হকদারের হক পর্ব- ৭
সংসর্গ ও বন্ধুত্বের কর্তব্য
বিবাহ বন্ধনে যেমন স্ত্রী ও পুরুষের উপর পরস্পর কতকগুলি কর্তব্য আরোপিত হয়, তদ্রূপ ভ্রাতৃত্ব এবং সংসর্গের বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হইলেও ভ্রাতৃত্বের উপর কতগুলি কর্তব্য আরোপিত হইয়া থাকে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : দুই ভাইয়ের উদাহরণ এইরূপ দুই হাতের ন্যায় যাহার একটি অপরটিকে ধৌত করিয়া দেয়।
সংসর্গ ও বন্ধুত্বের কর্তব্য দশ শ্রেণীতে বিভক্ত
(১) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের প্রথম কর্তব্য হল- ধন-সম্পদের মধ্যে। যাঁহারা ভাই-বন্ধুর হককে অগ্রগণ্য বলিয়া মনে করেন, এমনকি নিজের অংশও তাহাদিগকে প্রদান করেন তাঁহারা বন্ধুত্বের কর্তব্য আদায়ে সর্বোচ্চ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। যেমন মদীনার আনসারগণ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন “এবং তাহারা নিজেদের অপেক্ষা (মুহাজিরগণকে) অগ্রবর্তী রাখে যদিও নিজেরা ক্ষুধার্তই থাকুক না কেন”।
যাহারা ভাই-বন্ধুকে নিজতুল্য মনে করে এবং স্বীয় ধনকে নিজের ও তাহাদের সকলের ধন বলিয়া মনে করে তাহারা বন্ধুত্বের কর্তব্য সম্পাদনে দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত। যাহারা ভাই-বন্ধুকে গোলাম ও খাদিমের ন্যায় মনে করে এবং নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তু তাহাদিগকে অযাচিতভাবে দান করে, তাহারা সর্বনিম্ন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। ভাই-বন্ধুগণকে যদি এইরূপ বস্তুই তোমার নিকট হইতে চাহিয়া লইতে হয় তবে তুমি তাহাদের বন্ধু শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত রহিলে না। কারণ এমতাবস্থায় তোমার অন্তরে বন্ধুর দুঃখ-কষ্টের প্রতি সমবেদনা মোটেই নাই; এই বন্ধুত্ব আন্তরিক নহে, ইহা অভ্যাসজনিত সংসর্গ এবং ইহার কোনই মূল্য নাই।
হযরত উতবাতুল গোলাম (রাঃ)-এর এক বন্ধু ছিলেন। বন্ধু তাঁহাকে একদিন বলিলেন : আমার চারি হাজার দিরহামের প্রয়োজন। তিনি বলিলেন : আইস, দুই ៖ হাজার দিরহার গ্রহণ কর। বন্ধু অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া বলিলেনঃ তোমার লজ্জা হয় না? আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্বের দাবী করিতেছ, অথচ পার্থিব ধন-সম্পদকে উহার উপর প্রাধান্য দিতেছ।
এক বাদশাহের নিকট লোকে কতিপয় সূফী ব্যক্তির পরোক্ষ নিন্দা করিল। ফলে এই সমস্ত সূফী ব্যক্তিকে হত্যা করার নির্দেশ হইল। হযরত আবুল হাসান নূরী (রহঃ)-ও তাঁহাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি অগ্রসর হইয়া বলিলেন : সর্বাগ্রে আমাকে হত্যা করুন। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিলেন : আপনি সর্বাগ্রে অগ্রসর হইলেন কেন? তিনি বলিলেন : এ সমস্ত সূফী আমার ভাই-বন্ধু। আমার ইচ্ছা, অন্ততঃ এক মুহূর্তকাল পূর্বে নিজের জীবনের বিনিময়ে মুহূর্তের জন্য তাঁহাদের জীবন রক্ষা করি। বাদশাহ বলিলেন : সুবহানাল্লাহ্! যাঁহারা এরূপ মনুষ্যত্বের অধিকারী তাঁহাদিগকে হত্যা করা দুরস্ত নহে। ইহা বলিয়া তিনি সকলকে মুক্তি দিলেন।
হযরত ফতেহ মুসেলী (রহঃ) একদা এক বন্ধুর গৃহে গিয়া দেখিলেন বন্ধু ঘরে নাই। তাঁহার পরিচারিকাকে বলিলেন : তোমার প্রভুর ক্যাশ বাক্সটি আন। পরিচারিকা ইহা উপস্থিত করিলে তিনি আবশ্যক পরিমাণে টাকা-পয়সা উহা হইতে চাহিয়া লইয়া গেলেন । গৃহে ফিরিয়া এই সংবাদ শ্রবণে প্রভু এত আনন্দিত হইলেন যে, তৎক্ষণাৎ সে দাসীকে আযাদ করিয়া দিলেন।
এক ব্যক্তি হযরত আবূ হুরাইয়া (রাঃ)-এর নিকট গিয়া বলিতে লাগিল : আমি আপনার সহিত বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করিতে ইচ্ছা করি। তিনি বলিলেন : ভ্রাতৃত্বের কর্তব্য আপনার জানা আছে কি? আগন্তুক বলিলঃ না। তিনি বলিলেন : ভ্রাতৃত্বের হকসমূহের মধ্যে একটি হক এই যে, তোমার স্বর্ণ-রৌপ্যের উপর তুমি আমা অপেক্ষা বেশী হকদার হইবে না। আগন্তুক বলিলঃ আমি এখনও এই স্তরে উপনীত হই নাই। তিনি বলিলেন : ব্যাস্ তবে সরিয়া পড়। এ কার্য তোমার দ্বারা হইতে পারে না।
হযরত ইব্ন উমর (রাঃ) বলেন : এক সাহাবীর নিকট এক ব্যক্তি ভাজা করা গোশ্ত প্রেরণ করিল। তিনি বলিলেনঃ আমার অমুক বন্ধু খুব অভাবগ্রস্ত। তাহাকে দেওয়া উত্তম এবং (এই বলিয়া) গোশ্তগুলি তাঁহার নিকট পাঠাইয়া দিলেন। তথায় পৌছিলে তিনি তদ্রূপ উহা তাঁহার অপর এক বন্ধুর নিকট পাঠাইয়া দিলেন। তিনি আবার তাঁহার অন্য বন্ধুর নিকট পাঠাইয়া দিলেন। মোটকথা, এইরূপে ঘুরিতে ঘুরিতে গোশ্ত আবার প্রথম বন্ধুর নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল।
হযরত মাসরূক (রঃ) ও হযরত খুসাইমা (রঃ)-এর মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। তাঁহারা উভয়েই ঋণগ্রস্থ ছিলেন। তাঁহারা একে অন্যের ঋণ গোপনভাবে পরিশোধ করিলেন যে, কোন বন্ধুই তাহা জানিতে পারেন নাই।
হযরত আলী (রাঃ) বলেন : কোন গরীবকে একশত দিরহাম দান করা অপেক্ষা কোন বন্ধুর জন্য বিশ দিরহাম ব্যয় করাকে আমি উৎকৃষ্টতর মনে করি। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অরণ্য হইতে দুইটি মিসত্তয়াক কাটিয়া লইলেন। তন্মধ্যে একটি ছিল বাঁকা ও অপরটি সোজা। তাঁহার সঙ্গে এক সাহাবীকে সোজা মিসওয়াকটি দিয়া দিলেন এবং নিজে বাঁকাটি রাখিলেন। সাহাবী নিবেদন করিলেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ ! এই মিসওয়াকটি ভাল। ইহা আপনার নিজের জন্য রাখুন। তিনি বলিলেন : কেহ কাহারও সহিত ক্ষণকাল সঙ্গদান করিলেও কিয়ামত দিবসে জিজ্ঞাসা করা হইবে, সাহচর্যের হক আদায় করা হইয়াছে, না নষ্ট করা হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই উক্তিতে এইদিকে ইঙ্গিত রহিয়াছে যে, নিজের ক্ষতি স্বীকার করিয়াও অপরের উপকার করা বন্ধুত্বের কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ পরস্পর দুই বন্ধুর মধ্যে যে ব্যক্তি অপরকে অধিক দয়া ও সাহায্য করে আল্লাহ্ তাহাকে অধিক ভালবাসেন।
(২) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের দ্বিতীয় কর্তব্য হল- সর্বাবস্থায় অভিলাষ ও প্রার্থনা করিবার পূর্বেই সন্তুষ্ট চিত্তে বন্ধুর সাহায্য করা। প্রাচীন কালের বুযর্গগণের এইরূপ অভ্যাস ছিল যে, তাঁহারা প্রত্যহ বন্ধুগণের দ্বারে গমনপূর্বক গৃহবাসিগণকে জিজ্ঞাসা করিতেন : আপনারা কি করিতেছেন? লাকড়ী, আটা, তৈল, লবণ ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিস গৃহে মওজুদ আছে কিনা? তাঁহারা ভ্রাতৃ-বন্ধুগণের কার্যকে নিজেদের কার্যের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যক বলিয়া মনে করিতেন এবং তাহাদের কোন কার্য করিতে পারিলে অত্যন্ত আনন্দিত হইতেন।
হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেনঃ ধর্ম-ভ্রাতা আমার নিকট স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি অপেক্ষা অধিক প্রিয় কারণ, তাহারা ধর্ম স্মরণ করাইয়া দেয় এবং স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়া স্মরণ করাইয়া দেয়।
হযরত আতা (রহঃ) বলেনঃ তিন দিন পর পর স্বীয় বন্ধুগণের খোঁজ-খবর লও। বন্ধু পীড়িত থাকিলে সেবা কর। কোন কার্যে লিপ্ত থাকিলে সাহায্য কর এবং আল্লাহর যিকির হইতে অসতর্ক থাকিলে স্মরণ করাইয়া দাও।
হযরত জাফর ইবন মুহাম্মদ (রঃ) বলেন : শত্রু আমা হইতে নির্লিপ্ত না হওয়া পর্যন্ত আমি তাহার অভাব মোচনে অতি তাড়াতাড়ি করিয়া থাকি। এমতাবস্থায় বন্ধুদের জন্য আমার কি করা উচিত!
প্রাচীনকালের জনৈক বুযর্গ স্বীয় বন্ধুর মৃত্যুর পর চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত তাঁহার পরিবারবর্গের সেবা করিয়া বন্ধুত্বের কর্তব্য পালন করিয়াছিলেন।
(৩) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের তৃতীয় কর্তব্য হল ভাই-বন্ধুগণের সহিত প্রিয়বাক্য বলা এবং তাহাদের দোষ-ত্রুটি গোপন করা: - বন্ধুর পশ্চাতে কেহ তাহাকে অন্যায় বলিলে ইহার যথাযথ উত্তর দিবে এবং মনে করিবে, বন্ধু অন্তরালে থাকিয়া সব শুনিতেছে। বন্ধু সর্বদা তোমার পশ্চাতে থাকুক, ইহা তুমি যেমন কামনা কর, তুমিও তদ্রূপ তাহার পশ্চাতে থাকিবে। চালাকি করিবে না। বন্ধু কিছু বলিলে তাহা মানিয়া লইবে, কোনরূপ প্রতিবাদ করিবে না। তাহার গোপন কথা কাহারও নিকট প্রকাশ করিবে না। এমনকি বন্ধুত্ব ভঙ্গ হইয়া গেলেও প্রকাশ করিবে না। বন্ধুর গোপন কথা প্রকাশ করিয়া দেওয়া মন্দ স্বভাবের পরিচায়ক। তাহার স্ত্রী, সন্তানাদি ও বন্ধু-বান্ধবের নিন্দা করিবে না। কেহ তাহার দোষ-ত্রুটি উল্লেখ করিলে উহা তাহার নিকট বলিবে না। কারণ, বলিলে তুমি তাহাকে কষ্ট দিলে। কিন্তু লোক বন্ধুর প্রশংসা করিলে ইহা তাহার নিকট গোপন করিবে না। কেননা বন্ধুর প্রশংসা গোপন করা তাহার প্রতি হিংসার প্রমাণ। বন্ধু তোমার নিকট কোন অপরাধ করিয়া থাকিলে তজ্জন্য কোনরূপ অভিযোগ না করিয়া তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিবে এবং আল্লাহর ইবাদতে স্বীয় দোষ-ত্রুটি স্মরণ করিবে। তাহা হইলে তামার নিকট কেহ অপরাধ করিলে ইহাকে বিস্ময়কর বলিয়া মনে করিবে না এবং ইহাও বুঝিবে যে, সংসারে নির্দোষ ও ত্রুটিহীন মানুষ কখনই খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। একেবারে নির্দোষ ব্যক্তির সঙ্গলাভ করিতে চাহিলে মানব সমাজ ছাড়িয়া দিতে হইবে। হাদীস শরীফে আছে যে, মু'মিন ব্যক্তি সর্বদা অপরের ত্রুটির পশ্চাতে কোন উপযুক্ত ওযর (কারণ) আছে বলিয়া মনে করে। আর মুনাফিক সর্বদা অপরের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করিতে থাকে।
বন্ধুর একটি উপকারের বিনিময়ে তাহার দশটি ত্রুটি গোপন করিয়া রাখা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : অসৎ বন্ধু হইতে (আল্লাহর সমীপে) আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। কারণ, দোষ-ত্রুটি দেখিলে সে প্রকাশ করিয়া দেয় এবং কোন ভাল আচরণ দেখিলে উহা গোপন করিয়া রাখে।
(১) বন্ধুর কোন অপরাধ ক্ষমার যোগ্য হইলে তাহা ক্ষমা করিয়া দিবে এবং তাহার প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করিবে। কারণ কাহারও প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা হারাম। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : আল্লাহ্ মু'মিনগণের চারি বস্তু অপরের উপর হারাম করিয়াছেন--ধন, প্রাণ মান-মর্যাদা ও কুধারণা পোষণ।
হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : তোমরা সেই ব্যক্তির সম্বন্ধে কি মনে কর যে, তাহার নিদ্রিত ভ্রাতার গুপ্ত অঙ্গ হইতে কাপড় সরাইয়া তাহাকে উলঙ্গ করিতে থাকে? লোকে বলিল : ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইহাকে কে সঙ্গত মনে করিবে? তিনি বলিলেনঃ তোমরাই বরং মনে করিয়া থাক। কারণ, তোমরা তোমাদের ভাই-বন্ধুদের ত্রুটি প্রকাশ করিয়া থাক যেন অপর লোকে উহা জানিতে পারে।
বুযর্গগণ বলেন : কাহারও সহিত তুমি বন্ধুত্ব স্থাপনের ইচ্ছা করিলে প্রথমে তাহাকে ক্রোধান্বিত করিয়া গোপনে তাহার নিকট লোক পাঠাও, যে তথায় তোমার আলোচনা করিবে। ইহাতে ঐ ব্যক্তি যদি তোমাদের কোন গোপন কথা প্রকাশ করে তবে বুঝিবে সে বন্ধুত্ব স্থাপনের উপযোগী নহে। বুযর্গগণ আরও বলেন : যে ব্যক্তি আল্লাহর ন্যায় তোমার গোপন কথা জানিয়াও অপরের নিকট প্রকাশ করে না, তাহার সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন কর। এক ব্যক্তি তাহার এক বন্ধুর নিকট নিজের কোন গুপ্ত বিষয় ব্যক্ত করতঃ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল : আমি যাহা বলিলাম তাহা তোমার স্মরণ আছে কি? সে ব্যক্তি বলিলঃ না, ভুলিয়া গিয়াছি।
বুযুর্গগণ বলেন : যে ব্যক্তি চারি অবস্থায় তোমার বন্ধুত্ব ভুলিয়া যায় সে বন্ধুত্বের উপযোগী নহে (১) আনন্দের সময়, (২) ক্রোধের সময়, (৩) লোভের সময় এবং (৪) প্রবৃত্তির তাড়নার সময়, এই চারি সময়ে বন্ধুত্বের কর্তব্য ভুলিয়া যাওয়া উচিত নহে।
হযরত আব্বাস (রাঃ) স্বীয় পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে বলেন : আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর (রাঃ) তোমাকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করিয়াছেন এবং প্রবীণগণের উপর তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন, সাধারণ পাঁচটি উপদেশ স্মরণ রাখিও (১) তাঁহার গোপন তথ্য কাহারও নিকট প্রকাশ করিও না, (২) তাঁহার সম্মুখে কাহারও গীবত করিও না, (৩) তাঁহার নিকট কোন মিথ্যা কথা বলিও না, (৪) তাঁহার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করিও না, (৫) তোমা কর্তৃক কোন বিশ্বাষঘাতকতার কার্য যেন তিনি কখনও দেখিতে না পান।
বন্ধুর সহিত তর্ক-বিতর্ক ও মতভেদ করা অপেক্ষা অপর কিছুই বন্ধুত্বের পক্ষে এত অধিক ক্ষতিজনক নহে। বন্ধুর কোন কথায় প্রতিবাদ করিলে ইহার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, তুমি যেন তাহাকে নির্বোধ ও মুর্খ এবং নিজেকে বুদ্ধিমান ও মহাজ্ঞানী মনে করিয়া তাহার প্রতি অহংকার ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করিতেছ। এইগুলি শত্রুতার নিদর্শন, বন্ধুত্বের পরিচায়ক নহে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, :
"তোমরা আপন ভ্রাতার কোন কথায় প্রতিবাদ করিও না। তাহাকে বিদ্রূপ করিও না, তাহার সহিত কোন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিও না।"
বুযর্গগণ বলেন : তুমি তোমার বন্ধুকে ‘চল' বলিলে সে যদি জিজ্ঞাসা করে, কত দূর এবং কোথায় যাইতে হইবে; তবে সে বন্ধুত্বের উপযোগী নহে। তাহার উচিত অন্য কিছুই না বলিয়া তোমার সঙ্গে তৎক্ষণাৎ যাত্রা করা।
হযরত আবূ সুলাইমান দারানী (রঃ) বলেনঃ আমার এক বন্ধু ছিলেন। যাহাকিছু তাঁহার নিকট চাহিতাম তাহাই তিনি দিয়া দিতেন। একবার তাঁহার নিকট বলিলাম, অমুক বস্তু আমার প্রয়োজন আছে। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন : ‘কতটুকু প্রয়োজন?' ইহার পর আমার অন্তর হইতে তাঁহার বন্ধুত্বের আস্বাদ হ্রাস পাইতে লাগিল।
মোটকথা, বন্ধুর কথা ও কার্যের সহিত যথাসম্ভব ঐক্য ও আনুকুল্য রক্ষা করিয়া চলিতে পারিলেই বন্ধুত্ব স্থায়ী থাকে।
(৪) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের চতুর্থ কর্তব্য হল- কথায় বন্ধুর প্রতি প্রীতি ও ভালবাসা প্রকাশ করিবে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- “তোমাদের মধ্যে কেহ কাহাকে ভালবাসিলে তাহাকে উহা জানাইয়া দাও”।
তিনি এই উদ্দেশ্যে ইহা বলিয়াছেন যে, বন্ধু উহা জানিতে পারিলে তাহার হৃদয়েও ভালবাসা জন্মিবে। এমতবস্থায় বন্ধুর প্রতি ঐ ব্যক্তির ভালবাসা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাইবে। সকল অবস্থাতেই বন্ধুর খোঁজ-খবর লইবে, সুখ-দুঃখে তাহার অংশীদার হইবে। বন্ধুকে সম্বোধন করিতে হইলে উত্তম নামে সম্বোধন করিবে। তাহার কোন উপাধি বা পদবী থাকিলে ইহা ধরিয়া ডাকিবে। সম্ভবত : এই উপাধি তাহার খুব প্রিয় হইয়া থাকিবে।
হযরত উমর (রাঃ) বলেন : বন্ধুর বন্ধুত্ব ত্রিবিধ কারণে দৃঢ় হইয়া থাকে। (১) প্রিয় নামে সম্বোধন করিলে, (২) দর্শনমাত্র নিজে তাহাকে প্রথমে সালাম করিলে, (৩) আগে বন্ধুকে বসাইয়া পরে নিজে বসিবে। এতদ্ব্যতীত বন্ধুর অগোচরে তাহার পছন্দনীয় প্রশংসাবাদ করিবে। এইরূপে তাহার স্ত্রী, সন্তানাদি এবং তাহার আত্মীয়-স্বজনেরও প্রশংসা করিবে। এইরূপ ব্যবহার বন্ধুত্ব সুদৃঢ় হইয়া থাকে। আর বন্ধুকৃত উপকারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিবে।
হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ – যে ব্যক্তি স্বীয় বন্ধুর সদিচ্ছার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে সৎকার্যের কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করিবে না।
বন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাহাকে সাহায্য করা আবশ্যক। কেহ তাহার দোষারোপ করিলে উহা খণ্ডন করা উচিত। বন্ধুকে নিজের ন্যায় মনে করিবে। তোমার সম্মুখে তোমার বন্ধুকে অপর লোকে মন্দ বলিলে যদি তুমি কিছুই না বল তবে যেন লোকে তাঁহাকে প্রহার করিতে দেখিয়া তুমি তাহাকে সাহায্য না করিয়া নীরব হইয়া রহিলে। বরং প্রহার যন্ত্রণা অপেক্ষা বাক্যাঘাত অধিক যন্ত্রণাদায়ক।
কোন জ্ঞানী ব্যক্তি বলেনঃ বন্ধুর অগোচরে আমার সম্মুখে কেহ তাহার সন্বন্ধে আলোচনা করিলে আমি মনে করি, তিনি যেন উপস্থিত থাকিয়া সমস্তই শুনিতেছেন এবং তিনি উপস্থিত থাকিলে যেরূপ উত্তর দিতাম আমি তদ্রুপ উত্তরই দিয়া থাকি।
হযরত আবু দারদা (রাঃ) একস্থানে দুইটি আবদ্ধ বলদকে শায়িত দেখিলেন। কিন্তু ইহাদের একটি যখন উঠিয়া দাঁড়াইল তখন অপরটিও উঠিয়া দাঁড়াইল। ইহাতে তিনি অভিভূত হইয়া রোদন করিতে লাগিলেন এবং বলিলেনঃ ধর্ম-ভাই-বন্ধুগণও এইরূপ হইয়া থাকে (একজন দাঁড়াইলে অপরজনও দাঁড়ায় এবং একজন চলিতে আরম্ভ করিলে অপরজনও চলে)। দাঁড়ানো ও গমনে একে অন্যের অনুবর্তী হয়।
(৫) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের পশ্চম কর্তব্য হল- বন্ধুর প্রয়োজনীয় দীনী ইল্ম (ধর্ম বিদ্যা) তাহাকে শিক্ষা দেওয়া। কারণ, দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট হইতে রক্ষা করা অপেক্ষা তাহাকে দোযখের অগ্নি হইতে রক্ষা করা বহুগুণে শ্রেয়। ইল্ম শিক্ষা করিয়া তদনুযায়ী আমল না করিলে তাহাকে উপদেশ দিবে এবং আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করিবে। কিন্তু নির্জনে উপদেশ দিবে। ইহাতে বন্ধুর প্রতি তোমার অনুগ্রহ প্রমাণিত হইবে। কারণ, লোক-সম্মুখে উপদেশ দিলে বন্ধু লজ্জা পাইবে। মিষ্ট ভাষায় উপদেশ দিবে, শক্ত কথায় নহে। রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : এক মু'মিন অপর মু'মিনের দর্পণস্বরূপ। এই হাদীসের মর্ম এই যে, স্বীয় দোষ-ত্রুটি একে অপরের নিকট হইতে জানিয়া লইবে। বন্ধু যদি অনুগ্রহপূর্বক তোমার দোষ-ত্রুটি নির্জনে তোমাকে জানাইয়া দেয় তবে এই অনুগ্রহের জন্য তাহার প্রতি তোমার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত, অসন্তুষ্ট হওয়া কখনই সঙ্গত নহে। ইহার উদাহরণ এইরূপ-যেমন কোন ব্যক্তি তোমাকে জানাইয়া দিল যে, তোমার কাপড়ে সাপ অথবা বিচ্ছু রহিয়াছে। এমতাবস্থায় তাহার প্রতি তুমি অসন্তুষ্ট হইবে না, বরং যে উপকার সে করিয়াছে তজ্জন্য তাহার প্রতি তুমি কৃতজ্ঞ থাকিবে।
সমুদয় মন্দ স্বভাব মানুষের মধ্যে সাপ-বিচ্ছু সদৃশ। এই সমস্তের দংশন যন্ত্রণা কবরে আত্মার উপরে প্রকাশ পাইবে। উহাদের দংশন দুনিয়ার সাপ-বিচ্ছুর দংশন হইতে বহুগুণে অধিক যন্ত্রণাদায়ক হইবে। কারণ, দুনিয়ার সাপ-বিচ্ছুর দংশন দেহের উপর হইয়া থাকে । হযরত উমর (রা) বলেনঃ আল্লাহর রহমত তাহার উপর বর্ষিত হউক যিনি আমার দোষ-ত্রুটি আমার সম্মুখে উপহারস্বরূপ তুলিয়া ধরেন।
হযরত উমর (রাঃ), হযরত সালমান (রাঃ)-এর নিকট আগমন করিলেন। তিনি বলিলেন : ভাই-সালমান! সত্য সত্য বলুন, অপছন্দনীয় কোন্ কোন্ বিষয় আমার মধ্যে দেখিয়াছেন বা শুনিয়াছেন। হযরত সালমান (রাঃ) বলিলেনঃ এ বিষয়ে আমাকে ক্ষমা করুন। হযরত উমর (রাঃ) বলিলেন : আপনাকে অবশ্যই বলিতে হইবে। তিনি অত্যাধিক পীড়াপীড়ি করার পর হযরত সালমান (রাঃ) বলিলেনঃ আমি শুনিয়াছি, এক ওয়াক্তে আপনার দস্তরখানে দুই প্রকার খাদ্য আনীত হয় এবং আপনার দুইটি পিরহান আছে, একটি দিবাভাগে ও অপরটি রাত্রিকালে ব্যবহারের জন্য। হযরত উমর (রাঃ) বলিলেন : এই দুইয়ের কোনটিই সত্য নহে। আর কিছু শুনিয়াছেন কি? তিনি উত্তরে বলিলেনঃ না।
হযরত হুযাইফা মারআশী (রঃ) হযরত আসবাত (রাঃ)-কে পত্রযোগে জানাইলেন : আমি শুনিলাম, তুমি নিজের ধর্মকে দুই হাব্বার বিনিময়ে বিক্রয় করিয়া ফেলিয়াছ। অর্থাৎ তুমি বাজারে কোন বস্তু ক্রয় করিতে চাহিলে বিক্রেতা উহার মূল্য এক দাঙ্গা দাবি করিয়াছিল। কিন্তু তুমি উহা দুই হাব্বার বিনিময়ে চাহিয়াছিলে। বিক্রেতা তোমাকে চিনিত বলিয়া দুই হাব্বাতেই তোমাকে দিয়া দিল। তোমার ধার্মিকতা ও পরহিযগারীর কারণে অনুগ্রহ করতঃ অল্প মূল্যে সে জিনিসটি তোমাকে দিল। মোহের আবরণ মস্তক হইতে খুলিয়া ফেল এবং মোহ-নিদ্রা হইতে জাগ্রত হও।
যে ব্যক্তি কুরআর শরীফ পাঠ ও ধর্ম-বিদ্যা অর্জন করতঃ দুনিয়ার দিকে আকৃষ্ট হইয়া পড়ে, আমার আশংকা হয় সে আল্লাহর কালাম লইয়া উপহাস করিতেছে। উপদেশদাতার প্রতি যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞ হয়, বুঝা যায় যে, তাহার হৃদয়ে ধর্মের প্রতি অনুরাগ আছে। আল্লাহ্ তা’আলা মিথ্যাবাদীদের সম্পর্কে বলেন :
“আর কিন্তু তোমার উপদেষ্টাগণকে ভালবাস না।”
যে ব্যক্তি উপদেষ্টাগণকে ভালবাসে না, এইজন্য অহংকার, আত্মাভিমান তাহার ধর্ম ও বুদ্ধির উপর প্রবল হইয়া উঠে। মানুষ যখন নিজের দোষ-ত্রুটি মোটেই বুঝে না তখনই এইরূপ হইয়া থাকে। কিন্তু নিজের দোষ-ত্রুটি বুঝিলে তাহাকে আকারে-ইঙ্গিতে উপদেশ দেওয়া উচিত, স্পষ্ট ভাষায় লোক সম্মুখে উপদেশ দেওয়া উচিত নহে। আর বন্ধু যে অপরাধ কেবল তোমার নিকট করিয়াছে তাহা গোপন রাখা ও তৎসম্বন্ধে অজ্ঞ সাজিয়া থাকাই উত্তম। কিন্তু এইরূপ অপরাধ গোপন রাখার শর্ত এই যে, বন্ধু হইতে তোমার মন যেন ফিরিয়া না যায়। আর যদি একান্ত ফিরিয়া যায় তথাপি বন্ধুর প্রতি তাহার অগোচরে অসন্তুষ্ট হওয়া বন্ধু-বিচ্ছেদ অপেক্ষা শ্রেয়। কিন্তু ঝগড়া-বিবাদ এবং বাক-বিতণ্ডার আশংকা থাকিলে বিচ্ছেদই শ্রেয়। উক্ত অবস্থায় বিচ্ছেদ না ঘটাইয়া সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখার উদ্দেশ্য এই হওয়া উচিত যে, ভাই-বন্ধুদের দুর্ব্যবহারের কষ্ট সহ্য করিলে নিজের স্বভাব সংশোধিত হইবে, সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখিলে পার্থিব উপকার হইবে, এইরূপ উদ্দেশ্য থাকা উচিত নহে।
হযরত আবূ বকর কাত্তানী (রঃ) বলেন : আমার এক বন্ধু ছিলেন : তাঁহার ব্যবহারে আমার মনে কষ্ট ছিল। মনের এই কষ্ট যেন দূরীভূত হয় এই জন্য তাহাকে কিছু দান করিলাম, কিন্তু কোন ফল হইল না। অবশেষে তাহার হস্ত ধারণপূর্বক একদিন তাঁহাকে আমার গৃহে লইয়া আসিলাম এবং বলিলাম : আপনার পায়ের তালু আমার মুখমণ্ডলের উপর স্থাপন করুন। তিনি বলিলেন : ইহা কখনই হইতে পারে না। আমি বলিলাম : আপনাকে অবশ্যই ইহা করিতে হইবে; বিনা কারণেই করিতে হইবে। অগত্যা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি বাধ্য হইয়া স্বীয় পায়ের তালু আমার মুখের উপর স্থাপন করিলেন। ইহাতে আমার মনের সেই কষ্ট দূরীভূত হইল।
হযরত আবূ আলী রিবাতী (রঃ) বলেন : একবার আমি হযরত আবদুল্লাহ্ রাযীর সঙ্গীরূপে সফরে বাহির হইলাম। তিনি বলিলেনঃ সফরে সরদার কে হইবে? আমি-না তুমি? আমি বলিলাম আপনি হইবেন। তিনি বলিলেনঃ তাহা হইলে আমি যাহা বলিব তাহাই তোমাকে মানিতে হইবে। আমি বলিলাম : আপনার নির্দেশ শিরোধার্য করিয়া লইব। তৎপর তিনি একটি পেটরা চাহিলেন এবং তাহা আনিয়া উপস্থিত করিলাম। তিনি আমাদের পাথেয় দ্রব্য, কাপড়-চোপড় সমস্ত উহাতে পুরিয়া স্বীয় স্কন্ধে তুলিয়া লইলেন এবং যাত্রাপথে বাহির হইয়া পড়িলেন। আমি তাঁহাকে বার বার অনুরোধ করিয়া বলিলাম, গাঠুরিঠা আমার নিকট দিন, আপনি ক্লান্ত হইয়া পড়িলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই শুনিলেন না এবং বলিলেন : তুমি তাবেদার (আজ্ঞাবহ), সরদারের উপর তাবেদারের হুকুম চালাইবার অধিকার নাই।সফরে একবার সারারাত্রি বৃষ্টি হইতেছিল। তিনি আমার মাথার উপরে একখানি কম্বল ধরিয়া সারারাত্রি দণ্ডায়মান রহিলেন। যেন আমার শরীরে বৃষ্টির পানি পড়িতে না পারে। আমি কোন কথা বলিতে গেলেই তিনি বলিতেন : মনে রাখিও আমি সরদার তুমি তাবেদার। আমি মনে মনে বলিতে লাগিলামঃ হায়! তাঁহাকে যদি আমি সরদার না বানাইতাম ।
(৬) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের ষষ্ট কর্তব্য হল,- বন্ধুর ত্রুটি ক্ষমা করা। বুযর্গগণ বলেন : তোমার কোন বন্ধু তোমার নিকট কোন অপরাধ করিলে উহা হইতে তাহাকে অব্যাহতি প্রদানের জন্য তাহার পক্ষের সত্তর প্রকার ওযর তুমি নিজের মন হইতে উপস্থিত করিবে। ইহাতেও যদি তোমার মন তাহাকে ক্ষমা করিতে প্রস্তুত না হয় তবে স্বীয় মনকে বলিবে, তোর স্বভাব অত্যন্ত মন্দ এবং তুই নিতান্ত নীচ বংশজাত। তোর বন্ধু সত্তর ওযর পেশ করিল, তবুও তুই তাহাকে ক্ষমা করিতে পারিস না। সেই অপরাধ পাপজনক হইয়া থাকিলে উহা বর্জনের জন্য তাহাকে নম্রভাবে উপদেশ দিবে। এইরূপ অপরাধ সে পুনরায় না করিলে তুমি তাহার প্রতি এমন ভাব দেখাইবে যে, তুমি যেন সেই সম্বন্ধে বিন্দু-বিসর্গও অবগত নও। কিন্তু বারবার সেই অপরাধ করিতে থাকিলে তুমিও তাহাকে উপদেশ দিতে থাকিবে। বারবার উপদেশ দেওয়া সত্ত্বেও কোন ফল না হইলে এমতাবস্থায় কর্তব্য সম্বন্ধে সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)-এর মধ্যে মতভেদ আছে। হযরত আবু যর (রা) বলেন যে, এমতাবস্থায় বন্ধুত্ব ছিন্ন করা উচিত। কারণ, প্রথমে আল্লাহর উদ্দেশ্যেই বন্ধুত্ব স্থাপিত হইয়াছিল। সুতরাং এখন আল্লাহর উদ্দেশ্যেই বন্ধুত্ব ছিন্ন করা আবশ্যক। হযরত আবু দারদা (রাঃ) প্রমুখ কতিপয় সাহাবী বলেন যে, তেমন অবস্থায়ও বন্ধুত্ব ছিন্ন করা সমীচীন নহে। কারণ, আশা করা যায় যে, সে ঐ গুনাহ্ পরিত্যাগ করিতে পারে। কিন্তু এমন ব্যক্তির সহিত প্রারম্ভেই বন্ধুত্ব স্থাপন না করা উচিত ছিল।
একবার বন্ধুত্ব স্থাপন করতঃ উহা ছিন্ন করা সমীচিন নহে। হযরত নখঈ (রঃ) বলেন, পাপের কারণে বন্ধুকে পরিত্যাগ করিও না। কারণ, হয়ত আজ সে পাপ করিতেছে, কাল করিবে না। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, আলিমের দোষকে উপেক্ষা কর। তাহার প্রতি আস্থা হারাইও না এবং তাহার সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করিও না। আশা করা যায় যে, তদ্রুপ পাপ হইতে তিনি শীঘ্রই ফিরিয়া আসিবেন।
কথিত আছে, প্রাচীনকালের দুই বুযর্গের মধ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব ছিল। তাহাদের একজন কামপ্রবৃত্তির তাড়নায় কাহারও প্রতি প্রেমাসক্ত হইয়া পড়েন এবং স্বীয় বন্ধুকে বলিলেন : আমার হৃদয় প্রণয় রোগে আক্রান্ত হইয়া পড়িয়াছে। তুমি ইচ্ছা করিলে ভ্রাতৃত্ব বর্জন এবং বন্ধুত্ব ছিন্ন করিতে পার। বন্ধু বলিলেন আল্লাহ্ করুন, একটি মাত্র পাপের কারণে আমি তোমার সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করিব ! লা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ্, এক প্রণয় রোগের দরুন ভালবাসার সম্পর্ক কর্তন করিব। বরং তিনি দৃঢ়তার সহিত শপথ করিলেন যে, যতদিন পর্যন্ত সর্ব রোগের নিরাময় কর্তা আল্লাহ্ তাহার বন্ধুর প্রণয় রোগ আরোগ্য না করেন ততদিন তিনি পানাহার করিবেন না; সম্পূর্ণ উপবাস থাকিবেন। চল্লিশ দিন তিনি কোন প্রকার খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করিলেন না। তৎপর বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করিলেন: এখন আপনার অবস্থা কেমন ? বন্ধু উত্তর করিলেন : সেই একই অবস্থা, একই রকম বেদনা হা- হুতাশ। তিনি তৎপর পানাহার না করিয়া দিন দিন কৃশ হইতে কৃশতর হইতে লাগিলেন : অনন্তর বন্ধু যখন তাহাকে জানাইলেন যে, আল্লাহর অনুগ্রহে তাহার প্রণয় রোগ দূরীভূত হইয়াছে তখন তিনি আল্লাহ্কে ধন্যবাদ দিলেন এবং পানাহার করিলেন।
এক ব্যক্তিকে লোকে জিজ্ঞাসা করিল : আপনার বন্ধু ধর্ম পথ ত্যাগ করতঃ পাপে লিপ্ত হইয়া রহিয়াছে। আপনি তাহার সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করেন না কেন? তিনি উত্তর দিলেন : আজ তাহার বন্ধুর নিতান্ত প্রয়োজন। কারণ, তিনি ধ্বংসের পথে চলিয়াছেন। এমতাবস্থায় আমি তাহাকে বর্জন করিব কিরূপে? বরং ইহাই তাহাকে সাহায্য কবিবার প্রকৃষ্ট সময়। সদয় উপদেশ প্রদানে তাহাকে দোষখ হইতে রক্ষা করা কর্তব্য।
কথিত আছে, বনী ইসরাঈল বংশের দুই ব্যক্তি পরস্পর বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ ছিলেন। তাঁহারা উভয়েই এক পাহাড়ে ইবাদত করিতেন। একদা কোন প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয়ের জন্য তাঁহাদের একজন বাজারে গমন করেন। তথায় তাঁহার দৃষ্টি অকস্মাৎ এক কূলটা রমণীর প্রতি পতিত হওয়ায় তাহার প্রেমে আকৃষ্ট হইয়া তিনি তথায়ই রহিয়া গেলেন। এইরূপে কয়েক দিন অতিবাহিত হইয়া গেল। তখন অপর বন্ধু তাহার খোঁজে বাহির হইয়া পড়িলেন। ঘটনা শ্রবণ করতঃ তিনি তাঁহার নিকট যাইয়া উপস্থিত হইলেন। কূলটা রমণীর প্রেমাসক্ত ব্যক্তি লজ্জিত হইয়া বলিলেন : তুমি কে? আমি তোমাকে চিনি না। তিনি বলিলেন : প্রিয় ভ্রাতাঃ উদ্বিগ্ন হইও না। অদ্যকার ন্যায় এত ভালবাসা তোমার প্রতি ইতিপূর্বে কখনই ছিল না। এই কথা বলিয়া তিনি তাঁহাকে আলিঙ্গন করতঃ চুম্বন করিলেন। ইহাতে তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, বন্ধুর অনুগ্রহ দৃষ্টি হইতে তিনি তখনও বঞ্চিত হন নাই। তৎক্ষণাৎ তিনি তওবা করিলেন। এবং বন্ধুর সহিত চলিয়া গেলেন।
উপরিউক্ত বর্ণনা হইতে বুঝা যায় যে, হযরত আবু যর (রাঃ) মত অর্থাৎ পাপাসক্ত বন্ধুর সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করা নিরাপত্তার নিকটবর্তী হইতে হযরত আবু দরদা (রাঃ) মত অর্থাৎ তওবা করতঃ সৎপথে প্রত্যাবর্তনের আশায় পাপাসক্ত বন্ধুর বন্ধুত্ব ছিন্ন না করা অধিকতর ফিকাহ শাস্ত্রসম্মত ও অধিকতর সূক্ষ্ম দৃষ্টি প্রসূত। কারণ, বন্ধুর সহানুভূতি অবশেষে পাপাসক্ত ব্যক্তির তওবার কারণ হইয়া দাঁড়ায়। অপর পক্ষে পাপ-পংকিলে লিপ্ত হইয়া মানব যখন আত্ম সংশোধনে অক্ষম ও অপারগ হইয়া পড়ে তখনই তাহার ধর্মবন্ধুর সাহায্য ও সহানুভূতির সর্বাধিক প্রয়োজন। সুতরাং তাহাকে ত্যাগ করা যায় কিরূপে?
বন্ধুত্ব স্থাপনের পর পাপাসক্ত হইয়া পড়িলে বন্ধুত্ব বর্জন না করা ফিকাহ শাস্ত্রসম্মত বলার কারণ এই যে, উভয়ের স্থাপিত বন্ধুত্ব আত্মীয়তার বিধানের অন্তর্ভুক্ত। পাপের কারণে আত্মীয়তা ছিন্ন করা দুরস্ত নহে। এই জন্য আল্লাহ্ বলেন :
“যদি আত্মীয়-স্বজন তোমার প্রতি নাফরমানী করে তবে বলিয়া দাও, আমি তোমার কার্যের প্রতি অসন্তুষ্ট।”
এ স্থলে নাফরমানের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়ার জন্য আল্লাহ্ বলেন নাই।
হযরত আবু দারদা (রা)-কে লোকে জিজ্ঞাসা করিল : আপনার ভ্রাতা পাপ করে। আপনি তাহাকে দুশমন বলিয়া গণ্য করেন না কেন? তিনি বলিলেনঃ আমি তাহার পাপের প্রতি তো অসন্তুষ্ট। কিন্তু সে আমার ভাই (তাহার প্রতি অসন্তুষ্ট হইতে পারি কিরূপে?)
পাপাচারী ব্যক্তির সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন না করাই উচিত। কারণ, বন্ধুত্ব স্থাপন করতঃ ইহা ছিন্ন করা প্রতারণা (খেয়ানত) কিন্তু বন্ধুত্ব স্থাপন না করা প্রতারণা নহে। আর বন্ধুত্ব ছিন্ন করিলে বন্ধুত্ব স্থাপনের পর যে অধিকার প্রাপ্য হইয়াছিল তাহা লংঘন করা হয়। সমস্ত আলিমই এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
তোমার বন্ধু তোমার নিকট কোন অপরাধ করিয়া থাকিলে তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেওয়াই উত্তম। অপরাধ করিয়া সে যদি দোষ-স্খলণের জন্য কারণ দর্শায় এবং তুমি ইহাকে মিথ্যা বলিয়া বুঝিতে পার তথাপি উহা মানিয়া লইবে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
“যে ব্যক্তি স্বীয় ভ্রাতার ওযর গ্রহণ করে না সে ব্যক্তি রাস্তায় মুসলমানগণের নিকট হইতে খিরাজ আদায়কারীর ন্যায় পাপী (সাধারণত অমুসলমানগণের নিকট হইতে নির্ধারিত হারে যে ভূমিকর আদায় করা হয় তাহাকে খিরাজ বলে)। তিনি আরও বলেন : মুসলমান শীঘ্র অসন্তুষ্ট হয় এবং শীঘ্র সন্তুষ্ট হইয়া থাকে।
হযরত আবু সুলাইমান দারানী (রঃ) স্বীয় মুরীদকে বলেন : তোমার কোন বন্ধু হইতে কোন অন্যায় আচরণ লক্ষ্য করিলে তাহাকে তিরস্কার করিবে না। তিরস্কার করিলে তুমি হয়ত এমন কথা শুনিবে যাহা সে অন্যায় আচরণ হইতে অধিক পীড়াদায়ক। সেই মুরীদ বলেন : আমি যাচাই করিয়া হযরত পীর সাহেবের উক্ত উপদেশ অনুযায়ী ব্যবহার পাইয়াছি।
(৭) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের সপ্তম কর্তব্য হল,- বন্ধুর জীবদ্দশায় ও তাহার মৃত্যুর পরও তাহার জন্য দু'আ করা। নিজের স্ত্রী-পুত্র-পরিবারের জন্য যেমন দু'আ করিয়া থাক তদ্রুপ তাহার স্ত্রী-পুত্র-পরিবারের জন্যও দু'আ করিবে। বস্তুত বন্ধুর জন্য দু'আ প্রকারান্তরে নিজের জন্যই হইয়া থাকে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি স্বীয় ভ্রাতার অগোচরে তাহার মঙ্গলের জন্য দু’আ করিয়া থাকে, ফেরেশতাগণ তাহার মঙ্গলের জন্য ঠিক তদ্রুপ দু'আ করিয়া থাকেন। অপর এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে যে, তখন স্বয়ং আল্লাহ্ দু’আকারী বন্ধুকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন : আমি প্রথমে তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিব। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : অগোচরে বন্ধুগণের জন্য দু'আ আল্লাহ্ প্রত্যাখ্যান করেন না।
হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ আমি সিজদায় সত্তরজন বন্ধুর নাম করিয়া তাঁহাদের জন্য দু'আ করিয়া থাকি। বুযর্গগণ বলেনঃ তোমার মৃত্যুর পর ওয়ারিশগণ যখন তোমার পরিত্যক্ত ধন-সম্পত্তি বন্টনে ব্যস্ত থাকে তখন যে তোমার জন্য দু'আ করে এবং পরকালে আল্লাহ্ তোমার সহিত কিরূপ ব্যবহার করেন, এই আশংকায় যে বিহ্ববল থাকে সে ব্যক্তিই তোমার বন্ধু।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"মৃত ব্যক্তির দৃষ্টান্ত পানিতে নিমজ্জমান ব্যক্তির ন্যায়। নিমজ্জমান ব্যক্তি যেমন অবলম্বন পাওয়ার আশায় হাতড়াইয়া থাকে, মৃত ব্যক্তিও তদ্রুপ স্ত্রী-সন্তান-সন্ততি এবং বন্ধুদের প্রতীক্ষায় থাকে।"
আর জীবিতদের দু'আ নূরের পাহাড় হইয়া মৃতের কবরসমূহে পৌছিয়া থাকে। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, নূরের ভাণ্ডে করিয়া দু'আ মৃতদের সম্মুখে উপস্থিত করা হয় এবং বলা হয়, ইহা অমুকের পক্ষ হইতে তোমার নিকট উপহার। জীবিত লোকে উপহার পাইয়া যেরূপ সন্তুষ্ট হইয়া থাকে, মৃত ব্যক্তিও তদ্রুপ সন্তুষ্ট হইয়া থাকে।
(৮) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের অষ্টম কর্তব্য হল বন্ধুত্বের প্রতিদান হক কখনও না ভোলা। বন্ধুত্বের হক না ভোলার অর্থ ইহাও যে, বন্ধুর মৃত্যুর পর তাহার স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন ও তাহার বন্ধুবর্গের খোঁজ-খবর লইতে হইবে।
এক বৃদ্ধা রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি তাঁহার অতিশয় সম্মান প্রদর্শন করিলেন। সমবেত সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) ইহাতে বিস্মিত হইলে হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : এই মহিলা বিবি খাদীজা (রাঃ)-এর জীবদ্দশায় আমাদের এখানে আসিত।
বন্ধুত্বের কর্তব্য সম্পাদন করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। বন্ধুর মৃত্যুর পর তাহার পরিবারবর্গ, দাস-দাসী, শিষ্য প্রভৃতি যে সমস্ত লোকের তাহার সহিত সম্পর্ক ছিল, তাহাদের সকলের প্রতি অনুগ্রহ দৃষ্টি রাখাও বন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ততার মধ্যে গণ্য। বন্ধুর প্রতি যেরূপ ভালবাসা ও অনুগ্রহ ছিল তাহাদের প্রতি তদপেক্ষা অধিক অনুগ্রহ করা কর্তব্য। উচ্চ পদ, ধন-দৌলত এমনকি রাজ্যলাভের পরও বন্ধুর প্রতি পূর্ব নম্রতা সৌজন্য প্রদর্শন করা, তাহার সহিত অহংকার না করা এবং সর্বদা বন্ধুত্ব দৃঢ় রাখা ও কোন কারণেই বন্ধুত্ব ছিন্ন না করাকে বন্ধুত্বের হক আদায় করা বলে। কারণ, ভাই- ই-বন্ধুদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটান শয়তানের বড় কাজ যেমন আল্লাহ্ বলেন-
"অবশ্যই শয়তান তাহাদের মধ্যে বিবাদ বাধাইয়া দেয়।" অন্যত্র হযরত ইউসুফ (আ) এর উক্তি উদ্ধৃত করিয়া পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন
"শয়তান আমার ও আমার ভাইগণের মধ্যে বিবাদ বাধাইবার পর....”
বন্ধুর বিরুদ্ধে কেহ কিছু বলিলে ইহাতে কর্ণপাত না করা এবং যাহারা ঐরূপ বলে তাহাদিগকে মিথ্যাবাদী মনে করাও বন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ততার নিদর্শন। বন্ধুর শত্রুকে ভাল না বাসা; বরং তাহাকেও নিজের শত্রু মনে করা বন্ধুত্বের পরিচয়। কারণ, যে ব্যক্তি বন্ধুর শত্রুকে ভালবাসে তাহার বন্ধুত্ব দুর্বল।
(৯) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের নৰম কর্তব্য হল,- বন্ধুত্বের মধ্য হইতে লৌকিকতা উঠাইয়া দেওয়া এবং একাকী যেরূপভাবে থাকিতে অভ্যস্ত, বন্ধুর সহিতও তদ্রুপই থাকা। এক বন্ধু অপর বন্ধুর সহিত আচার-ব্যবহারে সামাজিক শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখিলে বুঝা যাইবে যে, তাহাদের মধ্যে পূর্ণ বন্ধুত্ব স্থাপিত হয় নাই।
হযরত আলী (রাঃ) বলেন : যে বন্ধুর নিকট তোমার ওযর পেশ করিবার ও লৌকিকতা প্রদর্শনের প্রয়োজন হয়, সেই বন্ধুদের মধ্যে নিকৃষ্টতম। হযরত জুনাইদ (রহঃ) বলেন : আমি অনেক বন্ধু দেখিয়াছি। কিন্তু এমন বন্ধুযুগল দেখি নাই যাহাদের একের পদমর্যাদা অপরের বিষণ্নতার কারণ হইয়াছে। তবে তাহাদের কাহারও মধ্যে কোন দোষ-ত্রুটি থাকিলে স্বতন্ত্র কথা।
বুযর্গগণ বলেন : দুনিয়াদার লোকের সহিত শিষ্টাচার রক্ষা করিয়া চলিবে। আর পরলোক প্রিয় ধর্মপরায়ণ লোকের সহিত ওজনসুলভ এবং আরিফগণের (অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি) সহিত তোমার ইচ্ছানুরূপ আচার-ব্যবহার করিবে। কতিপয় সুফী এই শর্তে একত্রে বাস করিতেন যে, তাহাদের মধ্যে কেহ সর্বদা রোযা রাখিলে বা রোযা না রাখিলে অথবা সারারাত্রি নিদ্রা গেলে বা সারারাত্রি নামায পড়িলে তাহাদের কেহই অপরের নিকট উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিবেন না।
ফলকথা, আল্লাহর উদ্দেশ্যে বন্ধুত্বের অর্থ অন্তরঙ্গতা এবং যেখানে অন্তরঙ্গতা রহিয়াছৈ সেখানে লৌকিকতার স্থান নাই ।
(১০) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের দশম কর্তব্য হল,- সমস্ত বন্ধুর সম্মুখে নিজকে সর্বাপেক্ষা অধম বলিয়া মনে করা; তাহাদের নিকট হইতে কোন স্বার্থলাভের আশা না করা। তাহাদের নিকট কোন বিষয় গোপন না করা এবং তাহাদের প্রতি সর্ববিধ কর্তব্য সম্পাদন করিতে থাকা।
হযরত জুনাইদ (রহঃ)-এর সম্মুখে এক ব্যক্তি বারবার বলিতেছিল : আজকাল বন্ধু দুর্ভল। তিনি উত্তর দিলেন : তুমি যদি এমন বন্ধুর অনুসন্ধান কর, যে কেবল তোমার খেদমত করিবে তোমার শোক-দুঃখে সহানুভূতি প্রকাশ করিবে, তবে এমন বন্ধু দুর্লভ বটে। কিন্তু যদি এমন বন্ধু অন্বেষণ কর যাহার খেদমত তুমি করিবে এবং যাহার দুঃখে তুমি সহানুভূতি প্রকাশ করিবে তবে এমন বন্ধু অনেক আছে।
বুযর্গগণ বলেন : যে ব্যক্তি নিজকে বন্ধুগণের মধ্যে উত্তম মনে করে সে নিজে পাপী হইবে এবং তৎসঙ্গে অপর বন্ধুকেও পাপী করিবে। আর যে ব্যক্তি নিজকে অপর বন্ধুর সমকক্ষ মনে করিবে সে নিজেও মনঃকষ্ট ভোগ করিবে এবং তাহার বন্ধুও মনঃকষ্ট পাইবে। কিন্তু সে নিজকে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট মনে করিলে সকল বন্ধুই শান্তি ও আরামে থাকিবে। হযরত আবু মুআবিয়াতুল আসওয়াদ (রঃ) বলেন : আমার সকল বন্ধুই আমা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। তাঁহারা আমাকে প্রাধান্য দিয়া থাকেন এবং আমার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিয়া থাকেন।
ঘনিষ্ঠতার বিভিন্ন শ্রেণী অনুযায়ী তাহাদের প্রতি কর্তব্যও বিভিন্ন প্রকার হইয়া থাকে। আল্লাহর সহিত বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতা সর্বাপেক্ষা দৃঢ়তম। এই ঘনিষ্ঠতার কর্তব্যসমূহ ইতিপূর্বে বর্ণিত হইয়াছে। যাহার সহিত বন্ধুত্ব নাই, কেবল ধর্ম সম্পর্ক বিদ্যমান, তাহার প্রতিও কতিপয় কর্তব্য রহিয়াছে।
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন