মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৬) দায়িত্ব তত্ত্ব



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৬)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

দায়িত্ব তত্ত্ব-
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 
আমি নভঃমণ্ডলীপৃথিবী ও পাহাড়-পর্বতের সামনে আমার আমানত পেশ করলাম। তারা সে দায়িত্ব বহন করতে অস্বীকার করল। তারা ভয় পেয়ে গেল। অথচ মানুষ সে দায়িত্ব নিল। কারণতারা বড়ই জালিম ও জাহিল। এটা এ কারণেই ঘটল যেআল্লাহ মুনাফিক ও মুশরিক নর-নারীকে শাস্তি দেবেন এবং মুমিন নর-নারীকে অনুগ্রহীত করবেন। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়ালু (সূরা আহযাবঃ আয়াত ৭২-৭৩)

ইমাম গাজ্জালী ও ইমাম বায়জারী (রঃ) প্রমুখ এটা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যেএ আয়াতের আমানত’ অর্থ হল আল্লাহ দত্ত দায়িত্ব। আকাশ ও পৃথিবীর অন্য সবাই সভয়ে এ দায়িত্ব পারিহার করেছে। মানুষ এ দায়িত্ব বুঝে নেয়ার কারণেই আল্লাহর আনুগত্যের জন্য যেমন পুরস্কার পাবেতেমনি তাঁর নাফরমানীর জন্য শাস্তিও পাবে। অন্যান্যের কাছে এ দায়িত্ব পেশ করার উদ্দেশ্য হল তাদের যোগ্যতা যাচাই করে নেয়া। তাদের অস্বীকার থেকে প্রমাণিত হয়এত বড় গুরুদায়িত্ব বহনের শক্তি ও সাহস তাদের নেই। মানুষ তা গ্রহণ করে নিজেদের যোগ্যতম বলে প্রমাণ দিল। 

এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য এইএখানে আল্লাহ পাকের মানুষ বড়ই জালিম ও জাহিল’ মন্তব্যটি মানুষের যোগ্যতার কারণ ইংগিত করেছে। জালিম তাকেই বলা হয়ইনসাফ করার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি জুলুম করে। তেমনি জাহিল তাকেই বলা যায়জ্ঞানার্জনের যোগ্যতা নিয়ে যে ব্যক্তি মূর্খ থাকে। বস্তুত মানুষ ছাড়া সব সৃষ্টিই হয় শুধু আলিম ও আদিল। তাদের ভেতরে অত্যাচার ও মূর্খতার কোন স্থানই নেই। যেমনফেরেশতা। নয় তারা শুধুই জালিম ও জাহিল। ইলম ও আদলের কোন যোগ্যতাই তাদের নেই। যেমন চতুষ্পদ জন্তু। সুতরাং উক্ত আমানত গ্রহণের যোগ্যতা কেবল তাদেরই থাকতে পারে যাদের ক্ষমতা প্রকৃতিজাত নয়উপার্জনক্ষম। তারপর আয়াতে ( لِّیُعَذِّبَ) শব্দের লাম’ পরিণতি অর্থে এসেছে। অর্থাৎ দায়িত্ব গ্রহণের পরিণতি হল সুখ ও দুঃখ। 

এক্ষণে যদি আপনি সঠিক ব্যাপার বুঝতে চানতা হলে প্রথমে ফেরশতার কথাই খেয়াল করুন। ফেরেশতাদের না আছে ক্ষুৎ-পিপাসানা ভয়-ভাবনা। তেমনি জৈবিক লালসারাগঅহংকার ইত্যাকার বলতে কিছুই নেই। তাদের রুজী রোজগার কিংবা স্বাস্থ্য রক্ষার বালাই নেই। এক কথায় জীবজগতের কোন প্রয়োজনেরই তাদের পরোয়া নেই। তারা থাকেন। তাই কোন বাঞ্ছিত বিধান প্রবর্তনের কিংবা বিরূপ বা অনুকূল মনোভাব গ্রহণের ঐশী নির্দেশ পাওয়া মাত্র সংগে তারা মনে-প্রাণে তা বাস্তবায়নের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন।

এবারের পশুদের কথা খেয়ার করুন। সেগুলোর অবস্থা শোচনীয়। কতশত মন্দ স্বভাবের পশুদের সাথে তারা আষ্টেপিষ্টে জড়িত। তারা জৈবিক আনন্দ ছাড়া কিছুই বুঝেনা। তাই বস্তুগত স্বার্থভোগ-লালসা ও উত্তেজনার উত্তাল তরংগে তারা ডুবে থাকে। 
অবশেষে মানুষের দিকে লক্ষ্য করুন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর পরিপূর্ণ কৌশল প্রয়োগ দ্বারা মানুষের ভেতর পরস্পর বিরোধী দুটো শক্তিরই সমাবেশ ঘটিয়েছেন।
(১) ফেরেশতা প্রকৃতি (বিবেক)। এ প্রকৃতি মানুষের মৌলিক প্রাণ থেকৈ প্রেরণা পায় এবং সেই প্রাণ থেকে তার মৌলিক প্রাণকে অহরহ প্রেরণা যোগায় (যৌগিক প্রাণ মানুষের গোটা দেহে ছড়িয়ে থাকে)। মৌলিক প্রাণের প্রেরণা গ্রহণই ফেরেশতা প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য এবং তার ওপরেই সে প্রেরণা প্রাধান্য বিস্তার করে। 
(২) পশু প্রকৃতি (প্রবৃত্তি অন্য সব পশুর ভেতর যে জৈব প্রবৃত্তি রয়েছে সেটাই মানুষের পশু প্রকৃতির ভিত্তি ও উৎস। যে চার উপাদানের মানুষের যৌগিক প্রাণের সৃষ্টিএ প্রকৃতিতেও তা বর্তমান। পশু প্রকৃতি সম্পূর্ণ স্বাধীণ হয়। মৌলিক প্রাণও তার নির্দেশ মেনে নেয়। 
এও স্মরণ থাকা চাইএ দুই শক্তির ভেতর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব চলে। কখনও বিবেক প্রবৃত্তিকে ওপরে টানতে চায়। কখনও আবার প্রবৃত্তি বিবেককে টেনে নিচে নামাতে চায়। সেক্ষেত্রৈ বিবেক পরাজিত হলে প্রবৃত্তির প্রভাব প্রকাশ পায় এবং প্রবৃত্তি পরাজিত হলে বিবেকের প্রভাব প্রকাশ পায়। আল্লাহ তা'আলা তো দুটোই প্রকাশের সযোগ দেন। উপার্জণকারী যেটাই উপার্জন করতে চায়তিনি সাধারণত সেটা দেন। যদি কেউ পশু স্বভাবের প্রাধান্য দিতে চায়আল্লাহ তার পথ খুলে দেন। পক্ষান্তরে কেউ যদি ফেরেশতা প্রকৃতির প্রাধান্য রাখতে চায়আল্লাহ পাকও তাকে তার ব্যবস্থা করে দেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ 
আল্লাহর পথে যে ব্যক্তি দান করে ও আল্লাহকে ভয় করে এবং ন্যায় কাজকে সমর্থন করেআমি তার জন্য পূণ্য কাজ সহজ করে দেই। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কার্পণ্য করে ও আল্লাহকে ভয় করেনা এবং সত্যপথকে মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেআমি তার জন্য পাপ কাজ সহজ করে দেই (সুরা লাইলঃ ৫-১০)

অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 
(হে রসুল) আপনার প্রভুর অবদানে আমি দলমত নির্বিশেষে ধন্য করে থাকি। এদলকেও দেইও দলকেও দেই। কারণআপনার প্রভু ইহলোকে তাঁর দান-দাক্ষিণ্য কারো জন্য বন্ধ রাখেন না (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত- ২০)

প্রত্যেক শক্তি বা প্রকৃতিতেই সুখ ও দুঃখ রয়েছে। নিজ প্রকৃতির অনুকূল ব্যাপারের অনুভূতিকে বলে সুখ এবং প্রতিকূল ব্যাপার সহ্য করার নাম দুঃখ। দেখুনমানুষকে যখন অবশ (ক্লোরোফর্ম) করার মত কিছু প্রয়োগ করা হয়তখন কোন কিছুই তাকে কষ্ট দিতে পারে না। যদি তার কোন অংগ আগুনে জ্বালানো হয় তা সে টের পাবেনা। কিন্তু যখন তার অবশ অবস্থা কেটে যায়এবং পুনরায় অনুভূতি ফিরে আসে তখন কিরূপ কষ্ট দেখা দেয় তাও জানেন। 

মানুষের অবস্থার সাথে গোলাপ ফুলের বেশ সাদৃশ্য রয়েছে চিকিৎসকরা বলেছেনতার ভেতর তিনটি শক্তি বিদ্যমান। একমৃত্তিকা প্রকৃতি। ঘষে দিয়ে গায়ে লাগালে তা প্রকাশ পায়। দুইজলীয় প্রকৃতি। চিপে পান করলে তা জানা যায়। তিনবায়বীয় প্রকৃতি। তার পরিচয় ঘ্রাণেই মিলে। 

এ সব আলোচনা থেকে জানা গেলমানুষের যোগ্যতাই দায়িত্ব দাবী করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের যে দায়িত্ব দিয়ে জবাবদিহির ব্যবস্থা করেছেন সেটা তাদের দাবীরই অনুকূল। তেমনি তাদের ভেতরকার ফেরেশতা প্রকৃতি (বিবেক) এ দাবীই জানায়তার অনুকূল ও উপযোগী কাজগুলো তার জন্য ফরজ (অপরিহার্য) করা হোক এবং প্রতিকূল ও অনুপযোগী পশু প্রকৃতির কাজগুলো হারাম (অবৈধ) করা হোক। তা হলেই সে শাস্তি থেকে বেঁচে গিয়ে শান্তি লাভ করতে পারবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

 সপ্তম পরিচ্ছেদ--

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...