হযরত ছিদ্দিক ইবনে ওনায়েছ (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলিয়াছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-তিনি এরশাদ করিতে শুনিয়াছি যে, একদিন হযরত জিব্রাইল (আঃ) তাঁহাকে বলিলেন, “হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আল্লাহ তা'আলা আপনাকে সালাম দিয়া আপনার উম্মতদিগকে এই খবর জানাইতে নির্দেশ করিয়াছেন যে, যাহারা জামাত বর্জন করিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে তাহারা বেহেশতের সুগন্ধ পাইবে না, যদিও তাহাদের আমল সমস্ত পৃথিবীর মানুষ হইতে অধিক হইয়া থাকে। রোজ কিয়ামতে আল্লাহ তা'আলা তাহাদের কোন ফরজ ও নফল এবাদত কবুল করিবেন না। জামাত বর্জনকারী আপনার নিকট এবং সমস্ত ফেরেশতা ও মানবকুলে অভিশপ্ত। তাহা ছাড়া তৌরাত-জব্বুর ও ইঞ্জিল তাহার প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করিয়া থাকে। এমনকি জামাত পরিত্যাগকারীর কোন প্রার্থনা কবুল হইবে না এবং সে ইহকালে ও পরকালে আল্লাহ তা'আলার রহমত হইতে বঞ্চিত থাকিবে। এই লোকেরাই আপনার উম্মতের মধ্যে নিকৃষ্ট এবং তাহারা মদ্খোর, দস্যু এবং সহস্র জ্ঞানী হত্যাকারী হইতেও অধম!”
হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “তোমরা নাসারা এবং ইহুদীগণকে সালাম করিও, কিন্তু আমার উম্মতের ইহুদীগণকে সালাম করিও না।”
হযরত সাদ্দাদ (রাঃ) আরজ করিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার উম্মতের ইহুদী কাহারা?” মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উত্তর করিলেন, 'যাহারা আযান শুনিয়াও জামাতে উপস্থিত হইল না, তাহারাই আমার উম্মতের মধ্যে ইহুদী।” তিনি আরও এরশাদ করিয়াছেন, “যে ব্যক্তি জামাত ভঙ্গকারীকে অল্প-বিস্তর খাদ্য বা রুটি দিয়া সাহায্য করিল, সে যেন নবীগণের হত্যায় সহায়তা করিল। সে মৃত্যুবরণ করিলে তাহাকে গোসল, জানাযা ও মুসলমানদের কবরস্থানে সমাহিত করিও না। এমন কি জামাত বর্জনকারী একাই যদি সমস্ত উম্মতের সমতুল্য নামায পড়ে, সকল আসমানী কিতাব পাঠ করে এবং সারা বৎসর রোযা রাখে আর সমস্ত উম্মতের সমতুল্য দান-খয়রাত করে, তবু সে বেহেশতের সুগন্ধ হইতে বঞ্চিত-হইবে। আল্লাহ তা'আলা জীবিত অথবা মৃত কোন অবস্থায়ই তাহার দিকে রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করিবেন না!”
জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “যে ব্যক্তি অজু করতঃ নামাযের জন্য মসজিদে প্রবেশ করিবে এবং জামাতের সহিত নামায আদায় করিবে, আল্লাহ তা'আলা তাহার গুনাহসমূহ মাফ করিয়া দিবেন।" অন্য এক বর্ণনায় আছে, 'যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ে যথাযথ সুন্দররূপে রুকু-সিজদাহ করতঃ নামায আদায় করিবে, তাহার সম্মানার্থ আল্লাহ তা'আলা বিভিন্ন সময়ে তাহাকে পনরটি পুরস্কার প্রদান করিবেন। তন্মধ্যে ইহকালে তিনটি, মৃত্যুমুহূর্তে তিনটি এবং আল্লাহ তা'আলার দীদারে তিনটি।
ইহকালে -
(১) ইহকালে আল্লাহ তা'আলা তাহার বয়স, খাদ্য-দ্রব্য বাড়াইয়া দিবেন এবং তাহার ও তাহার পরিবার পরিজনের রক্ষণাবেক্ষণ করিবেন।
(২) মৃত্যুকালে তাহাকে ভয়-ভীতি হইতে নিরাপত্তা, শান্তি এবং বেহেশতে প্রবেশের সুসংবাদ প্রদান করিবেন।' যেমন পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিয়াছেনঃ - “নিশ্চয়ই যাহারা বলিয়াছে যে, আল্লাহই আমাদের প্রতিপালক তারপর ៖ উহাতে মৃত্যু পর্যন্ত স্থির রহিয়াছে, তবে মৃত্যুলগ্নে বেহেশতের ফেরেশ্তাগণ নাযিল হইয়া তাহাদিগকে ভয়-ভীতি হইতে নিরাপত্তা এবং অঙ্গীকারকৃত বেহেশত রাজ্যে প্রবেশের সুসংবাদ দান করিয়া থাকে।”
(৩) আর কবরের মধ্যে মনকির নকীরের প্রশ্নোত্তর সহজ করিয়া দিবেন, কবরকে সুপ্রশস্ত করিবেন এবং বেহেশতের দিকে কবরের দরজা খুলিয়া দিবেন।
আর হাশরে -
(১) আল্লাহ তা'আলা তাহার চেহারাকে পূর্ণিমার চন্দ্রের মত সমুজ্জ্বল করিয়া উত্থিত করিবেন । যেমন পবিত্র কোরআনে এরশাদ হইয়াছে— “তাহাদের অগ্রে এবং পশ্চাতে নূর দৌড়াদৌড়ি করিতে থাকিবে।
(২) আর তাহার আমলনামা ডান হাতে প্রদান করিবেন এবং
(৩) তাহার হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত সহজভাবে গ্রহণ করিবেন।
আর আল্লাহ তা'আলার দীদারে
(১) আল্লাহ তা'আলা তাহার উপর রাজী ও সন্তুষ্ট থাকিবেন,
(২) আল্লাহ তা'আলা তাহাকে সালাম জানাইবেন এবং
(৩) তাহার প্রতি রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করিবেন। যেমন পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হইয়াছে- “ছালামুন কাউলাম মির রাব্বির রাহীম্।” অর্থাৎ : “আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে ছালাম প্রদান করিবেন।" আর সেইদিন কাহারও মুখমণ্ডল তরুতাজা থাকিবে এবং তাহারা আল্লাহ তা'আলার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া থাকিবে। আর পাঞ্জেগানা নামাযে যাহারা অলসতা প্রদর্শন করিবে আল্লাহ তাহাদিগকে পনরটি শাস্তির ভাগী করিবেন।
ইহলোকে- (১) তাহার হায়াত কমিয়া যাইবে, (২) তাহার আহার্য বস্তু হইতে বরকত উঠিয়া যাইবে এবং (৩) তাহার চেহারা হইতে নেককারের চিহ্ন মুছিয়া যাইবে।
মৃত্যুর সময়-
(১) ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় সে বড়ই কাতর হইবে, আর নেহায়েত অপমান ও অপদস্থ করিয়া তাহার রূহ কবজ করা হইবে।
কবরের মধ্যে-
(১) তাহার কবর এতই সংকীর্ণ করা হইবে যে, তাহার এক বাহু অন্য বাহুতে মিশিয়া যাইবে।
(২) আর জাহান্নামের দিকে তাহার কবরের দ্বার খুলিয়া দেওয়া হইবে এবং
(৩) বেহেশতে প্রবেশের সুসংবাদ হইতে সে বঞ্চিত হইবে এবং তাহাকে দোযখে প্রবেশের দুঃসংবাদ প্রদান করা হইবে।
আর হাশরের মাঠে –
(১) তাহার মুখমণ্ডল ঘোর কালবর্ণ করিয়া কবর হইতে উঠানো হইবে।
(২) আল্লাহ তা'আলার রহমত হইতে নিরাশার চিহ্ন তাহার কপালে লিখিয়া দেওয়া হইবে এবং
(৩) তাহাকে পিছনের দিক হইতে আমলনামা দেওয়া হইবে। আর,
আল্লাহ তা'আলার সাক্ষাতে-
(১) আল্লাহ তা'আলা তাহার সহিত কালাম করিবেন না,
(২) আল্লাহ তা'আলা তাহার প্রতি নজর করিবেন না,
(৩) তাহাকে শাস্তি হইতে রেহাই দিবেন না বরং তুলনামূলক কঠোর শাস্তিদান করিবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা তিনি কোরআন শরীফে ঘোষণা করিয়াছেন- “ফাখালাফা মিম বা'দিহিম খালফুন আদ্বাউছ ছালাতা ওয়াত্তাবাউশ শাহাওয়াতি ফাছাউফা ইয়াল্ক্কাউনা পাইয়্যা।”
অর্থাৎ: “তাহাদের পশ্চাতে একদল লোক আসিয়াছিল যাহারা নামায বিনষ্ট করিয়াছিল, অতএব শীঘ্রই তাহারা স্বীয় পথভ্রষ্টতার শাস্তি ভোগ করিবে।”
হযরত আনাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, জনাব রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “বান্দা যখন উত্তমরূপে অজু এবং বিশুদ্ধভাবে নিয়ত করতঃ নামায পড়িতে দণ্ডায়মান হয় এবং ‘আল্লাহু আকবার' বলে, তৎক্ষণাত সে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হইয়া যায়। আর যখন সে 'আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম' বলে তখন তাহার শরীরের অগণিত পশমতুল্য এক বৎসরের এবাদত লেখা হয়। আর সে যখন সূরা ফাতেহা পাঠ করে তখন সে যেন পবিত্র ‘হজ্জ ও ওমরাহ' সমাপ্ত করে। আর সে যখন ‘রুকু' করে তখন যেন সে তাহার ওজনের সমতুল্য স্বর্ণ আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় খরচ করে। আর যখন সে 'ছামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ্' বলে, তখন আল্লাহ তা'আলা তাহার প্রতি রহমতের নজর নিক্ষেপ করেন। সিজদাহর হালতে সে যখন 'ছোব্হানা রাব্বিয়াল আলা' পাঠ করে, তখন যেন সে একটি গোলাম আযাদ করে। আর যখন সে ‘তাশাহ্হুদ’ পাঠ করে তখন আল্লাহ তা'আলা তাহাকে সহস্র আলেম ও শহীদের পুণ্য প্রদান করেন। আর সালামান্তে নামায শেষ করিবার সাথে সাথে তাহার জন্যে বেহেশতের আটটি দরওয়াজা খুলিয়া দেওয়া হয়, সে বিনা হিসাবে নির্ভয়ে খুশীমত যে কোন দরওয়াজা দিয়া উহাতে প্রবেশ করিতে পারে।”
হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “কুকুরের পাঁচটি স্বভাব প্রত্যেক বান্দার মধ্যে থাকা দরকার। যেমন- (১) কুকুর সদা-সর্বদা ক্ষুধার্ত ও অভুক্ত থাকে, সুতরাং সৎলোকেরও তদ্রূপ থাকা দরকার। (২) কুকুরের কোন নির্দিষ্ট বাসস্থান থাকে না, অতএব সৎলোকদেরও থাকা উচিত নহে। (৩) কুকুর সারারাত্র বিনিদ্রভাবে স্বীয় প্রভুর গৃহ পাহারা দেয়, তদ্রূপ সৎলোকেরও অহোরাত্র জাগ্রত থাকিয়া আল্লাহ পাকের এবাদত করা দরকার। (৪) কুকুর উত্তরাধিকারীদের জন্য কিছুই রাখিয়া যায় না, তেমনি সৎলোকেরও রাখা উচিত নহে। (৫) কুকুর স্বীয় প্রভুর দুয়ার হইতে শত সহস্রবার তাড়া খাইয়াও বিতাড়িত হয় না, অনুরূপভাবে বান্দাদেরও নানারকম দৈব দুর্বিপাকে পড়িয়া আল্লাহ পাকের নাম স্মরণ রাখা দরকার।”
হযরত আলী (রাঃ) বলিয়াছেন, যাহার জীবনযাত্রা কুকুরের ন্যায় তাহার জন্য সু-সংবাদ রহিয়াছে। কুকুরের মধ্যে দশটি অভ্যাস দেখিতে পাওয়া যায়। যেমন – (১) কুকুরের কোন ধন-সম্পদ নাই, (২) বিশ্বের কোথাও তাহার মান-সম্মান নাই, (৩) সমস্ত দুনিয়া জুড়িয়াই তাহার বাসস্থান, (৪) আর ইহা অধিকাংশ সময় চুপচাপ থাকে, (৫) অধিকাংশ সময়ই ইহা ক্ষুধার্ত থাকে, (৬) কুকুর দিবারাত্র ইহার প্রভুকে স্মরণ করিয়া থাকে, (৭) সে যাহা পায় তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকে, (৮) শত সহস্র বেত্রাঘাত খাইয়াও সে প্রভুর দুয়ার পরিত্যাগ করে না, (৯) সে প্রভুর শত্রুকে আক্রমণ করে কিন্তু প্রভুর বন্ধুকে আক্রমণ করে না আর (১০) মৃত্যুকালে সে কিছুই পরিত্যাগ করিয়া যায় না। ইহাই হইল কুকুরের জীবনযাত্রার কতিপয় নিয়মাবলী। এই সকল স্বভাব সৎলোকদের মধ্যে থাকা দরকার।
পরবর্তী পর্ব
জান কবযের পর রূহের কবরে ও গৃহে আগমন-
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন