রবিবার, ১৯ মে, ২০২৪

দাকায়েকুল আখবার- (২৫) জান কবজের পর রূহের কবরে ও গৃহে আগমন



📚দাকায়েকুল আখবার- (পর্ব- ২৫)
✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জান কবজের পর রূহের কবরে ও গৃহে আগমন-
হযরত রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “কোন বনী আদম মৃত্যুবরণ করিলে তৃতীয় দিন তাহার রূহ ফরিয়াদ করে, “হে আল্লাহ ! আমাকে নিজের দেহ-খাঁচা ও গৃহ পরিদর্শন করিবার অনুমতি প্রদান করুন।”  তারপর অনুমতি লাভ করিয়া রূহ কবরের দিকে ধাবিত হয় এবং দূর হইতে প্রত্যক্ষ করে যে, তাহার শরীর, মুখ, নাসিকা হইতে পানির স্রোত বহিতেছে। তখন সে অনেকক্ষণ পর্যন্ত ক্রন্দন করতঃ আরজ করে, ‘আমার প্রিয় অসার দেহ! তোমার বিগত জীবনের কথা স্মরণ হইতেছে কি? হায়! এই সমাধিস্থল কত না দুঃখ-বেদনা, আপদ-বিপদ, লজ্জা-অপমান ও চিন্তা-ভাবনার নির্জন নিবাস।' অতঃপর রূহ ফিরিয়া যায়।  পুনরায় রূহ পঞ্চম দিনে ফরিয়াদ করে, হে আল্লাহ! আমাকে নিজের পরিত্যক্ত দেহ-খাঁচা দর্শন করিবার অনুমতি দান করুন। আল্লাহর অনুমতির পর রূহ গোরস্থানে আগমন করতঃ দূর হইতে অবলোকন করে যে, তাহার শরীর, নাক ও মুখ হইতে রক্ত, গলিত পুঁজ ও পচা রক্ত ইত্যাদি বহিয়া পড়িতেছে। তখন রূহ চীৎকার করিয়া বলে, “হে আমার অসহায়, নিঃস্ব দেহ বন্ধু তোমার অতীত জীবনের সুখ ও শান্তির কথা মনে পড়িতেছে কি? হায়! এইস্থান কত না ভীতিপ্রদ! এইস্থান কেবল দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা, অপমান, কষ্ট-শ্রম, বিভিন্ন প্রকার পোকা-মাকড় ও শ্বাপদ সঙ্কুলের আড্ডা। পোকার দংশনে তোমার দেহ ক্ষত-বিক্ষত ও চামড়া আলগা হইয়া গিয়াছে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জোড়া শিথিল হইয়া পড়িয়াছে।' অতঃপর রূহ সেই স্থান হইতে ফিরিয়া যায়। অধিকন্তু সপ্তম দিবসে রূহ পুনরায় আরজ করে, ‘হে আল্লাহ! আমাকে আমার দেহ দর্শন করিবার অনুমতি দান করুন! আল্লাহ তা'আলার অনুমতি লাভ করিয়া রূহ গোরস্থানে গমন করতঃ দূর হইতে আবলোকন করে যে, এইবার সমস্ত শরীরে পোকা পড়িয়া আছে৷ তখন রূহ অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হইয়া চীৎকার করিয়া বলে, 'হে আমার নিঃস্ব শরীর! তোমার অতীত জীবনের সুখ-দুঃখের কথা স্মরণে পড়িতেছে কি? আজ তোমার ছেলে-মেয়ে, বাপ-মা, ভাই-বন্ধু, ঘর-দুয়ার, সহায়-সম্পদ ও প্রতিবেশি স্বজনেরা কই? পৃথিবীর জীবনে ইহারা তোমার প্রতি সুপ্রসন্ন ছিল। অদ্য হইতে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত উহারা তোমার ও আমার জন্য বিলাপ করতে থাকিবে।
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করয়াছেন- “কোনও বিশ্বাসী বান্দার এন্তেকালের পর তাহার রূহ দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত তাহার ঘর-বাড়িতে ঘুরিয়া ফিরিয়া প্রত্যক্ষ করে যে, তাহার পরিবার-পরিজনের সদস্যগণ তাহার পরিত্যক্ত ধন-সম্পদ কেমনভাবে নিজেদের মধ্যে বন্টন করিতেছে এবং কিরূপে তাহার দায়-দেনা আদায় করিতেছে। এইভাবে এক মাসের পর হইতে সুদীর্ঘ এক বৎসর পর্যন্ত রূহ্ শরীর ও গোরের মধ্যে ঘুরিয়া ফিরিয়া অবলোকন করে যে, কোন ব্যক্তি তাহার জন্য প্রার্থনা করিতেছে এবং কে তাহার জন্য চিন্তার ভিতর কাল যাপন করিতেছে।” তারপর ইস্রাফিলের সিঙ্গার ফুৎকার দেওয়া পর্যন্ত মুমিন বান্দার রূহ আত্মার যথার্থ স্থানে তুলিয়া রাখা হয়। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন “তানায্যালুল মালাইকাতু ওয়াররূহু ফীহা বিইজনি রাব্বিহিম” অর্থাৎ লাইলাতুল কদরে ফেরেশতাগণ ও রূহ তাহাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অবতীর্ণ হন। এইখানে রূহ শব্দের অর্থ হইল রহমত বা শান্তি, যাহা পৃথিবীর অধিবাসী বান্দাদের উপর নাযিল হয়। অতএব উক্ত শব্দটি রূহ্ কিংবা 'রাউহুন' উভয়ই ধরা যাইতে পারে; তখন ইহার প্রকৃত তাৎপর্য এই দাঁড়ায় যে , ফেরেশ্তাগণের সহিত রূহ অর্থাৎ আল্লাহ পাকের রহমত ও করুণা নাযিল হইয়া থাকে। মতান্তরে বলা যায় যে, রূহ হইল এক মর্যাদাশীল ফেরেশ্তার নাম। যিনি মুমিন বান্দার উপর আল্লাহর রহমত নাযিল করিয়া থাকেন। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিতেছেন - “ইয়াউমা ইয়াকুমুর রূহ ওয়াল মালাইকাতু ছাফ্‌ফা” “সেইদিন রূহু এবং ফেরেশ্তামণ্ডলী কাতারবন্দী অবস্থায় দণ্ডায়মান হইবে। কিংবা রূহ্ অর্থ হইল বণি-আদমের রূহ্; অথবা রূহ অর্থ হযরত জিব্রাইল (আঃ)।” আরও বর্ণিত আছে যে , “হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র রূহ আরশের নিম্নদেশ হইতে লাইলাতুল কদরে দুনিয়াতে অবতরণ করিয়া তাঁহার প্রিয় মুমিন উম্মত নারী-পুরুষদিগকে সালাম ও দোয়া করিবার নিমিত্ত আল্লাহ পাকের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করিয়া থাকেন। "আরও বর্ণিত আছে যে, রূহ অর্থ হইল মৃত বিশ্বাসী মুসলমানদের আত্মীয়-স্বজনদের রূহ, যাহারা দোয়া করিয়া থাকে, “হে আল্লাহ ! আমাদিগকে নিজেদের নিবাসস্থলে প্রত্যাবর্তন করতঃ নিজ পরিবার-পরিজনদের হালত দর্শন করিবার জন্য অনুমতি প্রদান করুন?”
সুতরাং আল্লাহ তা'আলার অনুমতি লাভ করতঃ তাহারা লাইলাতুল কদরে পূর্ব নিবাসস্থলে উপস্থিত হয়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, মৃত লোকজন ঈদের দিন অথবা আশুরার দিন অথবা রাত্রিতে অথবা জুমআর দিন অথবা রজব মাসের প্রথম শুক্রবারে অথবা সাবান মাসের পনেরই তারিখের রাত্রে স্বীয় কবর হইতে বহির্গত হইয়া পরিবার-পরিজনদের সন্নিকটে উপস্থিত হইয়া বলে, “হে আমার পরিবার-পরিজনগণ! আজ কিছু টাকা-পয়সা অথবা খাদ্য সামগ্রী দান করিয়া আমার উপকার করিতে সচেষ্ট হও। আজ আমি ভিখারীর মত হইয়াই তোমাদের সমীপে আরজ করিতেছি। যদি তোমরা দান-খয়রাত করিতে সমর্থ না হও, তাহা হইলে এই পবিত্র রাত্রে অন্ততঃ দুই রাকায়াত নামাযে আমার কথা মনে কর!” তারপর রূহ অতিশয় দুঃখ সহকারে বলিয়া থাকে, “হায় ! হায় ! আমাদের জন্য কেহ দোয়া করিবার আছে কি? আমাদের নাম মনে করিবার মত কি কেহই নাই? হে আমাদের গৃহবাসীগণ! হে আমার ভার্যা! হে আমার সুবিশাল দালানের বাসীন্দাগণ! তোমাদের মাঝে আমাদের জন্য কোনও স্মরণকারী ও প্রার্থনাকারী আছে কি? আমরা আজ কবরে পড়িয়া রহিয়াছি। হে আমাদের অর্থ-সম্পদ বন্টনকারী ও সন্তান-সন্ততিদের হেয়কারী! আমাদের এই দুঃখ-বেদনা, অভাব-অভিযোগ ও দৈন্য-দুর্দশা সম্বন্ধে তোমাদের কেহই কি চিন্তা করে না? আমাদের কর্মানুষ্ঠান চিরতরে যদিও বন্ধ হইয়া পড়িয়াছে কিন্তু তোমাদের আমলনামা এখনও বন্ধ হয় নাই। হে প্রিয় বন্ধুগণ! আমাদের জন্য সামান্য রুটি দান বা প্রার্থনা করিতে বিস্তৃত হইও না। কারণ আমরা চির দরিদ্র হইয়া গিয়াছি।” মৃত ব্যক্তি যদি কিঞ্চিত দান, সদ্‌কাহ ও নেক লাভ করিতে পারে তাহা হইলে সে সুখী ও আনন্দিত হইয়া কবরে প্রত্যাবর্তন করে, অন্যথায় চিন্তিত ও বিমর্ষভাবে কবরে প্রবেশ করে।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, রূহ হৃদয়ে অথবা দেহস্থ কোন অংশে অবস্থান করে। ইহার প্রমাণস্বরূপ বলা যায় যে, কোন লোক নির্মম প্রহার অথবা কঠিন যন্ত্রণায়ও মৃত্যুমুখে পতিত হয় না আবার অন্য লোক সামান্য আঘাতেই মৃত্যুবরণ করে। ফলে বুঝা যায় যে, সেই আঘাতের স্থানেই রূহ তখন অবস্থান করিয়াছিল। অতএব স্পষ্টতঃই প্রমাণিত হয় যে, রূহ সর্বাবস্থায় শরীরের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়িয়া বিরাজ করে না। তবে রূহ যদি কখনও সমস্ত শরীরে অবস্থান করে তাহা হইলে মৃত্যু সমস্ত শরীরে বিকাশ লাভ করিয়া থাকে। আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশই ইহার উজ্জ্বল প্রমাণঃ - “কুল ইউহয়ী হাল্লাজি আন্‌শাআহা আউয়্যালা মাররাহ্” হে নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)!  আপনি “বলে দিন, যে আল্লাহ প্রথম সৃষ্টি করিয়াছেন, তিনিই পুনর্বার জীবিত করিবেন।” আর যদি ‘রূহ’ ও ‘রূহুয়ান’ এর প্রভেদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তাহা হইলে উত্তরে বলিব যে, এই দুইয়ের মধ্যে কোনই পার্থক্য নাই উভয়ে একই বস্তু। যেমন হাত, পা শরীর হইতে আলাদা বস্তু নহে। উহার শরীরের সাথে যেখানে সেখানে বিচরণ করে, কিন্তু পার্থক্য শুধু এই যে, রূহ নড়াচড়া করে না আর ইহার কোন নির্দিষ্ট জায়গা নাই। আর‘ রূহুয়ান'-এর অবস্থানস্থল হইল ভ্রূযুগলের মধ্যস্থল। রূহ বাহির করিলে মানুষ মারা যায়, আর রূহুয়ান বাহির করিলে মানুষ নিদ্রার কোলে ঢলিয়া পড়ে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, যদি একটি স্থির পানিপূর্ণ পাত্রে ছিদ্রপথে আলোক রশ্মি পতিত হয়, তবে উহার প্রতিবিম্ব স্পন্দন করিতে থাকে । অনুরূপভাবে রূহ বান্দার শরীরে প্রবেশ করিবার সাথে সাথে ইহার ছায়া আরশে প্রতিফলিত হয় এবং তখন বান্দা খাব দেখে। ইহাকে বলা হয় 'রূহুয়ান।' আর বান্দা যখন নিদ্রাচ্ছন্ন হয়, তখন 'রূহুয়ান' নাসিকার ছিদ্রপথে স্বর্গে আরোহণ করে এ ‘আলমে মালাকুতে' রূহের সান্নিধ্যে হাজির হয়। যদি প্রশ্ন করা হয় যে, ঈমানদার বান্দার রূহ আকাশে উত্থিত হইয়া আত্মার সন্নিধানে উহার খেদমতে ব্যাপৃত হয়, কিন্তু কাফেরের আত্মা তখন কোথায় অবস্থান করে? ইহার উত্তরে বলা হইয়াছে যে, কাফেরের আত্মাও ঊর্ধাকাশে আরোহণে সচেষ্ট হয়, কিন্তু শয়তান কর্তৃক বিকৃত হইয়া ইহারই সহিত ঘুরিতে আরম্ভ করে। যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে আত্মা যখন আকাশে উঠিয়া যায়, তখন শরীরে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয় না কেন? উত্তর হইবে যে, যদিও রূহ শরীর হইতে পৃথক হইয়া যায় কিন্তু জীবনী শক্তি ও শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া বাকী থাকে। কারণ এইগুলি রূহের মধ্যে শামিল নহে। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, “মানুষ, জিন, ফেরেশতা ও শয়তান এই চারি সম্প্রদায় হইল রূহসম্পন্ন জীব। তাহা ছাড়া অন্যান্য প্রাণী ও জীবের রূহ নাই, কেবল জীবনীশক্তি বা শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া আছে।"

হযরত মুহাম্মদ ইবনে তিরমিজি (রাঃ) বলিয়াছেন যে, রূহ হইল দুই প্রকার। প্রথম প্রকার রূহ শ্বাস-প্রশ্বাস এবং জীবনীশক্তি পরিচালিত করে এবং দ্বিতীয় প্রকার রূহ চলাফেরা ও নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। এইজন্য নিদ্রিতাবস্থায় চলাফেরার শক্তি লোপ পায় এবং জীবনীশক্তি শ্বাসক্রিয়া সচল থাকে। আর রূহের স্থান সম্বন্ধে বলা হয় যে, রূহ কবজের পর ইহা হযরত ইস্রাফিল (আঃ) শিঙ্গার মধ্যে থাকেন। তাঁহার শিঙ্গায় আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) হইতে শুরু করিয়া কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টজীবের সংখ্যা অনুসারে ছিদ্র রহিয়াছে। সেখানে প্রবেশ করিবার পর পুরস্কারপ্রাপ্তকে পুরস্কার দেওয়া হইবে এবং তিরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি তিরস্কৃত হইবে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মুমিনের রূহ্ বেহেশতের মধ্যে সবুজ পক্ষীর শরীরে পুরিয়া রাখা হয় আর কাফেরের রূহ্ দোযখের সিজ্জিন নামক স্থানে অথবা দোযখের মধ্যস্থিত কালো পাখীর মধ্যে রাখা হয়। আরও বর্ণিত আছে যে, মুমিন বান্দার রূহ কবজ হইবার সাথে সাথে রহমতের ফেরেশতাগণ উহা অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা সহকারে সপ্তাকাশে উঠাইয়া লইয়া যায়। তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ঘোষণা করা হয়, “হে ফেরেশতাগণ ! তোমরা তাহার নাম ‘ইল্লিন’ নামক পবিত্র গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করিয়া পুনর্বার শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত করিবার জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ কর।" নির্দেশানুসারে ফেরেশতাগণ তাহার রূহকে কবরের মধ্যে শরীরের সহিত সংযুক্ত করিয়া বেহেশতের দিকে একটি দরওয়াজা খুলিয়া দেয়। উক্ত দ্বারপথে সে স্বীয় বেহেশত অবলোকন করিতে করিতে রোজকিয়ামত পর্যন্ত সুখে অতিবাহিত করে। 
অপরদিকে কাফেরদের রূহ কবজ করিবার সঙ্গে সঙ্গে আযাবের ফেরেশতা সেই রূহসহ প্রথম আকাশে আরোহণ করিতে সচেষ্ট হইলে, আকাশের দ্বার বন্ধ হইয়া যায় এবং বলা হয় যে, ‘হে ফেরেশতাগণ! তাহার পাপাত্মাকে শরীরের সহিত সংযুক্ত করিয়া দাও।' সুতরাং ফেরেশতাগণ পাপাত্মাকে কবরে দেহের সহিত সংযুক্ত করিয়া দোযখের দিকে একটি দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দেয়। ফলে সে দোযখের দুঃখাবাস অবলোকন করিতে করিতে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত দুঃখে অতিবাহিত করিবে। এই প্রসঙ্গে মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন যে, “মৃত ব্যক্তিরা তোমাদের পায়ের আওয়াজ বা জুতার শব্দ শ্রবণ করে কিন্তু তারা কিছুই বলিতে পারে না।”

কোন একজন আলেমকে প্রশ্ন করা হইয়াছিল যে, “হুযুর ! মৃত্যুর পর মানবাত্মার অবস্থান স্থল কোথায়?” উত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন যে, নবীদের আত্মা জান্নাতুল আদনে এবং কবরের মধ্যে নিজ শরীরের জন্য শোকাকুল ও আল্লাহ পাকের জন্য সিজদাহ রত থাকে৷ শহীদের আত্মা বেহেশত রাজ্যের মধ্যস্থলে জান্নাতুল ফেরদাউসে সবুজ পাখীর দেহে অবস্থান করে। তাহারা স্বেচ্ছায় বেহেশৃতে বিচরণ করে এবং আরশের নিম্নস্থ ঝুলায়মান ফানুসে বিশ্রাম লাভ করে। আর মুসলমান শিশুদের রূহ বেহেশতি পাখীদের দেহে মেশাক পর্বতের সন্নিকটে কিয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করে। আর মোশরেক ও মোনাফেকদের শিশুদের রূহ বেহেশতের আনাচে কানাচে পরিভ্রমণ করিতে থাকিবে, কিয়ামত পর্যন্ত তাহাদের নির্দিষ্ট কোন বাসস্থান থাকিবে না। তারপর তাহারা মুমিনদের খাদেম হইবে। ঋণগ্রস্ত ও পরদ্রব্য গ্রাসকারী মুমিনের আত্মা আকাশ ও বাতাসের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে৷ ঋণ ও অন্যের হক আদায় না করা পর্যন্ত তাহাদের রূহ আকাশে উঠিতে সক্ষম হয় না অথবা বেহেশতে প্রবেশ করিতে পারে না। পাপে আকৃষ্ট ফাসেক মুসলমানদের আত্মাকে কবরের মধ্যে শরীরের সহিত আযাব করা হয় এবং বিধর্মী, কাফের ও মোনাফেকদের আত্মাকে জাহান্নামে সিজ্জিন নামক স্থানে আজীবন আযাব করা হয়।

আরও বর্ণিত আছে যে, রূহ্ একটি সূক্ষ্মদেহ সৃষ্টজীব। এইজন্য আল্লাহ তায়ালাকে “জিরূহ” বলা যায় না। কারণ সুনির্দিষ্ট গণ্ডিতে আল্লাহ তা'আলার বিরাজ করা কিছুতেই সম্ভব নহে। আরও বলা হইয়াছে যে, রূহ অস্তিত্বহীন; কিন্তু শরীরের অস্তিত্বের সঙ্গে ইহার মিল আছে। হাদীস শরীফে আছে যে, ইহুদীগণ নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে 'রূহ', 'আসহাবে কাহাফ' ও 'জুলকারনাইন' সম্বন্ধে প্রশ্ন করিয়াছিল৷ তাহাদের প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তা'আলা সূরায়ে কাহাফ নাযিল করেন। উক্ত সূরায় রূহ্ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করিয়াছেন, - “হে নবী ! ইহুদীগণ আপনাকে রূহ্ সম্পর্কে প্রশ্ন করিতেছে, উত্তরে আপনি বলিয়া দিন যে, রূহ আমার প্রতিপালকের নির্দেশে নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ রূহ সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত৷ সে সম্বন্ধে আল্লাহই সুপরিজ্ঞাত। আর ইহাও বলা হইয়াছে যে, রূহ সৃষ্ট জীব নহে। মূলতঃ ইহা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ বা বাণী মাত্র আল্লাহ তা'আলার “কুন” শব্দ হইতেই রূহের সৃষ্টি। বস্তুতঃ আল্লাহ তা'আলার আদেশ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রথম শ্রেণীর আদেশকে ‘আমারে এলজমি' বলে। নামায, রোযা ইত্যাদি এবাদতের নির্দেশসমূহ এই শ্রেণীর আদেশের অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয় শ্রেণীকে ‘আনরে তাকবীন' বলে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলিবেন- “তোমরা প্রস্তর কিংবা লৌহ অথবা অন্য কোনও বস্তুতে পরিণত হইয়া যাও,” আর তখনই তাহা হইয়া যায়। যেমন এরশাদ হইয়াছে “নায্যালা বিহি রূহল্ আমীন” অর্থাৎ পবিত্র কোরআন রুহুল আমিন ফেরেশতার মাধ্যমে নাযিল করিয়াছেন। তিনি আরও এরশাদ করিয়াছেন “ইয়াউমা ইয়াকুমুর রূহু ওয়াল মালাইকাতু ছাফ্‌ফ্ফাল্লা ইয়াতা কাল্লামুন৷ ইল্লা মান আজিনা লাহুর রাহমানু ওয়া কালা ছাওয়াবা ” 
অর্থাৎ : "যেদিন রূহ ও ফেরেশতাগণ নির্বাক অবস্থায় শ্রেণীবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান থাকিবেন, কিন্তু যাহারা আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হইবেন এবং সত্য বলিবেন, তাহারাই সত্য বলিবেন ও সুপারিশ করিতে সক্ষম হইবেন"। এখানে রূহ অর্থ হযরত জিব্রাইল (আঃ)। যিনি একাই কাতারবন্দি হইয়া দণ্ডায়মান হইবেন। আল্লাহ তা'আলা আরও এরশাদ করিয়াছেন, “যখন আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি সমাপ্ত করিলাম এবং আমার রূহ তন্মধ্যে ফুঁকিয়া দিলাম। ”এখানে রূহের অর্থ সৃষ্টির সম্মান প্রদান করিলাম। যেমন বলা হয় যে, “নাকাতুল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহর উষ্ট্রী এবং “বাইতুল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহর ঘর। উল্লিখিত সম্বন্ধও তেমন অর্থেই ব্যবহৃত নয়। আর আল্লাহ তা'আলা আরও এরশাদ করিয়াছেন, “আমি মরিয়মের বক্ষদেশে আমার রূহ ফুঁকিয়া দিলাম৷” এই সম্বন্ধও উপরোক্ত সম্মানাত্মক সম্বন্ধের অন্তর্ভুক্ত। আর ইহাও বলা হইয়াছে যে , “আমি মরিয়মের প্রতি হযরত জিব্রাইলের (আঃ) রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছি।” এই কারণেই হযরত ঈসা (আঃ) কে আল্লাহ পাকের রূহ বলা হয়।

পরবর্তী পর্ব
সিঙ্গার ফুৎকার পুনরুত্থান ও হাশরের বিবরণ-

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...