বুধবার, ১৫ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (১৮) মৃতের জন্য বিলাপ করিবার পরিণাম

 

📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ১৮)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মৃতের জন্য বিলাপ করিবার পরিণাম -
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, “যে ব্যক্তি বিপদে ধৈর্যধারণ করিতে না পারিয়া স্বীয় বস্ত্র ছিঁড়িয়াছে, কিংবা বুকে আঘাত হানিয়াছে সে ব্যক্তি যেন তীর, বর্শা লইয়া আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করিয়া দিয়াছে। হযরত নবীয়ে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “বিপদের সময় যে ব্যক্তি দরওয়াজা বা বস্ত্র কৃষ্ণবর্ণ করিয়াছে, অথবা ছিঁড়িয়াছে অথবা দোকান পাট নষ্ট করিয়াছে, কিংবা গাছ পালা তুলিয়াছে বা স্বীয় অঙ্গের পশম তুলিয়াছে, আল্লাহতায়ালা তাহার প্রতিটি পশম ও উৎপাদিত বৃক্ষের পাতার পরিবর্তে তাহার জন্য দোযখে একটি গৃহ তৈরী করিবেন এবং সে যেন আল্লাহ তায়ালার সহিত শরীক করিল ও সত্তরজন নবীকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হইল। যতদিন এই কালো দাগ থাকিবে, ততদিন আল্লাহ তা'আলা তাহার কোন ফরজ-নফল এবাদত, দান-খয়রাত ও দোয়া কবুল করিবেন না। আর আল্লাহ তা'আলা ঐ ধরনের ক্রোধসম্পন্ন ব্যক্তিদিগকে- যাহারা বিপদে ধৈর্য অবলম্বন করে নাই, তাহাদের কবরকে সংকীর্ণ করিয়া দিবেন এবং কঠিনভাবে তাহাদের হিসাব গ্রহণ করিবেন। আকাশমণ্ডল ও ভূূমণ্ডলে যাহা কিছু রহিয়াছে, সমুদয় জীব-জানোয়ার তৃণলতা ও ফেরেশতাগণ তাহার উপর আল্লাহ তায়ালার অভিসম্পাত কামনা করিবে এবং তাহার নামে এক হাজার পাপ লিখিত হইবে আর তাহাদিগকে উলঙ্গ অবস্থায় কবর হইতে বাহির করা হইবে।”
আর বিপদে অধৈর্য হইয়া যে ব্যক্তি জামার পকেট ছিঁড়িয়া ফেলিবে, আল্লাহ পাক তাহার ধর্ম বিনষ্ট করিয়া দিবেন। বিপদে অধৈর্য হইয়া যে ব্যক্তি নিজ গণ্ডদেশে চপেটাঘাত করিবে কিংবা মুখমণ্ডলের কোন অংশ জখম করিয়া ফেলিবে, আল্লাহ তা'আলা তাহার জন্য স্বীয় দর্শন (সাক্ষাত) হারাম করিয়া দিবেন।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, যখন কোন ব্যক্তি মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তখন কেহ যদি উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিতে করিতে সেই গৃহে প্রবেশ করে, তাহা হইলে মালাকুল মউত সেই গৃহের দরওয়াজায় দাঁড়াইয়া ঘোষণা করেন, “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা এরূপ করিতেছ কেন? আমি তোমাদের কাহারও হায়াত বা ধন-সম্পদ বিনষ্ট করি নাই এবং কাহারও উপর অত্যাচার করি নাই। তোমরা যদি আমার কাজে অসন্তুষ্ট হইয়া ক্রন্দন করিয়া থাক, তবে জানিয়া রাখিও, আমি আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালনকারী দাসানুদাস মাত্র। আর যদি মৃত ব্যক্তির জন্য ক্রন্দন করিয়া থাক, তবে জানিয়া রাখিও, সে ছিল নিতান্ত অসহায়। আর যদি আল্লাহ তা'আলার আদেশের কারণে ক্রন্দন করিয়া থাক, তবে তোমরা আল্লাহ তা'আলার শোকর গুজারী হইতে বঞ্চিত হইয়া কুফুরী করিতেছ। আল্লাহর শপথ দিয়া বলিতেছি যে, অবশ্যই তোমাদের নিকটও আমাকে আসিতে হইবে আর তোমরা কেহই আমার হাত হইতে রেহাই পাইবে না।”

ফকীহগণের অভিমত এই যে, মৃত ব্যক্তির জন্য উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করা হারাম; কিন্তু আওয়াজহীন ক্রন্দনে কোন ক্ষতি নাই তবে ধৈর্যধারণ করাই সর্বোত্তম। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন- “ইন্নামা ইয়াতাওফ্‌ফাছ ছাবিরুনা আজরুহুম বিশ্বাইরি হিছাব”  অর্থাত: - “অবশ্যই ধৈর্যশীলদিগকে অসংখ্য প্রতিদান প্রদান করা হইবে।”  হযরত নবীয়ে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, “উচ্চৈস্বরে ক্রন্দনকারীগণ ও তাহাদের সাহায্যকারীগণ এবং শ্রবণকারী ও নিকটবর্তী সকলেই আল্লাহ তায়ালা ও ফেরেশতাগণ এবং সমস্ত মানুষ অভিসম্পাত করিয়া থাকে।”

বর্ণিত আছে, হযরত হাসান ইবনে আলী (রাঃ) যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তাঁহার স্ত্রী এক বৎসর পর্যন্ত তাঁহার কবরের উপর পড়িয়াছিলেন। এক বৎসর পর তাবু উঠানো হইলে কবরের মধ্যস্থল হইতে এই আওয়াজ তিনি শুনিতে পাইলেন, “ওহে! যাহাকে তুমি হারাইয়াছ, তাহাকে কি তুমি পাইয়াছ?” হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পুত্র হযরত ইব্রাহিম (রাঃ) যখন ইন্তেকাল হন, তখন তাঁহার চক্ষুদ্বয় হইতে অশ্রু ঝড়িতেছিল। ইহা দর্শন করিয়া হযরত আবদুর রহমান আরজ করিলেন, “হুযুর আপনিতো আমাদিগকে এইরূপ করিতে নিষেধ করিয়াছেন?” প্রত্যুত্তরে তিনি বলিলেন, “আমি মাত্র দুইটি পাপ আওয়াজ ও দুইটি আহাম্মকি কাজ হইতে বিরত থাকিতে বলিতেছি। উহা হইল বিলাপের ও গানের সুরে ক্রন্দন করা, পোশাক-পরিচ্ছদ ছিন্ন করা এবং গলদেশে আঘাত হানা কিন্তু অশ্রু বিসর্জনে কোন দোষ নাই। আল্লাহ তা'আলা রহমতস্বরূপ দয়ালুদের হৃদয়ে উহা স্থাপন করিয়াছেন।” তারপর তিনি বলিলেন, “হে ইব্রাহিম! তোমার বিচ্ছেদে আমার হৃদয় ব্যথিত এবং চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হইয়া পড়িয়াছে।”

হযরত ওহাব ইবনে কায়সান (রাঃ) ও হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন যে, হযরত আবু হাফস ওমর (রাঃ) একজন স্ত্রীলোককে মৃত ব্যক্তির জন্য ক্রন্দন করিতে দেখিয়া তাহাকে নিষেধ করিলেন। অতঃপর হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “হে ওমর! তাহাকে ক্রন্দন করিতে দাও। কারণ হৃদয়ের দুঃখে চক্ষু হইতে অশ্রু প্রবাহিত হয় এবং উহা বিপদের সময়ের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়।”

পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...