মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (১৭) জান কবজের পর রূহের চীৎকার

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৭)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জান কবজের পর রূহের চীৎকার-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন, “একদিন আমি স্বীয় শয়ন কক্ষে বসিয়াছিলাম। এমন সময় অপ্রত্যাশিতভাবে আল্লাহ তা'আলার প্রিয় হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার গৃহে আগমন করিলেন। তখন আমি স্বীয় অভ্যাস অনুযায়ী দণ্ডায়মান হইতে চাহিলে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে উম্মুল মুমিনিন! স্বীয় স্থানে বসিয়া থাক।” আমি তাহাই করিলাম। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার ক্রোড়ে স্বীয় মাথা মোবারক স্থাপন করিয়া চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িলেন। অতঃপর আমি তাহার সাদা শ্মশ্রু মোবারক অন্বেষণ করিয়া ঊনবিংশটি সাদা শ্মশ্রুর সন্ধান লাভ করিলাম এবং মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলাম, আহা! আল্লাহ তায়ালার প্রিয় নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজ উম্মতদিগকে শোকের সাগরে ভাসাইয়া অনন্ত ধামে যাত্রা করিবেন। আর উম্মতগণ নবীবিহীন অবস্থায় থাকিয়া যাইবে। এইকথা চিন্তা করিতে করিতে আমার চক্ষুদ্বয় অশ্রু বন্যায় প্লাবিত হইয়া গেল এবং কয়েক ফোটা অশ্রু আল্লাহ তা'আলার প্রিয় নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার পবিত্র চেহারা মোবারকের উপর টপকাইয়া পড়িল। ফলে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জাগ্রত হইয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘হে উম্মুল মুমিনীন! তুমি ক্রন্দন করিতেছ কেন?' প্রত্যুত্তরে আমি সবকিছু বর্ণনা করিয়া তাঁহাকে শুনাইলাম।তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘হে উম্মুল মুমিনীন! বলতো মৃত ব্যক্তির নিকট কোন্ অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ ও অসহনীয়?” আমি উত্তর করিলাম, সে সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁহার প্রিয় রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-ই ভাল জানেন। তিনি বলিলেন, “তাহা অবশ্যই; কিন্তু তবু তুমি অভিমত প্রকাশ কর।” আমি বলিলাম, “যখন মৃত ব্যক্তিকে ঘর হইতে বাহির করা হয় এবং যখন তাহার সন্তানগণ হে পিতা! হে মাতা! বলিয়া ক্রন্দন করিতে করিতে তাহার পশ্চাতে দৌড়াইতে থাকে, আর সে ব্যক্তি, হে পুত্র! হে কন্যা! বলিতে থাকে, এই সময়টিই অত্যন্ত ভয়াবহ ও অসহনীয়।” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, হ্যাঁ, প্রকৃতই সে অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ।' হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “বলত আর কোন্ অবস্থা ভয়াবহ?” আমি উত্তর করিলাম, “যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখিয়া তাহার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনগণ তাহাকে আল্লাহ তা'আলার কুদরতের হস্তে সমর্পণ করিয়া প্রত্যাবর্তন করে এবং নিজের কৃতকর্ম ব্যতীত আর কিছুই তাহার থাকে না, এই অবস্থাটিও তাহার জন্য কম ভয়াবহ নহে।” হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “বলত আর কোন্ অবস্থা ভয়াবহ।” আমি প্রত্যুত্তরে বলিলাম, “আমার চাইতে আল্লাহ পাক ও তাঁহার রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-ই ভাল জানেন।” তখন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে উম্মুল মুমিনীন! জানিয়া রাখ যে, গোসলদানকারী যখন মৃত ব্যক্তিকে গোসল করাইবার নিমিত্ত তাহার পরিধেয় বস্ত্র, যুবকদের অঙ্গুরী ও জামা কাপড়, - আর কাজী, ফকীহ ও বৃদ্ধের পাগড়ী টানিয়া খুলিয়া ফেলে, সেই সময়টা মৃত ব্যক্তির পক্ষে অত্যন্ত ভয়াবহ ও অসহনীয়। রূহ তখন তাহার এই উলঙ্গ শরীর দেখিতে পায়, তখন সে অতি উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করিয়া বলে, 'হে গোসলদানকারী! তোমাকে আল্লাহ তায়ালার শপথ দিয়া বলিতেছি, আমার পরিধেয় বসন একটু আস্তে আস্তে খুলিয়া বাহির কর। কারণ, এইমাত্র আজরাইলের যাতনা হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়াছি।' তাহার এই চিৎকার মানব-দানব ভিন্ন অন্য সকলেই শুনিতে পায়। তারপর মৃত ব্যক্তির শরীরে যখন পানি ঢালা হয়, তখনও পূর্বের মত চিৎকার করিয়া বলে, 'হে গোসলদানকারী! তোমাকে আল্লাহর শপথ দিয়া বলিতেছি, তুমি আমার শরীরে অতি ঠাণ্ডা বা অতি গরম পানি ঢালিও না। কারণ, রূহ বাহির করিবার পর আমার শরীর ক্ষতবিক্ষত হইয়া গিয়াছে।' তারপর গোসলদানকারী মৃত ব্যক্তির শরীর যখন কচলাইয়া দিতে থাকে, তখনও সে বলিয়া উঠে, 'হে গোসলদানকারী, আল্লাহর শপথ ! আমার শরীর অতি জোরে মর্দন করিও না।' 
তারপর শবদেহে যখন কাফন পরান হয়, তখন রূহ উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলে, “হে গোসলদানকারী! আমার স্ত্রী, পুত্র, আত্মীয়-পরিজন আমার মুখমণ্ডল শেষবারের জন্য দেখিয়া লউক; সুতরাং তুমি আমার মাথার দিকের কাপড় শক্ত করিয়া বাঁধিয়া ফেলিও না।' অতঃপর যখন শবদেহ গৃহ হইতে বাহির করা হয়, তখন মৃতের আত্মা বলিয়া উঠে ‘হে লোকগণ! আল্লাহর শপথ, আমাকে গৃহ হইতে এত তাড়াতাড়ি বাহির করিও না। আমাকে শেষবারের মত আমার ঘর-বাড়ী, ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের নিকট হইতে বিদায় লইতে দাও।”
তারপর রূহ উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করিতে থাকে, 'হে মানবগণ! আজ হইতে আমি আমার স্ত্রীকে বিধবা এবং পুত্র-কন্যাদিগকে এতিম ও অসহায় করিয়া যাইতেছি। আল্লাহর শপথ, তোমরা কখনও তাহাদিগকে কষ্ট দিও না। আমি আমার যথাসর্বস্ব ফেলিয়া যাইতেছি, আর কখনও এইস্থানে প্রত্যাবর্তন করিব না।' 
অতঃপর মৃত ব্যক্তিকে খাটে করিয়া যখন লইয়া যাইতে শুরু করে তখন রূহ বলে, 'হে বন্ধুগণ! আল্লাহ তা'আলার শপথ, যে পর্যন্ত আমি আমার পুত্র-কন্যা, পরিবার ও প্রতিবেশীদের আওয়াজ শুনিতে পাই, ততক্ষণ আমাকে শীঘ্র বাহির করিও না। কেননা আজিকার এই বিচ্ছিন্নতা কিয়ামত পর্যন্ত বজায় থাকিবে।' যখন মৃত ব্যক্তির খাট লইয়া তিন কদম অগ্রসর হয়, তখন আত্মা আবার অতি উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিয়া বলে, হে বন্ধু ও সন্তানগণ! জানিয়া রাখ; আমি পৃথিবীর মোহে পড়িয়া জীবন শেষ করিয়াছি, সাবধান! তোমরা তাহার মোহে পড়িও না। তোমরা উহা হইতে দূরে থাকিও। পৃথিবী আমাকে লইয়া যেমন ছিনিমিনি খেলিয়াছে তোমাদিগকে লইয়াও যেন সেইরূপ করিতে না পারে।'
রূহ আরও বলে, ‘হে দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন জ্ঞানীবৃন্দ! আমার অবস্থা অবলোকন করিয়া তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর, তবেই তোমরা সফলকাম হইতে পারিবে। যাহা আমি সঞ্চয় করিয়াছিলাম, তাহা উত্তরাধিকারীদের জন্যেই ফেলিয়া আসিয়াছি। তোমরা আমার পরও জীবিত থাকিবে; কিন্তু তোমরা আমার পাপের একাংশও গ্রহণ করিবে না। আর উত্তরাধিকারীগণ তাহাদের প্রাপ্য অংশ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হিসাব করিয়া লইবে অথচ আমার কথা কেহই মনেও করিবে না।'
জানাযার নামাযের পর বন্ধু-বান্ধব ও লোকজন যখন চলিয়া যাইতে শুরু করে, তখন রূহ্ আল্লাহ তা'আলার শপথ দিয়া বলে, 'হে বন্ধুগণ! তোমরা আমাকে এত তাড়াতাড়ি ভুলিয়া যাইও না এবং দাফন শেষ হওয়ার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত ফিরিয়া যাইও না।' আর যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরের মধ্যে রাখা হয়, তখন সে তাহার উত্তরাধিকারীগণকে লক্ষ্য করিয়া বলে,- ‘হে আমার ওয়ারিশগণ! আমি এই পৃথিবীতে বহু ধন-সম্পদ অর্জন করিয়াছি এই সমস্ত তোমাদেরই জন্য রাখিয়া আসিয়াছি। তোমরা এই প্রচুর ধন-সম্পদ লাভ করিয়া আমাকে ভুলিয়া যাইও না । আমি পবিত্র কোরআন শরীফ ও আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়াছি, কিন্তু তোমরা আমার জন্যে নেকদোয়া করিতে বিস্মৃত হইও না।' 
আর দাফনের পর যখন সকলে প্রত্যাবর্তন করে, তখন মৃতব্যক্তি বলে ‘হে বন্ধুগণ! আমার জানা আছে যে, মৃতব্যক্তি জীবিতদের অন্তরে জামহারির হইতেও অধিক ঠাণ্ডা বলিয়া বিবেচিত হয়; কিন্তু আমার অন্তিম অনুরোধ, তোমরা আমাকে এত শীঘ্র ভুলিয়া যাইও না।”

হযরত আবু কালাবা (রঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, একদা স্বপ্নে তিনি একটি কবরস্থান দেখিতে পাইলেন, যাহার কবরগুলি ফাটিয়া গিয়াছে এবং মৃতব্যক্তিরা বাহির হইয়া কবরের পার্শ্বে বসিয়া রহিয়াছে। তিনি আরও দেখিতে পাইলেন যে, তাহাদের প্রত্যেকের সামনে একটি করিয়া নূরের তবক রহিয়াছে; কিন্তু তাহাদের মধ্যে একজনকে দেখিতে পাইলেন যে, তাহার নূরের তবক নাই এবং সে খুবই চিন্তিত। উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি জানিতে পারিলেন যে, প্রথমোক্ত ব্যক্তিগণের পুত্র-কন্যা ও বন্ধু-বান্ধব তাহাদের জন্য দোয়া ও দান-খয়রাত করিয়া থাকে। উহার ফলস্বরূপ তাহারা নূরের তবক প্রাপ্ত হইয়াছে; কিন্তু শেষোক্ত ব্যক্তির এক অসৎ পুত্র আছে; সে পিতার জন্য দান-খয়রাত বা দোয়া-কালাম কিছুই করে না। সেজন্য তাহার নূরের তবক নাই এবং প্রতিবেশীদের নিকট খুবই লজ্জিত। অতঃপর হযরত আবু কালাবা (রঃ) জাগ্রত হইয়া উক্ত ব্যক্তির পুত্রকে ডাকিয়া আনিয়া স্বপ্নযোগে যাহা কিছু অবগত হইয়াছিলেন আনুপূর্বিক সবকিছুই খুলিয়া বলিলেন। পুত্র বলিল, “হুযুর! আমি আপনার হাতে তাওবাহ করিয়া বলিতেছি, আর আমি কখনও পাপের কাজ করিব না এবং আজীবন পিতার কথা স্মরণ রাখিব এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট তাহার জন্য মাগফেরাত কামনা করিব।” তারপর সে মৃত পিতার জন্য দান-খয়রাত ও এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হইল। কিছুদিন পর হযরত আবু কালাবা (রঃ) পূর্ববত সেই কবরগুলি স্বপ্নে দেখিতে পাইলেন, পূর্বের সেই নূরহীন মৃত ব্যক্তির নিকট সূর্যের কিরণ হইতে অতি উজ্জ্বল একটি নূরের তবক বিরাজ করিতেছে। আর সেই ব্যক্তি বলিল, “হে আবু কালাবা ! আল্লাহ তা'আলা আপনাকে আমার অপেক্ষা উৎকৃষ্ট পুরস্কার দান করুন। আমি আপনার সাহায্যের ফলে দোযখের আযাব ও প্রতিবেশীদের তিরস্কার হইতে মুক্তিলাভ করয়াছি।” 

হাদীস শরীফে আছে, একদা আজরাইল ফেরেশতা ইসকান্দর দেশীয় এক ব্যক্তির সহিত সাক্ষাত করিলেন। লোকটি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কে?” মালাকুল মউত বলিলেন, “আমি মৃত্যুদূত!” ইহা শ্রবণ করিয়া উক্ত ব্যক্তির পৃষ্ঠদেশ ও পাঁজরের মধ্যে অনুকম্পন আরম্ভ হইল। মৃত্যুদূত তাহাকে বলিলেন, “তুমি কেন এমন করিতেছ?” প্রত্যুত্তরে সে বলিল, “আমি দোযখের ভয়ে এমন করিতেছি।” অতঃপর মৃত্যুদূত তাহাকে বলিল, আমি কি তোমাকে একখানা চিঠি লিখিয়া দিব না, যাহা দ্বারা তুমি নরক হইতে পরিত্রাণ লাভ করিবে?” মালাকুল মউত একখণ্ড কাগজ লইয়া  “বিছমিল্লাহিররাহমানির রাহীম” অর্থাৎ “পরম করুণাময় ও অনন্ত দয়ালু আল্লাহ পাকের নামে আরম্ভ করিতেছি” লিখিয়া দিয়া বলিলেন- “ইহা দ্বারাই তুমি দোযখ হইতে পরিত্রাণ লাভ করিবে।"

আরও বর্ণিত আছে যে, কোন এক অলী-আল্লাহ্ কাহারও “বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পাঠ শুনিয়া চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠেন, “প্রিয়তমের নামই যখন এত মধুর, তখন তাঁহার দর্শন বা দীদার না জানি কতই মধুর?” তিনি আরও বলিলেন, “মানুষ বলিয়া থাকে যে, আজরাইলের কারণে পৃথিবী এক পয়সার তুল্যও মূল্যবান নহে, কিন্তু আমি বলিব, মৃত্যুদূতবিহীন পৃথিবী এক কপর্দকেরও সমান নহে। কেননা মৃত্যুদূতই বন্ধুর মিলন ঘটাইয়া থাকে।"

পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...