেউ না কেউ অবশ্যই সকল তত্ত্বজ্ঞানের উৎসের দিকে কায়মনে নিবিষ্ট থাকেন। সে ব্যক্তি সেই উৎস থেকে ওহীদিব্যজ্ঞান কিংবা স্বপ্নের মাধ্যমে আসল জ্ঞান শিখে নেন। অন্যান্য লোক তাঁর ভেতর পথের আলো ও পুণ্যের প্রভাব দেখে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের প্রতি অনুগত হয়ে থাকে। 

প্রত্যেকটি মানুষকে অদৃশ্য জগতের কথা জানার শক্তি দেয়া হয়েছে। হোক তা সে স্বপ্নের মাধ্যমে কিংবা দিব্যজ্ঞানের সাহায্যে অথবা গায়েবী আওয়াজ শুনে বা দূরদৃষ্টি প্রয়োগ করে জানুক। তবে এতটুকু তারতম্য অবশ্যই রয়েছে যেকিছু লোক এক্ষেত্রে পূর্ণতা লাভ করেন এবং কিছু লোক অপূর্ণ থাকে। অপূর্ণদের তাই পূর্ণতা প্রাপ্তদের (বুজর্গদের) শরণাপন্ন হতে হয়। এ ছাড়াও মানুষের কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্যান্য জীবের ভেতর নেই। যেমনবিনয়পবিত্রতান্যায়পরায়ণতাদানশীলতাউদারতাপ্রার্থনালব্ধ ঐশী প্রভাব ইত্যাদি। এ ভাবের আরও কিছু অবস্থা রয়েছে। যেমন কারামত। 

মোট কথা যে সব বৈশিষ্ট্য মানুষকে জীবজগতে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে তার সংখ্যা অনেক। তবে সবগুলোরই মূলে হল দুটি শক্তি। (১) জ্ঞান বা বোধশক্তি। এর দুটো শাখা। একটি শাখার ঝোঁক থাকে মানবিক কল্যাণ ও তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিকগুলোর দিকে। অন্যটির ঝোঁক রয়েছে আল্লাহর কাছ থেকে সরাসরি সব কিছু জানার দিকে। (২) পূর্ণাঙ্গ কর্মশক্তি। এরও দুটো শাখা রয়েছে। একটির সাহায্যে মানুষ নিজের ইচ্ছানুসারে ভাল বা মন্দ কাজ করে থাকে। পক্ষান্তরে জীব-জন্তুর ইচ্ছা-অনিচ্ছার বালাই নেই। ভাল বা মন্দ কাজের ভাবনাও তাদের স্বভাবে নেই। ভাল বা মন্দ কাজ দ্বারা তারা প্রভাবিতও হয় না। তারা তো জৈবিক প্রাণের তাগাদায় চলে ও তার থেকেই শুধু প্রভাবিত হয়। তাই পশুরা এ ক্ষেত্রে বেপরোয়া। কিন্তু মানুষ যখন কোন কাজ করেকাজ ফুরিয়ে গেলেও তার প্রাণ বা প্রভাব থেকে যায় এবং তা তার প্রবৃত্তির খোরাক হয়। ফলে হয় তা থেকে আত্মা আলোকময় হয় অথবা আঁধারের ম্লানিময় আচ্ছাদিত হয়। 

শরীয়ত মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগ করে কাজ করার ক্ষেত্রেই শুধু জবাবদিহি করা হবে বলে শর্ত দিয়েছে। তার সাথে ডাক্তারের এ শর্তের মিল রয়েছে যেবিষ পানের ক্ষতি ও আফিমের উপকার পেতে হলে তা গিলে পেটে পৌঁছাতে হবে। আমি বলেছিমানুষের প্রবৃত্তি তার কাজের প্রভাব বা প্রাণশক্তি আহরণ করে এ বক্তব্যটি কোন না কোনরূপে আত্মিক সাধনা ও ইবাদতকে মানবকুলের সর্বসম্মত ভাবে ভাল বলে ঘোষণাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কারণতাদের অনুসন্ধিৎসা এর আলোকময়তা সম্পর্কে জেনে ফেলেছে। 

তেমনি মানুষ সর্বসম্মত ভাবেই পাপাচার ও নাফরমানীকে খারাপ বলে জানে। কারণতাদের অনুসন্ধিৎসা তার তমসা ও ক্ষতি দেখতে পেয়েছে। জীব জগতে মানবের স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির দ্বিতীয় শক্তিটির দ্বিতীয় শাখা হল তার উন্নততর অবস্থা ও শ্রেষ্ঠতর মর্যাদা। এ অবস্থা ও মর্যাদা অন্যান্য জীবের নেই। যেমনআল্লাহপ্রীতি ও আল্লাহর নির্ভরতা। 

প্রকাশ থাকে যেপরিমিত স্বভাব মানুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্য। অবশ্য তা নিম্ন জিনিসগুলো ছাড়া পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। (১) উন্নততর ও উত্তম ব্যক্তির অর্জিত যে বিদ্যাগুলো অন্যান্য মানুষ অনুসরণ করেছেসে সব বিদ্যা অর্জন। (২) আল্লাহর যে বিধি-বিধানে আল্লাহর পরিচিতি এবং কল্যাণময় ব্যবস্থাদি রয়েছেসেই শরীয়ত। (৩) যে সব নীতিমালা মানুষের ইচ্ছাকৃত কার্য-কলাপ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনের জন্য কার্যগুলোকে ফরজহারামমুস্তাহাবমুবাহ ও মকরুহ এ পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেছেসেই নীতিশাস্ত্র। (৪) মানবতার ও মানবিক সভ্যতার পূর্ণ বিকাশ ঘটানোর উপায় উপকরণাদি। 

আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ ও কলাকৌশল পবিত্র অদৃশ্য জগতে থেকে ব্যক্তি বিশেষকে সব চাইতে মেধাবী ব্যক্তির উপযোগী জ্ঞান দান করে তাঁর দিকে আকৃষ্ট করে। তখন তাঁর কাছ থেকে সে ব্যক্তি উপরোক্ত জ্ঞান অর্জণ করে নেয়। তারপর অন্যান্য ব্যক্তিরা তাকে অনুসরণ করে। মধুমক্ষিকার ঝাঁক যেভাবে তাদের রাজ মক্ষিকা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়এও তেমনি ব্যাপার। যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজ মক্ষিকাকে সেই শক্তি না দেয়া হততা হলে মধুমক্ষিকার ঝাঁকের এ গৌরবজনক কীর্তিকলাপ সম্ভব হত না। 

সে ভাবে কেউ যখন দেখে যেকোন জন্তু ঘাস ছাড়া বাঁচে নাতখন সে অবশ্যই বিশ্বাস করেতার জন্য কোন না কোন চারণ ক্ষেত্র সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। ঠিক সেভাবেই আল্লাহ পাকের কলা-কৌশল নিয়ে যারা চিন্তা-ভাবনা করেতারা অবশ্যই বিশ্বাস রাখে যেআল্লাহ তা'আলা নিশ্চয়ই এমন কতক বিদ্যা কোথাও না কোথাও দান করে রেখেছেন যার সাহায্যে মানুষ তার জ্ঞানগত অভাব অভিযোগ দূর করে পূর্ণত্ব লাভ করতে পারে। 

মোটকথা এ সব বিদ্যার অন্যতম হল স্রষ্টার একত্ব ও গুণাবলী সম্পর্কিত জ্ঞান। এ বিদ্যাটি এরূপ সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষিত হওয়া উচিত যা প্রত্যেকেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এরূপ জটিল ও অস্পষ্ট করে তা আলোচনা করা ঠিক নয় যা কারো পক্ষেই জানা ও বুঝা সম্ভব হয় না। তাই সে বিদ্যার বিশ্লেষণ আল্লাহ তাআলা তাঁর পরিচিতির মাধ্যমে দিয়েছেন। 

যেমন তিনি বলেনঃ সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি। সুতরাং তিনি এমন গুণ নিয়ে রয়েছেন যা মানুষ জানে। তারা নিজেরা সেগুলো ব্যবহারও করে। যেমনতিনি চিরঞ্জীবতিনি দেখেনশুনেনক্ষমতা রাখেনইচ্ছা রাখেনকথা বলেনরাগ হনঅসন্তুষ্ট হনদয়া দেখানমালিকানা রাখেনমুখাপেক্ষী হন না ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে এটাও প্রমাণ করে দিয়েছেন যেতাঁর এ গুণাবলীর সমকক্ষতা করার ক্ষমতা কারো নেই। সুতরাং তাঁর জীবনদেখা-শুনাক্ষমতাইচ্ছাকথা বলা ইত্যাদি আমাদের কারো মত নয়। এ ভাবে তাঁর প্রত্যেকটি গুণই আমাদের থেকে স্বতন্ত্র ধরনের। 
সেই অতুলনীয়তার ব্যাখ্যা হল এইমরুভূমির বালুবৃষ্টির বিন্দু কিংবা সব গাছপালার পাতা অথবা সকল জীবের শ্বাসপ্রশ্বাস গণনার মতই অসম্ভব ব্যাপার হল আল্লাহর গুণ আমাদের কারো ভেতরে পাওয়া। তিনি তো আঁধার রাতের গর্ভের পিপীলিকার চাল-চলন দেখেন এবং বদ্ধকোঠায় লেপের নিচে কে কি ফাস করে তাও শোনেন। সব গুণের ক্ষেত্রেই তাঁর এ শ্রেষ্ঠত্ব ও অতুলনীয়তা। 

এ বিদ্যার বিভিন্ন শাখার ভেতর রয়েছেউপাসনা পদ্ধতিজীবন ধারণ পদ্ধতিআলোচনা ও সমালোচনা পদ্ধতিসত্য ও ন্যায়ের পথে নিম্নস্তরের লোকের সন্দেহ সংশয় নিরসন বিদ্যাইতিহাস ও বর্ণনা শাস্ত্র (যে বিদ্যায় আল্লাহর অনুগ্রহঅভিলাষকবরহাশর ইত্যাদির বর্ণনা এবং একই মানুষকে বংশানুক্রমে যুগে যুগে আল্লাহ যে যোগ্যতা ও বিবেক-বুদ্ধির পূর্ণত্ব দান করেছেন তার বর্ণনা থাকে) এ সব বিদ্যা অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম রহস্যের জ্ঞান সমৃদ্ধ মহাজ্ঞানীরা ভেতরেই সীমিত ও সমন্বিত হয়েছিল। এ অবস্থাটিকে আশায়েরা সম্প্রদায় কালামে নফসী’ বা আদি বাক্য আখ্যা দান করেছে। এটা হল জ্ঞানইচ্ছা ও শক্তি ভিন্ন অন্য কিছু। তারপর যখন ফেরেশতা সৃষ্টির মুহুর্ত এলআল্লাহ তা'আলা জানতে পেলেনফেরেশতা সৃষ্টি ছাড়া মানুষের কল্যাণের কাজ সুসম্পন্ন হবে না। জ্ঞানের বিভিণ্ন শাখার মতই ফেরেশততারা মানুষের ভেতর জড়িয়ে ও ছড়িয়ে থাকবে। সুতরাং ফেরেশতাদের তিনি মানুষের প্রতি রহমত হিসেবে সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কুন’ (হয়ে যাও) বলা মাত্র হয়ে গেল। তখন তাদের ভেতর অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম তত্ত্বজ্ঞানীর ভেতর সীমিত ও সমন্বিত জ্ঞানের কিছুটা ঝলকানী দেয়া হল। ফলে তারা আত্মিক জীব হয়ে আত্মপ্রকাশ করল। আল্লাহ পাক এদের ব্যাপারেই বললেন, ‘আরশ বাহী ও তাদের পার্শ্বচররা’ ইত্যাদি।

তারপর যখন শাস্ত্রীয়ধর্মীয় ও জাতীয় পরিবর্তনের মুহুর্ত এলতখন আল্লাহর কৌশলগত প্রয়োজন দেখা দিল কিছু আত্মিক জিনিসের অস্তিত্ব দানের। তখন সে সব জ্ঞান যুগের প্রয়োজন অনুসারে বিস্তারিত ও বিশ্লেষিত হয়ে প্রকাশ পেল। সে সম্পর্কেই আল্লাহ বললেনঃ 
আমি এ জ্ঞানভাণ্ডার (কুরআন)-কে এক কল্যাণময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। আমি সতর্ককারী (পূর্বাভাস দাতা) ছিলাম।(সূরা দুখানঃ আয়াত ৩-৪)
এ রাতেই সব হিকমতপূর্ণ ব্যাপার আমার দরবার থেকে নির্দেশ (অর্ডিন্যান্স) আকারে মীমাংসিত ও বণ্টিত হয়

***[উক্ত আয়াতে (لَیۡلَۃٍ مُّبٰرَکَۃٍ)  অর্থাত মোবারকময় রাত বলতে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেক আলেম এই রাতকে 'কদরের' রাত বলেছেন অনেকে আবার 'বরাতে'-এর রাতের উল্লেখ করেছেন। কুরআন ও ্হাদিসের আলোকে দু'টি রাতই মোবারকময় রাত এতে কোন সন্দেহ নেই]*** অত্র তারকার মধ্যস্ত লাইন কয়টি বইএর অংশ নয়।

তারপর আল্লাহর কৌশলগত প্রয়োজন এক পুণ্য ও পূত চরিত্রের ব্যক্তিকে নবী হিসেবে মনোনীত করলেন। তাঁকে ওহী ধারণের যোগ্যতাও দান করলেন। এ জন্য উচ্চ স্তর ও উন্নত মর্যাদা নির্দিষ্ট করা হল। যখন তা পাওয়া গেলতখনই মনোনয়ন দেয়া হল এবং উদ্দেশ্য সফলের জন্য তাকে আল্লাহ মাধ্যম বানালেন। তার ওপর নিজ গ্রন্থ অবতীর্ণ করলেন। তাঁকে অনুসরণ করা মানুষের জন্য ফরজ করে দিলেন। হযরত মুসাকে (আঃ) লক্ষ্য করে আল্লাহ তাআলা এ তথ্যই ব্যক্ত করেছেনঃ “(হে মুসা!) আমি আপনাকে আমার (কাজের) জন্য মনোনীত করলাম 
সুতরাং অদৃশ্য জগতের অদৃশ্যতম তত্ত্ব জ্ঞানীর মানুষের জন্য এ সব অমূল্য বিদ্যা নির্ধারিত করে রাখা মানুষের প্রতি তাঁর অপর অনুগ্রহের পরিচয় দেয়। তারপর মানুষের সেবার জন্য ফেরেশতা সৃষ্টি করা মানুষেরই যোগ্যতার প্রতি ইংগিত দান করে। মানুষেরই বিভিন্ন যুগের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থাই আল্লাহর বিধানকে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত করে করে পূর্ণতা দান করেছে। ফলে মানুষের ওপর আল্লাহর (তরফের) দলীল-প্রমাণসুদৃঢ় ও বিজয়ী হল। 

এরপর যদি কেউ প্রশ্ন করেনামায কোত্থেকে ফরজ হলরাসূলের আনুগত্য কি করে ওয়াজিব হলচুরি ও ব্যভিচার কোথায় হারাম হলজবাবে বলবযেখান থেকে গরু ছাগরের ঘাস খাওয়া ফরজ ও মাংস খাওয়া হারাম করা হয়েছেমানুষের ফরজ হারামও সেখান থেকে করা হয়েছে। তেমনি যেখান থেকে মক্ষিকার ঝাঁকের জন্য রাজ মক্ষিকাকে অনুসরণ করা ওয়াজিব করা হলসেখান থেকেই মানুষের জন্য নবীকে অনুসরণ করা ওয়াজিব করা হয়েছে। হ্যাঁতফাত এতটুকু যেপশু-পাখীর জন্য ফরজ হারাম হয় প্রকৃতিগত ইলহামের দ্বারা এবং মানুষ সাধনা লব্ধ ওহীর ও দিব্যজ্ঞানের মাধ্যমে ফরজ হারামের সন্ধান পায়। তারপর অন্যান্যরা পায় ওহীপ্রাপ্ত ব্যক্তির অনুসরণের মাধ্যমে।

অষ্টম পরিচ্ছেদ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...