রবিবার, ১৯ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (২৭) সিঙ্গা ফুৎকারে প্রাণী জগতের অস্থিরতা



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৭)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সিঙ্গা ফুৎকারে প্রাণী জগতের অস্থিরতা-
হযরত ইস্রাফীল (আঃ)-এর প্রথম ফুৎকারের ভীষণ শব্দে সমস্ত প্রাণী অস্থির, বেকারার হইয়া যাইবে; কিন্তু যাহাদিগকে আল্লাহ পাক রক্ষা করিবেন, তাহারা অস্থির হইবে না। প্রথম ফুৎকারের সাথে সাথে পাহাড়-পর্বত উড়িয়া যাইবে, নভোমণ্ডলও নদীবক্ষে আন্দোলিত নৌকার মত প্রকম্পিত ও দুলিতে থাকিবে। গর্ভবতীদের গর্ভ নষ্ট হইয়া যাইবে। মাতা স্বীয় দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা বিস্মৃত হইবে। আর শয়তানগণ এদিক সেদিক পলায়ন করিতে থাকিবে এবং তারকাপুঞ্জ তাহাদের উপর বর্ষিতে থাকিবে। চন্দ্র-সূর্য গ্রহণ আরম্ভ হইবে ও তাহাদের উপর নভোমণ্ডলকে বিস্তৃত করিয়া দেওয়া হইবে। বালক বৃদ্ধ হইয়া যাইবে। যেমন আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন- (“ইন্না যাল্যালাতুছ্ ছাআতি শাইউন্‌ আজীম”।) “অবশ্যই প্রলয় কম্পন অত্যন্ত ভয়াবহ জিনিস”। এই অবস্থা চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত দীর্ঘ হইবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এই আয়াত পাঠ করিলেন যে, “হে মানব সকল! তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, নিশ্চয়ই কিয়ামতের কম্পন অতি ভীষণ।” তারপর তিনি সাহাবাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এই অবস্থা কখন হইবে বলিতে পার?” সাহাবাগণ আরজ করিলেন, “আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল অধিকতর জ্ঞানী।” তিনি বলিলেন, “এই অবস্থা সেইদিন হইবে, যেদিন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-কে ডাকিয়া বলিলেন-'হে আদম উঠ এবং তোমার গোনাহগার সন্তানদিগকে দোযখে প্রেরণ কর। তখন হযরত আদম (আঃ) ফরিয়াদ করিবেন, হে আল্লাহ! প্রতি হাজার হইতে কি পরিমাণ প্রেরণ করিব?' আল্লাহ তা'আলা বলিবেন, 'হে আদম! প্রতি হাজার হইতে একজনকে বেহেশতের জন্য রাখিয়া অবশিষ্ট নয়শত নিরানব্বইজনকে দোযখে পাঠাও।' এইকথা সাহাবাদের নিকট অত্যন্ত ভারী মনে হইল এবং তাঁহারা বিষণ্নচিত্তে কাঁদিতে লাগিলেন। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিয়া সাহাবাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, “আমার আশা, অবশ্যই তোমরা এক-চতুর্থাংশ বেহেশ্তী হইবে।” আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পুনরায় বলিলেন, “আমি আশা করি নিশ্চয়ই তোমাদের অর্ধাংশ বেহেশ্তী হইবে।” ইহা শ্রবণ করিয়া সাহাবাগণ সন্তুষ্ট হইলেন। হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলিলেন, “তোমরা খোশ খবরী গ্রহণ কর যে, তোমরা অন্যান্য উম্মতের তুলনায় একপাল উটের ভিতর একটি বকরী তুল্য হইবে এবং তোমরাই হাজারের মধ্যে একজন হইবে।”

হযরত আবু হোরাইরা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “আল্লাহ পাক তাঁহার একশত রহমতের একভাগ মাত্র জগতের কীট-পতঙ্গ, পশু-পক্ষী, মানব-দানব ইত্যাদিকে দান করিয়াছেন।” এই একভাগের ফলেই তাহারা পরস্পরে স্নেহ-মমতা, প্রেম-প্রণয় ও ভালবাসায় মত্ত হয়। আর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অবশিষ্ট নিরানব্বই রহমত দ্বারা রোজ কিয়ামতে বান্দাদের প্রতি রহমত ও দয়া করিবেন। তারপর আল্লাহ পাক হযরত ইস্রাফীল (আঃ)-কে মৃত্যুর জন্য সিঙ্গা ফুঁকিবার নির্দেশ দিবেন। অমনি তিনি, হে উলঙ্গ রূহ সকল! যথাশীঘ্র আল্লাহর হুকুমে বাহির হইয়া যাও, বলিয়া জোরে সিঙ্গার ফুৎকার প্রদান করিবেন। তখনই নভোমন্ডলের ও ভূমণ্ডলের সবকিছু মৃত্যু-মুখে পতিত হইবে; কিন্তু শহীদগণ আল্লাহর অভিপ্রায়ে রক্ষা পাইবে। যেমন এরশাদ হইয়াছে- (“ওয়ালা তাছাবান্নাল্লাজিনা কুতিলু ফী ছাবিলিল্লাহি আওয়াতা, বাল্ আহইয়াউন্ ইন্দা রাব্বিহিম ইউরযাকুন!”) "যাহারা আল্লাহর পথে নিহত হইয়াছে, তাহাদিগকে মৃত মনে করিও না, বরং তাহরা স্বীয় প্রতিপালকের নিকট জীবিত থাকিয়া উপজীবিকা আস্বাদন করিতেছে"। হাদীস শরীফে আছে যে, আল্লাহ তা'আলা শহীদগণকে পাঁচটি শ্রেষ্ঠ মর্যাদা প্রদান করিতেছেন, যাহা নবীগণকেও দান করেন নাই। এই প্রসঙ্গে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন – (১) সমস্ত শহীদগণের রূহ আল্লাহ তা'আলা কবজ করেন, কিন্তু আমার ও অন্যান্য নবীগণের রূহ আজরাইল (আঃ) কবজ করিয়া থাকেন। (২) মৃত্যুবরণের পর সমস্ত নবীগণকে গোসল দেওয়া হয়, এমন কি আমাকেও গোসল দেওয়া হইবে, কিন্তু শহীদগণকে গোসল দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। (৩) আমার এবং অন্যান্য নবীগণের জন্য ভিন্ন কাফন দিতে হয়, কিন্তু শহীদগণের ভিন্ন কাফনের দরকার হয় না। (৪) আমাকে এবং অন্যান্য নবীগণকে মৃত বলিয়া অভিহিত করা যায়, কিন্তু শহীদগণকে মৃত বলিয়া আখ্যায়িত করা যায় না। (৫) আমি এবং অন্যান্য নবীগণ আল্লাহ তা'আলার নিকট নিজ নিজ উম্মতের জন্য সুপারিশ করিবেন, কিন্তু শহীদগণ রোজ কিয়ামতে সমস্ত উম্মতের জন্য শাফায়াত করিবেন। 
আরও বর্ণিত আছে যে, রোজ কিয়ামতে আল্লাহ তায়ালা বারজনকে মৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা করিবেন। তাহারা হইবেন -(১) হযরত জিব্রাইল (আঃ), (২) হযরত মিকাইল (আঃ), (৩) হযরত ইস্রাফীল, (আঃ) (8) আজরাইল (আঃ) এবং আরশ বহনকারী আটজন (৫-১২) বিশিষ্ট ফেরেশ্তা। তখন সৃষ্টজগতে জ্বিন-ইন্‌সান, পশু-পক্ষী ও মানব, শয়তান বলিতে কিছুই থাকিবে না। তারপর আল্লাহ তায়ালা আজরাইল (আঃ) কে উদ্দেশ্য করিয়া হুকুম করিবেন, “হে আজরাইল (আঃ)! আমি তোমার নিমিত্ত পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মানুষের সমতুল্য সাহায্যকারী পয়দা করিয়াছি আর তোমাকে সাত আকাশ ও ভূমণ্ডলের সৃষ্ট পদার্থের সমতুল্য শক্তি প্রদান করিয়াছি। আজ তোমাকে গজব ও ক্রোধের লেবাছে সাজাইতেছি। যাও, এই মুহূর্তে ইবলিস্ শয়তানের উপর ভীমনাদে আক্রমণ কর এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত মানব-জ্বিনের দ্বিগুণ, চতুগুণ কষ্ট সহকারে তাহার রূহ কবজ কর আর তোমার সহকারী সত্তর হাজার দোজখের ফেরেশতাকে 'লজ্জা' নামক দোজখ হইতে সত্তর হাজার জিঞ্জির সঙ্গে লইতে নির্দেশ কর।” তারপর আজরাইলের নির্দেশক্রমে দোযখের দরওয়াজা খুলিয়া যাইবে এবং সত্তর হাজার দোযখের ফেরেশ্তা সমসংখ্যক জিঞ্জির লইয়া তাঁহার সামনে উপস্থিত হইবে। তখন আজরাইল এমন ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করিবেন যে, যদি সাত আকাশ ও ভূমণ্ডলের অধিবাসীবৃন্দ তাঁহার সেই মূর্তি অবলোকন করিত, তবে সকলেই মরিয়া যাইত। আজরাইল (আঃ) অভিশপ্ত ইবলিসকে দেখিয়াই এমন জোরে ধমক দিবেন যে ইহাতে সে বেহুঁশ হইয়া যাইবে এবং ভয়ঙ্কর শব্দ করিতে শুরু করিবে। যদি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের অধিবাসীগণ তাহার সেই বিকট শব্দ শ্রবণ করিত তবে সকলেই বেহুঁশ হইয়া যাইত।
অতঃপর আজরাইল (আঃ) তাহাকে রুদ্ররোষে বলিবেন, 'হে পাপিষ্ট! অপেক্ষা কর! এখনই তোকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করাইতেছি। তুই দীর্ঘদিন জীবমান ছিলি, আর তোর দ্বারা অনেক লোক পথভ্রষ্ট হইয়াছে।” ইহা শ্রবণ করিয়া ইবলিস্ পূর্ব প্রান্তে পলায়ন করিতে ছুটিয়া যাইবে, কিন্তু সেখানেও হযরত আজরাইল (আঃ) কে দেখিতে পাইবে। পুনরায় সে পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তে গিয়া আত্মগোপন করিতে চেষ্টা করিবে কিন্তু সেখানেও আজরাইল (আঃ)-কে দেখিতে পাইবে। পরিশেষে নিরুপায় হইয়া পৃথিবীর মধ্যস্থলে হযরত আদম (আঃ) এর কবরের পার্শ্বে উপস্থিত হইয়া বলিবে- 'হে আদম! তোমারই জন্য আমি লাঞ্ছিত ও অপমানিত হইয়াছি এবং আল্লাহর করুণা হইতে বঞ্চিত হইয়াছি। তারপর আজরাইল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করিবে, “হে আজরাইল! বল কিরূপে তুমি আমার প্রাণ বধ করিবে?" আজরাইল (আঃ) বলিবেন, 'হে দুরাত্মা ইবলিস! সায়ীর নামক জাহান্নামের শাস্তি ও আগুনের পাত্র দ্বারা তোর পাপাত্মাকে সংহার করিব।" তারপর ইবলিস্ ভূমিতে গড়াগড়ি দিতে থাকিবে। তখন দোযখের ফেরেশতাগণ কালালিবের অস্ত্র দ্বারা তাহাকে চতুর্দিক হইতে আঘাত করিতে থাকিবে এবং তীর ও বর্শার দ্বারা তাহাকে ক্ষত-বিক্ষত করিবে। আবশেষে জীবনপাতের কঠিন যন্ত্রণা ভোগ করিয়া ইবলিস্ মৃত্যুমুখে পতিত হইবে।

পরবর্তী পর্ব
মাখলুকাতের লয়প্রাপ্তি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...