মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৫) প্রাণের রহস্য



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৫)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

প্রাণের রহস্য 
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 
“(হে রসূল) তারা (ইয়াহুদীরা) আপনার কাছে প্রাণের রহস্য জানতে চাইছেআপনি বলে দিনপ্রাণ আল্লাহর নির্দেশ বৈ কিছুই নয় বরং তোমাদের খুব নগণ্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। (সূরা বনী ইস্রাঈলঃ আয়াত ৮৫) 
ইবনে মাসউদের বর্ণনায় তিনি (আউতিতুম) স্থলে (ওআ'তু) পাঠ করেছেন। তার অর্থ দাঁড়ায় তাদের নগণ্য জ্ঞান দেয়া হয়েছে। এই তাদের’ থেকে বুঝা যায়প্রশ্নকারীরা ইহুদী ছিল। তা ছাড়া এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেনা যেমুসলমানদের কেউ প্রাণের রহস্য জানতেন না। কিছু লোকের অবশ্য সেরূপ ধারণা রয়েছে। শরীয়ত প্রবর্তক যে ব্যাপারে চুপ ছিলেনসে ব্যাপারে কারো কিছু জানা সম্ভবই নয়এটা ভুল কথা। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে শরীয়ত দাতা এ জন্য নীরব ভূমিকা নিয়েছেন যেসেরূপ সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয় দুচারজনে বুঝলেও সর্ব সাধারণের বোধগম্য হবেনা।
আপনার জানা প্রয়োজনপ্রাণের রহস্য আপনি সর্বপ্রথম যতটুকু বুঝতে পারেন তা হল এইপ্রাণী জগতের আয়ুস্কালের ভিত্তি ও উৎসই হল প্রাণ। যতক্ষণ তা যে প্রাণীর দেহে অবস্থা করেসেটা জীবিত থাকে এবং যখনই প্রাণ দেহ ছেড়ে চলে যায়প্রাণীটি মারা যায়। 
আরও একটু গভীরে তলিয়ে দেখতে পাবেনদেহের ভিতর সূক্ষ্ম ও হালস্কা উষ্ণতার অস্তিত্ব মিলে। রক্তপিত্তকফ ইত্যাকার দেহের চার চীজের নিখুঁত ও নির্ভুল সংমিশ্রণে তা কলবের ভিতর জন্ম নেয়। তারপর তা অনুভূতিগতি ও বোধ শক্তির ধারককে (দেহকে) রুজীর আহরণে বয়ে চলে এবং তাতে চিকিৎসাদিরও দখল থাকে। 
অভিজ্ঞতা থেকে আরও জানা যায়সেই উষ্ণ পিণ্ড হাল্কা ও ভারী এবং পরিচ্ছন্ন ও অপরিচ্ছন্ন হওয়া নির্ভর করছে উপরি বর্ণিত শক্তিগুলোর ওপর। উক্ত শক্তিগুলো থেকে যে প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয়তার প্রতিক্রিয়া সেটার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। 
এ জানা যায়যখন সেই উষ্ণপিণ্ডের জন্ম ও রূপ লাভের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন অংগে কোন বিপত্তি দেখা দেয়তখন উষ্ণপিণ্ডেও গোলযোগ দেখা দেয়। এও জানা যায় উষ্ণ পিণ্ডের জন্ম লাভ জীবনের ও মিটে যাওয়া মৃত্যুর কারণ হয়। ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে তো মনে হয় এ উষ্ণ পিণ্ডই প্রাণ। কিন্তু যদি গভীর দৃষ্টিতে লক্ষ্য করা যায়তাহলে বুঝা যায়সেটা প্রাণের নিম্নতম স্তর মাত্র। ফুলের সাথে ঘ্রাণের যে সম্পর্ক কিংবা আগুনের সাথে কয়লারশরীরের সাথে তার ততটুকু সম্পর্ক। 

আরও গভীরে তলিয়ে দেখলে বুঝা যায়এ উষ্ণপিণ্ড প্রাণ নয়বরং মূল প্রাণের ধারক বা খোলস এবং শরীরের সাথে তার সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বস্তু। তার প্রমাণ হল এইআমরা বারংবার দেখছি শিশু যুবক এবং যুবক বৃদ্ধ হয়। তেমনি তার শরীরের মৌল উপাদান রক্তকফপিত্ত ইত্যাদি পরিবর্তন হয়ে চলে। তাই তার সংমিশ্রণে যে প্রাণের অস্তিত্ব দেখতে পাই তা আগের চাইতে বহুগুণ বেড়ে যায়। আবার দেখিশিশু ছোট থেকে বড় হয়কালো কিংবা সাদা হয়আলেম কিংবা জাহেল হয়। এভাবে তার অবস্থার বহুবিধ বিবর্তন ঘটেঅথচ ব্যক্তিত্বটি একই থেকে যায়। 

এখানে যদি কেউ (তার অবস্থা পরিবর্তন হওয়া বা না হওয়া নিয়ে) তর্ক-বিতর্ক চালায় তো আমি জবাবে বলবএ পরিবর্তনটি আমি ধরে নিয়েছি মাত্র। নইলে এতে তো সন্দেহ নেই যেতার অবস্থার প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হতেই থাকে। অথচ ব্যক্তিটি একই থেকে যায়। কিংবা এ ভাবে জবাব দেব যেশিশুটির নিজ অবস্থানে বহাল থাকা তো মেনে নেবকিন্তু তার অবস্থা নিজ অবস্থানে বহাল থাকতে পারেনা। এ থেকেই প্রমাণিত হলশিশুটি আসল বস্তু ও তার অবস্থা নকল বস্তু। 

সুতরাং এটাই সুপ্রমাণিত হলযে বস্তুর অস্তিত্ব মানুষকে জীবিত রাখে তা উক্ত প্রাণ বা উষ্ণপিণ্ড নয়। তেমনি দেহ তো নয়ই। ব্যক্তিত্বটিও নয়যা বাহ্যত মনে হয়। বরং প্রাণ হল সংমিশ্রণ মুক্ত একক ও স্বতন্ত্র এক জিনিস। তা হল এমন এক নূর বিন্দু বা আলোকপিণ্ড যা পরিবর্তনশীল অবস্থা কিংবা বিভিন্ন পদার্থের সংমিশ্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বতন্ত্র। এ আসল প্রাণ সত্তাটি ছোট ও বড়রকালো ও সাদার ও অন্যান্য বিপরীত ধর্মী বিভিন্ন অবস্থার ভেতর একই রকম থাকে। কোনরূপ বিবর্তন বা বিভক্তি স্বীকার করেনা। 

অবশ্য সেই আসল প্রাণ সত্তার সম্পর্ক (বাহ্য দৃষ্টির প্রাণ সত্তা) তাপপিণ্ডের সাথেই রয়েছে। সেটার কারণেই দেহের অস্তিত্ব বিরাজমান থাকে। কারণদেহ তো উষ্ণপিণ্ড সৃষ্টির চার উপাদা থেকেই অস্তিত্ববান। পক্ষান্তরে মূল প্রাণ জগতের এমন একটি খিড়কী যে পথে সে যে যে উপাদানে জড় প্রাণের সৃষ্টি তা সবই সেখান থেকে পেয়ে যায়। এখন থেকে গেল বিবর্তনের বিবরণী। পার্থিব উপাদানের সেটাই স্বভাব। দেখুনরোদ ও রোদের তাপ ধোপার ধোয়া কাপড় শুকিয়ে সাদা করেঅথচ ধোপাকে পুড়ে কালো করে। এও তেমনি ব্যাপার। 

আমরা বিশুদ্ধ মন ও মননের এটাই সিদ্ধান্ত যেদেহে যদি জড় প্রাণের উৎপাদন শক্তি না থাকেতাহলে জড় প্রাণ সেখান থেকে বিদায় নেয়। এরই নাম মৃত্যু! জড় প্রাণ থেকে মূল প্রাণের নাম মৃত্যু নয়। তাই যখন ধ্বংসকারী ব্যাধিতে জড় প্রাণ তথা তাপপিণ্ড হাওয়া হয়ে যায়তখনও আল্লাহর কৌশলগত কারণে মূল প্রাণ দেহের সাথে সম্পর্ক রেখে চলে। আপনি যদি কোন শিশির বায়ু ষোল আনা বের করে ফেলার জন্য আপ্রাণ প্রয়াস চালানএমনকি বায়ু আকর্ষণ করতে গিয়ে শিশি ভেংগে ফেলারও উপক্রম করেনতথাপি তাতে কিছু না কিছু বায়ু থেকেই যাবে। তা আবার শিশিতে ছড়িয়ে জড়িয়ে যাবে। এটুকুই তো বায়ু প্রকৃতির গূঢ়তম রহস্য বা অপরিবর্তনীয় ও অখণ্ড সত্তা। তেমনি যৌগিক প্রাণের মূলেও এক রহস্যময় অপরিবর্তনীয় ও অবিভাজ্য সত্তা রয়েছে এবং সেটাই মৌলিক প্রাণ। 
মৌলিখ প্রাণের নির্ধারিত এক সীমা ও পরিমাপ রয়েছে। তার ব্যতিক্রম হতে পারে না। মানুষ যখন মারা যায়তখন তার যৌগিক প্রাণ অন্যরূপ ধারণ করে। তখন মৌলিক প্রাণের কারণে তার যৌথ অনুভূতির যতটুকু অবশিষ্ট থাকেছাড়া জগতের সাহায্যে তা এরূপ শক্তি অর্জন কর যেদেখাশোনা ও কথা বলার সব কাজই তাতে সম্ভব হয়। অর্থাৎ দেহ তখন এক অবচেতন মনের অধিকারী হয়। 
নভোমণ্ডলীতে একই ধরনের শক্তি কাজ করছে। তাই যৌগিক প্রাণ ছায়াজগতের প্রভাবে আলো কিংবা আঁধারের পরিচ্ছদে ভূষিত হওয়ার ক্ষমতা লাভ করে। এ থেকে অন্তর্বর্তী জগতের (আলমে বরযখ) অদ্ভুত ঘটনাবলী সম্ভব হয়। তারপর যখন ইস্রাফীলের শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে (যেভাবে শিংগায় সুর ধ্বনি দিয়ে দেহজগতে প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়ে সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রাখার স্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়েছিল) তখন মৌলিক প্রাণের (আমরুল্লাহ) প্রভাবে সেটাকে দেহরূপ ভূষণ কিংবা ছাড়া ও কায়াজগতের মাঝামাঝি ধরনের এক দেহে দান করা হবে। 
তারপর থেকে শুরু হবে সত্য সংবাদ দাতার সংবাদগুলোর এককের পর এক বাস্তবায়ন। যেহেতু যৌগিক প্রাণের সংযোগ রয়েছে মৌলিক প্রাণের সাথেতাই এ প্রাণ ইহ ও পরকাল দুটোর প্রভাব লাভ করবে। আত্মিক জগতের সাথে সংযোগ তার ভেতর ফেরেশতাসুলভ স্বভাব জন্মাবে এবং জড় জগতের প্রভাব তার ভেতর পশুসুলভ স্বভাবের উদ্ভব ঘটাবে। 

প্রাণ (রূহ) তত্ত্ব সম্পর্কে ভূমিকা আলোচনা করেই আমার ক্ষান্ত হওয়া উচিত। এ বিষয়ের এ মূল তত্ত্বটুকু মেনে নেয়ার পর এর শাখা-প্রশাখা বিন্যাস ও বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান প্রয়োজন। আর তা এর চাইতে কোন উন্নততর বিষয়ের আলোচনায় প্রসংগত এর সব রহস্যজাল ছিন্ন হবার আগেই হওয়া চাই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...